Skip links

জেনারেলদের সাথে

স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মেজর এস. এম. সাইদুল ইসলাম (অব.) এর "জেনারেলদের সাথে" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 17 মিনিট

আমার দেখা প্রথম জেনারেল

“জেনারেল” শব্দটি বহুমাত্রিক, এবং ক্ষেত্র বিশেষে বিভ্রান্তিকর। অনেকে বলেন শব্দটি একা থাকলে সাধারণ, অন্যের সাথে থাকলে অসাধারণ। মেজর জেনারেল মুস্তাফিজ জেনারেল হবার আগ পর্যন্ত আমিও এই ধারণার সাথে একমত পোষণ করতাম। কারণ তখন পর্যন্ত আমরা মেজর ছাড়া জেনারেল দেখেছি শুধু মাত্র সেনাপ্রধানকে, তাও লেফটেন্যান্ট উপসর্গ সহ। সামরিক বাহিনীর বাইরে জেনারেল শব্দটির অবস্থা আরও জটিল। একা সাধারণ, আগে সাধারণ (জেনারেল সেক্রেটারি্), পরে মহা (সেক্রেটারি জেনারেল) অসাধারণ। এর ব্যাতিক্রম আছে জেনারেল ম্যানেজারের ক্ষেত্রে আগে বসেও তিনি মহাব্যবস্থাপক।

তবে এই পাঁচালির জন্যে আমি লিখতে বসিনি। বাংলা একাডেমী অভিধানে এই শব্দটির তিনটি অর্থ দেওয়া আছে। আমি তৃতীয় অর্থ অর্থাৎ সামরিক বাহিনীতে ফিল্ড মার্শালের আগের পদবীটির কথা বলার জন্যে লিখছি। সিনিয়র অফিসাররা আমার ধৃষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। কারণ তাঁরা প্রশ্ন করতে যত পছন্দ করেন উত্তর দিতে অতটা পছন্দ করেন না। তবুও আমি এই লেখাটা লিখে যেতে চাই। কারণ আমার জীবনের অনেকগুলি বছর কেটেছে জেনারেলদের সাথে। আর সাধারণ মানুষের এমন অসাধারণ মানুষ সম্পর্কে ব্যপক কৌতূহল।

আমার দেখা প্রথম জেনারেল হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান, আমাদের বেড়ে ওঠার সময় জিয়াউর রহমানের বিশাল প্রভাব ছিল এ দেশের মানুষের ওপর। জিয়াউর রহমানের নামে অনেক গল্পগাঁথা চালু ছিল। ওই বয়সে তার কতটুকু মিথ আর কতটুকু সত্যি তা বিবেচনা করার বোধবুদ্ধি ছিল না। তাঁকে দু’এক বারের জন্যে দূর থেকে দেখেছি।

আমি যে বছর (১৯৭৬) ক্যাডেট কলেজে ঢুকি, জিয়া তখন ক্ষমতায় নবাগত। দেশ থেকে আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী ইতিহাস অন্তর্হিত করা হয়েছে। দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে জিয়ার পোস্টার। সে সময় পত্রিকার উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে থাকত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঘোষণাসহ জিয়ার আরো অনেক কৃতিত্বের কথা। সম্ভবত ক্লাস এইটে পড়ার সময় আমি প্রথমবার জিয়াকে দেখি। তিনি আমাদের ক্যাডেট কলেজ পরিদর্শনে এসেছিলেন। আমাদের কলেজে ভিআইপিদের স্বাগত জানানোর জন্য ছাত্রদের রাস্তার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুভেচ্ছা স্বাগতম করতে হতো না। জিয়া খুব সংক্ষিপ্ত একটি ভাষণ দিয়ে বিদায় নেন। আমার কাছে একজন রাষ্ট্রপতিকে চাক্ষুষ দেখার চেয়ে সে ভাষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

জিয়াকে দ্বিতীয়বার দেখি ১৯৭৯ সালের ১ ডিসেম্বর উলশী যদুনাথপুর প্রকল্পের খাল খনন অনুষ্ঠানে। জিয়ার খাল খনন কর্মসূচির সূচনা এখানেই। প্রতি ক্লাসের তিনজন করে ছাত্র পাঠানো হয়েছিল আমাদের কলেজ থেকে। আমাকে কেন পাঠানো হলো, আমি জানি না। কলেজে বাগান করার সময় মাটি কোপানো ছিল আমার জন্য সবচেয়ে বিরক্তির কাজ। খাল কাটার কাজে আগ্রহী হওয়ার কোনো কারণই ছিল না। তবু খাল কাটা দলে নিজের নাম দেখে উল্লসিত হলাম। কারণ এই অজুহাতে অন্তত ক্যাডেট কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে যাওয়া হবে।

যদুনাথপুর যাওয়ার পর মনটা অন্য রকম হয়ে গেল। বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকে শুধু নয়, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জড়ো হয়েছে অনুষ্ঠানে। অনেকের আসার কারণ রাষ্ট্রপতিকে একনজর দেখা। তিনি হেলিকপ্টার থেকে নেমে বেশ খানিকটা পথ হেঁটে পৌঁছালেন অনুষ্ঠানে। আমাদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ক্যাডেট কলেজের ইউনিফর্ম পরে কোদাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ইউনিফর্ম পরে কাজ করতে পারবে?

তাঁর কথার জবাব দেবার মত করে আমরা ১৮ কিশোর বিপুল উৎসাহে অনেকটা মাটি খুঁড়ে ফেললাম।

জিয়াউর রহমানের সাথে শেষ দেখাটি অনেকদিন মনে থাকবে। সেই দেখা সরাসরি হয়নি। জিয়ার কফিন দেখেছিলাম টেলিভিশনে। আমরা তখন ক্লাস টুয়েলভে উঠি উঠি করছি, ক্যাডেট কলেজে এই সময়টি বড় আনন্দময়। পড়াশোনার চাপ কম। ক্লাস টুয়েলভের মত দায়িত্ব নেই। তবে বাঁদরামি আছে ষোল আনা। ক্লাস ইলেভেনের সবচেয়ে বড় কাজ দুষ্টুমিতে বৈচিত্র আনা। আমরা সেই মহৎ কর্মটিই করছিলাম কেমিস্ট্রি ল্যাবে। ক্যাডেট কলেজে আমরা শিক্ষকদের নামের আগে মিস্টার যোগ করে ডাকতাম। শিক্ষকদের সম্বোধনের এটি নাকি বিলেতি কেতা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ করা, মিস্টার রাখাল চন্দ্র ধর সেদিন আমাদের সামলাতে হিমসিম খাচ্ছিলেন।

এমন সময় সহপাঠী ইউসুফ (এখন ডঃ আবু ইউসুফ মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ, উপাচার্য নর্দান ইউনিভার্সিটি) পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকে বলে উঠলো জিয়া মারা গিয়েছেন। তার কণ্ঠস্বর কারো কানে পৌঁছালো কারো কানে পৌঁছালো না। আমি মনে করলাম, সে আমাদের সহপাঠী জিয়াকে পচাচ্ছে। শুধুমাত্র রাখাল চন্দ্র ধর কথাটি সিরিয়াসলি নিয়ে আমাদের সবাইকে একটি টেবিলের কাছে জড়ো করে, ইউসুফকে বললেন, ‘ঠিক করে বল, ইউসুফ বলল, “স্যার, আমি এমআই রুমের রেডিওতে শুনেছি, প্রেসিডেন্ট জিয়া হ্যাজ বিন অ্যাসাসিনেটেড”। ক্লাশের পরিবেশ মুহুর্তেই বদলে গেলো।

রাখাল চন্দ্র ধর ভালো ছাত্র ছিলেন। মাত্র কিছু দিন আগে জিয়ার সাথে হিজবুল বাহারে ঘুরে এসেছেন। তাঁর চোখ ছল ছল করতে থাকল। আমাদের ক্লাসমেটদের মধ্যে যাদের, প্রেসিডেন্টের সাথে নৌবিহারে যাবার সৌভাগ্য হয়েছিলো, তাঁরা সেই সব টুকরো টুকরো স্মৃতি হাতড়াতে থাকলো। যাদের সাধারণ জ্ঞান অসাধারণ, সেনাবাহিনী সম্পর্কেও খোঁজ খবর রাখে তারা সামরিক অভ্যূত্থান সম্পর্কে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে আমাদের মুগ্ধ করতে থাকলো।

আমাদের প্রিন্সিপ্যাল, লেফটেন্যান্ট কর্নেল নূরুল আনোয়ার একটু পর ক্লাস ইলেভেনকে ডেকে পাঠালেন তাঁর অফিসের সামনে। ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষা চলছে, তাই উনি ইলেভেনের সাথে কথা বলবেন। স্যারের অফিসের উল্টো দিকে খেলার মাঠের এক কোনায় আমরা জড়ো হলাম। স্যারদেরও প্রায় সবাই ছিলেন। প্রিন্সিপ্যাল কেবল বললেন, “ইট’স এ গ্রেট লস”। তাঁর গলা ধরে এলো, তিনি চোখে কালো সানগ্লাস পরে ফেললেন। একটু পর আবার বললেন, “গো টু হাউসেস, ডু নট লিসেন টু রিউমারস”।

হাউসে ফেরার সময় অনেক স্যারকে চোখ মুছতে দেখলাম। সে সময় ক্যাডেট কলেজে শনিবারের আলাদা একটা জেল্লা ছিলো, ক্লাস হতো মাত্র পাঁচ পিরিয়ড, আফটারনুন প্রেপের বদলে থাকত সোসাইটি, আর ডিনারের পর বড় পর্দায় মুভি। সেদিন তার কিছুই হলোনা। সারাটা কলেজ হয়ে রইলো নিষ্প্রাণ। সম্ভবত এর একদিন পর জিয়ার লাশ আনা হলো মানিক মিয়া এভিনিউতে।

টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হলো, জানাজার দৃশ্য। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি এর আগে বা পরে এত মানুষ মানিক মিয়া এভিনিউতে একসাথে জড়ো হয়নি । টেলিভিশনে জানাজার দৃশ্য দেখে মন খারাপ করে বেরুচ্ছিলাম আমরা সবাই। সিড়ির কাছে দেখি আমাদের হাউসের সুইপার দাঁড়িয়ে চোখ মুচছেন। (তার নাম ছিলো সম্ভবত রতন) বললাম কাঁদছেন কেন?

তিনি এবার ডুকরে উঠলেন, “একজন পেরসিডেন্ট আমার সাথে হ্যান্ডশিফ (হ্যন্ডশেক) করছেলো, হ্যারেও মাইরে ফ্যললো, কানবো না”!

Image Course: Wikimedia Commons

সশস্ত্র বাহিনীর পরীক্ষা

ঢাকা সেনানিবাসের শেষের দিকে যেখানে বিমান বাহিনীর কুর্মিটোলা ঘাঁটির শুরু তার ঠিক আগে নিচু পাঁচিল ঘেরা একটি চত্বর। তার ভেতরে দীর্ঘ বৃক্ষের ছায়ায় ইটের দেয়ালের লম্বা কয়েকটি টিনের দোচালা ঘর। ১৯৮২ সালে এটাই ছিল ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ড (আইএসএসবি)। চিঠি অনুযায়ী সকাল সাড়ে সাতটার একটু আগে সেখানে উপস্থিত হয়ে দেখি আমার মত আরও অনেকেই সেখানে হাজির হয়েছে, ব্যাগ, বোচকা নিয়ে।

তাদের মধ্যে রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের আমাদের সময়কার কলেজ প্রিফেক্ট আব্দুল্লাহ হিল বাকীকে (এখন মেজর জেনারেল) আমি চিনতে পারলাম। আগের বছর ইন্টার ক্যাডেট কলেজ ফুটবলের প্রিলিমিনারি রাউন্ডের যে খেলায় আমরা রাজশাহীকে ৩-১ হারিয়েছিলাম, সে খেলায় রাজশাহীর হয়ে মাটিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে হেড করে একটি গোল করেছিল বাকী, সেই থেকে তাকে আমি চিনি।

মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের একটা ছেলের সাথে পরিচয় হলো একটু পরে, তার নাম শাহনেওয়াজ (এখন এয়ার কমোডর), নুরুজ্জামান নামে রংপুর ক্যাডেট কলেজেরও একটি ছেলের পরিচয় পেলাম। অন্য কারো সাথেই আগে কোনদিন দেখা হয়নি। প্রথমে আমাদের কাগজপত্র চেক করে একটি ঘরে আমাদের জিনিসপত্র রাখতে বলা হলো। হাবিলদার পদবীর একজন এনসিও সারাক্ষণই আমাদের সাথে থাকলেন। এতদিন পর তাঁর নাম মনে করতে পারছিনা। তিনি বিভিন্ন অফিসিয়াল নির্দেশনার ফাঁকে ফাঁকে, অদ্ভুত ইংরেজিতে আমাদের হতোদ্যম করার চেষ্টা করতে লাগলেন। যেমন :

“আইএসএসবি ক্যান নট এভরি বডি ডু”।

“ইউ মে উইন ইফ গড কাইন্ড”।

তার সবচেয়ে প্রিয় বাক্য ছিল, “নো বডি ভায়োলেন্ট ডিসিপ্লিন”।

যে ঘরে আমাদের ব্যাগ বোচকা নামালাম, ঘরটি কমন রুমের মত। একদিকে টেলিভিশন, একদিকে বইয়ের আলমারি, এক কোনায় ক্যারম বোর্ড, দেয়ালে তিন বাহিনীর নানান ফর্মেশন সাইন। হাবিলদার সাহেবের কাছে জানা গেল এটি সৈনিকদের রিক্রিয়েশন রুম। আইএসএসবিতে থাকার সময়ই বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা। সেবার ফাইনালে উঠেছে দিনো জফের ইটালি আর প্যাসারোলার আর্জেন্টিনা। হাবিলদার সাহেবকে কয়েকজন অনুরোধ করল খেলা দেখানোর জন্যে। তিনি বললেন, “টিভি নো পারমিশন, নো বডি ভায়োলেন্ট ডিসিপ্লিন”।

একটু পরে আমাদেরকে পরীক্ষার জন্যে নিয়ে যাওয়া হলো। তখনও আইএসএসবিকে ভয়ংকর মনে হচ্ছে না। পরীক্ষা দিতে যারা এসেছে তাদেরকে খুব সিরিয়াসও মনে হচ্ছে না। আমাকে এহতেশাম ভাই বলে দিয়েছেন, “প্রথম দুই ঘন্টাতেই তুমি বুঝে যাবা, ৪দিন থাকছো কি থাকছো না। প্রথমে আইকিউ টেস্ট হবে। এটাকে স্ক্রিনিং টেস্টও বলে। এই টেস্ট যদি উৎরাতে না পারো তাহলে পত্রপাঠ বিদায়। তবে সেই বিদায় অত বিষাদময় নয়। ভ্রমণ ভাতা হিসাবে কিছু টাকা পাবা। যদি প্রথম ধাক্কায় টিকে যাও, কোঅপারেট এভরিওয়ান। বুদ্ধি দিয়ে পারো, সাহস দিয়ে পারো, এখানে ফার্স্ট সেকেন্ড হওয়ায় কিছু যাবে আসবেনা। কতজন নেওয়া হবে তারও ঠিক নেই। নির্দিষ্ট একটা স্ট্যান্ডার্ড তারা দ্যাখে। সেই স্ট্যান্ডার্ড পর্যন্ত যতজন যাবে সবাইকেই রাখবে।“

পরীক্ষা দিতে খারাপ লাগল না। এই পরীক্ষার মূল সমস্যা টাইম ম্যানেজমেন্ট। ২২ মিনিটে ৩৮ টা প্রশ্নের উত্তর দিতে হলো। সময়ের যতই টানাটানি মনে হোক, পরে ভেবে দেখেছি, সময় বাড়ালেও খুব একটা লাভ নেই। পারলে ঐ সময়ের মধ্যেই পারা যায়। সময় বেশি থাকলে অংকের বেলায় সাধারণ জিনিসও প্যাচ খেয়ে যায়। এরপর ১০০টি প্রশ্নের পরীক্ষা। সময় আধা ঘন্টা। সব মিলিয়ে এক ঘন্টারও কম সময়ে ১৩৮ নম্বরের পরীক্ষা। তারপর ঘন্টা খানেকের বিরতি।

আবার আমরা গিয়ে বসলাম রিক্রিয়েশন রুমে। এক কাপ চা আর নিমকপারা পাওয়া গেল নাস্তা হিসাবে। চা’তে দুধ চিনির আধিক্য দেখে পায়েসের কথা মনে হতে থাকল। ঘন্টা খানেকের মধ্যে আইকিউ টেস্টের ফল জানিয়ে দেওয়া হলো। অল্প কয়েকজন বাদে আমরা সবাই পাশ করেছি। যারা পাশ করেনি, তাদের বলা হলো লাঞ্চ নাগাদ তাদের টিএডিএর ব্যপারে ফয়সালা হয়ে যাবে। তারা লাঞ্চের পর চলে যেতে পারে। আর যারা পাশ করেছে তাদের মধ্য ৪ দিন কারা থাকতে পারবে, তা নির্ধারিত হবে পরের পরীক্ষার পর। সেই পরীক্ষার নাম PPDT (পিকচার পার্ফেকশন এন্ড ডেসক্রিপশন টেস্ট)।

আমদেরকে খুব কম সময়ের জন্যে কতগুলি অস্পষ্ট ছবি দেখানো হলো। ৩০ সেকেন্ডের মত সময় দেওয়া হলো ছবির চরিত্রগুলি বর্ণনা করার জন্যে, চরিত্র মানে, বয়স, আনুমানিক উচ্চতা এবং ওজন, লিঙ্গ, চুলের রঙ, এগুলির বর্ণনা। এরপর লিখতে হবে চরিত্রগুলি কি কাজ করছেন। সব শেষে ১৮০ সেকেন্ডে লিখতে হবে গল্প। PPDT’র আরেকটি অংশ হলো আলোচনা। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আলোচনা করতে হলো ছবির গল্পগুলি নিয়ে। তারপর আবার বিরতি। আমরা রিক্রিয়েশন রুমে ফিরে এলাম। কিছুক্ষণ পর এই পরীক্ষারও ফলাফল জানিয়ে দেওয়া হলো। আমরা যারা পাশ করেছি, তাদের প্রত্যেকের পোষাকের উপর একটা করে নম্বর লাগিয়ে দেওয়া হলো। হাবিলদার সাহেব তখনও আমাদের সাথে, তিনি বললেন এখন থেকে “নম্বারই নেম”।

আমার নাম হলো, ‘নাম্বার নাইন’। মন্দ লাগল না ব্যাপারটা। মাসুদ রানার নাম্বার ছিল এম আর নাইন।

বিকেলে শুরু হলো সাইকোলজি পরীক্ষা। সেখানেও বাক্য রচনা, গল্প লেখা, প্যারাগ্রাফ লেখা মোটামুটি এসব করেই পাঁচ ঘন্টা শেষ। পরীক্ষা শুরু হলো বাক্য রচনা দিয়ে প্রথমে ৬০টি ইংরেজি তারপর ২০ টি বাংলা। এহতেশাম ভাই বলেছিলেন, “কোন শব্দই বেশিক্ষণ দেখাবে না। সিরিয়াল মেইন্টেন করে লিখে যাবা, সিরিয়ালে ভুল হলে পরেরগুলো সব ভুল। আর যা লেখো তাতে যেন একটু সাহস, দেশপ্রেম এসব বোঝা যায়। যদি ব্লাড আসে কি লিখবা বলতো!” আমি বলেছিলাম, “কি লিখব?”

“ওই কিছু একটা লিখে দিও, যাতে তোমাকে ভিতু মনে না করে। গল্প, প্যারাগ্রাফ যা বলে সব কিছুর বেলায়ই কথাটা মাথায় রেখ”।

কি লিখেছিলাম, তার প্রায় কিছুই এখন মনে নেই। তবে এইটুকু মনে আছে, এহতেশাম ভাইয়ের পরামর্শ আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করেছি। পরীক্ষা শেষে রুমে আসতে আসতে দশটা বেজে গেল। পরের দিন প্রোগ্রেসিভ গ্রুপ টাস্ক, গ্রুপ ডিসকাশন, ইন্ডিভিজুয়াল অবস্টাকল, এক্সটেম্পোর স্পিচ। দেখলাম অনেকেই বিষয়গুলো জানে। কয়েকজন এর আগেও আইএসএসবি দিয়েছে, কেউ কেউ খুব ভালো করে শিখে এসেছে কোন ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে।

যাদের কথা-বার্তা শুনে একটু দুর্বল মনে হচ্ছিল, আমি তাদের কয়েকজনকে, এহতেশাম ভাইয়ের কাছে পাওয়া জ্ঞান বিতরণ করতে থাকলাম। আমার মনে হলো, কাজটা খারাপ না, প্রথমতঃ অন্যদের শেখাতে গিয়ে নিজের কতটুকু মনে আছে, সেটা ঝালাই হয়ে যাচ্ছিল, আর দ্বিতীয়তঃ যারা উপকৃত হচ্ছে, গ্রুপ টাস্কের সময় তারা হয়তো আমাকে ডাকবে। শুনেছি, যে যতবার গ্রুপ টাস্কে ডাক পায়, সে নাকি পরীক্ষকদের কাছে তত ভালো মার্কস পায়।

দ্বিতীয় দিনে ইন্ডিভিজুয়াল অবস্ট্যাকল ছাড়া আর সব কিছুই ভালো হলো। গ্রুপ ডিসকাশনের শুরুতেই অনেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ফলে কারো কথা শোনা যায় না। আমি ভাবলাম ওই যুদ্ধে যোগ দিয়ে কাজ নেই, তার চেয়ে যারা শুরু করে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনাই ভালো। এরপরে কোন এক ফাঁকে ঢুকে পড়তে পারলে, আস্তে ধীরে অ্যাংকরের ভূমিকা নেওয়া যায়। আমার ভাবনাটা গ্রুপ ডিসকাশনে ভালোই কাজে লাগল।

তৃতীয় দিন প্ল্যানিং এক্সারসাইজ, কমান্ড টাস্ক, মিউচুয়াল অ্যাসেসমেন্ট, প্রেসিডেন্সিয়াল ভাইভা, আর সব ছাপিয়ে আমার মনজুড়ে বিশ্বকাপের ফাইনাল। ডিনারের সময়ও হাবিলদার সাহেবকে রাজী করানো গেল না। তিনি বললেন, “নিড স্যার পারমিশন”। তখন মোবাইলের যুগ নয়, আর বেশির ভাগ আর্মি অফিসারের বাসায় টেলিফোনও ছিল না। সেই পারমিশনের চেষ্টাও করা গেল না। গভীর রাতে কে যেন জানালা দিয়ে ঢুকে টিভি অন করে ফেলল। সকালে কোনভাবে জানতে পেরে হাবিলদার সাহেব “এভরিবডি ভায়োলেন্টস ডিসিপ্লিন” বলে ফুঁসতে থাকলেন।

চতুর্থ দিন সকালে আমাদের সবাইকে আবার রিক্রিয়েশন রুমে জড়ো হতে বলা হলো। অনেকে ঘামতে থাকল অকারণেই। দুপুরের একটু আগে পাঁচজনকে গ্রিন কার্ড দেওয়া হলো। ক্যাডেটদের মধ্যে বাদ পড়লো নুরুজ্জামান। ক্যাডেট কলেজের বাইরের যে দুজন গ্রিন কার্ড পেয়েছিল তাদের একজনের নাম ইলিয়াস, সে নরসিংদী থেকে এসেছিল। আরেকজনের নাম মনে করতে পারছি না, তার বাসা ছিল মোহাম্মদপুর। আমি গ্রিন কার্ডের সাথে ২৩৪ টাকা পেলাম টিএ/ডিএ।

নিজেকে মহারাজা মনে হতে লাগলো। নাইনথ জিডিপির আইএসএসবিতে টিকেছি, শুধু তা-ই নয়, সেই সাথে ২৩৪ টাকা যাতায়াত ভাতা পেয়েছি। যশোরের ভাড়া ৫৫ টাকা। বাকি টাকা দিয়ে কী কী করা যায়, ভাবতে ভাবতে ১০ নম্বর বাসে উঠলাম। ক্যান্টনমেন্ট হয়ে এই বাস যায় বালুরঘাট থেকে গুলিস্তান। আমি নামব পরীবাগে, সেখান থেকে জাদুঘরের পেছন দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীমউদ্দীন হলে।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মেজর এস. এম. সাইদুল ইসলাম (অব.) এর “জেনারেলদের সাথে” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। এছাড়া বিশেষ ছাড়ে বইটি পেতে চাইলে ক্লিক করুন বুকশেয়ারের এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বইনগর পেজের ইনবক্সে। আর ইবুক হিসেবে পড়তে চাইলে ক্লিক করুন বইটইয়ের এই লিঙ্কে

আউটডোর এক্সারসাইজে একদিন

বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির ফার্স্ট টার্মারদের অবস্থা কর্মী মৌমাছির মত। সুসময়েও কোয়ার্টার চক্কর, জিসি ফ্রাই, আবে জমজমে পূণ্যস্নান, হ্যাভারস্যাকে ছয়টি ইট কাঁধে ফেলে সিনিয়রের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর বয়ান শোনা, অথবা তাঁর কোন হোমটাস্কে সাহায্য করা ছিলো একেবারেই ডাল ভাত। বিএমএর রাস্তায় ফার্স্ট টার্মাররা হাঁটতো না, সিনিয়রদের ভাষায় হাঁটা ছিল তাদের জন্যে হারাম।

মুখে কিছু না কিছু গুনগুন করতে করতে তাদের দৌড়ে চলাচল করা ছিল রেওয়াজ। সেই গুণ গুনানির অন্তর্নিহিত শব্দ কখনও স্লামালাইকুম স্যার হতে পারে, কখনও কারো নাম হতে পারে, যথা সময়ে সেসব প্রকাশ করা হবে। এরকম পরিবেশে নিপীড়িতদের ঐক্য মজবুত হয়। বন্ধুত্ব দানা বাঁধে কষ্টে, বিপদে, আউটডোর এক্সারসাইজে। আমাদের বন্ধনটা দানা বাঁধল প্রথম আউটডোর এক্সারসাইজ “পদক্ষেপে”।

বিএমএ থেকে শুরু করে তিন দিনে প্রায় ৯০ কিঃমিঃ পথ পায়ে হেঁটে আবার বিএমএতে ফিরে আসার পর শেষ হয় পদক্ষেপ। পথে নানান ভাবে যুদ্ধের আবহ তৈরি করা হয়। কখনও গুলি ছুঁড়ে শত্রুর উপস্থিতি বুঝানো হয়, কোথাও কৃত্রিম প্রতিবন্ধক সৃষ্টি করা হয়। প্রশিক্ষকরা তখন শত্রু পক্ষ। ক্যাডেটদের এসব মোকাবেলা করতে হয় যুদ্ধের মতই, যুদ্ধের নিয়মে। বন্ধু চেনার সেটি সেরা সময়।

এই এক্সারসাইজে আমাকে প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হলো, কাদেরকে দেওয়া হলো আমার রানারের (আর্দালি)দায়িত্ব। রানার হবার জন্যে কাদেরের জন্ম হয়নি। আমি অর্জুন সাজার যোগ্যতা রাখি বা না রাখি কাদের আমার সত্যিকারের সারথি হয়ে উঠলো। প্রায় আধাদিন হাঁটার পর, প্লাটুন কমান্ডার মেজর আলাউদ্দিন মোহাম্মাদ আব্দুল ওয়াদুদ, বীরপ্রতীক আমার পয়েন্ট সেকশনকে (সব চেয়ে সামনের সেকশন) কোন এক অজুহাতে রাস্তার পাশের জলায় নামিয়ে দিলেন।

আমাদের গতি কমে গেল। সামনের প্লাটুন থেকে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি, কাদের বলল, “তিন নম্বর সেকশনটাকে সামনে পাঠিয়ে দে। আর জলারটা হোক তিন নম্বর, গতি ঠিক থাকবে”। আমি তাই করলাম। মেজর ওয়াদুদ আমার দিকে একটু অন্যভাবে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টিতে সপ্রশংস বিস্ময়। এক্সারসাইজের পর তিনি আমাকে বললেন, “Where did you get that Idea? I really liked it”.

একটু পর একটি ব্রিজ পার হতে গিয়ে ঝামেলায় পড়লাম। প্লাটুনের সবাই হুড়মুড়িয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ব্রিজ পার হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের সময় পদাতিকের ব্রিজ পার হবারও একটি নিয়ম থাকে। সেই নিয়মের কথা তখনও আমরা শিখিনি। মেজর ওয়াদুদ, আমাকে ডেকে সবাইকে থামাতে বললেন। আমি সবাইকে ব্রিজের এপারে ফিরে আসতে বললাম। তিনি আমাকে আলাদা ডেকে বললেন, “টেল দেম টু ক্রস দ্য ব্রিজ ইন লিপ ফ্রগিং ম্যনার, ডু য়ু নো হোয়াট ইজ দ্যাট?” ডানে বায়ে মাথা ঝাকালাম।

বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন, “স্পিক আপ ব্লাডি চ্যাপ”। বললাম, “আই ডোন্ট নো স্যার”। আমাকে বেশ সময় নিয়ে তিনি বিষয়টা বোঝালেন। খুবই সহজ ব্যাপার, হুড়মুড়িয়ে পার না হয়ে দুই জন করে, পার হবে, বাকি দু’জন তাদের কভার করবে। প্রথম যারা সামনে এসেছে তারা কিছু দূর গিয়ে অবস্থান নেবে, এতক্ষণ যারা কাভার করছিল তারা তখন সামনে যাবে। এভাবেই একে অন্যের নিরাপত্তায় থেকে অথবা একে অন্যকে নিরাপত্তা দিয়ে ব্রিজের এপার থেকে ওপারে যাবে।

আমি প্লাটুনের সবাইকে সেটা বুঝিয়ে বললাম। প্রায় সারাদিনের পরিশ্রম আর ক্লান্তিতে তারা তার কতটুকু বুঝল জানিনা। দু’এক জন বাদে সবাই আগের মতই দৌড়ে যেতে থাকল। মেজর ওয়াদুদ আবার আমাকে ডেকে জিগ্যেস করলেন, “ডিড য়ু টেল দেম হাউটু ডু ইট?”

বললাম, “ইয়েস স্যার।”

“টেল দেম এগেইন”, বললেন তিনি।

আবার বললাম সবাইকে। কিন্তু পারাপার পদ্ধতির কোন পরিবর্তন হলোনা। মেজর ওয়াদুদ, এবার বিষ্ফোরিত হলেন আমার উপর। একটু আগে যে রেট অব এডভান্স ঠিক রাখার জন্যে আমার উপর তিনি প্রসন্ন হয়েছিলেন, তার কোন চিহ্ন নেই তার আচরণে। ডেকে বললেন, “ইয়ু হ্যাভ ফেইলড টু কনভে মাই মেসেজ টু দেম”। বেশিক্ষণ চাপের মধ্যে থাকলে আমি নিজেকে সামলাতে পারিনা। বললাম, “স্যার আই হ্যাভ টোল্ড দেম সেভারেল টাইমস, ইফ দে ডু নট লিসেন হোয়াট ক্যান আই ডু?”

তিনি হিম শীতল গলায়, “আই উইল নাউ গিভ ইউ আ কিক এন্ড ইউ উইল ফল ইন টু দ্যা রিভার” বলে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। ব্রিজের লোহা আর কাঠের পাটাতনের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম, ফিট তিরিশেক নিচে দিয়ে বয়ে যাওয়া হালদা নদীর তাতে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি আগের মতই বয়ে চলেছেন। নির্ভার, নির্ভয়। আমার মাথায় প্রথম চিন্তা এল, আমি তো সাঁতার জানিনা!

আরও সামনে কুয়াইশ বা নওয়াপাড়ার কাছে, জায়গাটির নাম সঠিক মনে নেই, একটি খাল পার হবার সময়, ক্যাপ্টেন এস এম আবু রেজা বদান্যতায় খালের পানিতে চুবানি খেয়ে আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। হ্যাভারস্যাকে রাখা দুটি কম্বল, গ্রাউন্ডশিট, ইউনিফর্ম, জুতাসহ যাবতীয় অস্থাবর ভিজে অব্যবহার্য। সেই রাতে আমাদের তাঁবু পড়ল, বুড়িশ্চরে। কুয়াইশ বুড়িশ্চর কলেজের মাঠে।

ডিসেম্বরের রাত। ভেজা কম্বল, আর জিনিস পত্তরের কারণে বিভকের ভেতরে মোটামুটি কোল্ড স্টোরেজ অবস্থা। বিকেল থেকে ভেজা কাপড়ে থেকে আমার হাত পায়ে কোন সাড়া পাচ্ছি না। কাদেরকে কিছু বলিনি, তবে এই দীর্ঘ রাত ভেজা কম্বলে কিভাবে কাটাবো ভেবে ভেবে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছি। কাদের বলল, “তুই ব্যাটা খামাখা চিন্তা করস, আমার কম্বল আছে না! তুই যেহেতু ভিজছস, আগে তোরে কম্বল পেচা করে গরম করব, দেন উই উইল শেয়ার দ্য ব্ল্যঙ্কেট”। রাতে কম্বলের ভাজে আমার এক জোড়া ভেজা ডাংরি রেখে তার উপর ঘুমিয়ে সেটাকে প্রায় শুকিয়ে ফেলল সে। বলল, “এই শীতে পরপর দু’দিন ভেজা ডাংরি পরলে তোর খবর হয়ে যাবে”।

কাদেরকে কৃতজ্ঞতা জানাবার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। সে হঠাৎ বলল, “আচ্ছা তুই ফাইনালি বিএমএ তে আসলি কেমনে বলতো!” বললাম, “পরে শুনিস, এখন শীতে মারা যাচ্ছি, বলতে ভাল্লাগছে না”। সে বলল, সিদুল, এখন জিগাইসি। বললি না, পরে কিন্তু বলার সুযোগ পাবি না”। বললাম, “দোস্ত অনেক ঝামেলা হয়েছে, আর্মি হেড কোয়ার্টার বলল, এয়ারফোর্স থেকে এনওসি লাগবে।“

“এনওসি কি ?” কাদেরের প্রশ্ন।

“এনওসি মানে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট, আমি সেনাবাহিনীতে গেলে এয়ারফোর্সের কোন আপত্তি নেই সেটা লিখিত ভাবে জানানো, অনেক রিকোয়েস্ট করে, সেটা নিতে হয়েছে।”

কাদের হঠাৎ বলল, “তুই ব্যাটা এয়ারফোর্সে যাইতি সেটাই ভালো হতো, আমাদের কথায় জানডা বরবাদ করার জন্যে আর্মি আইছস।”

কাদেরের কথার কোন উত্তর দিলাম না। আমার মন বলল, এয়ারফোর্সে তোদের মত বন্ধু পেতাম কই। একটু পর, পর আমার চোখ ভিজে যেতে লাগল। রাতের বিভকের নিকষ কালো আঁধারে, তা দেখা যায়না।

Image Course: army.mil.bd/

শাস্তির অভিজ্ঞতা

টেন্থ লং কোর্সে আমরা ৯৮ জন প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলাম। সেকেন্ড টার্মে উঠতে উঠতে আমাদের সংখ্যা কিছু কমে গেল। প্রশিক্ষণে ভালো না করার জন্যে বিদায় নিতে হলো কয়েকজনকে। ৩ জন পরের কোর্সে রেলিগেটেড হয়ে গেল। অন্যদিকে নাইন্থ লং কোর্স থেকে রেলিগেটেড হয়ে আমাদের কোর্সে যোগ দিল কয়েক জন। এই টার্মে স্বাধীনতা কিছুটা বাড়লেও জীবনটা হয়ে পড়ল ফটিকের মত। সেকেন্ড টার্মারদের মত বালাই বিএমএতে আর কিছু নেই। পান থেকে চুন খসলে সিনিয়র টার্মারদের রোষানলে পড়তে হয়। ফার্স্ট টার্মের দুই একটা ভুল ভ্রান্তি উপেক্ষা করা হলেও সেকেন্ড টার্মে সেই ভুলের পুনরাবৃত্তির সুযোগ নেই। এক্সারসাইজ অনুসন্ধানে একটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেল।

অনুসন্ধানের জন্যে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সীতাকুন্ডের এক পাহাড়ি এলাকায়। পাহাড়ের উপরে নিচে মিলিয়ে ছোট ছোট বিভকে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। দুই পাহাড়ের মাঝের এক ছায়াঘেরা এক চিলতে সমতলে আমাদের বেইস ক্যাম্প। সূর্য ওঠার আগে আর সূর্য ডোবার পর দুই বার বেইস ক্যাম্পে গিয়ে খাবার আনতে হয়। খাবারের জন্যে মেসটিন, পানির জন্যে ক্যানটিন, ছাড়া অন্য কোন তৈজস নেবার অনুমতি নেই।। সকালে ভালোই লাগে। গাছের ছায়ায় বসে থাকলে দুপুরেও খারাপ লাগে না। সমস্যা হয় টহলে বের হলে। মেসটিনে থেকে থেকে চৈত্রের তাতানো দুপুরে খাবার বিস্বাদ হয়ে যায়, ক্যান্টিনের পানিতে হাত লাগলে হাতে ফোস্কা ওঠার মত অবস্থা হয়। হালকা বাতাস যখন এক আধবার ঘামে ভেজা শরীর ছুঁয়ে দিয়ে যায়, তখন মুহুর্তের জন্যে একটু ভালো লাগে, তারপর আবার যা, ছিল তাই।

অনুসন্ধান হচ্ছে পেট্রলিং বা টহল শেখানোর এক্সারসাইজ। আগে আমাদের টহল সম্পর্কে তাত্ত্বিক জ্ঞান দেওয়া হয়েছে ক্লাশে। আমরা জেনেছি পেট্রলিং সাধারণত দু’টি কারণে করা হয়। এক, তথ্য সংগ্রহ আর দুই, নিজেদের তথ্য গোপন করা। কর্ম পদ্ধতি এবং কাজের উদ্দেশ্য’র উপর নির্ভর করে টহলের ধরন। তার মধ্যে কোনটি স্ট্যান্ডিং পোস্ট বা লিসনিং পোস্ট, কোনটি রেকি পেট্রল, কোনটিবা ফাইটিং পেট্রল। এক্সারসাইজ অনেকটা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার মত। খেলার যেমন নিয়ম কানুন থাকে, এক্সারসাইজেরও তেমন নিয়ম নীতি থাকে। গোলাগুলি করার আইন, এক্সারসাইজের সীমানা, পোশাক, সময় অসময়, চিকিৎসা, সত্যিকারের বিপদ সবকিছুর জন্য নির্দেশনা দেওয়া থাকে এক্সারসাইজ পেপারে। টহলের জন্যে আমাদেরকে ব্ল্যাঙ্ক এমুনিশন দেওয়া হয়েছে। আসল গুলির মত তাতে সিসা থাকেনা ব্ল্যাঙ্ক এমুনিশনে, গুলির মুখে বারুদ থাকে। কাছ থেকে গুলি করলে, সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা। প্রশিক্ষণের সময় টার্গেটের (মানুষ) ১০০ গজের মধ্যে, গুলি করা নিষেধ।

একদিন দুপুরে ফাইটিং পেট্রলে বেরিয়েছিল দু’টি দল। রেকি পেট্রলে যেমন শত্রুকে এড়িয়ে চলতে হয়। ফাইটিং পেট্রল তেমন নয়। ফাইটিং পেট্রল মোটামুটি যুদ্ধংদেহি। দৈবাৎ শত্রুর সাথে দেখা হয়ে গেলে, ছেড়ে কথা বলা হবেনা। আমাদের দল দু’টিও ছেড়ে কথা বলেনি। ১০০ গজের মধ্যে গুলি করার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, উত্তেজনার আতিশয্যে একজন একেবারে কাছ থেকে অন্যদলের উপর গুলি করে বসল।

গুলিতে মারাত্নক আহত হয়ে লুটিয়ে পড়ল মাহমুদ হোসেইন নামে একজন। চোখের নিচে সরাসরি গুলি লেগে বারুদ ছড়িয়ে পড়েছিল তার চোখ মুখে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে সরাসরি তাকে ইস্পাহানি চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। খবর শুনে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। বিএমএতে জয়েন করার দিন আমি আর হোসেইন, একই ট্রেনে এসেছিলাম। রাজশাহী বোর্ডে এসএসসি, এইচএসসিতে স্ট্যান্ড করা হোসেইন বিএমএতেও খুব ভালো করছিল। ও বিএমএতে থাকতে পারবে কিনা, অথবা চোখে দেখতে পারবে কিনা ভাবতে ভাবতে, আমার টহলের সময় এসে গেল।

রাত ভর টহল দিয়ে ভোর সাড়ে চারটার দিকে বেইস ক্যাম্পে ফিরে চা খেতে এসে দেখি, আব্দুল্লা হীল বাকী পরের দিনের ফাইটিং পেট্রলের জন্য দল গোছাচ্ছে। অনুসন্ধান এক্সারসাইজে প্রশিক্ষকরা শুধু টহলের ধরন, সময় আর দল নেতা নির্বাচন করে দিতেন। দলনেতা তার পছন্দ মত দল বেছে নিত। বাকীও আমার মতই এয়ারফোর্সের আইএসএসবিতে সিলেক্ট হয়ে আর্মিতে এসেছিল। বিএমএতে আমাদের দু’জনের পোস্টিংও হয়েছে একই প্লাটুনে। বাকী যদি আমাকে টহল দলে চায়, আমাকে আবার যেতে হবে। তাই আমি তাকে বললাম, “তুমি কিন্তু আমাকে দলে রেখোনা, যদি রাখো আমি মাথায় ব্যান্ডেজ বানবো, যেন আমাকে দেখে আহত মনে হয়, মোট কথা আমি আজ আর যেতে চাইনা”।

টহল ফেরত আরও কয়েকজন সেখানে আড্ডা দিচ্ছিল। আগের দিন দুপুরে আমাদের এক কোর্সমেটকে আমাদের নতুন প্লাটুন কমান্ডার ক্যাপ্টেন মইনুল ইসলাম (পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল) কিভাবে শাস্তি দিয়েছেন, সেটা নকল করে দেখালো একজন। আমিও তালে তালে, প্লাটুন কমান্ডারকে নিয়ে খানিক টিপ্পনি কেটে, আমার বিভকের পথ ধরলাম। নিচ থেকে কে যেন ডেকে বলল, “সাইদুল, প্লাটুন কমান্ডার ডাকছেন”। আমার মনে হলো, এটা কোর্সমেটদের ফাইজলামি। বললাম, “মইনুলরে বল আমার সময় নেই”। তারপর যেমন যাচ্ছিলাম, তেমন যেতে থাকলাম।

দু’এক কদম যাবার পরই, কারো বাঁজখাই গলায় আমার নাম শুনে থমকে দাঁড়ালাম। দেখলাম ক্যাপ্টেন মইনুল বেইস ক্যাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকছেন। ভয় পেয়ে গেলাম তাঁকে দেখে, মনে হলো এতক্ষণ সব কথাই তিনি শুনেছেন আড়াল থেকে। আমি দৌড়ে তাঁর কাছে যাওয়া মাত্রই তিনি বললেন, স্টার্ট ফ্রন্ট রোল। আগের রাতের বৃষ্টিতে বেস ক্যাম্পের কাছে পানি জমে ছিল। সেই পানিতে ডিগবাজি দেওয়া শুরু করলাম। তিনি খুবই নিরাসক্ত দৃষ্টিতে স্টিক চেয়ারে বসে প্রকৃতি দেখতে থাকলেন। যখন আমি দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি তখন তিনি মুখ খুললেন, “ব্লাডি হোয়াইট গোট, ওয়াট ডিড ইয়ু সে ?” আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “স্যার আই ওয়াজ জোকিং”।

উনি বললেন, “ইয়ু ডোন্ট হ্যাভ টু স্ট্যান্ড আপ টু সে দ্যাট, কিপ রোলিং”

আমি আবার ডিগবাজি শুরু করলাম।

উনি আরেকটু পর বললেন, “আর ইয়ু টায়ার্ড?”

আমি কিছু বললাম না। উনি বললেন, “গেট আপ”। ভাবলাম শাস্তি বুঝি শেষ হলো। পাশের একটা পাহাড় দেখিয়ে উনি বললেন, “ক্যান ইয়ু জাজ দ্য ডিসটেন্স?”

বললাম, “ইটস বিটুইন ফোর হান্ড্রেড এন্ড ফোর ফিফটি?”

“ওকে, গো এন্ড টাচ দ্য হিল এন্ড কাম ব্যাক।”

ঠিক মত দাঁড়াতে পারছিলাম না। তারপরও দৌড়াতে হলো। ফিরে আসার পর ক্যাপ্টেন মইনুল বললেন, “ইউ রান লাইক অ্যা প্রেগন্যান্ট ডাক।” আমি তখন তাঁর কথার জবাব দেবার অবস্থায় নেই। সাড়ে চারটার সময় যখন আমি শাস্তি খাওয়া শুরু করেছি, তখনও সুবেহসাদিক হয়নি, এখন পুবের আকাশে লালিমা ছাড়িয়ে গাছ পালার ফাঁক দিয়ে সূর্য ওঠা শুরু করেছে। আমাকে আবার যেতে হলো পাহাড় ছুঁতে। এভাবে কতবার যেতে হয়েছিল মনে নেই। এক সময় ক্লান্তিতে দাঁড়াতে পারছিলাম না। চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ার আদেশ হলো।

ক্যাপ্টেন মইনুল বললেন, “স্ট্রেচ ইয়োর লেগ। টেইক ডিপ ব্রেথ।” একটু দম ফিরে আসতে না আসতেই, বললেন, “স্টার্ট সাইড রোল” অবশেষে সাড়ে ছয়টার সময় শেষ হলো পানিশমেন্ট। তিনি বললেন, “য়ু ওয়ান্ট টু বি এ গুড অফিসার?” আমি নিশ্চুপ। মইনুল বললেন, “ইফ য়ু ওয়ান্ট টু বি এ গুড অফিসার, আই ক্যান মেইক ইট। ইফ য়ু ডোন্ট ওয়ান্ট, গেট আউট অব দ্যা একাডেমি। ডোন্ট স্পয়েল আদার্স”। তাঁর হাত থেকে ছাড়া পেয়ে, কাদায় মাখামাখি হওয়া জামা কাপড় নিয়ে বিভকের সামনে শুয়ে পড়লাম। তখন ধীরে ধীরে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ছে পাহাড় থেকে পাহাড়ে। সকালে যারা টহলে যাবে, বেস ক্যাম্পের সামনে তাদের ব্রিফিং হচ্ছে। আমার কানে তার দুই একটা কথা ভেসে আসছিল। কিন্তু ক্লান্তিতে আমি চোখ খুলে রাখতে পারছিলাম না।

Image Course: army.mil.bd/

টীকা

এমআই রুম : মেডিকেল ইন্সপেকশন রুম/হাসপাতাল

আফটারনুন প্রেপ : দুপুরের পাঠ প্রস্তুতি

সোসাইটি : সহ শিক্ষা কার্যক্রমের জন্যে ক্যাডেটদের ক্লাব

হিজবুল বাহার : বাংলাদেশের প্রথম যাত্রীবাহী জাহাজ, জিয়াউর রহমান এই জাহাজে মেধাবী ছাত্রদের নিয়ে সমুদ্র বিহারে গিয়েছিলেন।

কলেজ প্রিফেক্ট : ছাত্রদের পরিচালনার জন্যে কলেজ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রদের মধ্য থেকে নিয়োজিত প্রধাণ লিডার

এনসিও : নন কমিশন্ড অফিসার (ল্যান্স কর্পোরাল থেকে হবিলদার পর্যন্ত)

টিএডিএ : ট্রাভেলিং এলাউন্স এন্ড ডেইলি এলাউন্স এক কথায় ভ্রমণ ভাতা।

কোয়ার্টার চক্কর : ক্যাডেটদের কোম্পানি লাইনের চারিদিকে সিকি মাইল দৌড় 

জিসি ফ্রাই : প্রখর রোদে সংক্ষিপ্ততম পোষাকে পিচের রাস্তায় সূর্যমুখী হওয়া 

আবে জম জম : বিএমএর ঘোড়ার আস্তাবলের পয়ঃনিষ্কাশনের নর্দমা 

বিভক : ছোট্ট তাঁবু 

ডাংরি : কভারল জাতীয় পোশাক 

মেসটিন : খাবার নেবার চ্যাপ্টা ধরণের স্টিল অথবা টিনের বাটি

ক্যান্টিন : সৈনিকের পানির বোতল



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মেজর এস. এম. সাইদুল ইসলাম (অব.) এর “জেনারেলদের সাথে” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। এছাড়া বিশেষ ছাড়ে বইটি পেতে চাইলে ক্লিক করুন বুকশেয়ারের এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বইনগর পেজের ইনবক্সে। আর ইবুক হিসেবে পড়তে চাইলে ক্লিক করুন বইটইয়ের এই লিঙ্কে

Featured Image: wallpaperflare.com

আপনার মন্তব্য লিখুন