Skip links

আমি কেন লিখি: জর্জ অরওয়েল

আদর্শ থেকে প্রকাশিত আফসানা বেগম এর "লেখক হওয়ার পথে" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 12 মিনিট

খুব অল্প বয়সে, সম্ভবত আমার বয়স যখন বড়জোর পাঁচ কি ছয়, তখনই আমি বুঝেছিলাম যে বড় হয়ে আমাকে লেখক হতে হবে। তারপর সতেরো থেকে চব্বিশ বছরের মাঝামাঝি সময়টাতে আমি সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে এলাম, কিন্তু সেটা করেছিলাম আসলে নিজের স্বভাবজাত প্রকৃত বৈশিষ্ট্য অগ্রাহ্য করে। আর তারপর দেরিতে হলেও আমি তা বুঝতে পারলাম, পাকাপাকিভাবে তাই লেখালেখিতেই ফিরে এলাম।

বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে আমি ছিলাম মেজো, বাকি দুজনই আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট এবং বড়। আট বছর বয়সের আগে বাবাকে তেমন দেখেছি বলে মনে পড়ে না। হয়তো এ জন্যই কিংবা অন্য কোনো কারণে আমি ছিলাম কিছুটা নিঃসঙ্গ, আর তাই হয়তো সে সময় আমি কিছুবদভ্যাস রপ্ত করে ফেলেছিলাম, যা আমাকে স্কুলর বাকি সবার কাছে খানিকটা অপ্রিয় করে তুলল।

একাকী একটা শিশুর মতো আমার একা একা বসে থাকা আর কল্পনায় গল্প বানানোর অভ্যাস হয়ে গেল। একা একাই আমি বিভিন্ন চরিত্র হয়ে নিজের সঙ্গে কথা বলতাম। আর আমি নিশ্চিত, তখন থেকেই সেই একাকিত্ব আর অবহেলার অনুভূতি আমার ভেতরে সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা জাগিয়ে তুলেছিল। আমি জানতাম শব্দ এবং তার ব্যবহারের মাধ্যমে সব প্রতিকূল তা জয় করার এক অদ্ভুত শক্তি ছিল আমার ভেতরে। আর আমার মনে হলো, এই শক্তি কাজে লাগিয়ে আমি নিজের জন্য এমন একটা বলয় তৈরি করতে পারি, যার বাইরে দৈনন্দিন জীবনের সব অসফলতাকে বুড়ো আঙুল দেখানো যায়। যদিও সেই বয়সে লেখার পরিমাণটা ছিল একেবারেই হাস্যকর— খুব মনোযোগ দিয়ে লেখা বলতে গেলে সম্পূর্ণবাল্যকালে সব মিলিয়ে আধা ডজন পাতার বেশি না।

চার-পাঁচ বছর বয়সে আমি প্রথম কবিতা লেখি, মা সেটা পড়ার জন্য আমার কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলেন। কবিতাটা ছিল বাঘ সম্পর্কিত, এর বাইরে আর কিছু মনে পড়ে না এখন। সেই বাঘের ছিল ‘চেয়ারের মতো দাঁত’— যথেষ্ট গম্ভীর তুলনা! তবে সেই সুন্দর কবিতাটি ছিল ব্লেকের ‘বাঘ, বাঘ’ কবিতার একটি নকল সংস্করণ।

এগারো বছর বয়সে, যখন ১৯১৪-১৮ সালে যুদ্ধ লাগবে লাগবে করছিল, আমি একটি দেশপ্রেমের কবিতা লিখেছিলাম। কবিতাটা সেখানকার আঞ্চলিক একটি কাগজে প্রকাশিত হলো। আর তার দুই বছর পরে আরেকটি কবিতা একই কাগজে এল, কিচেনারের (ব্রিটিশ  ফিল্ড মার্শাল, ১৮৫০-১৯১৬— অনুবাদক) মৃত্যুর সময়। তারপর ধীরে ধীরে, আমার বয়স যখন আরেকটু বাড়ল, আমি জর্জিয়ান (আঠারো শতকের শুরুর দিকে লিখিত ইংরেজি কাব্যের ধারা— অনুবাদক) স্টাইলে কিছুবেশ খারাপ আর অসমাপ্ত কবিতা লিখেছিলাম। আমি তখন কিছুছোটগল্প লেখারও চেষ্টা করেছিলাম, যেসব ছিল ভয়ংকর রকমের ব্যর্থতা। তবে সেই চেষ্টাটাই ছিল আগামীতে আমি যে কাজে মনোনিবেশ করব তার খসড়া।

সে যা-ই হোক, এই পুরো সময়টা আমি সাহিত্যের কর্মকাণ্ডের মধ্যে জড়িত ছিলাম। মূল কাজ শুরু করার আগে আমি সে রকম কিছু কাজ করতাম, যা খুব তাড়াতাড়ি করে ফেলতে পারি, অথচ তেমন কোনো আনন্দ পাই না, তবে করি। স্কুলর কাজের বাইরে, কিছুনির্দিষ্ট উপলক্ষ নিয়ে কবিতা, কিছুকৌতুক কবিতা লিখতাম আর লিখতাম এত দ্রুত যে, সেই গতির কথা ভাবলে এখন আমার ভীষণ অস্বাভাবিক লাগে।

মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে আমি ছড়ার মতো করে ছন্দ মেলানো একটি নাটক লিখে শেষ করে ফেলেছিলাম, লিখেছিলাম অ্যারিস্টোফেনের (প্রাচীন গ্রিসের নাটক রচয়িতা, যাকে তার কৌতুক নাটকের জন্য বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪৮-৩৮০— অনুবাদক) লেখার ধরন অনুকরণ করে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে লিখে ফেলেছিলাম সেটা, এডিটিং শেষ করে স্কুল ম্যাগাজিনে সেটা ছাপতে দিয়েছিলাম। সেই ম্যাগাজিন ছিল একটা রম্য রচনাধর্মী প্রকাশনা। তবে সেটি করতে আমার এত পরিশ্রম করতে হয়নি, আজকের দিনে খুব নিম্নমানের সাংবাদিকতা করতেও যতটা কষ্ট করতে হয়।

সেভাবেই ধীরে ধীরে আমি সাহিত্যের বিভিন্ন অনুশীলনের মধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চেষ্টা করছিলাম; তখন একটা সময় ছিল যে আমি নিজেকে নিয়ে ক্রমাগত গল্প বানাতাম, যেন আমার মনের ভেতরে ডায়েরির মতো কিছু একটা ছিল। আমার মনে হয় ছোট বাচ্চাদের জন্য এটা খুব প্রিয় আর সাধারণ একটা কাজ। একেবারে ছোটবেলায় আমি নিজেকে নিয়ে যখন নানান কল্পনায় ব্যস্ত থাকতাম, ধরা যাক আমি মনে করতাম যে আমি রবিন হুড, নিজেকে তার মতো বিভিন্ন রোমাঞ্চকর দৃশ্যে দেখতাম, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আমার কল্পনাগুলো কেন যেন কেবল আমার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছিল না, ছড়িয়ে পড়ছিল, আমি তখন আমার চারপাশে যা আছে, যত মানুষ আছে সবাইকে নিয়ে কল্পনা করা শুরু করলাম, মনের ভেতরে সেসব বর্ণনা করতাম। 

কয়েক মিনিটের জন্য আমার মাথার ভেতরে এ ধরনের ব্যাপার ঘটে যেত: ‘সে ঘরের দরজাটি ঠেলে ভেতরে এলো। হলুদাভ একটা আলোকরশ্মি মসলিনের পর্দা ভেদ করে টেবিলের ওপরে পড়েছে, যেখানে ম্যাচের বাক্সটি রাখা, আধা খোলা, কালির দোয়াতের পাশে পড়ে আছে যেন। ডান হাত পকেটে রেখে সে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। নিচে রাস্তার ওপরে কচ্ছপের পিঠের মতো উপুড় হয়ে একটা বিড়াল একটা শুকনো পাতাকে ধাওয়া করছে’… ইত্যাদি, ইত্যাদি।

প্রায় পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত আমি এই অভ্যাসটা ছাড়তে পারিনি, বলতে গেলে আমার সাহিত্য সৃষ্টির সময়ের আগপর্যন্ত। মনে হতো আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধেই যেন ক্রমাগত বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছি, কোথা থেকে যেন একটা তাগিদ আসছে। বর্ণনার ভাষা আর ধারাটা হতো আমার প্রিয় বিভিন্ন লেখকের মতো, বিভিন্ন বয়সে আমি যাদের ভক্ত হয়েছিলাম, কিন্তু আজ যতটুকু মনে পড়ছে, বর্ণনাগুলো সব সময় খুব সতর্ক হয়ে বানাতাম, কোথাও যেন কোনো ভুল না হয়। 

লেখক হওয়ার পথে বই থেকে জর্জ অরওয়েল এর কথা

Image Course: thebridgehead.ca

আমার বয়স যখন ষোলো, আমি শব্দ নিয়ে খেলায় যে খুব মজা, সেটা আবিষ্কার করলাম, শব্দের ছন্দ কিংবা এক শব্দ থেকে আরেক শব্দের জন্ম— এসব নিয়ে খেলতাম; মনে মনে প্যারাডাইস লস্ট থেকে লাইন আওড়াতাম। তারপর সেই চেষ্টা চলতেই থাকল। 

সেসব করতে যে কেবল মজাই পেতাম, তা নয়, মাঝে মাঝে আমার মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত নেমে যেত, এক শব্দের বানানের সঙ্গে আরেক শব্দের বানানের তুলনা করতাম, উল্টো করে লিখতাম, প্রতিবার শিহরিত হয়ে উঠতাম। একটা ঘটনাকে কী করে বর্ণনা করতে হয়, তা তত দিনে আমার হাতে চলে এসেছিল। বলতে গেলে সেটা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আয়ত্ত করে ফেলেছিলাম। সুতরাং, কী ধরনের বই লিখতে চাই, সেটাও বুঝে গিয়েছিলাম। যদিও লিখিনি, তবু এটুকু জানতাম যে লেখার কাজেই আমি ভবিষ্যতে মনোনিবেশ করতে চাই।

আমি বড় আয়তনের সামাজিক উপন্যাস লিখতে চাইছিলাম, যার শেষ হবে বিষাদে, সেখানে থাকবে প্রতিমুহূর্তে র বিশদ বিবরণ। আর শব্দের ব্যবহার হবে এমনভাবে, যেন তারা নিজেরাই তাদের প্রয়োজনে সেখানে এসে পড়েছে। আর সত্যি কথা বলতে কি, আমার লেখা প্রথম উপন্যাস ‘বার্মিজ ডেজ’ তেমনই, যেটা আমি শেষ করেছিলাম আমার তিরিশ বছর বয়সে, তবে তা পরিকল্পনা করেছিলাম আরও আগে। 

আমি অনেক আগের কথা থেকে বলা শুরু করেছি, কারণ কেউ যদি একজন লেখকের ধারাটি বুঝতে চায়, তবে তার আগের জীবন জানাটা জরুরি মনে করি। লেখক কী নিয়ে লিখবে, সেটা নির্ভর করে কোন যুগে সে জন্মেছে এবং বিকাশ লাভ করেছে, তার ওপরে— অন্ততপক্ষে আমাদের মতো ভয়াবহ অস্থিরতা আর বিপ্লবের সময়টাতে যারা বড় হয়েছে, তাদের জন্য এ কথা খাটে— কিন্তু একজন লেখক লেখা শুরুর অনেক আগেই নিজের ভেতরে একধরনের আবেগী চরিত্রের সৃষ্টি করে, যেটা থেকে কখনো পুরোপুরি সে লুকিয়ে থাকতে পারে না।

তবে লেখার কাজটাকে নিজস্ব খেয়ালখুশি আর অপরিপক্বতা থেকে মুক্ত করতে হলে সব ভুলে তাকে সেই কাজেই মনোনিবেশ করতে হবে, কিন্তু যদি সে তার ওপর অতীতের ঘটনার সমস্ত প্রভাব ভুলে লিখতে যায়, তবে বলতে গেলে সে নিজের ভেতরের সৃষ্টির প্রতিভাকেই ধ্বংস  করবে। বেঁচে থাকার জন্য জীবিকা হিসেবে নেয়া ছাড়াও আমি মনে করি লেখালেখি করার বড় চারটি কারণ আছে, যেকোনো পরিমাণে গদ্য রচনার কথা যদি ভাবি, এই চারটি কারণ বিভিন্ন মাত্রায় প্রত্যেক লেখকের মধ্যে উপস্থিত; তবে কার ভেতরে কতটা, সেটা নির্ভর করে তার লেখার বিষয়ের ওপর, লেখার সময়, লেখার ধরন, সর্বোপরি চারদিকের পরিবেশের ওপর। কারণগুলো হলো— 

১. নির্ভেজাল আত্মবাদ ব্যাখ্যা করে বলা যায়, চতুর হওয়ার আগ্রহ, মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার ইচ্ছা, মৃত্যুর পরেও স্মরণীয় হয়ে থাকার বাসনা। আর সবচেয়ে মজার হলো, ছোটকালে যারা খুব জ্ঞানের কথা শুনিয়েছে, তাদের একহাত দেখে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা। একজন লেখকের সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যে বিজ্ঞানী, শিল্পী, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সফল ব্যবসায়ী— এককথায় সমাজের বিচিত্র চরিত্র মিশে থাকে।

পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ কিন্তু স্বার্থপর নয়, বিশেষ করে তিরিশ বছর বয়সের পর থেকে মানুষ শুধুনিজের জন্য বাঁচার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসে। বরং তখন থেকে তারা বাঁচে অন্যের জন্য। তারপর থেকে জীবন অনেকটাই একঘেয়ে। তবে অবশ্য কিছু ব্যতিক্রম আছে। কিছু মানুষ আছে, যারা জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত কেবল নিজের কারণে বাঁচে। লেখকেরা হলো সেই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সত্যিকারের লেখকেরা, আমার বলা উচিত, তারা অযথাই ভীষণ আত্মকেন্দ্রিক, যদিও অর্থের প্রতি উদাসীন। 

২. সৌন্দর্যপিপাসা। একে বলা যায় বাহ্যিক পৃথিবীর সৌন্দর্যের প্রতি ধারণা। অন্যভাবে বলতে গেলে, সমস্ত কিছুর নান্দনিক সজ্জা। একটি ধ্বনির পাশে আরেকটি ধ্বনির সৌন্দর্য, টানটান একটি গদ্যের আকর্ষণ অথবা চমৎকার একটি গল্পের ছন্দ। সুন্দর একটি অভিজ্ঞতা, যা লেখকের কাছে মূল্যবান, অনুভূতিটি অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করার অদম্য ইচ্ছা আর সুযোগ, যা সে কোনোমতেই হারাতে চায় না।

অবশ্য নান্দনিক চিন্তাভাবনা অনেক লেখকের ক্ষেত্রে গৌণ। তবে পাঠ্যবইয়ের লেখক থেকে শুরু করে পোস্টার লেখকেরও নিজস্ব কিছু শব্দ থাকে, যা সে ব্যবহার করে আনন্দ পায়। সেসব বিশেষ শব্দের বিশেষ আবেদন আছে তার কাছে; অথবা একজন ভাবতে পারে তার লেখার বা বাক্যের সৌন্দর্যনিয়ে, ভাবতে পারে আয়তন বা মার্জিন নিয়ে। ট্রেনের সময়সূচি থেকে শুরু করে এমন কোনো বই নেই, যা নান্দনিক সৌন্দর্য মাথায় রেখে বানানো হয়নি।

৩. ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার প্রেরণা। প্রতিটি ঘটনা ঠিক যেমন, তাকে সেভাবেই দেখা, তার মধ্য থেকেই সত্য বের করে আনা এবং ভবিষ্যতের জন্য সংগ্রহ করা। 

৪. রাজনৈতিক কারণ। ‘রাজনৈতিক’ শব্দটি ব্যাপক অর্থ প্রকাশ করে। পৃথিবীকে একটি নির্দিষ্ট দিকে পথনির্দেশ দেওয়ার বাসনা, সমাজে মানুষ যে জন্য সংগ্রাম করছে সেই চাওয়া-পাওয়ার মধ্যে কিছু নীতির অনুপ্রবেশ ঘটানো। আরেকটি কথা, কোনো লেখাই রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে নয়। একটি শিল্প কোনোভাবেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, এটা বলাও একরকমের রাজনৈতিক চিন্তা। 

এখন এটা দেখা যেতে পারে যে এই বিচিত্র প্রবণতাগুলো নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে লেখকের ভেতরে কে কতটুকু জায়গা করে নিতে পারে, আবার মানুষে মানুষে বা সময়ের পরিবর্তনে তারা কীভাবে বদলে যায়। সাধারণ নিয়মে— একজন যখন পরিপূর্ণ বয়সে পৌঁছায়, তখনকার মানসিকতাটাই হলো তার স্বভাব— তখন আমি ছিলাম এমন এক মানুষ, যে প্রথম তিনটি কারণ প্রকট হয়ে আমার ভেতরে চার নম্বর কারণটিকে জাগতেই দেয়নি।

খুবই শান্তিপূর্ণভাবে শুরুর দিকে আমি কেবল বর্ণনামূলক সাহিত্য রচনা করে যাচ্ছিলাম। আমি কোনো রকমের রাজনৈতিক ভাবনার কথা জানতামই না। বিষয়টা এমন হয়েছিল, যেন আমি কেবল বর্ণনাই করে যাব। প্রথম পাঁচ বছর আমি ছিলাম এক চাকরিতে, যা আমার জন্য নয়। চাকরিটি ছিল দ্য ইন্ডিয়ান ইমপেরিয়াল পুলিশে। অবস্থান বার্মায়। আর তারপর ক্রমাগত দরিদ্র হতে লাগলাম, আমার ভেতরে পরাজিত হবার অনুভূতি এলো।

সে সময় অন্যের মতে চলার ব্যাপারে তীব্র অনীহা টের পেলাম। মনের ভেতরে তখনই আমি শ্রমিকশ্রেণির জীবনযাপনের প্রতি ভালোবাসা সম্পর্কে পুরোপুরি জানতে পারলাম। বার্মায় চাকরি করতে গিয়ে বিদেশি শাসন সম্পর্কেও জানলাম। কিন্তু সেসব অভিজ্ঞতাও আমাকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল না। তারপর এলো হিটলার, স্প্যানিশ যুদ্ধ শুরু হলো। তবে ১৯৩৫ সালের শেষ পর্যন্ত আমি নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। এখনো মনে আছে, নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বের প্রকাশ ঘটানোর জন্য সে সময় একটি কবিতা লিখেছিলাম।

দুশ বছর আগে, আমি হয়তো ছিলাম এক সুখী যাজক
অন্তিম বিপর্যয়ের চিন্তা মাথায় রেখে উপদেশ বিলাতাম
আর নিজের গাছে ওয়ালনাটগুলোকে ক্রমশ বেড়ে উঠতে দেখতাম।
কিন্তু দুর্ভাগ্য, জন্মেছিলাম এক দুঃসময়ে
তাই স্বর্গেযাবার সুযোগ গেল ফসকে
আমাদের ঠোঁটের ওপরে জেগে ওঠা কেশরাশি
তখন সুন্দর করে কামানো
একদিন ভালো সময় এলো
আমাদের খুশি করা ছিল এতই সহজ
যাবতীয় দুশ্চিন্তা ভুললাম
গাছের স্নিগ্ধ পাতার ওপরে ঘুমিয়েও পড়লাম।
বোকা আমরা তাই সাহস পাইনি সব নিজের করে পেতে
এখন শুধু খুশির ভান ধরি;
আপেলের ডালে বসে যে পাখিটি ডাকত
সে-ও হয়তো পারত শত্রুকে ঘায়েল করতে
অথচ অ্যাপ্রিকট আর মেয়েদের শরীর
ধোঁয়ার মধ্যে অজস্র তেলাপোকা,
ভোরের আলোয় ঘোড়া আর হাঁসের সারি,
সবকিছুই যেন স্বপ্ন কেবল।
তখন স্বপ্ন দেখাও ছিল নিষিদ্ধ;
সুখ ছিল মূখাভিনয়ের মতো নির্বাক:
চকচকে রুপালি ঘোড়া
ক্ষুদ্রা কার স্থূল দেহগুলো ঘোড়ার ওপরে
আমি ছিলাম সেই কেঁচো, যে কখনো ফিরে তাকাইনি,
হারেমবিহীন নপুংসক এক;
যাজক আর নেতার মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেছি
ইউগিন অ্যারামের মতো;
নেতা আমার ভবিষ্যৎ বলছিল
রেডিও বাজছিল আপন মনে
যাজক বলেছিলেন অস্টিন সেভেন এনে দেবেন,
ডুগি যেটা বরাবর চালায়।
স্বপ্নে দেখছিলাম পাথরের মেঝেঅলা এক পুরীতে থাকি,
আর জেগে উঠে দেখি সত্যিই;
এই যুগটা দেখার জন্য নিশ্চয়ই আমার জন্ম হয়নি;
হয়েছিল কি স্মিথের? জোনসের? কিংবা তোমার?

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন আদর্শ থেকে প্রকাশিত আফসানা বেগম এর “লেখক হওয়ার পথে: বিশ্বখ্যাত বারো সাহিত্যিকের লেখালেখির ভুবন” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে
আদর্শ প্রকাশনীর লেখক হওয়ার পথে বইয়ের প্রচ্ছদ

স্পেনের যুদ্ধ আর ১৯৩৬-৩৭ সালের অন্যান্য সমস্যা সময়ের কাঁটাটি ঘুরিয়ে দিল। বুঝতে পারলাম কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত আমি যা যা লিখেছি তার প্রতিটি লাইন, সরাসরি কিংবা প্রচ্ছন্নভাবে, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এবং সমাজতন্ত্রের সপক্ষে— অন্তত আমি নিজে 

তাই মনে করি। ওই সময় কেউ ওটা ছাড়া অন্য কিছুলিখতে পারত, সেই ভাবনাটাই আমার কাছে একধরনের বোকামি বলে মনে হয়। সবাই ওই এক বিষয়েই লিখত, নিজের নামে হোক বা ছদ্মনামে। সেটা ছিল কেবল একটা নৈতিকতার প্রশ্ন— হয় এদিকে, না হয় ওদিকে পক্ষপাত দিতে হবে। আর যে তার রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব নিয়ে যত সচেতন হবে, সৌন্দর্যবোধ আর বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ধোঁকা না করে সে সেটা তত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারবে। 

দশ বছর ধরে আমি যে চেষ্টাটা করে যাচ্ছি, তা হলো রাজনৈতিক লেখালেখিকে একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। প্রায়ই আমার শুরুটা হয় একটা পক্ষপাতিত্ব কিংবা অনাচার নিয়ে। তবে যখন একটি বই লিখব বলে বসি, তখন আমি নিজেকে এভাবে বলি না যে, ‘আমি একটি চমৎকার শিল্প তৈরি করব’। আমি লেখি কারণ, কিছু মিথ্যে আমার চোখে পড়ে, যা সবাইকে জানাতে চাই। কিছু বিষয় হয়তো এসে পড়ে, যার দিকে আমি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই।

তা ছাড়া, মূলত আমার ইচ্ছে থাকে যে মানুষ লেখাটা পড়ে প্রতিক্রিয়া দেখাক। কিন্তু আমি এমনি এমনি কোনো বই লিখতে পারব না বা কোনো ম্যাগাজিনের জন্য প্রবন্ধও রচনা করতে পারব না, যদি তাতে ভেতরে সৌন্দর্যচর্চার বিষয়টি না থাকে। কেউ একজন  আমার লেখার প্রতি যদি আগ্রহী হন, তবে দেখবেন সেটা কেবল একটা রাজনৈতিক ঘটনার পর্যালোচনা হলেও একজন রাজনীতিবিদ  তাকে পুরোপুরি রাজনৈতিক লেখা বলবেন না। বাল্যকালে পৃথিবীকে দেখার যে ক্ষমতা অর্জন করেছি, তা পুরোপুরিভাবে বাদ দেওয়া যায়  না, আর আমি তা চাইবও না। যত দিন বেঁচে আছি, আমার গদ্যের  ধারায় অটুট থাকতে চাই।

পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসা, চোখের সামনে আকৃতিসমৃদ্ধ প্রতিটি জিনিস থেকে শুরু করে একটা প্রয়োজনবিহীন তথ্যের প্রতিও আছে আমার অফুরান ভালোবাসা। নিজের অনুভূতিকে দমন করে রেখে কোনো লাভ নেই। লেখার মাধ্যমে আমার ভেতরের  সুপ্ত অনুভূতি , পছন্দ-অপছন্দ জানানো এবং তার পেছনে যুক্তি তৈরি করাটাই আমার কাজ। চেতনা নিয়ে কেবল নিজের ভেতরে ডুবে থাকা আজকের দিনের জন্য আর মঙ্গলজনক নয়।  

তবে এটা সহজ নয়, এটা লেখার গঠনগত এবং ভাষাগত সমস্যা তৈরি করতে পারে। আর তা ছাড়া লেখকের সত্যবাদিতার বিষয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। কত ভয়াবহ সমস্যা হতে পারে তার একটা উদাহরণ দিই। স্প্যানিশ যুদ্ধ নিয়ে লেখা আমার বই, ‘হোমেজ টু ক্যাটালোনিয়া’, এটা অবশ্য কেবলই একটা রাজনৈতিক পর্যালোচনার বই, কিন্তু বস্তুত এটা লেখা হয়েছিল কোনো লেখনী ধারাকে অগ্রাহ্য করে। সাহিত্যের প্রতি আমার স্বভাবজাত একনিষ্ঠতা অক্ষুণ্ন রেখে আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেছি এই বইয়ে সত্য প্রকাশ করতে। কিন্তু অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে এটাতে ছিল একটা লম্বা চ্যাপ্টার, সেখানে খবরের কাগজের বেশ কিছু খবর তুলে দেওয়া ছিল, ফ্র্যাংকোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অপরাধে যাদের চিহ্নিত করা হয়, সেই ট্রটস্কিটস সদস্যের সমর্থনে করা কিছু রিপোর্ট।

এ রকম একটা চ্যাপ্টার দু-এক বছর পরে পাঠকের কাছে মূল্যহীন হয়ে পড়ে, বইটার বারোটা বাজিয়ে দেয়। একজন সমালোচক, যাকে আমি বেশ পছন্দ করি, আমাকে এ বিষয়ে নিজের একটি বক্তব্য পড়ে শুনিয়েছিল। ‘এই বইয়ে আপনি এসব হাবিজাবি ভরে দিয়েছেন কেন?’ সে বলল, ‘আপনি হয়তোবা ভেবেছিলেন সাংবাদিকতায় নিয়োজিত থাকলে এভাবেই  লেখা উচিত।’ তিনি যা বলেছিলেন সেটা সত্যিই ছিল, কিন্তু ওটা ছাড়া আমি হয়তো অন্য কোনোভাবে বইটি সাজাতে পারতাম না। আমি জানতাম, ইংল্যান্ডের খুব কম মানুষই হয়তো জানতে পারে যে নির্দোষ মানুষদের অহরহই অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করা হয়। অন্যদিকে, আমি যদি তাদের অপরাধী ভাবতাম, তবে নিশ্চয়ই কখনো ওই বই প্রকাশ করতাম না। 

এভাবে অথবা অন্যভাবে এই সমস্যা বারবার সামনে আসতেই থাকবে। এখানে ভাষাগত সমস্যাটি সূক্ষ্ম এবং আলোচনা করতে বহু সময় লাগবে। আমি কেবল বলতে পারি যে লেখকজীবনের পরের বছরগুলোতে আমি কেবল সরাসরি বর্ণনা পরিহার করে যথাযথ বর্ণনার দিকে নজর দিয়েছি। যেকোনোভাবেই হোক না কেন, যত দিন ধরে লিখছি, তত দিনে লেখার একটি নির্দিষ্ট ধারা দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা। আর সেই ধারাটিকে ধরে আরও আরও লিখে যাওয়া উচিত।

‘অ্যানিমেল ফার্ম’ হলো সেই বই, যেখানে আমি সে চেষ্টা করেছি। সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে আমি রচনাটি দাঁড় করেছি, যেন রাজনৈতিক চিন্তা ও সৌন্দর্যবোধ একই সঙ্গে ফুটে ওঠে। সাত বছর ধরে আমি কোনো উপন্যাস লিখিনি, কিন্তু তাড়াতাড়িই লেখায় হাত দেব। এটা একটা ব্যর্থতাও হতে পারে। প্রতিটি বইকেই একেকটি ব্যর্থতা মনে হতে পারে। কিন্তু আমার পরিষ্কার ধারণা আছে, আমি সত্যি সত্যি একটি বইয়ের মধ্য দিয়ে ঠিক কী প্রকাশ করতে চাই। 

যা লিখলাম তার মধ্যে আগের পাতাটিতে চোখ বুলিয়ে দেখি, এমনভাবে নিজেকে তুলে ধরলাম যে আমার লেখালেখি সম্পূর্ণভাবে মানুষের চাহিদার ওপরে নির্ভরশীল। আমি আসলে সে রকম কোনো অনুভূতি রেখে যেতে চাই না। সব লেখকই সত্যিকার অর্থে হয়তো ব্যর্থ, স্বার্থপর আর অলস। সবচেয়ে বড় কথা হলো, লেখকদের মধ্যে যার যার লেখার নিজস্ব কারণটি রহস্যের ভেতরে ঢাকা। একটি সম্পূর্ণবই লিখে শেষ করা এক ভয়াবহ আর ক্লান্তিকর যাত্রা, যেন এক মারাত্মক অসুখ থেকে মুক্তিলাভের ভয়ংকর প্রচেষ্টা।

একজন মানুষের এই কাজে কখনোই হাত দেওয়া উচিত নয়, যতক্ষণ না এমন কোনো শত্রু তাকে ধাওয়া করছে, যাকে সে পুরোপুরি বুঝতেও  পারছে না আবার মোকাবিলাও করতে পারছে না। একমাত্র এমন যদি না হয় যে মানুষটি বুঝতে পারছে তার শত্রুটি মনোযোগ পাবার জন্য একটা শিশুর মতো ঘ্যানঘ্যান করছে। আর এটাও সত্যি যে কারও  পক্ষে পাঠযোগ্য কিছু লেখা সম্ভব নয়, যতক্ষণ না সে নিজেকে নিজের  ব্যক্তিত্বের সীমার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে পারে। একটি ভালো গদ্যকে অবশ্যই স্বচ্ছ হতে হবে।

আমি হলফ করে বলতে পারব না, সবচেয়ে বেশি কোন তাড়নায় আমি লেখি। তবে এটুকু বলতে পারি যে আমি জানি কোন তাড়নাকে কখন আমি সবচেয়ে বেশি মূল্য দিই। আজ  নিজের কাজের দিকে যদি ফিরে তাকাই, অবধারিতভাবে দেখতে পাই কোথায় আমি আমার রাজনৈতিক মতাদর্শকে তুলে ধরিনি,  কোথায় লেখার অযোগ্য বিষয়কে মজাদার করে লিখে পাঠকের মন  ভুলিয়েছি। কত বাক্য লিখেছি অর্থহীন। আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য কত অপ্রয়োজনীয় বিশেষণ ব্যবহার করেছি। আর কতবার আমি সাহিত্যের সঙ্গে অসততা করেছি।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন আদর্শ থেকে প্রকাশিত আফসানা বেগম এর “লেখক হওয়ার পথে: বিশ্বখ্যাত বারো সাহিত্যিকের লেখালেখির ভুবন” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

Featured Image: lemonde.fr

আপনার মন্তব্য লিখুন