Skip links

যে স্পাই বানান করতে জানত না!

স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহার "স্পাই স্টোরিজ" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 25 মিনিট

এক.

২০০০ সালের নভেম্বর মাসে নিউ ইয়র্কের লিবিয়ান কনস্যুলেটে পৃথক পৃথকভাবে তিনটি রহস্যময় প্যাকেজ এসে উপস্থিত হয়। প্যাকেজগুলো পাঠানো হয়েছিল অজ্ঞাতনামা এক প্রেরকের পক্ষ থেকে সরাসরি লিবীয় নেতা মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফিকে উদ্দেশ্য করে!

তিনটি প্যাকেজের ভেতরেই ছিল ইংরেজিতে লেখা একটি করে কভার লেটার, দুর্বোধ্য সাংকেতিক ভাষায় লেখা কতগুলো পৃষ্ঠা এবং সেই সাথে সংযুক্ত চূড়ান্ত গোপনীয় কিছু ডকুমেন্ট এবং ছবি। কভার লেটার তিনটি ছিল হুবহু একইরকম। সেগুলোর প্রতিটির ওপর ইংরেজিতে বড় হাতের অক্ষরে লেখা ছিল: THIS LETTER CONTAINS SENSITIVE INFORMATION। অর্থাৎ, ‘এই চিঠিতে স্পর্শকাতর তথ্য আছে’।

শিরোনামের নিচে চিঠিগুলোতে যা লেখা ছিল, তার অংশবিশেষ ছিল মোটামুটি এরকম:

এই চিঠিটি অত্যন্ত গোপনীয়। এটি পাঠানো হয়েছে আপনাদের প্রেসিডেন্ট অথবা গোয়েন্দাবাহিনীর প্রধানকে উদ্দেশ্য করে। অনুগ্রহ করে চিঠিটি কূটনৈতিক ব্যাগে করে পাঠিয়ে দেবেন। অফিসে, বাসায় কিংবা ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে কারো সাথে চিঠিটির অস্তিত্বের কথাও আলোচনা করবেন না। এই নির্দেশ যদি অনুসরণ না করেন, তাহলে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চিঠিটির এবং এর বিষয়বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কে জেনে ফেলতে পারে এবং এগুলো সংগ্রহ করে ফেলতে পারে।

কভার লেটার ছাড়াও তিনটি খামের প্রথমটির ভেতর ছিল চার পৃষ্ঠার একটি সাংকেতিক চিঠি, যেখানে মোট ১৪৯টি লাইনে একের পর এক সাজানো ছিল অক্ষর এবং সংখ্যার সংমিশ্রণে তৈরি দুর্বোধ্য কতগুলো শব্দ। দ্বিতীয় খামের ভেতর ছিল কীভাবে সুনির্দিষ্ট সাইফার কী (Cipher Key) এবং কোড বুক (Code Book) ব্যবহার করে সাংকেতিক চিঠিটির মর্ম উদ্ধার করতে হবে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত নির্দেশনা।

আর তৃতীয় খামের ভেতর ছিল দুই সেট কোড শিট (Code Sheet)। প্রথম সেটে ছিল সাইফার কী, যা দিয়ে সাইফারটেক্সট (Ciphertext) তথা সাংকেতিক লিপিকে প্লেইনটেক্সট (Plaintext) তথা সাধারণ লিপিতে রূপান্তরিত করা যাবে। আর দ্বিতীয় সেটে ছিল ছয় পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা দুই অক্ষরের কয়েক ডজন ব্রেভিটি কোড (Brevity Code) তথা সংক্ষিপ্ত কোড এবং তাদের অর্থের তালিকা, যেগুলো দিয়ে প্লেইন টেক্সটের সংক্ষিপ্ত শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থ বোঝা যাবে।

অর্থাৎ তিনটি খামের মধ্যে প্রথমটিতে ছিল মূল সাংকেতিক চিঠি, আর পরের দুটো খামে ছিল সেই সাংকেতিক চিঠির মর্ম উদ্ধার করার চাবি। প্যাকেজগুলো যে পাঠিয়েছিল, সে নিশ্চিত করতে চেয়েছিল, চিঠিটির প্রকৃত অর্থ যেন কেবলমাত্র গাদ্দাফি কিংবা তার গোয়েন্দাপ্রধানই উদ্ধার করতে পারেন। একটি বা দুটি খাম অন্য কারো হাতে পড়ে গেলেও যেন তারা কিছু বুঝতে না পারে।

কিন্তু তার জানার কথা ছিল না, গাদ্দাফির হাতে পৌঁছা তো দূরের কথা, লিবিয়ান কোনো কর্মকর্তার হাতে পৌঁছার আগেই তিনটি খামই গিয়ে পড়বে কনস্যুলেটের ভেতর আন্ডারকভারে থাকা এফবিআইর এক স্পাইয়ের হাতে!

ডিসেম্বরের এক সোমবার সকালে প্যাকেজ তিনটি এসে পৌঁছে এফবিআইর ওয়াশিংটন ডিসির ফিল্ড অফিসে। কেসটি সমাধান করার দায়িত্ব এসে পড়ে সেখানে কর্মরত স্পেশাল এজেন্ট স্টিভেন কারের উপর।

চার পৃষ্ঠার চিঠিটিকে এনসাইফার (Encipher) তথা সংকেতায়িত করা হয়েছিল ষোড়শ শতকে উদ্ভাবিত ভিজেনিয়ার সাইফার (Vigenère Cipher) নামে অত্যন্ত জটিল একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে, সাইফার কী দেয়া থাকলেও যা সমাধান করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তারপরেও এফবিআইর নিউ ইয়র্ক ফিল্ড অফিসের কর্মকর্তারা চিঠিটির প্রথম কয়েকটি লাইনের পাঠোদ্ধার (Decipher) করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কার সেটুকুই পড়তে শুরু করেন:

আমি সিআইএর মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক একজন অ্যানালিস্ট। আমি অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য হস্তান্তরের মাধ্যমে আপনাদের দেশের হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করতে চাই। আমার টপ সিক্রেট ক্লিয়ারেন্স আছে এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (এনএসএ), ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ), সেন্ট্রাল কমান্ডসহ (সেন্টকম) অনেকগুলো গোয়েন্দাসংস্থার চূড়ান্ত গোপনীয় নথিপত্রে আমার প্রবেশাধিকার আছে …

তার দাবি যে ভিত্তিহীন না, সেটা প্রমাণ করার জন্য নিজেকে সিআইএর অ্যানালিস্ট দাবি করা গুপ্তচরটি প্রতিটি খামের ভেতর CLASSIFIED SECRET তথা ‘গোপনীয় হিসেবে শ্রেণিবিন্যস্ত’ এবং CLASSIFIED TOP SECRET তথা ‘চূড়ান্ত গোপনীয় হিসেবে শ্রেণিবিন্যস্ত’ লেখা কিছু ডকুমেন্ট সংযুক্ত করে দিয়েছিল।

এর অধিকাংশই ছিল আমেরিকার স্পাই স্যাটেলাইট দিয়ে তোলা মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কয়েকটি সামরিক স্থাপনার ছবি এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সরকার ও সেনাবাহিনীর ওপর আমেরিকার গোয়েন্দা প্রতিবেদন। এছাড়াও আরো কিছু ডকুমেন্টও সেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মধ্যে একটি ছিল একেবারে নিচে দিয়ে উড়ে যাওয়া একটি প্লেন থেকে তোলা ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত গাদ্দাফির একটি প্রমোদতরীর ছবি, যেটি তুলেছিল ইসরায়েলি গোয়েন্দাবাহিনী!

এফবিআই কর্মকর্তা স্টিভেন কার এবং তার স্ত্রী মিশেল কার; Image Source: Michelle Carr

স্টিভেন কার তার এফবিআইর জীবনে এ ধরনের কিছু দেখেননি। এসব তথ্য যদি আসলেই লিবিয়ার হাতে পড়ে, তাহলে কী অবস্থা হবে, সেটা ভেবে তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। গুপ্তচরটিকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে পরামর্শের জন্য তিনি ছুটে যান তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লিডিয়া জেখোরেকের কক্ষে। ইতোমধ্যেই অবশ্য তিনি গুপ্তচরটির সম্ভাব্য কিছু বৈশিষ্ট্যের একটি তালিকা তৈরি করে নিয়েছেন, যেগুলো ব্যবহার করলে অনুসন্ধান কার্যক্রম অনেকটাই সহজ হয়ে আসবে।

প্রথমত, ডকুমেন্টগুলো থেকে বোঝা যায়, গুপ্তচরটির টপ সিক্রেট ক্লিয়ারেন্স আছে। দ্বিতীয়ত, চিঠিতে ব্রেভিটি কোডের ব্যবহার থেকে ধারণা করা যায়, সম্ভবত তার সামরিক প্রশিক্ষণ আছে। তৃতীয়ত, গোয়েন্দাসংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ইন্টেলিঙ্কে (Intelink) তার প্রবেশাধিকার আছে। কারণ চিঠির সাথে সংযুক্ত ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায়, সেগুলো ইন্টেলিঙ্ক থেকে প্রিন্ট করা হয়েছিল। চতুর্থত, গুপ্তচরটি বিবাহিত এবং সম্ভবত তার সন্তান আছে। কারণ চিঠির পরবর্তী অংশে সে লিখেছিল, ‘গুপ্তচরবৃত্তির মধ্য দিয়ে আমি নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে ফেলছি।’

আর পঞ্চমত, গুপ্তচরটি ইংরেজি বানানে একেবারেই কাঁচা! ছয় পৃষ্ঠার যে ব্রেভিটি কোডের তালিকা সে তৃতীয় খামের ভেতর সংযুক্ত করে দিয়েছিল, যেখানে দুই অক্ষরের বিভিন্ন সাংকেতিক শব্দের প্রকৃত অর্থ লেখা ছিল, কার লক্ষ্য করেন সেখানে অনেকগুলো সহজ শব্দের বানানই ভুল। Anonymous-কে সেখানে লেখা হয়েছে Anonmus, Allegations-কে Alligations, Reveal-কে Reveil, Precaution-কে Precausion … পুরো তালিকাটিই ভুলে ভরা!

ব্যাপারটি খুবই অস্বাভাবিক। সিআইএর একজন অ্যানালিস্ট, যার টপ সিক্রেট ক্লিয়ারেন্স আছে, যে গুপ্তচরবৃত্তির যোগ্যতা রাখে, জটিল সাংকেতিক ভাষায় বিশাল চিঠি এনক্রিপ্ট করতে পারে, সেই ব্যক্তি এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটি চিঠিতে এতগুলো বানান কীভাবে ভুল করে? কার এর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পেলেন না।

পরদিন থেকেই কাজে লেগে পড়েন স্টিভেন কার। তিনি এফবিআই এবং এনএসএর সেরা ক্রিপ্টোলজিস্টদেরকে দায়িত্ব দেন সম্পূর্ণ চিঠিটি ডিকোড করার জন্য। সাইফার কী এবং কোড বুক সামনে থাকা সত্ত্বেও ভি সাইফারের জটিল একটি সংস্করণ ব্যবহার করে এনক্রিপ্ট করার কারণে ১৪৯ লাইনের চিঠিটির পাঠোদ্ধার করতে তাদের ৭২ ঘণ্টা সময় লেগে যায়!

ডিকোড করা চিঠিটি থেকে বেশ কিছু নতুন তথ্য জানা যায়। গুপ্তচরটি দাবি করে, সে ২০ বছর ধরে সিআইএর হয়ে কাজ করছে এবং আগামী ২ বছরের মধ্যেই সে অবসরে যাবে। কিন্তু এত বছর চাকরি করার পর সে যে পেনশন পাবে, সেটা তার মতে যথেষ্ট না। কাজেই সে লিবিয়ার হাতে আমেরিকার গোয়েন্দা কার্যক্রম, তাদের স্পাই স্যাটেলাইটগুলোর কক্ষপথের অবস্থান, সেগুলোর লিবিয়ার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হস্তান্তর করতে প্রস্তুত, বিনিময়ে তাকে মাত্র ১৩ মিলিয়ন ডলার দিলেই চলবে!

যোগাযোগ করার জন্য চিঠিতে একটি ইমেইল আইডিও দেয়া ছিল। কার তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাটর্নি জেনারেলের অনুমতি নিয়ে ইমেইল সার্ভিস প্রোভাইডারের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি জানতে পারেন, আইডিটি খোলা হয়েছে মাত্র চার মাস আগে। এর পর থেকে গত কয়েকমাসে এটি বেশ কয়েকবার ব্যবহার করা হয়েছে, প্রতিবারই ওয়াশিংটন ডিসির বিভিন্ন পাবলিক লাইব্রেরি থেকে, কেবল এক বার ভার্জিনিয়ার শ্যান্টিলি এলাকা থেকে।

আইডিটিতে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইমেইল ছিল না, কিন্তু লাইব্রেরিগুলোর অবস্থান কারকে নতুন একটি সূত্রের সন্ধান দেয়। চিঠিতে গুপ্তচরটি নিজেকে সিআইএর অ্যানালিস্ট হিসেবে দাবি করেছিল। কিন্তু কার ধারণা করেন, সেটি হয়তো ছিল তার আসল পরিচয় গোপন করার একটি প্রচেষ্টা। বাস্তবে হয়তো তার আসল কর্মস্থল সিআইএ (CIA) না, বরং এনএসএ (NSA) অথবা এনআরও (NRO)। কারণ যেসব স্থান থেকে ইমেইল আইডিটি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেগুলোর আশেপাশে কেবল এই দুটি গোয়েন্দাসংস্থার সদর দপ্তরই ছিল।

এনএসএর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের প্রধান, রবার্ট ম্যাকক্যাসলিনের সহায়তায় স্টিভেন কার সন্দেহভাজনদের তালিকা গুটিয়ে আনতে থাকেন। ইন্টেলিঙ্ক থেকে নির্দিষ্ট ছবিগুলো ঠিক কখন প্রিন্ট করা হয়েছিল, সেই মুহূর্তে এই দুই গোয়েন্দাসংস্থার কোন কোন কর্মচারী ইন্টেলিঙ্ক ব্যবহার করছিল, তাদের মধ্যে কয়জনের টপ সিক্রেট ক্লিয়ারেন্স আছে, এভাবে ফিল্টার করতে করতে শেষপর্যন্ত তাদের সন্দেহের তালিকায় মাত্র একজনের নাম অবশিষ্ট থাকে – এনআরও (NRO) তথা ন্যাশনাল রিকনিসন্স (Reconnaissance) অফিসের ইমেজ অ্যানালিস্ট, ব্রায়ান প্যাট্রিক রিগ্যান।

ব্রায়ান রিগ্যান দেখতে মোটেও স্পাইসুলভ না। সাড়ে ছয় ফিট লম্বা, বেশ স্থূলকায়, ৩৭ বছর বয়সী বোকাসোকা চেহারার লোকটিকে প্রথম দেখায় সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। তার চেহারায়, চাল-চলনে কিংবা কথাবার্তায় কোনো বিশেষত্ব নেই। আশেপাশের মানুষের কাছেও তিনি অলস এবং মাথামোটা হিসেবেই পরিচিত। তার একঘেয়ে, বৈচিত্র্যহীন জীবনের উপর নজরদারি করতে গিয়ে এফবিআই কর্মকর্তারা হাঁপিয়ে ওঠেন। তাদের সন্দেহ হতে থাকে, আসলেই তারা ঠিক লোকের ওপর নজরদারি করছেন তো?

কিন্তু তাদের সন্দেহ দূর হতে বেশি দেরি হয় না। রিগ্যানের লেখা বিভিন্ন রিপোর্ট ঘাঁটতে গিয়ে তারা আবিষ্কার করেন, তার ইংরেজি বানানেও ছোট বাচ্চাদের মতো অজস্র ভুল!

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহার “স্পাই স্টোরিজ: এসপিওনাজ জগতের অবিশ্বাস্য কিছু সত্য কাহিনি” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে পারবেন রকমারির এই লিঙ্ক থেকে অথবা বুকশেয়ারের এই লিঙ্ক থেকে। এছাড়াও অনলাইনে পড়তে চাইলে পড়তে পারেন বইটই অ্যাপের এই লিঙ্ক থেকে অথবা রোর বাংলার এই লিঙ্ক থেকে।

দুই.

ব্রায়ান প্যাট্রিক রিগ্যানের জন্ম ১৯৬২ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডের এক নিম্নবিত্ত আইরিশ অভিবাসী পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই রিগ্যান ছিলেন ডিসলেক্সিয়ায় (Dyslexia) আক্রান্ত। ডিসলেক্সিয়া হচ্ছে এমন এক ধরনের ব্যাধি, যার কারণে মানুষের অক্ষর চিনতে সমস্যা হয়। ফলে ডিসলেক্সিকরা প্রচলিত পদ্ধতির পড়ালেখায় খুব ভালো করতে পারে না। তারা বানান ভুল করে, পড়া মনে রাখতে পারে না এবং গণিতে দুর্বল হয়। কিন্তু অন্যদিকে তারা যেকোনো চিত্র এবং জটিল কারুকার্যের নকশা খুব সহজেই মনে রাখতে বা চিহ্নিত করতে পারে। ফলে এনক্রিপশন/ডিক্রিপশনে এরা চমৎকার কাজ করতে পারে।

ডিসলেক্সিয়ার কারণে রিগ্যান স্কুলের পড়ালেখায় খুবই কাঁচা ছিলেন। তার পরীক্ষার ফলাফল ছিল খুবই খারাপ। তখনও আমেরিকার সমাজে কিংবা স্কুলগুলোতে ডিসলেক্সিয়াজাতীয় রোগে আক্রান্ত শিশুদের প্রতি বাড়তি যত্ন নেয়ার রীতি চালু হয়নি। স্কুলের সহপাঠীরা তাকে প্রতিবন্ধী বলে নিপীড়ন করত। তার সাথে প্রচণ্ড রকম দুর্ব্যবহার করত। ঘরে, বাইরে এবং পরবর্তীতে কর্মক্ষেত্রে সবার কাছে প্রতিনিয়ত অপমানিত হওয়া আর অবমূল্যায়নের শিকার হওয়াই যেন ছিল রিগ্যানের আজীবনের নিয়তি!

রিগ্যান জানতেন, তার খারাপ ফলাফলের কারণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবেন না। ফলে হাইস্কুল শেষ করে তিনি বিমানবাহিনীতে ভর্তি হন। সেখানে বেসিক ট্রেনিং শেষ করার পর ১৯৮০ সালে তার চাকরি হয় সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বিভাগে। তার মতো ডিসলেক্সিকের জন্য এটি ছিল চমৎকার একটি চাকরি। পনের বছর বিমানবাহিনীতে থাকার পর ১৯৯৫ সালে তাকে স্থানান্তর করা হয় এনআরও তথা ন্যাশনাল রিকনিসন্স অফিসে, যেটি মূলত বিশ্বব্যাপী আমেরিকার স্পাই স্যাটেলাইটগুলোর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা বিমানবাহিনীর অধীনস্থ গোয়েন্দাসংস্থা।

এনআরওতে রিগ্যানের সময় খুব ভালো যাচ্ছিল না। তিনি অনুভব করছিলেন, এখানে তার যথাযোগ্য মূল্যায়ন হচ্ছে না। তার সহকর্মীদের পদোন্নতি হলেও তার কোনো পদোন্নতি হচ্ছিল না এবং পদোন্নতির কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছিল না।

১৯৯৯ সালে বিমানবাহিনী থেকে তাকে ইউরোপে পোস্টিংয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু পারিবারিক কারণে তার পক্ষে তখন ইউরোপ যাওয়া সম্ভব ছিল না। তিনি পোস্টিং বাতিলের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু প্রতিউত্তরে তাকে জানানো হয়, বিদেশে না গেলে ২০০০ সালের আগস্টের ৩১ তারিখে, তার চাকরিজীবনের ২০তম বছর পূর্ণ হওয়ার পর তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অবসরে যেতে হবে।

রিগ্যান পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়েন। তিনি জানতেন বিমানবাহিনীতে তার সুনির্দিষ্ট কাজের যে অভিজ্ঞতা ছিল, তা দিয়ে সামরিক জগতের বাইরে তার পক্ষে ভালো কোনো চাকরি জোগাড় করা সম্ভব হবে না। রিগ্যানের স্ত্রী ছিলেন অতিরিক্ত খরুচে স্বভাবের। স্ত্রীর বিভিন্ন শখ আর চার ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে গিয়ে রিগ্যান তার একাধিক ক্রেডিট কার্ডে সব মিলিয়ে ১ লাখ ১৬ হাজার ডলার ঋণ করে ফেলেছিলেন। মাত্র ৩৯ বছর বয়সেই অবসরে গেলে বাকি জীবন কীভাবে কাটাবেন, সেটা ভেবে রিগ্যান উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে শুরু করেন।

একই সাথে রিগ্যানের মনের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভেরও সৃষ্টি হতে থাকে। তাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করা তার সহকর্মীদের প্রতি, তার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রতি এবং তার নিজের প্রতিও। এরকম সময়ই তার মাথায় প্রথমবারের মতো গুপ্তচরবৃত্তির ধারণা আসে। তার কাছে মনে হতে থাকে, রাষ্ট্রের গোপন তথ্য বিক্রি করে হলেও বাড়তি কিছু টাকা পাওয়াটা তার ন্যায্য অধিকার। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে তিনি তার প্রাপ্য আদায় করে নিবেন। আর নিজের কাছে হলেও প্রমাণ করে ছাড়বেন, সবাই তাকে সারাজীবন ধরে যেরকম অযোগ্য মনে করে এসেছে, তিনি মোটেও সেরকম অযোগ্য নন!

গুপ্তচরবৃত্তির কাজটা তার জন্য মোটেও কঠিন হবে না। এনআরওতে তার কাজই ছিল আমেরিকার স্পাই স্যাটেলাইটগুলো দিয়ে তোলা বিভিন্ন ছবি বিশ্লেষণ করা এবং ইন্টেলিঙ্কে তার বিভাগের ওয়েবপেজ দেখাশোনা করা। নিজের কাজের ফাঁকে ফাঁকেই তিনি টপ সিক্রেট ক্লিয়ারেন্স ব্যবহার করে গোপন সব তথ্য এবং ছবি হাতিয়ে নিতে পারবেন।

তার ডিসলেক্সিয়াও এক্ষেত্রে চমৎকার কভার হিসেবে কাজ করবে। সবাই তাকে সারা জীবন ধরে মাথামোটা বলে অবজ্ঞা করে এসেছে। কাজেই ভবিষ্যতে যদি কখনও তথ্য পাচারের ঘটনা ফাঁসও হয়ে যায়, তবুও কেউ তাকে সন্দেহ করবে না। তিনি যে গুপ্তচরবৃত্তি করার মতো যোগ্যতা এবং বুদ্ধিমত্তা রাখেন, এটাই কারো মাথায় আসবে না। সবার চোখের সামনে দিয়েই আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম সেরা গুপ্তচরবৃত্তির কাজটি সম্পন্ন করবেন তিনি!

কিশোর ব্রায়ান রিগ্যান; Image Source: FBI

তিন.

১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ব্রায়ান রিগ্যান পুরোদমে কাজে লেগে পড়েন। তিনি ইন্টেলিঙ্ক ব্যবহার করে লিবিয়া, ইরাক, ইরান, সুদান এবং চীনের কাজে লাগার মতো বিভিন্ন তথ্য এবং ছবি অনুসন্ধান করতে শুরু করেন। তিনি জানতেন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই দেশগুলোই ছিল আমেরিকার সবচেয়ে বড় শত্রু। কাজেই আমেরিকার গোপন তথ্যের জন্য এরা প্রত্যেকেই মোটা অঙ্কের টাকা পরিশোধ করতে রাজি হবে।

রিগ্যান ইন্টেলিঙ্কে গিয়ে Top Secret Iran এবং Top Secret Libya লিখে এসব দেশ সম্পর্কে গোপন তথ্য এবং ছবি খুঁজে বের করে প্রিন্ট করতে শুরু করেন। অবশ্য ডিসলেক্সিয়ার কারণে তিনি Libya’র পরিবর্তে একাধিকবার Lybia এবং Libia লিখেও সার্চ করেন। এসব দেশের কাছে বিক্রি করার জন্য তিনি ইসরায়েল সম্পর্কেও বিভিন্ন গোপন তথ্য ডাউনলোড করে রাখেন। এছাড়াও আমেরিকার সামরিক সক্ষমতা এবং গোয়েন্দা কার্যক্রম সংক্রান্ত তথ্য তো ছিলই।

অফিসে রিগ্যানের এবং তার পাশের ভদ্রলোকের কিউবিকলের মাঝামাঝি স্থানে একটি লকার ছিল। রিগ্যান প্রিন্ট করা ডকুমেন্টগুলো সেই লকারের ভেতর জমা করে রাখতে শুরু করেন। কয়েকদিন পরপরই তিনি নতুন নতুন ডকুমেন্ট প্রিন্ট করতেন এবং সবার চোখের সামনে দিয়ে লকারটি খুলে আগে থেকে জমানো ডকুমেন্টগুলোর সাথে সেগুলো যোগ করে আবার লকারটি বন্ধ করে দিতেন। কেউ কখনও তাকে জিজ্ঞেস করত না, কী আছে সেখানে।

১৯৯৯ সালের শেষের দিকে একবার রিগ্যানকে অফিসের কাজে কয়েকদিনের জন্য বাইরে যেতে হয়েছিল। ফিরে এসে তিনি দেখতে পান, তার লকারটি গায়েব হয়ে গেছে! রিগ্যানের সারা শরীর অবশ হয়ে আসে। তিনি কি তাহলে ধরা পড়ে গেছেন? কিছুক্ষণের মধ্যেই তার কাছে বিল্ডিং ম্যানেজমেন্টের অফিস থেকে একটি ফোন আসে। অপরপ্রান্তের লোকটি জানতে চায়, লকারের ভেতরে থাকা কাগজপত্রগুলো কি তার?

অস্বীকার করার কোনো উপায় ছিল না। রিগ্যান স্বীকার করেন, হ্যাঁ, সেগুলো তারই। লোকটি জানায়, বিল্ডিং ম্যানেজমেন্টের কর্মীরা অফিস গোছাতে এসে লকারটির কোনো মালিক না পেয়ে সেটি তুলে নিয়ে গিয়েছিল। পরে ভেতরে কাগজপত্র আছে বুঝতে পেরে তারা সেটি খোলার চেষ্টা করে। চাবি না থাকায় তারা ড্রিল মেশিন দিয়ে লক খুলে ডকুমেন্টগুলো বের করে। গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়ায় তারা সেগুলো জমা করে রাখে এবং তার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করে।

চেপে রাখা নিঃশ্বাসটা আস্তে করে ছেড়ে দেন রিগ্যান। তার আশঙ্কা একেবারেই অমূলক ছিল। ডকুমেন্টগুলো দেখেও বিল্ডিং ম্যানেজমেন্টের কর্মীরা কিছু সন্দেহ করেনি। তারা স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিয়েছে, সেগুলো তার কাজেরই অংশ। তাদেরকে ধন্যবাদ দিয়ে এবং ডকুমেন্টগুলো তার অফিসে পাঠিয়ে দিতে অনুরোধ জানিয়ে ফোন রেখে দেন রিগ্যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের একজন সবগুলো ডকুমেন্ট একটি প্যাকেটের ভেতর ভরে তার অফিসে দিয়ে যায়।

এবার রিগ্যান ডকুমেন্টগুলো লুকিয়ে রাখেন তার মাথার ওপরে দেয়ালের সাথে লাগানো একটি ক্যাবিনেটের ভেতর। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্তে আসেন, আর বেশিদিন এগুলো অফিসে রাখা নিরাপদ হবে না। দ্বিতীয়বার অন্য কারো চোখে পড়ার আগেই ধীরে ধীরে এগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে অন্য কোনো জায়গায়।

অফিসে নিজের ডেস্কে বসে গুপ্তচরবৃত্তি করছেন রিগ্যান; Image Source: FBI

হাইস্কুলে ওঠার পর থেকেই ব্রায়ান রিগ্যান নিয়মিত জিমে যাওয়ার অভ্যাস শুরু করেছিলেন। এনআরওতে যোগ দেয়ার পর থেকে জিমে যাওয়া তার জন্য আরো সহজ হয়ে যায়। এনআরও ভবনের বেজমেন্টেই এর কর্মচারীদের জন্য একটি জিম ছিল। রিগ্যান প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় জিমে যাওয়ার ব্যাগে করে বাড়তি জামা-কাপড় সাথে নিয়ে যেতেন। এরপর অফিস শেষে ব্যায়াম সেরে, কাপড় পাল্টে, আবার সেই ব্যাগ কাঁধে করে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়তেন।

২০০০ সালের মার্চ মাসের এক বিকেলে অফিস থেকে বের হওয়ার সময় রিগ্যান তার গোপন ডকুমেন্টগুলো থেকে এক গাদা কাগজ বের করে নেন। এরপর সেগুলো তার জিমের ব্যাগের ভেতর ঘামে ভেজা জামা-কাপড়ের নিচে লুকিয়ে সবার সামনে দিয়ে কিউবিকল থেকে বেরিয়ে আসেন।

রিভলভিং ডোর দিয়ে বের হওয়ার সময় রিগ্যানের বুকের ভেতর কেউ যেন হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সিকিউরিটি গার্ডরা তাকে পেছন থেকে ডাক দিল! কিন্তু বাস্তবে শেষপর্যন্ত কিছুই ঘটল না। সিকিউরিটি গার্ডরা তাকে বছরের পর বছর ধরে এই একই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আসতে-যেতে দেখেছে। সেদিন তাকে নতুন করে সন্দেহ করার কোনো কারণ ছিল না। কোনো রকম তল্লাশি ছাড়াই বেরিয়ে এলেন তিনি।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে রিগ্যান অল্প অল্প করে সবগুলো ডকুমেন্ট অফিস থেকে নিজের বাসায় সরিয়ে নেন। স্ত্রী এবং সন্তানদের অলক্ষ্যে সেগুলো তিনি লুকিয়ে ফেলেন তার বেজমেন্টের একটি ক্যাবিনেটে। ততদিনে সেখানে প্রিন্ট করা কাগজের সাথে যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু সিডি এবং ভিএইচএস টেপও। জুলাই মাসে তিনি যখন সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, তার কাছে বিক্রি করার মতো যথেষ্ট তথ্য জোগাড় হয়েছে, তখন তার বেজমেন্টে সিডি এবং টেপের বাইরে শুধুমাত্র প্রিন্ট করা কাগজের সংখ্যাই ছিল প্রায় ২০,০০০!

২০০০ সালের এপ্রিল মাস থেকেই রিগ্যান বিদেশি গোয়েন্দাসংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ করার পরিকল্পনা আঁটতে শুরু করেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, ঝুঁকি এড়ানোর জন্য তিনি কখনই সরাসরি কারো সাথে সাক্ষাৎ করবেন না। প্রথমে তিনি ডকুমেন্টগুলো লুকিয়ে রাখবেন উন্মুক্ত, কিন্তু নির্জন এবং গোপন কোনো স্থানে। এরপর গোয়েন্দাসংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ করবেন সাংকেতিক চিঠির মাধ্যমে। যদি তারা টাকা দিতে রাজি হয়, তাহলে পরবর্তীতে ধাপে ধাপে তাদেরকে লুকানো স্থানগুলোর স্থানাঙ্ক সরবরাহ করবেন। আর অধিকতর নিরাপত্তার জন্য বার্তা আদান-প্রদানে প্রতিবারই ভিন্ন ভিন্ন এনক্রিপশন পদ্ধতি ব্যবহার করবেন।

জুলাই মাসে রিগ্যানের স্ত্রী অ্যানেট যখন তাদের চার সন্তানকে নিয়ে সুইডেনে বেড়াতে যান, তখন একদিন রিগ্যান বেজমেন্টে গিয়ে সবগুলো ডকুমেন্ট গোছাতে শুরু করেন। কোন দেশের কাছে কী ধরনের তথ্য বিক্রি করা যাবে, সে অনুযায়ী তিনি ডকুমেন্ট, সিডি এবং টেপগুলো একাধিক স্তূপে সাজিয়ে রাখেন। এর বাইরে আরেকটি স্তূপে তিনি প্রায় ৫,০০০ পৃষ্ঠা জড়ো করেন, যেগুলোতে ছিল তার জোগাড় করা সবচেয়ে স্পর্শকাতর তথ্য। এরপর প্রতিটি স্তূপের ডকুমেন্টগুলো প্রথমে একাধিক পৃথক পৃথক প্লাস্টিকের ব্যাগে এবং এরপর সেই ব্যাগগুলো আবার আবর্জনার পলিথিনে ভরে রেখে দেন।

জুলাই মাসের এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় রিগ্যান তার বাসা থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে অবস্থিত ম্যারিল্যান্ডের পাটাপস্কো ভ্যালি স্টেট পার্কে গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানকার জঙ্গলের গহীনে গিয়ে তিনি কোদাল দিয়ে মাটিতে গভীর একটি গর্ত করেন। এরপর ব্যাকপ্যাকে করে বয়ে আনা গোপন ডকুমেন্টগুলোর একটি ব্যাগ সেখানে ফেলে দিয়ে আবার গর্তটি সমান করে বুজে দেন।

কপালের ঘাম মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ান রিগ্যান। আশেপাশে তাকিয়ে পা গুণে গুণে হাঁটতে শুরু করেন নিকটবর্তী গাছটির দিকে। এরপর এক পকেট থেকে একটি পেরেক বের করে গেঁথে দেন গাছটির গায়ে, আর অন্য পকেট থেকে একটি জিপিএস লগিং ডিভাইস বের করে গাছটির স্থানাঙ্ক নির্ণয় করে টুকে রাখেন একটি নোটবুকে।

পরবর্তী কয়েকদিনের মধ্যে একই পদ্ধতিতে এক এক করে সাতটি প্যাকেট জঙ্গলের ভেতর বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে ফেলেন রিগ্যান। কিন্তু এসব প্যাকেটের একটিও তার বিক্রি করার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা অন্য বারোটি প্যাকেট তিনি লুকিয়ে ফেলেছিলেন এর কয়েকদিন আগেই, ভার্জিনিয়ার অন্য একটি স্টেট পার্কে।

ম্যারিল্যান্ডের স্টেট পার্কে লুকানো এই সাতটি প্যাকেটের মধ্যে রিগ্যান রেখেছিলেন সেই অতি সেনসিটিভ তথ্যগুলো। তিনি এগুলো পৃথক স্থানে লুকিয়েছেন তার ইনস্যুরেন্স প্ল্যান হিসেবে। যদি কোনো কারণে তিনি ধরা পড়েই যান, তখন এই অতি গোপনীয় তথ্যগুলোই তাকে রক্ষা করবে। এগুলো দিয়ে তিনি ব্ল্যাকমেইল করবেন মার্কিন সরকারকে!

রিগ্যানের লাইব্রেরিতে যাওয়ার দৃশ্য; Image Source: FBI

রিগ্যানের লাইব্রেরিতে এসপিওনাজের দৃশ্য; Image Source: FBI

২০০১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে রিগ্যানের সন্দেহ হতে থাকে, তার কার্যক্রম হয়তো ফাঁস হয়ে গেছে। সেই নভেম্বর মাসে তিনি লিবিয়ানদের উদ্দেশ্যে তিনটি প্যাকেজ পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু কয়েকমাস পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। প্যাকেজগুলো কি তবে তাদের কাছে পৌঁছেনি? সেগুলো কি সিআইএ বা এফবিআইর হাতে পড়ে গেছে? তারা কি তার ওপর নজরদারি করছে? রিগ্যান সিদ্ধান্ত নেন, তিনি ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করবেন।

২০০১ সালের মে মাসের ২৩ তারিখ সকাল বেলা তিনি তার ভার্জিনিয়ার নতুন কর্মস্থল থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। প্রায় নির্জন রাস্তা দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় রিয়ার ভিউ মিররের দিকে তাকিয়ে তিনি বোঝার চেষ্টা করতে থাকেন, কেউ তার পিছু পিছু আসছে কি না। মূল সড়ক থেকে হঠাৎ প্রচণ্ড বাঁক নিয়ে তিনি পাশের একটি সরু রাস্তায় ঢুকে পড়েন এই আশায় যে, কেউ তাকে অনুসরণ করলে তাকেও তার মতোই বাঁক নিতে হবে।

আরো কিছুক্ষণ এলোমেলো গাড়ি চালিয়ে তিনি উপস্থিত হন ম্যানাসাস ন্যাশনাল ব্যাটেলফিল্ড পার্কের সামনে। সেখানকার কাঁচা রাস্তা দিয়ে অর্ধেক পথ যাওয়ার পর গাড়ি থামিয়ে তিনি আশেপাশে তাকালেন। নাহ, কেউ তার পিছু পিছু আসেনি। তারপরেও সন্দেহজনক গতিবিধি চোখে পড়ে কি না, তা দেখার জন্য আরো ২০ মিনিট তিনি সেখানে বসে রইলেন। পুরোনো আমলের একটি পিকআপ ট্রাক সামনে দিয়ে ছুটে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই ঘটল না।

গাড়ির ভেতর থেকে রিগ্যান পুরোনো কয়েকটি ম্যাগাজিন বের করে হাতে নিলেন। এরপর পার্কের ভেতর একটি নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে একটি গাছের নিচে সেগুলো পাথর চাপা দিয়ে রেখে ঘরে ফিরে গেলেন। সেদিন সন্ধ্যার সময় তিনি আবারও হাজির হলেন সেই পার্কে। গিয়ে দেখলেন ম্যাগাজিনগুলো হুবহু একইভাবে জায়গামতো পড়ে আছে। কেউ সেগুলো স্পর্শও করেনি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন রিগ্যান। নাহ, কেউ তাকে অনুসরণ করছে না।

কিন্তু রিগ্যানের ধারণা ছিল ভুল। গত কয়েকমাস ধরে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা তিনি ছিলেন এফবিআইর নজরে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি ফোনালাপ তারা রেকর্ড করছিল। জঙ্গলের ভেতর সেই পুরোনো আমলের পিকআপ ট্রাকটিও ছিল তাদেরই ভাড়া করা। রিগ্যান অত্যন্ত প্রতিভাবান ছিলেন সত্য, কিন্তু এফবিআইর দুর্দান্ত টিমওয়ার্কের সাথে পাল্লা দেয়া তার কাজ ছিল না।

চার.

এফবিআইর স্পেশাল এজেন্ট স্টিভেন কার এবং তার এনএসএর সহকর্মীরা ব্রায়ান রিগ্যানকে সনাক্ত করতে পেরেছিলেন ২০০১ সালের এপ্রিল মাসেই। কিন্তু তাদের হাতে শক্ত কোনো প্রমাণ ছিল না। আদালতে কাউকে দোষী প্রমাণ করার জন্য শুধু বানান ভুল শনাক্ত করাই যথেষ্ট না। তাছাড়া এফবিআইর তখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা বাকি ছিল। কাজেই তারা দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা রিগ্যানের ওপর নজরদারির ব্যবস্থা করে। কিন্তু রিগ্যানের একঘেয়ে বিরক্তিকর জীবনে নতুন কিছুই ঘটছিল না।

২০০১ সালের জুন মাসে একদিন রিগ্যান স্থানীয় একটি পাবলিক লাইব্রেরিতে যান। তার পেছনে পেছনে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন এফবিআইর দুজন এজেন্ট। ঘণ্টাখানেক ইন্টারনেট ব্যবহার করে যাওয়ার পর এজেন্ট দুজন ছুটে যান দিকে। তাদের ভাগ্য ভালো, রিগ্যান ব্রাউজার বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন।

এজেন্ট দুজন ব্রাউজারের হিস্টরি ঘেঁটে জানতে পারেন, রিগ্যান পুরো সময়টা কাটিয়েছিলেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত লিবিয়া এবং ইরাকের দূতাবাসগুলোর ঠিকানা অনুসন্ধান করে। অর্থাৎ আমেরিকার ভেতরে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হওয়ায় রিগ্যান সম্ভবত ইউরোপে গিয়ে লিবিয়া এবং ইরাকের দূতাবাসে যোগাযোগ করার পরিকল্পনা করছেন।

২০০০ সালের আগস্ট মাসেই বিমানবাহিনী থেকে রিগ্যানকে অবসর নিতে হয়েছিল। কিন্তু কয়েকমাস পরেই তিনি টিআরডাব্লিউ নামে একটি প্রাইভেট সিকিউরিটি কনট্রাক্টরের অধীনে চাকরি পান। তারা রিগ্যানের পূর্বের অভিজ্ঞতা জানতে পেরে তাকে আবারও এনআরওতেই তাদের কন্ট্রাক্টের অধীনে চাকরি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০০১ সালের আগস্ট মাস থেকে রিগ্যান পুনরায় চাকরিতে যোগদান করেন। কিন্তু এবার তার অজান্তে অফিসে তার প্রতিটি মুহূর্তের কর্মকাণ্ড রেকর্ড করছিল এফবিআই কর্মকর্তারা।

২০০১ সালের ২৩ আগস্ট রিগ্যান কাজের ফাঁকে দিয়ে ২০ মিনিটের জন্য ইন্টেলিঙ্কে প্রবেশ করে একটি চাইনিজ মিসাইল সাইটের ঠিকানা খুঁজে বের করেন এবং নিজের নোটবুকে টুকে রাখেন। এরপর তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে এক সপ্তাহর ছুটি চান এই বলে যে, স্ত্রী-পরিবারসহ তিনি লং ড্রাইভে ওরল্যান্ডো শহরে বেড়াতে যেতে চান। কিন্তু ছুটি পাওয়ার পর ওরল্যান্ডোর পরিবর্তে সেদিন বিকেলেই তিনি উপস্থিত হন ওয়াশিংটন ডালাস এয়ারপোর্টে, বিকেল ৪টার ফ্লাইট ধরে জুরিখে যাওয়ার জন্য।

এফবিআই কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, রিগ্যান সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছেন সেখানকার বিদেশি দূতাবাসগুলোতে গিয়ে চুরি করা ডকুমেন্টগুলো বিক্রি করার জন্য। রিগ্যান যখন প্লেনে চড়ার জন্য বাসে উঠতে যাবেন, ঠিক তখন তার সামনে গিয়ে হাজির হন স্টিভেন কার এবং তার এফবিআইর সহকর্মীরা। তারা রিগ্যানকে আটক করে তার দেহ তল্লাশি করেন। তার ডান পায়ের জুতার ভেতর তারা ঠিকই একটি চিরকুট খুঁজে পান, যেখানে ইংরেজিতে দুটি ঠিকানা লেখা ছিল। ঠিকানা দুটি ছিল জুরিখের ইরাকি এবং চাইনিজ দূতাবাসের।

রিগ্যানের কাছ থেকে পাওয়া সাংকেতিক কোড; Image Source: FBI

রিগ্যানের সাথে আরো কিছু কাগজও ছিল, কিন্তু সেগুলো ছিল সব সাংকেতিক ভাষায় লেখা। তার ব্যাগের ভেতর একটি ট্রাউজারের পকেটে একটি স্পাইরাল প্যাডের গায়ে বিচ্ছিন্নভাবে ১৩টি শব্দ লেখা ছিল, যেমন: tricycle, rocket, switch, ইত্যাদি। আরেকটি ইনডেক্স কার্ডের গায়ে লেখা ছিল এরকম আরো ২৬টি বিচ্ছিন্ন শব্দ। তার ওয়ালেটের ভেতর একটি চিরকুটের গায়ে লেখা ছিল অর্থহীন কতগুলো অক্ষর এবং শব্দ, যার শুরুটা ছিল এরকম: 5-6-N-V-O-A-I …। আর তার ব্যাগের ভেতর একটি ফোল্ডারের ভেতর চার পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা ছিল কতগুলো তিন অঙ্কের সংখ্যা, যেমন: 952, 832, 041 …।

স্টিভেন কারের বুঝতে বাকি ছিল না, এগুলোর প্রতিটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন তথ্যের সাংকেতিক রূপ। এর কিছু হয়তো গোপন কোনো স্থানের ঠিকানা, আর বাকি কিছু হয়তো কোড ভেঙে সেই ঠিকানা উদ্ধার করার চাবি। কিন্তু রিগ্যান কোনো কিছুই স্বীকার করতে রাজি হচ্ছিলেন না। তিনি দাবি করছিলেন, এগুলো অর্থহীন কিছু সংখ্যা ছাড়া আর কিছুই না। অবসর সময়ে তিনি সংখ্যার খেলা খেলতে পছন্দ করেন, এগুলো তারই অংশ।

রিগ্যানকে গ্রেপ্তার করতে পেরে কারের খুশি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি খুশি হতে পারছিলেন না। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তারা রিগ্যানকে গ্রেপ্তার করেছেন ঠিকই, কিন্তু রিগ্যানের চুরি করা তথ্য উদ্ধার করতে তাদের তখনও অনেক দেরি।

স্টিভেন কার এবং এফবিআইর ক্রিপ্টোলজিস্টরা কাজে লেগে পড়েন। ওয়ালেটের ভেতরে থাকা চিরকুটের গায়ে লেখা 5-6-N-V-O-A-I … অংশটুকুর অর্থ উদ্ধার করা ছিল তুলনামূলকভাবে সহজ। প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এফবিআইর ক্রিপ্টোলজিস্ট ড্যানিয়েল ওলসন বুঝতে পারেন, এটি এনক্রিপ্ট করা হয়েছে সিজার শিফটের (Caesar Shift) মাধ্যমে। সিজার শিফট হচ্ছে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার কর্তৃক উদ্ভাবিত একটি এনক্রিপশন পদ্ধতি, যেখানে প্রতিটি অক্ষরকে তার পরবর্তী নির্দিষ্টতম কোনো একটি অক্ষর দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়।

ওলসন দেখতে পান, এটি আসলে সিজার শিফটের সরলতম রূপ, যেখানে কী-এর মান হিসেবে ১ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি অক্ষরকে মাত্র ১ ঘর ডানে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। A-কে লেখা হয়েছে B, B-কে লেখা হয়েছে C, C-কে D… এরকম। এটি সমাধান করতে হলে প্রতিটি অক্ষরকে শুধু উল্টোদিকে ১ ঘর সরিয়ে দিলেই হবে। অর্থাৎ 5-6-N-V-O-A-I … এর প্রকৃত অর্থ হবে 4-5-M-U-N-Z-H …।

চিরকুটটির প্রথম লাইন সম্পূর্ণ ডিক্রিপ্ট করার পর তার অর্থ দাঁড়ায় 45 MUNZHOF BANHOF STR, যেটি শুনতেই অর্থহীন কোনো শব্দের পরিবর্তে জার্মান শব্দের মতো শোনায়। ওলসন গুগল সার্চ করে দেখতে পান, এটি হচ্ছে জুরিখে অবস্থিত একটি সুইস ব্যাঙ্কের ঠিকানা।

একই পদ্ধতিতে পরের লাইনগুলো ডিক্রিপ্ট করে তিনি দেখতে পান, সেগুলো হচ্ছে আরেকটি সুইস ব্যাংকের ঠিকানা, ব্যাংক দুটির অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ এবং অ্যাকাউন্ট দুটির নাম্বার। রিগ্যানের পরিকল্পনা ছিল, এসপিওনাজের ফলে প্রাপ্ত ১৩ মিলিয়ন ডলার তিনি এই অ্যাকাউন্টগুলোতেই জমা রাখবেন।

রিগ্যানের ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কোড; Image Source: wired.com

স্পাইরাল প্যাডের পৃষ্ঠায় বিচ্ছিন্নভাবে লেখা ১৩টি শব্দের অর্থ উদ্ধার করা ছিল সেই তুলনায় একটু কঠিন। কিন্তু স্টিভেন কার লক্ষ্য করেছিলেন, গ্রেপ্তার হওয়ার দিন সকালবেলা রিগ্যান ইন্টেলিঙ্ক ব্রাউজ করার সময় যে প্যাডটিতে নোট নিয়েছিলেন, এটি ছিল ঠিক সেই প্যাডটিই।

এমন কি হতে পারে, এই শব্দগুলো আসলে রিগ্যানের ব্রাউজ করা চাইনিজ মিসাইল সাইটের ঠিকানা? অথবা তার স্থানাঙ্ক? কার ইন্টেলিঙ্কে প্রবেশ করে মিসাইল সাইটটি খুঁজে বের করেন এবং দেখতে পান, সাইটটির অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশে সর্বমোট ১৩টি অক্ষরই আছে। অর্থাৎ প্যাডের প্রতিটি শব্দ আসলে এক একটি অক্ষরকে নির্দেশ করছে!

কার আবার শব্দগুলোর দিকে তাকালেন: tricycle, rocket, switch … হঠাৎ তার মনে হলো, তিনি ব্যাপারটি বুঝতে পারছেন। রিগ্যান প্রতিটি সংখ্যাকে এমন একটি জিনিসের নাম দিয়ে প্রকাশ করেছেন, যে জিনিসটির ছবি তার মনে ভেসে উঠলেই ঐ সংখ্যাটির মান মনে পড়ে যাবে। যেমন ট্রাইসাইকেলের যেহেতু তিনটি চাকা, তাই এই শব্দটি দেখলেই বোঝা যাবে এর মান আসলে ৩। একইভাবে রকেট যেহেতু লম্বা একটি জিনিস, তাই এর মান হবে ১। সুইচ যেহেতু শুধু অন এবং অফ করা সম্ভব, তাই এর মান হবে ২।

কয়েকটি শব্দের মান বের করা অবশ্য একটু কঠিন ছিল। যেমন weapon এর মান ছিল ৬, যেহেতু রিভলভার এক ধরনের উইপন এবং রিভলভারের ম্যাগাজিনে ছয়টি চেম্বার থাকে। আবার casino এর মান ছিল ৭, যেহেতু ক্যাসিনোর সাথে ভাগ্য জড়িত এবং ভাগ্যের সাথে লাকি সেভেন শব্দটি জড়িত। একে একে সবগুলো শব্দ ডিকোড করার পর কার দেখতে পান, আসলেই সেগুলো ছিল চাইনিজ মিসাইল সাইটের কো-অর্ডিনেট!

এই পদ্ধতিতে কোনো শব্দকে এনকোড করার প্রক্রিয়াকে ক্রিপ্টোলজির ভাষায় বলা হয় নেমোনিক (Mnemonic) কোড। এমনিতেও পদ্ধতিটি ডিসলেক্সিকদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। যেকোনো সংখ্যা সহজে মনে রাখার জন্য তারা এই পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। কার এবং তার দল ইনডেক্স কার্ডের গায়ে লেখা ২৬টি শব্দের অর্থ বের করার জন্যও এই একই পদ্ধতি প্রয়োগ করলেন। দেখা গেল সেগুলো ইরাকি সার্ফেস-টু-এয়ার মিসাইল সাইটের কো-অর্ডিনেট।

এরপর বাকি রইল শুধু চার পৃষ্ঠা জুড়ে লেখা ট্রাইনোম (Trinome) তথা তিন অঙ্কের সংখ্যাগুলোর অর্থ উদ্ধার করা। কার অনুমান করতে পারছিলেন, সেগুলো সম্ভবত অনেকগুলো স্থানাঙ্কের কোড, যেসব স্থানে হয়তো রিগ্যান তার চুরি করা তথ্যগুলো লুকিয়ে রেখেছেন। কিন্তু কোনো কী ছাড়া এই কোড তারা ভাঙবেন কেমন করে?

পাঁচ.

রিগ্যান যখন প্রথম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তখন তিনি কোনো অপরাধই স্বীকার করতে রাজি হচ্ছিলেন না। কিন্তু এফবিআই যখন তার বাসার কম্পিউটার ঘেঁটে লিবিয়ান দূতাবাসে পাঠানো ডকুমেন্টগুলোর সফট কপি খুঁজে পায়, তখন তার আর অস্বীকার করার কোনো উপায় ছিল না।

এরকম হাতেনাতে ধরা পড়ে গেলে অধিকাংশ অপরাধীই সাধারণত নিজের অপরাধ স্বীকার করে নেয় এবং কর্তৃপক্ষের সাথে সমঝোতায় যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু রিগ্যানের কথা ভিন্ন। তিনি সহযোগিতা না করে পাল্টা হুমকি দিতে শুরু করেন। তিনি দাবি করেন, তার কাছে মাটির নিচে লুকানো এমন সব তথ্য আছে, যেগুলো অন্য কোনো দেশের হাতে পড়লে যুদ্ধ বেঁধে যাবে! এই তথ্যগুলোর সন্ধান তিনি তখনই দিবেন, যখন সরকার তাকে লঘুতম শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দিতে রাজি হবে।

এনআরও চাইছিল রিগ্যানের সাথে যেকোনো ধরনের সমঝোতায় গিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তথ্যগুলো উদ্ধার করে ফেলতে। কিন্তু জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট বেঁকে বসে। তাদের অবস্থান ছিল, একবার কারো চাপের কাছে নতি স্বীকার করলে এরপর অন্যান্য অপরাধীরাও সেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করবে।

রাষ্ট্রপক্ষ বিভিন্নভাবে রিগ্যানকে বাগে আনতে চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। রিগ্যান আগের মতোই অনড় থাকেন। ফলে মামলা শেষপর্যন্ত আদালতে গড়ায় এবং ক্ষুব্ধ রাষ্ট্রপক্ষ রিগ্যানের মৃত্যুদণ্ডের জন্য আবেদন করে বসে। এটি ছিল ১৯৫৩ সালের রোজেনবার্গ কেসের পর থেকে আমেরিকার ৫০ বছরের ইতিহাসে এসপিওনাজের দায়ে কারো মৃত্যুদণ্ড চাওয়ার প্রথম ঘটনা।

গ্রেপ্তার হওয়ার পর রিগ্যান; Image Source: usatoday.com

বিচার শুরু হওয়ার প্রাক্কালে রিগ্যান আরেকটি দুঃসাহসী কাজ করে বসেন। তিনি জেল থেকে গোপনে তার স্ত্রীর কাছে সাংকেতিক ভাষায় একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি তাকে অনুরোধ করেন, সে যেন জঙ্গলে গিয়ে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে কিছু খেলনা জিনিস লুকিয়ে রেখে আসে।

রিগ্যানের পরিকল্পনা ছিল, রাষ্ট্রপক্ষ যখন আদালতে অভিযোগ করবে যে, তিনি জঙ্গলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট লুকিয়ে রেখেছেন, তখন তিনি পুরো ব্যাপারটা অস্বীকার করবেন। তিনি দাবি করবেন, কোনো ডকুমেন্ট না, বরং সন্তানদের সাথে ট্রেজার হান্ট খেলার জন্যই তিনি জঙ্গলে বিভিন্ন খেলনা লুকিয়ে রেখেছিলেন। এফবিআই অনর্থক তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।

কিন্তু তার স্ত্রী কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগেই এফবিআই চিঠিটি উদ্ধার করে ফেলে। এবার তারা রিগ্যানকে নির্জন প্রকোষ্ঠে প্রেরণ করার এবং তার স্ত্রীকে আটক করার হুমকি দেয়। স্ত্রীকে বাঁচানোর জন্য শেষপর্যন্ত রিগ্যান হার স্বীকার করেন। গ্রেপ্তার হওয়ার প্রায় দেড় বছর পর রিগ্যান প্রথমবারের মতো এফবিআইর সাথে সহযোগিতা করতে রাজি হন। এই দেড় বছরে হাজার চেষ্টা করেও এফবিআই এবং এনএসএর ক্রিপ্টোলজিস্টরা ঐ চার পৃষ্ঠার তিন অঙ্কের সংখ্যাগুলো ডিকোড করতে পারেনি।

রিগ্যান জানান, সবগুলো ডকুমেন্ট তিনি মোট ১৯টি স্থানে লুকিয়ে রেখেছেন। এরমধ্যে ১২টি প্যাকেজ রেখেছেন ভার্জিনিয়ার পোকাহন্টাস স্টেট পার্কে এবং বাকি ৭টি প্যাকেজ রেখেছেন ম্যারিল্যান্ডের পাটাপস্কো ভ্যালি স্টেট পার্কে। এফবিআই যে চার পৃষ্ঠার তিন অঙ্কের সংখ্যাগুলো ডিসাইফার করতে চাইছে, সেগুলো হচ্ছে ভার্জিনিয়ার ১২টি সাইটের কো-অর্ডিনেট। সেগুলো তিনি এনসাইফার করেছেন বুক কোড (Book Code) ব্যবহার করে। অর্থাৎ সেগুলো ডিসাইফার করতে নির্দিষ্ট একটি বইয়ের প্রয়োজন হবে।

কিন্তু রিগ্যান এফবিআইকে আশ্বস্ত করেন, এত কষ্ট করে সংখ্যাগুলো ডিকোড করার আসলে কোনো দরকার নেই। তিনি তাদেরকে ভার্জিনিয়ার একটি রাস্তার নির্দিষ্ট একটি সাইনবোর্ডের ঠিকানা দিয়ে বলেন, সেখানে মাটির নিচে একটি প্লাস্টিকের টুথব্রাশ কন্টেইনার লুকানো আছে, যার ভেতরে একটি কাগজে প্লেইনটেক্সটেই ঐ ১২টি সাইটের কো-অর্ডিনেট লেখা আছে! এফবিআই তার কথা মতো গিয়ে ঠিকই এক সপ্তার মধ্যে সবগুলো প্যাকেজ উদ্ধার করে আনে।

কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় ম্যারিল্যান্ডের ৭টি সাইটের ঠিকানা নিয়ে, যেখানে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ডকুমেন্টগুলো রাখা ছিল। এর কো-অর্ডিনেটগুলো লেখা ছিল ভার্জিনিয়ার টুথব্রাশ কন্টেইনারের ভেতরেই আরেকটি কাগজে। কিন্তু প্লেইনটেক্সটের পরিবর্তে এগুলো লেখা ছিল সাইফারটেক্সট তথা সাংকেতিক ভাষায়। পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে ছিল অনেকগুলো ট্রাইনোম তথা তিন অঙ্কের সংখ্যা। এর ফাঁকে ফাঁকে ছিল একটি ইংরেজি বর্ণের সাথে দুই অঙ্কের একটি সংখ্যার কয়েকটি মিশ্রণ। অনেকটা এরকম: … 413 958 431 13A 11A 40A 775 167 102

কাগজটি হাতে পাওয়ার পর স্টিভেন কার সেটি রিগ্যানের দিকে এগিয়ে দেন। কিন্তু রিগ্যান শূন্যদৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে থাকেন। এমনিতেই তিনি ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত। তথ্য মনে রাখতে তার কষ্ট হয়। তার ওপর কোডগুলো তিনি লিখেছিলেন প্রায় তিন বছর আগে। এরমধ্যে কত কিছু ঘটে গেছে! কোন পদ্ধতিতে যে তিনি এই পৃষ্ঠাটি এনসাইফার করেছিলেন, সেটি তিনি এখন নিজেই আর মনে করতে পারছেন না!

রিগ্যানের ট্রাইনোম কোডগুলো; Image Source: FBI

কয়েক সপ্তাহ পর এক সকালে রিগ্যানকে সাথে নিয়ে স্টিভেন কার, ড্যানিয়েল ওলসন এবং অন্যান্য কর্মকর্তারা ব্রেইনস্টর্মিং সেশনে বসলেন। সবাই মিলে একসাথে কোডগুলো নিয়ে আলোচনা করবেন, যদি কারো মাথা থেকে নতুন কোনো সূত্র বেরিয়ে আসে, এই আশায়।

রিগ্যান জানালেন, তিনি শুধু মনে করতে পারছেন, পৃষ্ঠাটি এনক্রিপ্ট করার জন্য কোড বুক হিসেবে তিনি তার হাইস্কুলের ইয়ারবুক ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু কীভাবে ব্যবহার করেছিলেন, তা তার মনে নেই। এনক্রিপ্ট করা পৃষ্ঠাটির একেবারে উপরে Number 1 লেখা ছিল। রিগ্যান জানালেন, এটি হচ্ছে ইয়ারবুকে তার নিজের নামের রেফারেন্স। কিন্তু অন্য সংখ্যাগুলোর সাথে এটি কীভাবে সম্পর্কিত, সে ব্যাপারে তিনি কোনো ধারণা দিতে পারলেন না।

লাঞ্চের কিছুক্ষণ আগে ওলসন হঠাৎ লক্ষ্য করলেন, 13A সংখ্যাটিকে পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে বেশ কয়েকবার দেখা যাচ্ছে। তিনি গুণে দেখলেন, কিছু দূর পরপর করে সংখ্যাটি মোট সাত বার লেখা হয়েছে। তার মনে পড়ল, ম্যারিল্যান্ডে মোট প্যাকেজের সংখ্যাও সাত। এমন কি হতে পারে, প্রতিটি প্যাকেজের জন্য একবার করে 13A সংখ্যাটি উল্লেখ করা হয়েছে?

ওলসনের কিছু একটা সন্দেহ হলো। তিনি ইয়ারবুকে রিগ্যানের ছবি থেকে গুণে গুণে ১৩তম ছবিটার দিকে তাকালেন। এই ছবিটা অন্য সবগুলো ছবি থেকে ভিন্ন। এখানে ছাত্রটির আসল নামের পরিবর্তে লেখা ছিল Mystery Man। আর সেই নামটি কেটে দিয়ে কলম দিয়ে লেখা ছিল Frank। পুরো ইয়ারবুকে অন্য কোনো নামের প্রথম অক্ষর F ছিল না।

ওলসনের সন্দেহ হলো, এটাই হয়তো মূল চাবি। সম্ভবত F হচ্ছে প্রতিটি প্যাকেজের অবস্থান বর্ণনা করার জন্য প্রয়োজনীয় সাধারণ একটি শব্দের প্রথম অক্ষর। কী হতে পারে সেটা? ওলসনের একটা শব্দই মনে পড়ল: দূরত্বের একক, ফিট (Feet)!

রিগ্যান সাথে সাথে সায় দিলেন। হ্যাঁ, তার মনে পড়েছে। বর্ণযুক্ত তিন অক্ষরের অন্য সংখ্যাগুলোও এই পদ্ধতিতেই ডিকোড করতে হবে। ওলসন পরের সংখ্যাদুটির দিকে তাকালেন: 11A এবং 40A। রিগ্যানের ছবি থেকে ১১তম এবং ৪০তম ছবির নাম পাওয়া গেল Cindy এবং Donna। পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী এদের প্রথম অক্ষর নিলে হয় C এবং D। রিগ্যান জানালেন, এটা হচ্ছে CD তথা কমপ্যাক্ট ডিস্ক। অর্থাৎ এখানেই তিনি সিডিগুলো লুকিয়ে রেখেছেন!

পরবর্তী শব্দগুলো ডিকোড করার পর দেখা গেল, সেগুলো হচ্ছে SP তথা Small Package এবং LP তথা Large Package। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই CD, LP কিংবা SP ঠিক কোথায় লুকানো আছে? ওলসন বুঝতে পারছিলেন, এগুলোর প্রতিটির আগে যে একসারি বর্ণবিহীন তিন অঙ্কের সংখ্যা আছে, সেগুলো ডিকোড করতে পারলেই এদের কো-অর্ডিনেটগুলো পাওয়া যাবে। কিন্তু সেগুলো ডিকোড করার পদ্ধতি তখনও কেউ জানে না।

রিগ্যানের লুকিয়ে রাখা বিভিন্ন সিক্রেট ডকুমেন্ট, সিডি, লার্জ প্যাকেজ, স্মল প্যাকেজ; Image Source: FBI

ওলসন হঠাৎ আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করলেন। শুরুর দিকে কিছুক্ষণ পরপর বর্ণযুক্ত শব্দ থাকলেও শেষ তিন লাইনে কোনো বর্ণযুক্ত শব্দ নেই। সেখানে পরপর অনেকগুলো তিন অঙ্কের সংখ্যা। কেন হঠাৎ এই পরিবর্তন? শেষ তিন লাইনের বিশেষত্ব কী? রিগ্যানও ভাবতে লাগলেন, কিন্তু মনে করতে পারলেন না।

এক সপ্তাহ পর হঠাৎ একদিন স্টিভেন কারের ফোন বেজে উঠল। রিগ্যান যে জেলে ছিলেন, সেই আলেক্সান্দ্রিয়া জেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ফোন করেছেন। তিনি জানালেন, রিগ্যান তাকে অনুরোধ করেছেন তিনি যেন স্পেশাল এজেন্ট কারকে একটি জরুরি ম্যাসেজ পৌঁছে দেন। ম্যাসেজটি হচ্ছে, রিগ্যান কাজটি সমাধান করে ফেলেছেন!

পরদিনই কার ছুটে গেলেন রিগ্যানের সাথে দেখা করার জন্য। রিগ্যান তাকে জানালেন, ট্রাইনোমগুলো কীভাবে ডিকোড করতে হবে, সেটা তার মনে পড়ে গেছে। কিন্তু তার আসলে কোনো দরকার ছিল না। কারণ শেষ তিন লাইনে যে সংখ্যাগুলো লেখা ছিল, সেখানেই সব সমাধান দেয়া ছিল। সেগুলো কোনো এনক্রিপ্টেড কোড ছিল না, সেগুলো ছিল একেবারে প্লেইন টেক্সটে লেখা সাতটি সাইটের অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশ!

রিগ্যানের আশঙ্কা ছিল, তিনি হয়তো এনক্রিপশন পদ্ধতি ভুলে যেতে পারেন। সেজন্যই পৃষ্ঠার নিচে সরাসরি কো-অর্ডিনেটগুলো লিখে রেখেছিলেন। কিন্তু এই কথাও যে তিনি ভুলে যাবেন, সেটা কে জানত?

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ স্টিভেন কার এবং তার সহকর্মীরা ব্যস্ত সময় কাটান। তারা কো-অর্ডিনেট অনুযায়ী ম্যারিল্যান্ডের পার্কে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেন ঠিকই, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন ব্যাপারটা খুব একটা সহজ না। কারণ ভার্জিনিয়ার মতো রিগ্যান এখানে সরাসরি কো-অর্ডিনেটের স্থানেই প্যাকেজগুলো লুকিয়ে রাখেননি। অধিকতর নিরাপত্তার জন্য তিনি এখানে প্যাকেজগুলো লুকিয়েছিলেন নির্দিষ্ট কো-অর্ডিনেটের বিপরীত দিকের গাছটি থেকে নির্দিষ্ট ফিট দূরে।

একদিন স্টিভেন কার জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে রিগ্যানকে জঙ্গলের ভেতর নিয়ে যান তাদেরকে সঠিক স্থান খুঁজে বের করতে সাহায্য করার জন্য। অবশ্য কার নিজেও সন্দিহান ছিলেন। যে লোক সাধারণ বানান মনে রাখতে পারে না, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা কীভাবে এনক্রিপ্ট করেছিল সেটা মনে রাখতে পারে না, সে কি তিন বছর আগে লুকানো জায়গার কথা মনে রাখতে পারবে?

কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে রিগ্যান ঠিকই খালি চোখে জঙ্গলের গাছপালার দিকে এক নজর তাকিয়েই দেখিয়ে দিতে পেরেছিলেন, ঠিক কোথায় কোথায় তিনি প্যাকেজগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন! বানান এবং সংখ্যা মনে রাখতে না পারলেও ডিসলেক্সিকরা যে দৃশ্য খুব ভালো মনে রাখতে পারে, সবাইকে যেন সেটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

আদালতে ব্রায়ান রিগ্যান; Image Source: FBI

ওলসন হঠাৎ আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করলেন। শুরুর দিকে কিছুক্ষণ পরপর বর্ণযুক্ত শব্দ থাকলেও শেষ তিন লাইনে কোনো বর্ণযুক্ত শব্দ নেই। সেখানে পরপর অনেকগুলো তিন অঙ্কের সংখ্যা। কেন হঠাৎ এই পরিবর্তন? শেষ তিন লাইনের বিশেষত্ব কী? রিগ্যানও ভাবতে লাগলেন, কিন্তু মনে করতে পারলেন না।

এক সপ্তাহ পর হঠাৎ একদিন স্টিভেন কারের ফোন বেজে উঠল। রিগ্যান যে জেলে ছিলেন, সেই আলেক্সান্দ্রিয়া জেলের সুপারিন্টেন্ডেন্ট ফোন করেছেন। তিনি জানালেন, রিগ্যান তাকে অনুরোধ করেছেন তিনি যেন স্পেশাল এজেন্ট কারকে একটি জরুরি ম্যাসেজ পৌঁছে দেন। ম্যাসেজটি হচ্ছে, রিগ্যান কাজটি সমাধান করে ফেলেছেন!

পরদিনই কার ছুটে গেলেন রিগ্যানের সাথে দেখা করার জন্য। রিগ্যান তাকে জানালেন, ট্রাইনোমগুলো কীভাবে ডিকোড করতে হবে, সেটা তার মনে পড়ে গেছে। কিন্তু তার আসলে কোনো দরকার ছিল না। কারণ শেষ তিন লাইনে যে সংখ্যাগুলো লেখা ছিল, সেখানেই সব সমাধান দেয়া ছিল। সেগুলো কোনো এনক্রিপ্টেড কোড ছিল না, সেগুলো ছিল একেবারে প্লেইন টেক্সটে লেখা সাতটি সাইটের অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশ!

রিগ্যানের আশঙ্কা ছিল, তিনি হয়তো এনক্রিপশন পদ্ধতি ভুলে যেতে পারেন। সেজন্যই পৃষ্ঠার নিচে সরাসরি কো-অর্ডিনেটগুলো লিখে রেখেছিলেন। কিন্তু এই কথাও যে তিনি ভুলে যাবেন, সেটা কে জানত?

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ স্টিভেন কার এবং তার সহকর্মীরা ব্যস্ত সময় কাটান। তারা কো-অর্ডিনেট অনুযায়ী ম্যারিল্যান্ডের পার্কে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু করেন ঠিকই, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন ব্যাপারটা খুব একটা সহজ না। কারণ ভার্জিনিয়ার মতো রিগ্যান এখানে সরাসরি কো-অর্ডিনেটের স্থানেই প্যাকেজগুলো লুকিয়ে রাখেননি। অধিকতর নিরাপত্তার জন্য তিনি এখানে প্যাকেজগুলো লুকিয়েছিলেন নির্দিষ্ট কো-অর্ডিনেটের বিপরীত দিকের গাছটি থেকে নির্দিষ্ট ফিট দূরে।

একদিন স্টিভেন কার জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে রিগ্যানকে জঙ্গলের ভেতর নিয়ে যান তাদেরকে সঠিক স্থান খুঁজে বের করতে সাহায্য করার জন্য। অবশ্য কার নিজেও সন্দিহান ছিলেন। যে লোক সাধারণ বানান মনে রাখতে পারে না, তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা কীভাবে এনক্রিপ্ট করেছিল সেটা মনে রাখতে পারে না, সে কি তিন বছর আগে লুকানো জায়গার কথা মনে রাখতে পারবে?

কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে রিগ্যান ঠিকই খালি চোখে জঙ্গলের গাছপালার দিকে এক নজর তাকিয়েই দেখিয়ে দিতে পেরেছিলেন, ঠিক কোথায় কোথায় তিনি প্যাকেজগুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন! বানান এবং সংখ্যা মনে রাখতে না পারলেও ডিসলেক্সিকরা যে দৃশ্য খুব ভালো মনে রাখতে পারে, সবাইকে যেন সেটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহার “স্পাই স্টোরিজ: এসপিওনাজ জগতের অবিশ্বাস্য কিছু সত্য কাহিনি” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে পারবেন রকমারির এই লিঙ্ক থেকে অথবা বুকশেয়ারের এই লিঙ্ক থেকে। এছাড়াও অনলাইনে পড়তে চাইলে পড়তে পারেন বইটই অ্যাপের এই লিঙ্ক থেকে অথবা রোর বাংলার এই লিঙ্ক থেকে।

Featured Image: Vasiliki Kostopoulou / EyeEm/Getty Images/EyeEm

আপনার মন্তব্য লিখুন