Skip links

কাজী নজরুল ইসলাম কি ‘কাফির কবি’?

সত্যায়ন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আরিফুল ইসলাম এর "খোঁপার বাঁধন" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 9 মিনিট

লাফিজা ‘উত্তর আধুনিক মুসলিম মন’ বইটি পড়া শেষ করলো। গতো ২০০ বছরে আধুনিকতা মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম চিন্তাবিদরা কী ফর্মুলা হাজির করেছেন এই নিয়ে বইটি। ৫০ জন মুসলিম মনীষীর সাথে লাফিজার পরিচয় হলো। বেশিরভাগের নাম সে আগে জানতো না।

লাফিজা সবচেয়ে অবাক হয়েছে ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করা মার্গেট মার্কাসের জীবনী পড়ে। তাঁর ইসলাম গ্রহণ এবং ইসলামি সংস্কৃতির প্রতি টান দেখে লাফিজা মুগ্ধ হয়েছে। তাঁর মুগ্ধতা এখনো কাটছে না। ইহুদি মার্গেট মার্কাস ইসলাম গ্রহণের পর নাম পরিবর্তন করে হোন ‘মরিয়ম জামিলা’। ত্রিশটিরও বেশি বই তিনি লিখেছেন। মরিয়ম জামিলার কোনো বই কি মাহিরের বুক সেলফে আছে? লাফিজার বিশ্বাস অবশ্যই থাকবে।

মাহির বিভিন্ন জনরার বই পড়ে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ইতিহাস, জীবনী, জীবনদর্শন, আকীদা সব ধরণের বই তার বুক সেলফে সাজানো। ‘কী পড়তে পছন্দ করো?’ জিজ্ঞেস করলে মাহির বলে, “আমি সর্বভুক। আমি সব পড়ি। যাই পড়ি, তাই ভালো লাগে। সবচেয়ে ভালো লাগে, ভালো-মন্দ যাচাই-বিশ্লেষণ করে ভালোটা গ্রহণ করতে।”

প্রতিদিন সকালের মতো আজও মাহির রিডিংরুমে বসে বই পড়ছে। লাফিজাকে আসতে দেখে মাহির সিনেমার ডিরেক্টরের মতো ক্যামেরার মতো দুটো হাত চোখের সামনে রেখে বললো, “তোমার খোঁপায় যদি একটি বেলীফুল থাকতো, তোমাকে কী যে মানাতো না!”

মাহিরের কমপ্লিমেন্ট হয়তো বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলা। কিন্তু, লাফিজার শুনতে ভালোই লাগছে। আরেকটু কাছে যেতেই মাহির কবিতার কয়েকটি লাইন আবৃত্তি করলো-

“আধখানা চাঁদ আকাশ পরে

উঠবে যবে গরব-ভরে

তুমি বাকি আধখানা চাঁদ হাসবে ধরাতে,

তড়িৎ ছিড়ে পড়বে তোমার খোঁপায় জড়াতে।”

এমন কবিতা শুনে লাফিজা হেসে কুটিকুটি। স্বামী যখন সুন্দর করে ফ্ল্যাট করে, তখন কার না ভালো লাগে?

“এতো সুন্দর কবিতা কে লিখেছেন? নাকি তুমি?”

“না, আমি নই। আমার ভালোবাসাকে যিনি ভাষায় প্রকাশ করা শিখিয়েছেন, সেই কাজী নজরুল ইসলাম এটা লিখেছেন।”

লাফিজা জানে যে, মাহির কাজী নজরুল ইসলামের একজন ভক্ত। কিন্তু, কতো বড়ো বা কতো ছোটো ভক্ত সেটা সম্পর্কে সে নিশ্চিত নয়। তার অনেকদিনের ইচ্ছা মাহিরকে জিজ্ঞেস করবে, নজরুলকে সে কিভাবে দেখে। নজরুলের নাতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পড়ে লাফিজা মুগ্ধ হয়। গুনগুনিয়ে ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’ গায়, মাঝেমধ্যে মাহিরের মুখে নজরুলের রোমান্টিক কবিতার লাইন শুনে। তবুও নজরুলকে নিয়ে লাফিজার মনে অনেক প্রশ্ন। যে নজরুল রাসূলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিবেদন করে কবিতা লিখেছেন, সেই নজরুল আবার শ্যামা সঙ্গীত লিখেছেন, হিন্দু দেব-দেবীর গুণকীর্তিন গেয়েছেন।

এসবের কারণে লাফিজার মনে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে এক ধরণের ‘প্রশ্নবোধক চিহ্ন’ আছে। সে জানতে চায়। মাহিরকে বললে হয়তো সে বুঝাবে। লাফিজা কোনো প্রকার ইতঃস্ততবোধ না করেই মাহিরকে জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা, তুমি যে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে এতো গুণকীর্তন করো, তুমি কি জানো তিনি শ্যামা সঙ্গীত লিখেছিলেন? তবুও কেনো তাকে নিয়ে মাতামাতি করো?”

নিজের প্রশ্ন করা দেখে লাফিজা একটু অবাক হলো। সে কি মাহিরকে আক্রমণ করে কথা বললো? মাহির তাকে কী সুন্দর একটি কমপ্লিমেন্ট করলো, তাকে থ্যাংক্স না দিয়ে উল্টো তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালো? মনের মধ্যে যখন এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন মাহির হেসে বললো, “বসো লাফিজা, সোফায় বসো। প্রশ্নটি আমার কাছে খুব মজার। অনেকবার অনেককেই এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। আজ তোমার সাথেও আমার ভিউ শেয়ার করি।”

লাফিজা মাহিরের পাশে সোফায় বসলো। সে মোটামুটি নিশ্চিত হলো যে, মাহির কিছু মনে করেনি। স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে। লাফিজা গুণমুগ্ধ শ্রোতার মতো দুই গালে হাত রেখে মাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে। অঙ্গভঙ্গির মধ্য দিয়ে মাহিরকে ম্যাসেজ দিলো- আমি শুনতে আগ্রহী।

“তোমার প্রশ্নের মূল পয়েন্ট তো হলো, ইসলাম। তাই না? অর্থাৎ, ইসলামের মাপকাঠিতে কাজী নজরুল ইসলাম উত্তীর্ণ কি-না, এই তো?”

লাফিজা মাথা নাড়লো। “হ্যাঁ, এটাই। যিনি নাতে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লিখছেন, তিনি আবার শ্যামা সঙ্গীত লিখেছেন। সেক্ষেত্রে আমরা তার কবিতা পড়বো কি-না? গ্রহণ করবো কি-না?”

মাহির কথা বলা শুরু করলো।

আমরা প্রথমেই কবিতার ক্ষেত্রে ইসলামের মাপকাঠি নির্ধারণ করে নিই। ইসলাম আমাদেরকে যে মাপকাঠি দিয়েছে, সেই মাপকাঠির আলোকে পৃথিবীর সকল কবিকে মাপবো, পৃথিবীর সকল কবিতাকে যাচাই-বাছাই করবো। ঠিক আছে?

লাফিজা দ্বিতীয়বারের মতো মাথা নাড়লো।

কাজী নজরুল ইসলাম কি কাফির কবি? আরিফুল ইসলামের খোঁপার বাঁধন বইয়ের আর্টিকেল

কাজী নজরুল ইসলাম; Image Course: Wikimedia Commons

রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আগমনের সময়কাল ছিলো আরবি কাব্য ইতিহাসের অনেকটা স্বর্ণযুগকাল বলা যায়। আরবের বিখ্যাত কবিদের কবিতা কাবা ঘরে ঝুলানো হতো। যে গোত্রে একজন যোগ্য কবি থাকতেন, সেই গোত্রের সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে যেতো। বর্তমান যুগের নোবেল পুরস্কারের মতো। যে দেশের কেউ নোবেল পুরস্কার পায়, সে দেশের সম্মান যেমন বেড়ে যায়, তেমনি তখনকার সময়ের কবিদের ব্যাপারেও একই কথা ছিলো।

আরবের একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন উমাইয়া ইবনে আবিস-সালাত। তিনি কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে, তার কিছু কিছু কবিতা ইসলামি মূল্যবোধ ধারণ করতো। সেগুলো ইসলামি মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো।

আমর ইবনে শারিদের পিতার সাথে একবার রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফরে বের হলেন। তিনি তাঁকে বললেন, “তোমার কি উমাইয়া ইবনে আবিস-সালাতের কোনো কবিতা মুখস্ত আছে? মুখস্ত থাকলে আমাকে শুনাও।”

সাহাবী একটি কবিতা আবৃত্তি করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুনলেন। তাঁর ভালো লাগলো। তিনি তাঁকে আরো কবিতা আবৃত্তি করতে বললেন। এভাবে একে-একে ঐ সাহাবী উমাইয়া ইবনে আবিস-সালাতের ১০০ টি পংক্তি রাসূলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুনালেন।

লাফিজা, বলো তো, সেই কবিকে মুসলিম ছিলেন নাকি অমুসলিম?

লাফিজা বললো, “অমুসলিম।”

ঠিক। সেই অমুসলিম কবির ১০০ টি কবিতার আবৃত্তি শুনতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপত্তি করেননি, কারণ কবিতার কন্টেন্ট ছিলো ইসলামি মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সবগুলো কবিতা শুনে মন্তব্য করেন, “সে তো প্রায় মুসলিম হয়েই গিয়েছিলো!”

অর্থাৎ, কবি উমাইয়া ইসলাম গ্রহণ করেনি, কিন্তু তার এই কবিতাগুলো যেনো ইসলাম গ্রহণ করেছে!

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবিতা বিরোধী ছিলেন না, বরং অশ্লীল-অনর্থক মিথ্যা কবিতার বিরোধী ছিলেন।

আহযাব যুদ্ধের পর মক্কার কুরাইশরা রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিন্দা করে কবিতা রচনা শুরু করে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইতোমধ্যে তরবারির জবাব দিয়েছেন তরবারির মাধ্যমে। কিন্তু, কবিতার জবাব তো আর তরবারির মাধ্যমে দেয়া যায় না। তিনি সাহাবীদের মধ থেকে আহ্বান জানালেন, কে মুসলমানদের মান-সম্মান রক্ষা করতে পারবে? রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আহ্বানে তিনজন সাহাবী সাড়া দিলেন। তারা হলেন:

  • কা’ব ইবনে মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)
  • আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)
  • হাসসান বিন সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।

তিনজনই কবি। তবে তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি হিশেবে স্বীকৃত হাসসান বিন সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাসসানকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কাফিরদের নিন্দা করে কবিতা লিখতে বললেন। তিনি বললেন, “হে হাসসান! আল্লাহর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পক্ষ থেকে জবা দাও।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর কাছে দু’আ করেন, “হে আল্লাহ! হাসসানকে রুহুল কুদুস (জিবরাঈল) দ্বারা সাহায্য করো।”

হাসসান বিন সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একমাত্র কবি, যাকে স্বয়ং জিবরাঈল (আলাইহিস সালাম) কবিতা রচনায় সহযোগিতা করেন।

মসজিদে নববীর একটি মিম্বারে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খুতবা দিতেন। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নির্দেশে আরেকটি মিম্বার স্থাপন করা হয় হাসসানের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জন্য; যাতে তিনি সেই মিম্বারে দাঁড়িয়ে ইসলামের পক্ষে কবিতা আবৃত্তি করতে পারেন।

উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তখন খলিফা। তিনি হাসসানকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) দেখলেন মসজিদে কবিতা আবৃত্তি করছেন। এটা দেখে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। অর্থাৎ, তুমি মসজিদে বসে কবিতা আবৃত্তি করছো! হাসসান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বুঝতে পারলেন বিষয়টি। তিনি উমরকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) উদ্দেশ্য করে বললেন, “এখানে আপনার চেয়েও উত্তম ব্যক্তির উপস্থিতিতেও আমি কবিতা আবৃত্তি করতাম।”

অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন জীবিত ছিলেন, তখনই তো আমি মসজিদে কবিতা আবৃতি করতাম, এখন আর এমন কী?

একবার জাহেলী যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি তারাফার একটি কবিতা রাসূলের সামনে আবৃত্তি করা হলে তিনি কবিতাটির প্রশংসা করে বলেন- “এতো নবীদের কথার মতো কথা।”

“লাফিজা, কবিতার ব্যাপারে নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিলো সেটা বুঝতে পারছো?”

লাফিজা বললো, “হ্যাঁ। তারমানে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কন্টেন্ট দেখে কবিতার ব্যাপারে কমেন্ট করতেন? এই তো? মানে, ‘কে লিখলো?’ সেটা মূখ্য ছিলো না, ‘কী লিখলো?’ সেটাই মূখ্য।”

একজাক্টলি। এই তো ধরতে পেরেছো। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রশংসা করে ইতিহাসে যতো কবিতা রচিত হয়েছে, তারমধ্যে শীর্ষ সারিতে থাকবে কবি কা’ব বিন যুহাইরের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বিখ্যাত কবিতা ‘বানাত সু’আদ’। তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর এই কবিতাটি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সামনে বসে আবৃতি করে শুনান, সাহাবীরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

তুমি যদি পার্ফেকশনিজমের লেন্স থেকে কবিতার প্রেক্ষাপট না জেনে কবিতাটি পড়ো, তাহলে এটাকে তুমি গ্রহণ করতে তো পারবেই না, ছুঁড়ে ফেলে দিবে। তোমার কাছে মনে হবে এটা রোমান্টিক কবিতা, যেখানে একজন নারীর বিরহ-বেদনা, অস্থিরতা-চঞ্চলতা ফুটে উঠেছে। একজন প্রিয়তমা নারীর কথা, তার শারীরিক বর্ণনা পড়ে তোমার রুচিতে কুলোবে না।

কিন্তু, আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রশংসায় রচিত কবিতাটি শুনে এতোটাই মুগ্ধ হোন যে, তাঁর নিজের গায়ের চাদরটি কবিকে দিয়ে দেন।

আরবরা কোনো কিছু শুনে, কোনো সংবাদে যখন অসম্ভব খুশি হতো, তখন তারা এমনটি করতো। কবি কা’ব ইবনে মালিকের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাওবা কবুলের ঘটনাটি পড়লেও এটা দেখতে পাবে।

কা’ব বিন যুহাইরের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কবিতাটির নাম হয়ে যায় ‘কাসিদাতুল বুরদা’ বা চাদরের কবিতা। আরো সুন্দর করে বললে- যে কবিতার ফলে চাদর উপহার পেয়েছেন।

কা’ব বিন যুহাইর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) জাহেলী স্ট্যান্ডার্ড থেকে কবিতাটি লিখেছিলেন। জাহেলী স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী একটি কবিতা ‘কবিতা’ হয়ে উঠার পেছনে যে ধরণের ইনগ্রিডিয়েন্টস থাকা দরকার ছিলো, সেই কবিতায় তা ছিলো। ফলে, নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবিতাটিকে ঔন করেন, স্বীকৃতি দেন।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন সত্যায়ন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আরিফুল ইসলাম এর “খোঁপার বাঁধন” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। এছাড়া বিশেষ ছাড়ে পেতে চাইলে ক্লিক করুন ওয়াফিলাইফের এই লিঙ্কে, অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে।
কাজী নজরুল ইসলাম কি কাফির কবি? আরিফুল ইসলামের খোঁপার বাঁধন বইয়ের প্রচ্ছদ

পরবর্তীতে সাহাবীরা কবিতার জাহেলী স্ট্যান্ডার্ডকে ছুঁড়ে ফেলে নিজস্ব রীতি হাজির করেন। আলীর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কবিতা, আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার (রাদিয়াল্লাহু আনহু), পরবর্তীতে ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ), ইমাম আশ-শাফেঈর (রাহিমাহুল্লাহ) কবিতা পড়লে দেখতে পাবে কবিতা নতুন রীতিতে চলছে। কবিতার রীতির প্যারাডাইম শিফট হবার আগ পর্যন্ত জাহেলী স্ট্যান্ডার্ডের কবিতাকে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এপ্রিশিয়েট করেছেন, সাহাবীরা চর্চা করেছেন।

বিখ্যাত তাবেঈ সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব বলেন, “আবু বকর কবি ছিলেন। উমর কবি ছিলেন। আলী ছিলেন এই তিনজনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি।”

উমর ইবনুল খাত্তাবকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তো বলা হতো তখনকার আরবের সবচেয়ে বড়ো সাহিত্য সমালোচক। সাহিত সমালোচক হতে হলে তো মুসলিম, অমুসলিম সকল কবির কবিতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে।

উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ‘কাফির কবি’ যুহাইর বিন আবু সুলমাকে যুগের ‘সর্বশ্রেষ্ঠ কবি’ মনে করতেন। কেন তার কারণ তিনি ব্যাখ্যা করেন, “তিনি এক কথার মধ্যে আরেক কথা গুলিয়ে ফেলতেন না। জংলী ও অশোভন কথাও এড়িয়ে চলতেন। কোনো ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান গুণেরই তিনি প্রশংসা করতেন। কোনো রকম অতিরঞ্জন করেননি।”১০

নবিজীর স্ত্রী আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) তো ‘কাফির কবি’ যুহাইর ইবনে জানাবের কবিতা প্রায় সময়ই আবৃত্তি করতেন।১১

এমনকি আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) নবিজীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘কাফির কবি’ আবু কাবীর আল হুযালীর একটি কবিতা আবৃত্তি করে শুনাতেন। আয়িশার (রাদিয়াল্লাহু আনহা) কবিতা আবৃত্তি শুনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রফুল্লবোধ করেন।১২

কথা বলতে বলতে মাহির অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছে। কথার মধ্যে ছন্দপতন হবে কি-না এটা ভেবে লাফিজা দ্বিধায় আছে। সে কি বলবে, এক গ্লাস পানি এনে দিই? কী মনে করে যেনো কথাটি বলেই ফেললো- “মাহির, পানি খাবে?”

“হ্যাঁ, দাও।”

মনে হচ্ছিলো, মাহির অধীর আগ্রহে পানির জন্য অপেক্ষা করছিলো। ফ্রিজ থেকে লাফিজা এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এলো। হিমশীতল পানি না, নরম্যাল পানিও মিশিয়েছে। মাহির ঢুকঢুক করে এক গ্লাস পানি খেলো। আরেক গ্লাস পানি খাবে কি-না জিজ্ঞেস করলে ‘না’ বললো।

এবার একটু রিলাক্স-মুডে বসে বললো, “কবিতার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই ক্লিয়ার। কবিতার কন্টেন্ট যদি অশ্লীলতা বর্জিত হয়, ইসলামের মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ইসলামি আকীদার ব্যাপারে কোনো ধরণের বিভ্রান্তির প্রকাশ না ঘটায়, তাহলে সেইসব কবিতা গ্রহণযোগ্য; সেটা যে কবিই লিখেন না কেনো। তিনি হাসসান বিন সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হোন, উমাইয়া ইবনে আবিস সালাত হোন, আবু নুয়াস হোন, বাশার ইবনে বুরদ হোন, ইমরাউল কায়স হোন, নাবিগা যুবায়নি হোন, উইলিয়াম ওয়ার্ডসওর্থ হোন, লর্ড বায়রন হোন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হোন বা কাজী নজরুল ইসলাম। ‘কে কবিতা লিখেছেন?’ সেটা ব্যাপার না, ‘কী লিখেছেন?’ সেটাই আসল কথা। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে শুরু করে সাহাবী, সবাই এভাবেই কবিতাকে মেপেছেন।

মজার ব্যাপার কী জানো লাফিজা? আমি এতোক্ষণ এতো উদাহরণ দিয়ে যা বললাম, সেটা এতো উদাহরণ না দিয়ে একজন সাহাবীর একটি উক্তি বলার মাধ্যমেই মূল কথা বলে ফেলতে পারতাম।”

লাফিজা জিজ্ঞেস করলো, “কোন সাহাবী?”

আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)। কবিতার মাপকাঠির ব্যাপারে তাঁর চমৎকার একটি মূল্যায়ন আছে। তাঁর এই উক্তিটি হাদীসের কিতাবে পাওয়া যায়। তিনি বলেন:

“কবিতার মধ্যে কিছু আছে ভালো, কিছু আবার নিকৃষ্ট। তুমি তার ভালোটা গ্রহণ করো আর নিকৃষ্টটা পরিহার করো।”১৩

এই মাপকাঠিতে ফেলে আমরা যেকোনো কবির কবিতাকে মূল্যায়ন করতে পারি। কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কবিতাগুলো গ্রহণ করতে পারি, ইসলামি মূল্যবোধ বহির্ভূত কবিতাগুলো পরিহার করতে পারি। এই মেথোডোলজিটাই রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), সাহাবী, তাবেঈ, সালাফগণ ফলো করেছেন। ইসলামি সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এটাই হলো মূলনীতি- ভালোটা গ্রহণ, খারাপটা বর্জন।

লাফিজার ধারণা ফকফকা পরিষ্কার হলো। কবিতার ব্যাপারে মাহির এতো পড়াশোনা করেছে ভেবেই অবাক হচ্ছে। তার সাথে কথা বলে মজা পাওয়া যায়। আন্দাজে কথা বলবে না। যা বলবে জেনেশুনেই বলবে, দলীলভিত্তিক, যুক্তিযুক্ত।

যে উদ্দেশ্যে লাফিজা রুমে এসেছিলো, সেটাই ভুলে গিয়েছিলো এতোক্ষণ ধরে। মাহিরকে জিজ্ঞেস না করে নিজেই বইয়ের সেলফে মরিয়ম জামিলার বই খুঁজছে সে। খুঁজে না পেলে না হয় মাহিরকে জানাবে।

রেফারেন্স:

১। ‘এ মোর অহংকার’ কবিতা। নজরুল রচনাবলী: ৩/১৬৪।
২। সহীহ মুসলিম: ৫৭৭৮।
৩। সহীহ মুসলিম: ৫৭৮২।
৪। সহীহ বুখারী: ৪৫৩।
৫। সহীহ বুখারী: ৩২১২।
৬। নাকদ আশ শি’র, মুকাদ্দিমা ২৩।
৭। তাবাকাত আশ-শুআরা, পৃষ্ঠা ৮৭।
৮। আল ইকদ আল ফারীদ: ৫/২৮৩।
৯। আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন: ১/১৩৯।
১০। ইবন সালাম, তাবাকাত আশ-শু’আরা, ২৯।
১১। আল ইকদ আল ফারীদ: ৫/২৭৫।
১২। কবিতাটি সংকলিত আছে- ইমাম ইবনুল কাইয়্যিমের (রাহিমাহুল্লাহ) মাদারিজুস সালিকীন গ্রন্থে, পৃষ্ঠা ২৭৭।
১৩। ইমাম বুখারী, আদাবুল মুফরাদ: ৮৭৪।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন সত্যায়ন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আরিফুল ইসলাম এর “খোঁপার বাঁধন” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। এছাড়া বিশেষ ছাড়ে পেতে চাইলে ক্লিক করুন ওয়াফিলাইফের এই লিঙ্কে, অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে।

Featured Image: bd-shikkha.com

আপনার মন্তব্য লিখুন