Skip links

চা বাগানের বিচিত্র জীবন

স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মোরশেদ আলম হীরার "চা বাগানের বিচিত্র জীবন" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 16 মিনিট

যেভাবে চা বাগানে

১৯৭৭ সাল। জানুয়ারি মাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এমএসসি পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের অপেক্ষায় আছি। আর্টস ফ্যাকাল্টির শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে পরিচিত কয়েকজন সহ চা সিংগারা খেতে গেলাম। অনেকদিন পর দেখা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত এক বন্ধুর সাথে।

বললাম, এতদিন কোথায় ছিলে?

আমি তো এখন চাকরি করি। চার মাস আগে চাকরি পেয়েছি। সিলেটের শ্রীমঙ্গলে পোস্টিং। ছুটিতে ঢাকা এসেছি।

কি চাকরি করো?

ব্রিটিশ কোম্পানি জেমস ফিনলের চা বাগানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার।

বেতন কত?

এক হাজার দুইশ টাকা, সাথে বাগান থেকে নগদ কুক এলাউন্স হিসেবে তিনশ টাকা পাই। সব মিলিয়ে মোট বেতন পনেরশ টাকা ধরতে পার। সাথে সার্ভেন্ট, বাংলো সব ফ্রি।

মাথা খারাপ হয়ে গেল! বেতন দেড় হাজার টাকা। তার উপর, থাকার জন্য বাংলো, কাজ করানোর সার্ভেন্ট ফ্রি। সে আমলে সরকারি কর্মকর্তা পদমর্যাদায় (যাকে তখন পঞ্চম গ্রেড বলা হত) প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল সাড়ে চারশ টাকা। সেটাই ছিল আমার মতো সব চাকরি প্রার্থীর স্বপ্ন। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা যেখানে বেতন আরও কম। এখনকার তুলনায় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল ভয়াবহ।

বন্ধু বলল, জেমস ফিনলে কোম্পানি চাকরির বিজ্ঞাপন দেয়না। ওদের আরো অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার লাগবে, তুমি আগ্রহী হলে কোথায় দরখাস্ত করবে সেই ঠিকানা দিতে পারি।

বললাম, এক্ষুণি দাও।

পরদিন দরখাস্ত পাঠিয়ে দিলাম, পনেরো দিন পর ইন্টারভিউয়ের চিঠি পেলাম। চিঠিতে উল্লেখ ছিল, আগের রাতে ঢাকা থেকে সিলেট মেইল ট্রেনে উঠবে। অমুক দিন ভোর পাঁচটায় শ্রীমঙ্গল রেল স্টেশনে তোমার জন্য ফিনলের জিপ অপেক্ষা করবে। বড় ভাই যথেষ্ট টাকা দিয়ে বললেন “ব্রিটিশ কোম্পানির চাকরি, সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। ফার্স্ট ক্লাসে যাবি, তাহলে সারারাত ঘুমাতে পারবি। ইন্টারভিউতে ফ্রেশ লাগবে।” তখন ঢাকায় গাড়ির সংখ্যা অনেক কম, রাস্তায় খুব একটা জ্যাম ছিলোনা। আমার তৎকালীন নিবাস ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা থেকে কমলাপুর রেলস্টেশনে রিকশায় আধা ঘণ্টায় যাওয়া যায়। তবুও রওনা দিলাম দুই ঘন্টা আগে। কারণ চানখারপুলের কাছে এক জ্বিনের বাদশার সাথে দেখা করবো।

এই জ্বিনের বাদশার নাম ছিল সেলিম শাহ। উনার খানকাহ কার্জন হল সংলগ্ন হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষে আমি প্রায়ই ওখানে যেতাম। প্রতি সন্ধ্যায় কাওয়ালী গানের আসর বসতো। সেলিম শাহ ধ্যানে বসতেন। গানের মূর্ছনায় ভক্তরা ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দিত। এক পর্যায়ে তার উপর জ্বিন ভর করতো, তখন উপস্থিত সবাই জ্বিনকে ভাইজান ভাইজান ডেকে নানা সমস্যার কথা বলতো। সেই জ্বিন বেশ ধার্মিক ছিল। সেলিম শাহের উপর ভর করা অবস্থায় আজান শুনলেই বলতো “আমি যাই নামাজ পড়তে।” মানুষ তাদের সমস্যার কথা বললে জ্বিন ভাইজান সমস্যা সমাধানের জন্য কাউকে তাবিজ, কাউকে পানি পড়া, কাউকে বিভিন্ন প্রকার পাথর দিতেন। আর এগুলো আনতেন ম্যাজিকের মতো। কখনো ফুলের পাপড়ি ঘষে ঘষে, কখনো ছুরি দিয়ে কেটে পাকা পেঁপের ভেতর থেকে অথবা বাতাসে হাত মুঠো করে। আমি মুগ্ধ হয়ে এসব দেখতাম। রহস্যের নেশা ছিল ছোটবেলা থেকে। কোরআনে আছে আল্লাহ মানুষ ও জ্বিন সৃষ্টি করেছেন, তাই জ্বিনদের নিয়ে আকর্ষণ ছিল বরাবরই।

খানকাহ-তে পৌঁছে দেখি সেলিম শাহের উপর জ্বিন ভর করে আছে। সালাম দিয়ে বললাম ভাইজান আগামীকাল আমার একটা চাকরির ইন্টারভিউ আছে। শ্রীমঙ্গল যাব ট্রেনে। দোয়া চাইতে এসেছি। জ্বিন বলল, তুমি এখনি হাইকোর্টের সামনে থেকে একদামে একটা ফুলের মালা নিয়ে এসো। একটা রিক্সা নিয়ে পনেরো মিনিটের মধ্যে মালা এনে জিনের গলায় পরিয়ে দিলাম। উনি মালার একটি ফুলের কয়েকটি পাপড়ি নিয়ে দু আঙ্গুলে ঘষে ঘষে হাত মুঠো করে আমার হাতে যা দিলেন তা একটা কালো পাথর। বললেন এটা গ্রানাইট পাথর। ইন্টারভিউয়ের সময় বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলে আংটি বানিয়ে পড়বে, চাকরি পাকা তোমার। বললাম আমার ট্রেন সোয়া একঘন্টা পর। এই সময়ের মাঝে আংটি বানাবো কীভাবে? উনি বললেন তাহলে ইন্টারভিউয়ের সময় হাতের মুঠোয় বা পকেটের কোথাও রাখবে যাতে শরীরে স্পর্শ লাগে। টাকা দিতে চাইলে নিলেন না। বললেন যে এটা জ্বিন জাতির পক্ষ থেকে উপহার।

Courtesy: bangladeshus.com

পাথর মানিব্যাগে রেখে কমলাপুর রেলস্টেশনে ছুটলাম। ফার্স্ট ক্লাসের টিকেট চাইতে টিকেট কাউন্টার থেকে বলল কোন দুনিয়ায় থাকেন আপনি? এই ট্রেনের ফার্স্ট ক্লাসের টিকেট কয়েকদিন আগেই শেষ হয়ে যায়। থার্ড ক্লাসে যেতে পারবেন। হবে? কী আর করা, টিকেট কাটলাম থার্ড ক্লাসের। থার্ড ক্লাসে ‘আগে আসলে আগে পাবে’ হিসেবে আসন। বাকিরা দাঁড়িয়ে থাকে। আমার ইন্টারভিউয়ের কথা শুনে টিকেট ক্লার্কের মায়া হলো। এক কুলি সর্দারকে ডেকে দিয়ে বললেন আমার একটা আসনের ব্যবস্থা করে দিতে।

ট্রেন প্ল্যাটফর্মে থামার আগেই দেখলাম থার্ড ক্লাসের যাত্রীরা লাফিয়ে লাফিয়ে চলন্ত ট্রেনে উঠছে। কুলি সর্দার এক কামরায় লাফ উঠে পড়ল আর আমি ঐ কামরায় চোখ রেখে ট্রেনের সাথে সাথে দৌড়াতে লাগলাম। শেষপর্যন্ত আসন পেলাম। কুলি সর্দারকে দশ টাকা দিলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যে দেখি ট্রেনের ওই কামরায় যত লোক বসে আছে তার দ্বিগুণ লোক দাঁড়িয়ে। দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা। এখনকার ট্রেনে যেমন এক কামরা থেকে অন্য কামরায় যাওয়া যায়, তখন তেমন ছিলনা। এক কামরাতেই বন্দি থাকতে হতো। ট্রেনে উঠে ব্রিফকেসটা রাখলাম সিটের নিচে, পায়ের কাছে। খাওয়ার জন্য কলা কিনে ব্রিফকেসের উপর রেখেছিলাম। খিদে পেলে কলা খুঁজতে গিয়ে দেখি আমার ব্রিফকেস উধাও। লম্বা বেঞ্চের মতো পিঠাপিঠি দুই সারি করে আসন যার নিচটা পুরো ফাঁকা। সবাই বলল ওদিক থেকে টেনে ব্রিফকেস নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে গেছে চোর।

মাথা কাজ করছিল না। কী করবো? ব্রিফকেস আমার সবচেয়ে ভালো পোশাক ছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক মূল সনদপত্রগুলো ছিল। খুব সাধারণ শার্ট প্যান্ট পড়েছিলাম রাতের ট্রেন জার্নির জন্য। সারা রাত ট্রেনে এই পোশাকের হাল কী হবে। এভাবে ইন্টারভিউ ফেস না করে নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু ইতোমধ্যে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। জিজ্ঞাসা করে জানলাম পরবর্তী স্টপেজ টঙ্গী। ট্রেন দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে, কয়েক মিনিটের মধ্যে টঙ্গী পৌঁছে যাবে। দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম। এক প্রবীণ ভদ্রলোক দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি আমার ব্রিফকেস চুরির ঘটনাটি কামরার সবার মতো জেনে গেছেন। আমার যাত্রার গন্তব্য ও উদ্দেশ্য শুনে বললেন, “তোমার কাছে টাকা পয়সা আছে?”

হ্যাঁ, মানিব্যাগে টাকা আছে। ব্রিফকেসে কোনো টাকা ছিলনা।

তোমার কাছে টিকেট আছে, মানিব্যাগে টাকা আছে, নেমে যাবে কেন? ইন্টারভিউ ফেস কর, তোমার হয়তো চাকরি হবেনা কিন্তু একটা বিদেশি কোম্পানিতে ইন্টারভিউয়ের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।

উনার কথায় যুক্তি খুঁজে পেলাম, মনে হলো কে যেন ভেতর থেকে বলছে,”হারার আগেই হেরে যাবে কেন?” সিদ্ধান্ত বদলে আমার আসনে বসতে গিয়ে দেখি, দাঁড়ানো একজন আমার জায়গা দখল করে বসে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। তাকে কিছু বলতে ইচ্ছা হলোনা। আবার দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে সারা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিলাম।

শীতের রাত। ভোর ছয়টার দিকে ট্রেন শ্রীমঙ্গল স্টেশনে পৌঁছালো। ভেবেছিলাম আমি একাই ইন্টারভিউ দিতে এসেছি। প্লাটফর্মে নেমে ধারণা পালটে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক পরিচিত মুখ দেখলাম। বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের অনার্সে প্রথম শ্রেণি পাওয়া বেশ কজন উজ্জ্বল ছাত্র। আমার ডিপার্টমেন্টের প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয়ও আছে এদের মধ্যে। আমি অনার্সে দ্বিতীয় শ্রেণি। মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল যে এদের সাথে আমি কুলাবো কী করে?

স্টেশন থেকে বেরিয়ে দেখি জেমস ফিনলের বেশ কয়েকটি জিপ। আমাদের জানানো হলো এক ঘন্টা পর গাড়ি গন্তব্যে রওনা হবে এর মধ্যে আমরা যেন ওয়েটিং রুমে ফ্রেশ হয়ে কিছু নাস্তা করে নেই। সবাই ওয়েটিং রুমে রাতের কাপড় পাল্টে স্যুট, কোট, টাই পড়ে সারা গায়ে সুগন্ধি স্প্রে করছে আর আমি চুপচাপ বসে দেখছি। আমার পোশাক ও জিনিসপত্র ছিল ব্রিফকেসে। সেটাতো এখন চোর বাবাজীর কাছে। আমার সাথে কোনো কোট টাই ছিলনা, ছিল একটি ফুলহাতা সোয়েটার। পরিচিত একজনের থেকে চিরুনি চেয়ে মাথার চুলটা ঠিক করে নিলাম। ফিনলে চা বাগানের অফিসে পৌঁছানোর পর হালকা চা বিস্কুটের সাথে সবাইকে একটা ফরম পূরণ করতে দিলো যাতে আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়ে নানারকম প্রশ্ন ছিল যার একটা ছিল, আমি রাজনীতিতে আগ্রহী কি না? আমি লিখেছিলাম, হ্যাঁ, অবশ্যই। সেখানে ফিনলের কোনো লোক না থাকায় সবাই বলাবলি করছিল, এর উত্তরে ‘না’ লিখবে। ব্রিটিশ কোম্পানি, পলিটিক্সের কথা শুনলে হয়তো চাকরি হবে না।

সারা রাত জেগে দাঁড়িয়ে থাকার ক্লান্তিতে আমার ঘুম এসে যাচ্ছিল, কিন্তু কপাল ভালো ইন্টারভিউ শুরু হলে প্রথমেই আমার ডাক পড়ল। জ্বিন ভাইজানের দেয়া গ্রানাইট পাথরটি তার কথামতো এমনভাবে প্যান্টের পকেটে রাখলাম যেন শরীরে স্পর্শ লাগে।

Courtesy: jugantor.com

ইন্টারভিউ বোর্ডে দুজন বাঙালি ও একজন ব্রিটিশ ছিলেন। দেখলাম ব্রিটিশ ভদ্রলোক স্টার ব্র্যান্ডের সিগারেট খাচ্ছেন। এটা সে সময়ের সবচেয়ে সস্তা সিগারেট। এক প্যাকেটের দাম চার আনা। বাঙালি বিগ বস মাঝখানে বসা। তিনি বললেন প্রার্থীদের মধ্যে তুমি বাদে সবাই আমাদের দেওয়া ফরমে লিখেছে তারা রাজনীতিতে আগ্রহী নয়। শুধু তুমি লিখেছো আগ্রহী। কেন?

স্যার, রাজনীতি অর্থ ব্যাপক, রাজনীতি মানে শুধু মিছিল করা আর বক্তৃতা দেয়া নয়। রাজনীতি মানে দেশ সমাজ নিয়ে চিন্তা করাও, দেশ সমাজ নিয়ে না ভাবলে এই জীবনের কী দাম? এ ধরনের আরো কিছু কথা বলেছিলাম।

So philosophical, মন্তব্য করে পাশের জনকে ইশারা করলেন।

দ্বিতীয় জন বললেন, তুমি কি ক্রিকেট খেলো?

বললাম হ্যাঁ।

তুমি কী একজন ব্যাটসম্যান না বোলার?

ব্যাটিং বোলিং দুটোই পারি।

যদিও কথাটা পুরোপুরি সত্যি ছিল না। দু চারদিন খেললেও ক্রিকেটার বলতে যা বোঝায় তা আমি ছিলাম না।

কেন মিথ্যে বললাম? যে বন্ধু আমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে দরখাস্ত করার ঠিকানা দিয়েছিল সে বলেছিলো ক্রিকেট খেলি কিনা প্রশ্ন করলে আমি যেন হ্যাঁ বলি। কারণ শীতের সময় চা বাগানের ‘ফিনলে ক্লাব’ এ অনেক ক্রিকেট খেলা হয়, তাই প্লেয়ার জানলে অগ্রাধিকার পাওয়া যায়।

এবার ব্রিটিশ ভদ্রলোকের পালা। এক সিগারেটের আগুন দিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মি. মোরশেদ, ডু ইউ হ্যাভ এনি গার্লফ্রেন্ড?

ইয়েস, মাই মাদার ইজ মাই গার্লফ্রেন্ড, শি ইজ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড।

আর কেউ আছে?

মাই সিসটার্স আর মাই গার্লফ্রেন্ডস, দে আর মাই গুড ফ্রেন্ডস।

আর কেউ? তুমি জানো আমি কী বলতে চাইছি।

হেসে বললাম, বুঝেছি তুমি কী বলতে চাও। এখনো এমন কেউ নেই।

বলল, তোমাকে যদি আমরা নির্বাচিত করি তাহলে দেখবে তোমার চারপাশে শত শত সুন্দরী তরুণী বাগানের চা পাতা উঠাচ্ছে, তারা তোমার মনযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করবে।

এ পর্যায়ে বিগ বস জানালো, আমার ইন্টারভিউ শেষ। কোনোরকম কাগজপত্র দেখতে চাইলোনা তাই ট্রেনে লাগেজ হারানোর কথা বলতে হয়নি। মন খারাপ হয়ে গেল। দেশের চা শিল্পের ইতিহাস সহ সাধারণ জ্ঞানের বই ভাজা ভাজা করে মুখস্থ করেছি আর আমাকে ওরা কিসব প্রশ্ন করলো!

আগেই জানানো হয়েছিল ইন্টারভিউ শেষে দুপুর দেড়টায় লাঞ্চ দিবে এবং তারপর নির্বাচিতদের নাম বোর্ডে টানিয়ে দেয়া হবে। পরে চট্টগ্রামের ফিনলে অফিস থেকে ডাকযোগে চিঠি পাঠানো হবে। কিন্তু আমার আর ওখানে থাকার ইচ্ছে ছিলোনা কেননা একদিন আগের পোশাকে আমি খুবই অস্বস্তিবোধ করছিলাম। হঠাৎ শুনলাম একজন ড্রাইভার বলছে একটা জিপ শ্রীমঙ্গল যাচ্ছে কাজে, কেউ চাইলে ঘুরতে যেতে পারে। আমি কাউকে কিছু না বলে জিপে উঠে বসলাম। শহরে এসে ড্রাইভারকে বললাম ঢাকা যাবার বাস স্ট্যান্ডে নামিয়ে দিতে। নামার সময় বলল, “সাহাব হামার ২৫/৩০ মিনিটের কাজ, আপনাকে কি এখান থেকেই আবার তুলবো?” ওকে ২০ টাকা হাতে দিয়ে বললাম তোমার আর আসতে হবেনা, আমি ঢাকা চলে যাচ্ছি। ড্রাইভার অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।

বাসে করে বিকেলে ঢাকায় ফিরে সরাসরি বড় ভাইয়ের অফিসে গিয়ে সবকিছু খুলে বললাম।

বললাম “ফিনলে’র চাকরি তো হবেনা, তবে যে চাকরিই পাই সবার আগে ট্রেনে আপনার দামি কাশ্মীরী যে শাল হারিয়েছি, ঠিক তেমন একটা শাল উপহার দিব”।

আমার মাস্টার্সের রেজাল্ট তখনো বের হয়নি। তবু পরদিন থেকে চাকরি খোঁজা শুরু করলাম। ১২ দিনের মাথায় মেসার্স জেমস ফিনলে এন্ড কোম্পানি থেকে একটি চিঠি পেলাম। দুরু দুরু বুকে চিঠি খুলতে লাগলাম কারণ ওরা আগেই জানিয়েছিল যে সবাই চিঠি পাবে। যাদের চাকরি হবেনা, ইন্টারভিউতে অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে তাদেরও চিঠি দেয়া হবে। চিঠি খুলে দেখলাম আমি সহ আরো দুজনকে অভিনন্দন জানিয়ে চাকরিতে নির্বাচিত হওয়ার চিঠি দিয়ে ও পরবর্তী দশ দিনের মধ্যে চট্টগ্রাম ফিনলে অফিসে কন্ট্রাক্ট সই করতে যেতে বলা হয়েছে।

অবাক হয়ে গেলাম এই চাকরি হওয়ায়। আমি কল্পনাও করিনি। ট্রেনে লাগেজ হারানোয় আমি ছিলাম অতি সাধারণ পোশাকে আর প্রতিযোগিতা হয়েছিল আমার থেকে অনেক মেধাবী ছেলেদের সাথে যাদের পরীক্ষার ফলাফল অনেক ভালো ছিল। ভাবতে লাগলাম এটা কি ইন্টারভিউতে ক্রিকেট খেলতে পারা নিয়ে অর্ধসত্য কথার ফল। নাকি জ্বিন ভাইজানের গ্রানাইট পাথরের ক্যারিশমা? নাকি বিধাতার পক্ষ থেকে আমার সামান্য মেধার কোনো পুরষ্কার?

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মোরশেদ আলম হীরার লেখা “চা বাগানের বিচিত্র জীবন: বাগানের ভেতরের অজানা গল্প” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। এছাড়া বিশেষ ছাড়ে বইটি পেতে চাইলে যোগাযোগ করুন বুকশেয়ার অথবা বইনগর পেজের ইনবক্সে। আর ইবুক হিসেবে পড়তে চাইলে ক্লিক করুন বইটইয়ের এই লিঙ্কে

দেশের মধ্যে আরেক দেশ

জেমস ফিনলে কোম্পানির চাকরির শুরুতে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। এ কোন বাংলাদেশ? এ যে দেখছি রাষ্ট্রের ভেতর আরেকটা রাষ্ট্র। সবকিছু কঠোর নিয়ম শৃঙ্খলায় বাঁধা যার তুলনা হতে পারে সেনাবাহিনীর সাথে।

২৪ ঘণ্টা অন ডিউটি। আমরা যারা অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার তাদের রাতে বাগান এলাকার বাইরে যেতে ম্যানেজারের লিখিত অনুমতি লাগে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্ছ্বাসপূর্ণ বাঁধনহারা জীবন, মধুর ক্যান্টিনে আড্ডায় রাজনৈতিক আলাপ, শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনের গরম চা সিঙ্গারা, বিকেলে ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবে (আমি যার জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলাম) পাড়ার বন্ধুদের আড্ডায় সন্ধ্যায় গোস্ত পরোটা খাওয়া। আহা কী উদ্দাম জীবন ছিল! সেই আমি এখন শেকলে বন্দি। অবশ্য এরকম একটা কিছুর আভাস পেয়েছিলাম জেমস ফিনলের হেড অফিসে জব কন্ট্রাক্ট সাইন করতে গিয়ে। বিল পিট্রি নামে এক বিশাল সাইজের ইংরেজ সাহেব জব কন্ট্রাক্ট আমার হাতে দিয়ে বলেছিলেন, “Welcome young man. Be ready for an extreme hard life”.

ঐ সময়ে ফিনলে কোম্পানির ১৬ টি চা বাগানের একটি বারাউরা টি এস্টেট  নামে একটি চা বাগানে আমার প্রথম পোস্টিং হয়। সাধারণত অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারদের এক বছর পর পর নতুন চা বাগানে পোস্টিং হতো।

চা বাগানে কাজ শুরু সকাল ৬ টায়। ঘুম থেকে উঠতে হতো ভোর ৫ টায়। হেঁটে যেতে হতো দেড় কিলোমিটার দূরের আউট গার্ডেন অফিসে। বাগানকে ভালোভাবে বুঝার জন্য প্রথম বছর কোনো পরিবহন সুবিধা দেওয়া হতোনা। ১ বছর পর মোটর সাইকেল দেওয়া হতো। ম্যানেজার পদে প্রমোশন হলে জিপ।

আউট গার্ডেন অফিসে থাকতো লোকাল স্টাফরা, তাদের বলা হয় বাবু। দক্ষ এই বাবুদের অধিকাংশ ছিলেন হিন্দু। এরাই আসলে বাগান চালাতো। শ্রমিক সর্দাররা আসতো ঐ দিনের কাজ বুঝে নিতে। প্রত্যেক সর্দারের অধীনে নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রমিক কাজ করতো। সকালের এই প্রোগ্রামকে বাগানের ভাষায় ‘গুনতি’ বলা হয়। বাংলোয় ফিরে নাস্তা করে ৮টায় কাজ দেখতে বেরোতে হতো। কাজের ড্রেস হাফ প্যান্ট হাফ শার্ট, হাতে লাঠি, মাথায় ক্যাপ। লাঞ্চের সময় ফিরে আবার বিকেল ৩ টায় বেরোতে হতো। ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যেত। সপ্তাহে ২/৩ দিন সন্ধ্যার পর ফ্যাক্টরি ডিউটিতে যেতে হতো যেখানে ঐ দিনের তোলা কাঁচা পাতা, চা-তে রূপান্তরিত হয়। দৈনিক গড়ে প্রায় ১৫/১৬ কি.মি হাঁটতে হতো। ফ্যাক্টরি ডিউটি থাকলে কাজ করতে হতো সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। তবে সপ্তাহে দুদিন ছিল কিছুটা স্বস্তির কারণ বিকাল ৩ টায় কোম্পানির ক্লাবে সব বাগানের ম্যানেজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজাররা পরিবার নিয়ে একত্রিত হতো।

দাস প্রথার কথা বইপুস্তকে পড়েছি, চা বাগানে গিয়ে এর বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো। রাস্তা দিয়ে আমরা হেঁটে বা গাড়িতে যাওয়ার সময় পথচারী শ্রমিকরা দাঁড়িয়ে যেতো। কুর্নিশের ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে কপাল থেকে হাঁটু পর্যন্ত হাত উঠানামা করে ‘সালাম সাহাব’ বলতো এবং আমরা পার না হওয়া পর্যন্ত মাথা তুলে দাঁড়াতো না। বাগানের ভেতর ৩/৪ ফুট সরু রাস্তা দিয়ে চলার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা শ্রমিকেরা চোখের পলকে রাস্তা ছেড়ে চা গাছের ভেতর ঢুকে পড়তো যেন সাহেবদের এক দুই ফুট কাছেও যেতে না হয়। এটাই বাগানের নিয়ম, নিয়ম ভাঙা যাবেনা। শ্রমিকদের কাছে সাহেবরা ভগবান, কাজে কোনো ত্রুটি বা কাজের বাইরে কোনো অন্যায় করলে ওরা প্রথমেই এসে হাত জোড় করে বলত, “সাহেব তুই ভগবান, তুই মায়ে বাপ, মাফ করে দে”।

Courtesy: banglablogger.info

দুর্গাপূজা শুরুর দিনে আমাকে ওরা মণ্ডপে দাওয়াত দিল। গিয়ে দেখি বিরাট আয়োজন। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে। সব প্রসাদ আমার সামনের টেবিলে রাখা। প্রতিটি পদ একটু একটু করে খেতে অনুরোধ করল। তারপর উপস্থিত সবাইকে তা দেয়া হলো এই বলে যে, “এটা সাহেবের প্রসাদ”। সাহেবের হুকুম’ চা বাগানের প্রথম ও শেষ কথা।

এক রাতে দশটার দিকে বিছানায় শোয়ার পর পায়ে ব্যাথা অনুভব করায় ডিউটির দারোয়ানকে ডেকে বললাম আমি বই পড়ছি, তুমি আমার পা টা একটু টিপে দাওতো। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা, হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখি ও খুব আস্তে আস্তে পা টিপে যাচ্ছে। ঘড়িতে দেখি রাত ৩ টা বাজে। আঁতকে উঠে বললাম, “আমি ঘুমিয়ে গেছি, তুমি চলে গেলেনা কেন?” ওর উত্তর, “সাহাব আপকো হুকুম থা পা টিপনেকে লিয়ে।” সর্বশেষ হুকুম সে পেয়েছে পা টিপতে। এভাবেই হুকুমকে তালিম করে ওরা।

কাজে যোগ দেয়ার পর প্রথম কর্মদিবসে দুপুরে কাজ শেষে লাঞ্চ করতে বাংলোয় ঢুকে দেখি সামনের ব্যালকনিতে হেড দারোয়ান দাঁড়িয়ে। টেবিলে রাখা এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত। শরবতের গ্লাস হাতে নিয়ে ওখানে বেতের চেয়ারে বসলাম। আরেকজন এলো, সে মেঝেতে বসে আমার পা দুটো সামনের টেবিলে উঠিয়ে দিলো। তারপর পা থেকে কেডস খুললো, মোজা খুলে তা দিয়ে পায়ের ঘাম মুছে দিয়ে কিছুক্ষণ পা টিপে দিয়ে কেডস মোজা নিয়ে চলে গেল। ভাবলাম মন্দ নয়। কেডসের ধুলো ময়লা বাংলোর ভেতর গেলনা। আসলো অন্য এক জন। বললো, “সাহাব গোসল তৈয়ার”। এর কাজ কুয়া থেকে পানি উঠানো, বাংলো, বাথরুম পরিষ্কার করা। গোসলের পর যে কাপড় পড়ব তা বাথরুমে প্রস্তুত রাখা ইত্যাদি। এই লোককে বাগানের ভাষায় বলা হয় ‘পানিওয়ালা’। গোসল শেষ হলে বাবুর্চি এসে বললো, “সাহাব খানা তৈয়ার”, গেলাম ডাইনিং টেবিলে খেতে। এভাবেই আমার প্রথম দিনের বাংলো ট্রেনিং চললো। যুগ যুগ ধরে ব্রিটিশরা ওদের এভাবেই ট্রেনিং দিয়ে গেছে।

চা বাগানের পাতা উঠানোর কাজ মহিলারাই বেশি করে। পুরুষদের জন্য অন্য ধরনের কাজ, অন্য কাজ না দিতে পারলে ওরাও পাতা উঠায়। নিয়ম হলো আড়াই পাতি তুলতে হবে অর্থাৎ উপরের নরম দুটি পাতা একটি কুঁড়ি। এর থেকেই সবচেয়ে ভালো মানের চা হয়, যা বিদেশে রপ্তানি করে ভাল দাম পাওয়া যায়। যেহেতু যে যত বেশি পাতা উঠাবে সে তত বেশি টাকা পাবে তাই শ্রমিকরা ওজন বেশি পাবার জন্য সাড়ে তিন থেকে সাড়ে পাঁচ পাতা পর্যন্ত উঠাতো যা থেকে নিম্ন মানের চা হয় এবং এর দামও অনেক কম, এজন্য সর্দার, বাবু ও সাহেবদের এত নজরদারি। চা বাগানের প্রতিদিনের যুদ্ধ, এই দুটি পাতা একটি কুঁড়ির যুদ্ধ।

শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ ছিল তরুণীরা। তারা বেশি পাতা তুলতে পারতো এবং ভালো পাতাগুলি তুলতো। বেশিরভাগ বয়স্ক মহিলারা সাড়ে চার বা পাঁচ পাতা পর্যন্ত তুলতো। তাই এদের কাজ বেশি পর্যবেক্ষণ করতে হতো।  তরুণীদের কাছে গেলে ওরা বলতো এই সাহেব তুই বুড়িদের কাছে এত ঘুরঘুর করিস কেন? আমাদের পছন্দ হয় না? আমিও ওদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলাম, বলতাম তোদের কাছে ঘুরঘুর করলে আমাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করবি তাই দূরে থাকি। কোনো কারণে মন খারাপ থাকলে বলতো এই সাহেব তোর মন খারাপ কেন?

Courtesy: Amir Levy/Getty Images

আশ্চর্য আধুনিকতা

উচ্ছ্বাস ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা ছিল চা বাগানের তরুণীরা। এই তরুণীদের ব্যক্তিগত জীবন যাপন পদ্ধতি বেশ আশ্চর্যজনক যা অনেকটা পাশ্চাত্যের সাথে মিলে যায়। প্রায় প্রত্যেক তরুণীর আছে একটা করে বয়ফ্রেন্ড। যার নেই সে খুব মনমরা হয়ে থাকতো। পশ্চিমা দেশের মতো এরাও বনিবনা নাহলে কিছুদিন পর পর পার্টনার পরিবর্তন করতো। কাজ শেষ হলে বিকেলে এই যুবক যুবতীরা বাগানের শেড ট্রি ও জঙ্গলের গাছ থেকে শুকনা লাকড়ি সংগ্রহ করে নিজেদের রান্নাবান্নার জ্বালানির প্রয়োজন মিটিয়ে বাকিটা বাজারে বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করতো। এই আয় তাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করতো কারণ ওদের মজুরি ছিল অনেক কম। এই তরুণ তরুণীদের অনেকেই বাগানের রেজিস্টার্ড শ্রমিক নয়। ওরা বুড়ো মা-বাবার বদলি হিসেবে কাজ করতো। লাকড়ি সংগ্রহ করতে গিয়ে ফ্রিস্টাইলে প্রেমলীলা চলতো চা গাছের নিচে বা পাশের জঙ্গলে।

যতদিন সম্ভব এভাবেই চলতো কারণ বিয়েতে ছিল অনেক বাধা। তারা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করতে চাইতো তবে পঞ্চায়েত সদস্যদের দাওয়াত করে খাওয়ানোর সাথে কিছু টাকাও দিতে হতো। বেশিরভাগ ছেলেমেয়েদের এই সামর্থ্য ছিলনা। তাই যখন দুজন সিদ্ধান্ত নিতো একসাথে থাকবে তখন একদিন উধাও হয়ে পার্শ্ববর্তী কোনো এক বাগানে পরিচিত কারো কাছে কিছুদিনের জন্য আশ্রয় নিত। মেয়েপক্ষ পঞ্চায়েতের কাছে বিচার দিত অমুক ছেলে তাদের মেয়েকে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে। পঞ্চায়েত ছেলেমেয়ে দুজনকে সমাজচ্যুত করতো অর্থাৎ তারা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যেতে পারবেনা। কিছুদিন পর ওরা ফিরে এসে আলাদা একটা ঘর উঠিয়ে ভদ্রলোকের ভাষায় ‘লিভ টুগেদার’ করতে থাকতো। এর ফলে ওরা অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত সমাজচ্যুত থাকতো। এই ব্যবস্থা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। আমার চাকরির সময়ে, মানে ৭০ এর দশকের শেষ দিকে চা বাগানে এমন দম্পতির সংখ্যা আনুমানিক ছিল শতকরা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ভাগ। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক ভালো, তাই এ সংখ্যাটা এখন অনেক কম হওয়ারই কথা।

বহুদিন এমন হয়েছে যে সকালের গুনতির সময় এক জোড়া বুড়ো-বুড়ি যাদের স্বামী স্ত্রী বলে জানতাম তারা তাদের বিয়ের দাওয়াত দিচ্ছে। প্রথমবার আমি একেবারে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। পরে জেনেছি এই বুড়ো দম্পতিরা এতদিন ‘লিভ টুগেদার’ করে সমাজচ্যুত হয়ে আছে। তাদের সন্তানরা আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করতে চাইছে, তাই আগে তাদের বাবা মার বিয়ে হতে হবে। রহস্যময় এই চা বাগানের জগত। এখানে এমন সম্পর্ক খুব দোষের কিছু নয়। লোভ ও ভোগ প্রতিনিয়ত আপনাকে হাতছানি দিবে।

একদিন সন্ধ্যার দিকে কাজ শেষে হেঁটে বাংলোয় ফিরছি, খেয়াল করলাম একজন অনেকক্ষণ ধরে আমাকে অনুসরণ করছে। খুবই অস্বস্তি লাগছিলো। ঠিক পেছন পেছন হাটছে। ফিরে দেখি লুঙ্গি পরা এক লোক। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কে?

সালাম দিয়ে বলল, স্যার আমার নাম আলী আহমদ। আমি এই বাগানের গাছ কাটা ঠিকাদার।

বুঝলাম বড় ঠিকাদার, ফ্যাক্টরির বয়লারে দৈনিক প্রায় ৩০০/৩৫০ মন জ্বালানি কাঠ লাগে।

স্যার আপনি নতুন এসেছেন, কোনো সমস্যা হলে আমাকে খবর দিয়েন, আমি সব কাজ পারি, যা চাইবেন।

ঠিক বুঝলাম না আপনার কথা, কী বলতে চান পরিষ্কার করে বলুন। কী পারেন আপনি?

স্যার আমি সব পারি। পাহাড়, পর্বত, নদী নালা, উড়িয়া, সাঁওতালী, খাসিয়া, মনিপুরি, বাঙালি যা কিছু চান। হুকুম দিবেন আধা ঘন্টার মধ্যে বান্দা হাজির।

পরিষ্কার ইঙ্গিত এই লোকের। বললাম কোনো প্রয়োজন হলে আপনাকে খবর দিব। একটু ভয়ও পেয়ে গিয়েছিলাম। কারণ তখন ৭/৮ দিন হলো মাত্র চাকরিতে জয়েন করেছি। বাগানের আশেপাশে ঘন বন জঙ্গল, এই চাকরির যেমন গ্ল্যামার আছে, তেমন বিপদও আছে আর সে কেমন লোক কে জানে?

আলী আহমদ আমাকে সালাম দিয়ে পেছনের দিকে চলে যেতে লাগলো। আমি ক্লান্ত পায়ে বাংলোর দিকে আবার হাঁটা শুরু করলাম।

চারদিকে তখন অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে।

Courtesy: Shabbir Ferdous/Flickr

সাহেবদের অবৈধ চিহ্ন

একদিন বিকেলে অফিস চত্বরে চা পাতা ওজন করা দেখছিলাম। একটি মেয়েকে দেখে বেশ চমকে গেলাম। হলুদ চোখ, গায়ের রং উজ্জ্বল ফর্সা। মলিন বেশভূষার মধ্যেও ২৬/২৭ বছর বয়সী রূপবতী মেয়েটির চেহারায় আভিজাত্য ফুটে আছে। কড়া রোদে তার মুখ থেকে ঘাম টপ টপ করে পড়ছে। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে টুকরি ভর্তি পাতা মেশিনে ওজন করে চলে যাওয়ার পর পাশে দাঁড়ানো বড় বাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, সুন্দরী এই মেয়েটি কে?

বাবু আমার প্রশ্ন শুনে বলল স্যার শুনেছি এই মেয়েটির মা এর জন্মের একদিন পর মারা গেছে আর এর বাবা কে কেউ ঠিক বলতে পারেনা।

বললাম, ওকে দেখে তো মনে হয় ওর শরীরে ব্রিটিশ কোনো সাহেবের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে!

বাবু বলল স্যার বাগানের অনেকে অনুমান করে তাই বলে। যেহেতু ওর মা কাউকে কিছু বলে যায়নি তাই কে ওর বাবা, সঠিক তথ্য কেউ জানেনা।

ইংরেজ সাহেবদের অবৈধ সন্তানের তথ্যটা হয়তো পাঠকদের চমকে দেবে!

প্রবীণ এই ‘বাবু’র ও অন্যদের সাথে পরে কথা বলে জেনেছিলাম জেমস ফিনলে ছাড়া আরও যে কয়টি ব্রিটিশ কোম্পানি বৃহত্তর সিলেটে আছে সেসব বাগানেও ইংরেজ সাহেবদের এইরকম কিছু অবৈধ সন্তান ও উত্তরাধিকারীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

কিছু কিছু ইংরেজ সাহেব তাদের শয্যা সঙ্গীনি ও অবৈধ সন্তানদের দেখভালের ব্যবস্থা করেছেন বলেও জানা যায়।

একজন ব্রিটিশ সাহেব (নাম মনে করতে পারছিনা) তার সঙ্গীনির একটি মেয়ে হওয়ার পর ইংল্যান্ড ফিরে যাওয়ার আগে শ্রীমঙ্গল ও চট্টগ্রাম শহরে তাদের জন্য বাড়ি কিনে দেন ও বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যবস্থা করেন। কালক্রমে সেই ছোট্ট মেয়েটি অপরূপা তরুণী হয়ে উঠে। জেমস ফিনলের মাসুদুল হক (ছদ্মনাম) নামে সুদর্শন এক ম্যানেজার শ্রীমঙ্গলে যাওয়া আসার সূত্রে গভীরভাবে মেয়েটির প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। প্রায়ই মেয়েটিকে তার বাংলোয় নিয়ে আসতো। গুজব শোনা যায় তারা বিয়ে করবে। লোকমুখে মাসুদুল হকের পরিবার বিষয়টি জেনে যায়। চা শ্রমিকের অবৈধ সন্তানকে বিয়ে করবে তাদের ছেলে? গোপনে বাগান থেকে ছেলেকে উদ্ধারের মহাপরিকল্পনা করতে থাকে তার পরিবার। এক রোববার আমাদের কোম্পানির বালিসেরা ভ্যালি ক্লাবের সাথে ঢাকা ক্লাবের প্রীতি ক্রিকেট খেলা চলছিল। হঠাৎ দেখি সেনাবাহিনীর কয়েকটি জিপ মাঠের কাছে এসে থামল। সেনাবাহিনীর ইউনিফরম পরা কয়েকজন সৈনিক সহ এক অফিসার গাড়ি থেকে নেমে সুপারিন্টেনডেন্টের (চা বাগানে অবস্থান করা শীর্ষ কর্মকর্তা) সাথে কিছু কথা বলে মাসুদুল হককে মাঠ থেকে ডেকে তার মায়ের অসুস্থতার কথা বলল। তারপর খেলার পোশাকেই তাকে জিপে উঠিয়ে ঢাকা চলে গেল। পরে জেনেছি ঐ আর্মি অফিসার ছিলেন তাদের আত্নীয়।

বহু বছর আগে ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড, ওয়ালিস সিমসন নামে ডিভোর্সি এক আমেরিকান মহিলার প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করার জন্য ব্রিটিশ সিংহাসন ত্যাগ করেছিলেন। ম্যানেজার মাসুদুল হক তার পরিবারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে করে এক মাস পর চা বাগানে ফিরে আসেন এবং কিছুদিনের মধ্যে ঐ মেয়েকে বিয়ে করেন। জয় হলো প্রেমের। কেউ ত্যাগ করে সিংহাসন। কেউ ত্যাগ করে পরিবার। বিয়ের আগে ও পরে মাসুদুল হক ভাইয়ের বাংলোয় বেশ কয়েকবার তার রূপসী ও শিক্ষিতা স্ত্রীর সাথে আমার দেখা ও কথাবার্তা হয়।

উনার দিকে তাকিয়ে ভাবতাম তার বাবা যদি তার মাকে ভালোভাবে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে না দিয়ে অন্য সাহেবদের মতো বাগানেই ফেলে যেত তবে সে অন্য মেয়েদের মতোই আজ একজন চা শ্রমিক থাকতো। মলিন পোশাকে ঘর্মাক্ত হয়ে থাকতো মুখ।

তখন মনে হয়, আসলে টাকাই এ জগতে সব। মান মর্যাদা, সামাজিক অবস্থান সবকিছুই। বড়ই রহস্যময় এ জগত।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মোরশেদ আলম হীরার লেখা “চা বাগানের বিচিত্র জীবন: বাগানের ভেতরের অজানা গল্প” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। এছাড়া বিশেষ ছাড়ে বইটি পেতে চাইলে যোগাযোগ করুন বুকশেয়ার অথবা বইনগর পেজের ইনবক্সে। আর ইবুক হিসেবে পড়তে চাইলে ক্লিক করুন বইটইয়ের এই লিঙ্কে

Featured Image: theins.ru

আপনার মন্তব্য লিখুন