Skip links

লুই পাস্তুরের কাণ্ডকারখানা

আদর্শ থেকে প্রকাশিত রাগিব হাসান এর "বিজ্ঞানীদের কাণ্ডকারখানা ২" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 8 মিনিট

জীবাণুর শত্রু

ভদ্রলােক দেখতে কিন্তু একেবারেই নিরীহ গােছেরকবি কবি চেহারা, দাড়িগোঁফের কারণে অনেকটা রবীন্দ্রনাথের মতাে দেখায়সারাক্ষণ চিন্তায় মগ্ন থাকেনভাবুক গােছেরকিন্তু দুনিয়ার তাবত জীবাণুর কাছে এই লােকটা মহা শত্রুত্রাসটাইপেরকে এই লােক? ঘটনা কী তার? কেন জীবাণুর দলের গণশত্রু ইনি

জানতে হলে যেতে হবে ১৮২০এর দশক থেকে শুরু হওয়া এই জীবাণুদের চিরশত্রুর শৈশবে

পাগলা নেকড়ের কামড়

১৮২০এর দশকের শেষ দিক, জায়গাটা ফ্রান্স আরবাে শহরদরিদ্র চর্মকারের তৃতীয় সন্তান হিসেবে জন্মানাে ছেলেটি তখন একেবারেই বাচ্চা বয়সেবন্ধুদের সাথে বাইরে খেলায় মগ্ন এমন সময় চারদিকে চিল্লাচিল্লি শুরু হয়ে গেলসবাই প্রাণপণে দৌড়ে পালাচ্ছেবাচ্চাদের দেখে এক লােক দাড়িয়ে গেলবলল, এই যে বাচ্চারা, দৌড়ে পালাও

কী হয়েছে? ছেলেটি আর তার বন্ধুরা কৌতূহলী

দৌড়ে পালাও, পাগলা নেকড়ে কামড়াতে আসছে, এক্ষুনি পালিয়েবাঁচো সবাইসাবধান করে দিল লােকটি

আসলেই তাে, পাগলা কুকুর কিংবা নেকড়ের কামড় তাে একেবারে ভয়াবহ একটা ব্যাপারপাগলা নেকড়ের মুখ থেকে লালা ঝরছে, আর যাকে দেখে তাকেই কামড়াতে চেষ্টা করছেকেউ যদি কামড় খায় একবার, মরণ নিশ্চিত, সাথে সাথে নাপাগলা কুকুর বা নেকড়ের কামড় খেলে সপ্তাহ কয়েক পরে হয় জলাতঙ্ক রােগআক্রান্ত রােগী পিপাসায় ছটফট করতে থাকে, কিন্তু পানি দেখলেই ভয় পায় প্রচণ্ড, খেতে পারে না একটুওপাগলা যে কুকুরের কামড় খেয়েছে, আচরণেও সে রকম করতে থাকে, খিঁচুনি উঠে একসময়ে মারা যায়রােগ একবার শুরু হলে আর কোনাে চিকিৎসা নেই, মরণ সুনিশ্চিত

পাগলা নেকড়েটা নাকি ইতিমধ্যেই একজনকে কামড়ে দিয়েছেহুটোপুটি করে ছেলেটি আর তার বন্ধুরা সবাই ফিরে গেল বাড়িতেপরে খবর মিলল, যে লােকটিকে কামড়ে দিয়েছিল নেকড়ে, তার জলাতঙ্ক হয়েছেভয়াবহ যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে লােকটি মারা গেল, সারাক্ষণ পানি পানি বলে পিপাসায় চিৎকার করছে, কিন্তু পানি দেখলেই ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে

লােকটির এই যন্ত্রণাময় মৃত্যু ছেলেটির মনে গভীর রেখাপাত করল কেন হয় রকম জলাতঙ্ক? কীভাবে ঠেকানাে যাবে রকম কঠিন অসুখ? মনে মনে শপথ নিল ছেলেটি, বড় হয়ে একসময় রােগের চিকিৎসা সে বের করেই ছাড়বে

এই ছেলেটি কে? তার নাম, লুই পাস্তুর (Louis Pasteur)ফরাসি এই বিজ্ঞানী নানা রােগজীবাণুজাত রােগের চিকিৎসা প্রতিষেধক বের করে পৃথিবীর সব মানুষের যে কত বড় উপকার করেছেন, তা বলার বাইরেবইটির লেখক (আমি)সহ পাগলা কুকুরে আক্রান্ত কোটি কোটি মানুষ তাদের জীবন রক্ষার জন্য লুই পাস্তুরের কাছে ঋণী হয়ে আছেন। 

লুই পাস্তুর - রাগিব হাসানের বিজ্ঞানীদের কাণ্ডকারখানা ২ বই থেকে

Image Course: kesinbilgi.net

রােগবালাইয়ের আসল কারণ

চর্মকারের ঘরে জন্মানাে সেই কৌতূহলী ছেলে লুই পাস্তুর শপথ নিয়েছিলেন, এই রােগবালাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে জয়ী হয়ে ছাড়বেনছেলেবেলায় ইচ্ছে ছিল, শিল্পী হবেন, দারুণ আঁকতেনকিন্তু আস্তে আস্তে বিজ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ জন্মাল পাস্তুরের আর ছেলেবেলার সেই শপথের কথা ভােলেননিতাই পড়াশােনা শেষ করে গবেষণা শিক্ষকতায় যােগ দিলেন তিনি। 

ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত সবার ধারণা ছিল, সব রােগবালাইয়ের কারণ হলাে খারাপ বাতাসএকেক রােগের জন্য একেক রকমের খারাপ বাতাস বা মায়াজমা (Miasma) দায়ীকারও নাকে রকম খারাপ বাতাস গেলে তার সেই রােগ হয়আরও ধারণা ছিল, প্রাণের উদ্ভব ঘটে আপনাআপনিযেমন এক তাল কাঁচা মাংশ বাইরে রেখে দিলে সেখানে আপনাআপনি পােকার জন্ম হয় আর সেটা আপনা থেকেই পচতে থাকে

নানা রকমের জীবাণুর অস্তিত্বের ব্যাপারটা অবশ্য মানুষ তখনই জানতদুই বছর আগে ১৭শ শতকে আবিষ্কৃত হয়েছিল মাইক্রোস্কোপ সেটা দিয়ে পানি, দুধ, প্রাণিদেহ সর্বত্র ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবাণু (ব্যাকটেরিয়া, অ্যামিবিয়া, প্রটোজোয়া) এসবের চেহারা বিজ্ঞানীরা দেখে ফেলেছিলেনকিন্তু তাদের ভূমিকা কী, তা কেউ বুঝতে পারেনিসবাই ভাবত এসব জীবাণু আর নানা রােগের কোনােই সম্পর্ক নাই

দুই হাজার বছর আগে গ্রিক বিজ্ঞানী গ্যালেন যে খারাপ বাতাস তথা মায়াজমা তত্ত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন, সেটাতেই সবাই বিশ্বাস করত আর রােগের চিকিৎসাও হতাে তার ভিত্তিতেবলাই বাহুল্য, অধিকাংশ রােগ আসলে এভাবে সারত না, আর মানুষ সামান্য জ্বর বা রকম অন্যান্য রােগে মারা যেত সব সময়ই

১৮৫৬ সাল। লুই পাস্তুর তখন লিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকতার এক ছাত্রের বাবার ছিল ওয়াইন বা মদের কারখানাবিটের মূল থেকেগাজন বা ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মদ বানাতেন তিনিকিন্তু সমস্যা হলাে প্রায়ই ওয়াইনটা টক অখাদ্য হয়ে যেতপাস্তুর গবেষণা করে দেখলেন, টকে যাওয়া মদের টক স্বাদ আসে ল্যাকটিক অ্যাসিডের উপস্থিতির কারণেআর টক হয়ে যাওয়া মদের মধ্যে সব সময়েই বিশেষ এক রকমের ইস্ট (Yeast) জাতীয় ছত্রাকের দেখা মেলে

পাস্তুর বের করলেন, এই ছত্রাকই হলাে মদ টকে যাওয়ার কারণমদ ছাড়াও দুধ পচে টক হয়ে যাওয়ার কারণটাও পাস্তুর গবেষণা করে দেখলেন। মাইক্রোস্কোপের তলায় টক হয়ে যাওয়া দুধ নিয়ে দেখলেনসেখানেও একই ঘটনা, টকে যাওয়া দুধে সব সময়ই পাওয়া যাচ্ছে জীবাণুতার মানে কী দাঁড়াল? পাস্তুর বললেন, জীবাণুরাই আসলে খাবারদাবার কিংবা দুধ বা মদ পচার কারণ। আর তা থেকে রক্ষা করতে হলে এই জীবাণুদের মারতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

সেই পদ্ধতিও বাতলে দিলেন লুই পাস্তুর দুধ বা রকম যে খাবার বা পানীয়কে রক্ষা করা দরকার, সেটাকে ৬০ থেকে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফোটাতে হবে কিছুক্ষণসেটা করলে ব্যস, জীবাণুদের রফাদফাউত্তাপের চোটে তারা সবাই সপরিবারে মারা পড়বে, ফলে ফুটিয়ে নেওয়া দুধ বা অন্য পানীয় আর নষ্ট হবে না। 

এই পদ্ধতির নাম দেওয়া হলাে পাস্তুরায়ন বা Pasteurizationএই পদ্ধতি চালুর পর থেকে খাবারদাবার পচার হাত থেকে রক্ষা করার উপায় জেনে গেল সবাইআজও খাবারকে দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করতে পাস্তুরায়ন করা হয়, আপনি বা আমি যে দুধ খাই বােতল থেকে, বােতলজাত করার আগে সেটাকে পাস্তুরায়ন করে নেওয়া হয়েছে বলেই অনেক দিন পরেও সেটা ঠিক থাকছে। 

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন আদর্শ থেকে প্রকাশিত রাগিব হাসান এর “বিজ্ঞানীদের কাণ্ডকারখানা-২: ১৮ জন বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের জীবনে ঘটে যাওয়া মজার ও অনুপ্রেরণাদায়ী কাহিনী” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে
রাগিব হাসানের বিজ্ঞানীদের কাণ্ডকারখানা ২ বইয়ের প্রচ্ছদ

জীবনের উৎস, মৃত্যুর কারণ

পাস্তরের সময়ে সবার আরেকটা ভুল ধারণা ছিল, রােগজীবাণু, কীটপতঙ্গ এসব নাকি আপনা থেকেই জন্ম নেয় যেমন খাবার বা মাংসবাইরে রেখে দিলে তাতে পােকা ধরে, পচে যায়সেই পােকা আপনা আপনিই আসে খাবারে রকম ভাবত সবাইকিন্তু লুই পাস্তুর বললেন, খাবারে জীবাণু আসলে তবেই খাবারটা পচবে, আর খােলা খাবারে মাছির ডিম পাড়লে সেটা থেকেই নতুন মাছির জন্ম হবেশূন্য থেকে কখনােই প্রাণের উদ্ভব হয় না

বিতর্কের নিষ্পত্তি করতে ফরাসি বিজ্ঞান একাডেমি ২৫০০ ফ্ৰা মূল্যের আলহামবার্ট পুরস্কার ঘােষণা করল, যিনি এই প্রশ্নের নিষ্পত্তি করতে পারবেন, তিনি এই পুরস্কার পাবেনপাস্তুর নেমে পড়লেন প্রমাণেএকটা সরু গলার বিকারে মুরগির মাংসের ঝােল রাখা হলােএটাকে পাস্তুরিত করে মুখটা আটকে দেওয়া হলােকয়েক দিন পরেও এটা পচল নাএরপর পাস্তুর বিকারের সরু গলার ছিপি খুলে দিলেনবাইরের বাতাসের রােগজীবাণুর ছোঁয়া যেই লাগল, ঝােলটা পচতে শুরু করল

প্রমাণিত হলাে, বাতাসে ভেসে আসা জীবাণুই খাদ্যদ্রব্য পচায়একইভাবে মাংসকে পাস্তুরিত করে আটকে রেখে লুই পাস্তুর দেখলেন, তাতে কোনাে পােকা হয় নাখােলা রাখলে আর তাতে মাছিডিম পাড়লে তবেই সেখানে পােকা ধরেএভাবে ১৮৬২ সালে লুই পাস্তুর প্রমাণ করলেন, প্রাণ থেকেই প্রাণের উদ্ভব ঘটেআর জন্য সেই পুরস্কার জিতে নিলেন তিনি

আর একই সময়ে আরেকটা জিনিসও প্রমাণ করে দেখালেনবিভিন্ন রােগের পেছনে আছে নানা রকমের জীবাণুএটা আবিষ্কার করলেন রেশমের গুটিপােকার রােগের কারণ বের করতে গিয়েতিনি দেখালেন, আক্রান্ত গুটিপােকা থেকে পাওয়া জীবাণু যদি সুস্থ গুটীপােকার দেহে ঢােকানাে হয়, তাহলে তাদেরওঅসুখ হয় একইভাবেপাস্তুরের এই আবিষ্কার হাজার বছরের মায়াজমা বা খারাপ বাতাস তত্ত্বকে গুঁড়িয়ে দিল, সবাই বুঝতে পারল সংক্রামক রােগের মূল কারণ নানা রকমের জীবাণু। 

রােগবালাই প্রতিরােধক টিকা আবিষ্কার

এবারে পাস্তুরের বাড়িতে হাজির ফ্রান্সের মুরগির খামারিরাতাদের খামারের মুরগি মারা পড়ছিল কলেরার মড়কেপাস্তুর খুঁজে পেলেন এক রকমের ব্যাকটেরিয়াকিন্তু মুরগি বাঁচাবেন কীভাবে? গবেষণা চালাতে শুরু করলেনকীভাবে মুরগি আক্রান্ত হয় তা বােঝার জন্য মুরগির দেহে বিভিন্ন অবস্থার জীবাণু প্রবেশ করিয়ে দেখছিলেন, কীভাবে এসব ব্যাকটেরিয়া মুরগির দেহে কলেরা রােগ শুরু করে দেয়।

এ সময় মাসখানেকের জন্য ছুটিতে গেলেন পাস্তুর। এক সহকারীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, জীবাণুপূর্ণ তরলগুলােকে ঠিকমতাে গুছিয়ে রাখতে। সেই সহকারী নিজেও চলে গেছে ছুটিতে। এক মাস পরে এসে পাস্তুর দেখলেন, জীবাণুর তরলটা নিজেই কেমন যেন পচে গেছে, আর জীবাণুগুলাে হয়ে গেছে দুর্বল। এ রকম জীবাণু যেসব মুরগির দেহে ঢােকানাে হলাে, তারা অসুস্থ হলেও মরল না। আর এরপরে সেসব মুরগি শরীরে কঠিন জীবাণু ঢােকালেও তাদের আর কলেরা হলাে না।

লুই পাস্তুর বুঝলেন, বড় একটা আবিষ্কার করে ফেলেছেনকোনাে জীবাণু দিয়ে যদি কোনাে রােগ হয়, তাহলে সেই জীবাণুকে নানাভাবে দুর্বল করে ফেলে সেই দুর্বল জীবাণু দেহে প্রবেশ করাতে পারলেই প্রাণীটি সেই রােগকে প্রতিরােধ করতে পারবে মানে, দুর্বল জীবাণু হলাে সেই রােগেরই প্রতিষেধক টিকাপাস্তুর বানিয়ে ফেললেন মুরগির কলেরার প্রতিষেধক টিকাবন্ধ হয়ে গেল মুরগির মড়কএরপর ভেড়া পালকেরাও এল ভেড়ার অ্যানথ্রাক্সরােগ নিয়েপাস্তুর একই পদ্ধতি অবলম্বন করে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণুকে দুর্বল করে পাস্তুর সেটার টিকাও বানিয়ে ফেললেনটিকা দেওয়া ভেড়াদের আর এই রােগ হলাে না । 

লুই পাস্তুর এবং জোসেফ মাইস্টার

লুই পাস্তুর এবং জোসেফ মাইস্টার; Image Course: meteoweb.eu

জলাতঙ্কের টিকা: শৈশবের প্রতিজ্ঞা

পাস্তুরের শৈশবের সেই প্রতিজ্ঞার কথা মনে আছে তাে? জলাতঙ্কের প্রতিষেধক বের করবেন, সেই প্রতিজ্ঞা? পাস্তুর ভােলেননি তার কথা অন্য সবকিছুর টিকা বের করার পরে এবার মানুষের জলাতঙ্কের টিকা বের করায় মন দিলেন পাগলা কুকুরের মুখ থেকে বেরােনাে লালা প্রবেশ করালেন খরগােশের দেহেতাদেরও জলাতঙ্ক হলােবুঝলেন, কুকুরের লালায় আছে সেই জীবাণু

তখনকার দিনে অবশ্য জলাতঙ্কের ভাইরাস দেখার মতাে মাইক্রোস্কোপ ছিল নাতবু পাস্তুর ধরে নিলেন, লালার মধ্যেই জীবাণু আছেএবারে এই জলাতঙ্কে মরা খরগােশের স্নায়ু বাতাসে শুকিয়ে নিয়ে দুর্বল করলেন জলাতঙ্কের জীবাণুকে। বানালেন জলাতঙ্কের টিকা৫০টা কুকুরকে এই টিকা দেওয়ার পরে তাদের জলাতঙ্ক হলাে নাকিন্তু নিন্দুকেরা বলল, এই টিকা আসলে মানুষের দেহে কাজ করবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়

কাকে টিকা দিয়ে পরীক্ষা করবেন? পাস্তুর চিন্তায় পড়ে গেলেনএকপর্যায়ে ভাবলেন, নিজের ওপরেই পরীক্ষা দিবেন কি নাএমন সময় সমস্যার সমাধান হয়ে গেল কাকতালীয় ভাবে ১৮৮৫ সালের জুলাই মাসে বছর বয়সের বাচ্চা ছেলে জোসেফ মেইস্টারকে পাগলা কুকুরে কামড়ে আঁচড়ে ছিন্নভিন্ন করে দিলপ্রাণে বাঁচলেও ডাক্তাররা রায় দিলেন, জোসেফের জলাতঙ্ক হবেআর বাঁচবে না সে

কাঁদতে কাঁদতে জোসেফের যখন শয্যাশায়ী, তখন শুনতে পেলেন পাস্তুরের এই নতুন টিকার কথাশেষ চেষ্টা করতে নিয়ে এলেন ছােট্ট জোসেফকে পাস্তুরের গবেষণাগারেযদি কোনােভাবে ছেলেটাকে বাঁচানাে যায়!

পাস্তুর ঝাপিয়ে পড়লেন কাজেজোসেফকে প্রতিদিন একটি করে মােট ১৩টি ইঞ্জেকশন করে টিকা দিলেনমৃতপ্রায় জীবাণু দিয়ে শুরু করে আস্তে আস্তে টিকার জোর বাড়ালেনএভাবে টিকা দেওয়ার পরেশুরু হলাে প্রতীক্ষার পালাতিন মাস অপেক্ষা করার পরে আবার জোসেফকে ডাক্তাররা পরীক্ষা করলেনসে তখনাে সম্পূর্ণ সুস্থএকেবারেই কোনাে রােগের লক্ষণ নেই

বােঝা গেল, পাস্তুরের টিকা কাজ করেছেইতিহাসে প্রথমবারের মতাে জলাতঙ্ক রােগে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচল একটি প্রাণআর শৈশবের সেই প্রতিজ্ঞাটি রক্ষা করলেন পাস্তুরশুরু হলাে জীবাণুদের বিরুদ্ধে মানুষের সফল যুদ্ধ জয়ের পালা

জীবাণুদের মহাত্রাস এই মহান বিজ্ঞানী পাস্তুর পক্ষাঘাতে মারা যান১৮৯৫ সালেকিন্তু তার আগেই প্রতিষ্ঠা করেছেন পাস্তুর ইনস্টিটিউটসেখানে বাঘা বাঘা সব বিজ্ঞানী করে চলেছেন এখনাে নানা রােগজীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইমানবজাতিকে রােগমুক্ত করার যে প্রতিজ্ঞা পাস্তুর করেছিলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম আজও করে চলেছে সেই সাধনা

পাস্তুরের দেওয়া টিকা নিয়ে জলাতঙ্কে মৃত্যু থেকে বাঁচা সেই জোসেফ মেইস্টারের কী হলাে? কৃতজ্ঞ জোসেফ আজীবন পাস্তুরের সেবা করার সিদ্ধান্ত নেনবড় হওয়ার পরে পাস্তুর ইনস্টিটিউটের কেয়ারটেকার বা রক্ষণাবেক্ষক হিসেবে কাজ নেনপাস্তুরের হাতে গড়া এই ইনস্টিটিউটের সবকিছুর দেখাশােনার দায়িত্ব ছিল তার

১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানরা আক্রমণ করে ফ্রান্সসে বছরের জুন মাসে প্যারিস দখল করে নেয় জার্মান সেনাবাহিনীপাস্তুর ইনস্টিটিউটে এসে হানা দেয় তারামেইস্টারকে আদেশ দেয়, পাস্তুরের সমাধি ভেঙে তার মৃতদেহ বের করতেজীবনদাতা পাস্তুরের সমাধির এই অপমান জোসেফ মেইস্টার করতে পারবেন না কিছুতেই, তাই আত্মদান করলেনমেইস্টারজীবনদাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক অসামান্য নিদর্শন। (১)

(আপনারা বইটি পড়তে পারছেন, সেটাও পরােক্ষভাবে লুই পাস্তুরের অবদানকেন? কারণ বছর বয়সে আমাকেও রাস্তার এক পাগলা কুকুরে কামড়ে দিয়েছিল, লুই পাস্তুরের আবিষ্কৃত জলাতঙ্কের টিকা দেওয়ার কারণেই রক্ষা পেয়েছিল প্রাণএই মহান বিজ্ঞানীর প্রতি তাই ব্যক্তিগতভাবে আমি ঋণী

(১) কারাে কারাে মতে অবশ্য জোসেফ আত্মহত্যা করেছেন জার্মান সেনাদের হাতে তাঁর পরিবারের মৃত্যুর মিথ্যা খবর পেয়ে (ডুফোর, নেচার ২০১৩)। 



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন আদর্শ থেকে প্রকাশিত রাগিব হাসান এর “বিজ্ঞানীদের কাণ্ডকারখানা-২: ১৮ জন বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের জীবনে ঘটে যাওয়া মজার ও অনুপ্রেরণাদায়ী কাহিনী” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

Featured Image: theobjectivestandard.com

আপনার মন্তব্য লিখুন