Skip links

খায়রুন্নেসা: উপমহাদেশের এক আদর্শ নারী

দ্বীন পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত আরিফুল ইসলামের "পুণ্যবতী: মহীয়সী নারীদের জীবনের গল্প" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 8 মিনিট

আর্টিকেলটি আপনি চাইলে অডিও পডকাস্ট হিসেবেও শুনতে পারেন:

অডিওটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন Tajul Islam Hakim। অডিওটি শুনতে ভালো লাগলে সাবস্ক্রাইব করুন তার ইউটিউব চ্যানেল

উপমহাদেশের নারীরা জ্ঞানার্জনে অনেক পিছিয়ে ছিলেন। তাদেরকে পড়ালেখা শেখানোর ব্যাপারে খুব কম পরিবারের আগ্রহ ছিলো। হিন্দু এবং মুসলিম, দুই সমাজের ছিলো এমন চিত্র। আমাদের দাদী-নানীদের দিকে তাকালে আমরা এই বাস্তবতা দেখতে পাই। দাদী-নানীদের মধ্যে যাদের জন্ম ১৯৫০ সালের পূর্বে, তাদের মধ্যে কয়জন লেখাপড়া জানতেন?

মুসলিম পরিবারের নারীদেরকে মোটামুটি দ্বীনি জ্ঞানার্জন শেখানোর প্রচেষ্টা দেখা যায়। সম্ভ্রান্ত বা আলেম পরিবারের নারীরা কেউ কেউ বই পড়তে পারতেন। কিন্তু, নারীদেরকে লেখা শেখানো হতো না। লেখা না শেখানোর পেছনে এক অদ্ভুত যুক্তি ছিলো। সেটা হলো-

“মেয়েরা লিখতে শিখলে তারা প্রেমপত্র লিখবে!” [১]

মেয়েরা যাতে প্রেমপত্র লিখতে না পারে, সেজন্য অনেক পরিবার মেয়েদেরকে লেখালেখি শেখাতো না। পড়াও শেখানো হতো সীমিত পর্যায়ে। ছোটোবেলায় অল্পবিস্তর পড়ানো শেষেই মেয়েদের শিক্ষাজীবন শেষ হতো। কোনো আলেম পরিবারে অসংখ্য ছেলে কুরআনে হাফিজ পাওয়া গেলেও মেয়ে হাফিজা ছিলোই না বললেই হয়; যা ছিলো একেবারে হাতেগোনা।

উপমহাদেশের তৎকালীন এই বাস্তবতা বুঝতে পারলে পরবর্তী সেই মহীয়সী নারীর আলোচনা বুঝতে সুবিধা হবে।

তাঁর নাম ছিলো খায়রুন্নেসা (রাহিমাহাল্লাহ)। ১৮৭৮ সালে ভারতের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিলো ধনী ও আলেম পরিবার। তাঁর বাবার নাম ছিলো যিয়াউন নবী। তিনি ছিলেন একজন আলেম এবং একজন বইপ্রেমী। যেখানে বই পেতেন, কেনার চেষ্টা করতেন। যিউয়ান নবী যাকে বিয়ে করেন (অর্থাৎ খায়রুন্নেসার মা), তিনি বিয়ের আগে পড়াশোনা শিখেছিলেন। বিয়ের পর নিজ তত্ত্বাবধানে যিয়াউন নবী স্ত্রীকে আরো পড়াশোনা শেখান।

এমন আলেম বাবা ও গুণবতী মায়ের মেয়ে হলেন খায়রুন্নেসা। তিনি ছিলেন দুই ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে চতুর্থ। তাঁর ভাইয়েরাও আলেম-হাফেজ হোন।

যিয়াউন নবী তাঁর চতুর্থ মেয়ে খায়রুন্নেসাকে অনেক আদর করতেন। এই মেয়ে তাঁর মতো হয়েছে। বইয়ের প্রতি তাঁর অদম্য নেশা। তিনি নতুন কোনো বই পড়ার পর তাঁর এই মেয়ের সাথে সেই বই নিয়ে আলোচনা করেন। রাতে তাহাজ্জুদ নামাজের সময় তিনি যখন জাগেন, দেখতে পান তাঁর এই মেয়েটিও নামাজ পড়তে উঠেছে। পড়াশোনা, ইবাদাত, গৃহস্থলীর কাজে খায়রুন্নেসা ছিলেন বেশ দক্ষ।

পরিবারে অনেক বই ছিলো, লাইব্রেরি ছিলো। খায়রুন্নেসা পারিবারিক লাইব্রেরি থেকে অনেক বই পড়েন। তাঁর যুগে একজন মেয়ে এতো বই পড়াটা ছিলো বিরল। সবাই তাঁর জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ দেখে মুগ্ধ হতো।

এমন শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তাকে লেখালেখি শেখানো হতো না। কিন্তু তিনি দমে যাবার পাত্রী নন। তাঁর বড়ো চাচাতো ভাই সাইয়েদ খলীলুদ্দীন, যিনি ছিলেন গোটা খান্দানের অভিবাবক, তাঁর কাছে খায়রুন্নেসা লেখালেখি শেখার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করেন। সাইয়েদ খলীলুদ্দীন তাঁর এমন আগ্রহ দেখে তাঁকে অনুমতি প্রদান করেন। নিজ খান্দানের বিপরীতে গিয়ে খায়রুন্নেসা লেখালেখি শিখেন। [২]

Image Course: nbclosangeles.com/ Shutterstock

তাঁর ভাই সাইয়েদ আব্দুল্লাহ ছিলেন কুরআনে হাফিজ। কিন্তু, তাঁর খান্দানের কোনো মহিলা কুরআনের হাফিজা ছিলেন না। কুরআনের প্রতি অগাধ ভালোবাসা তাঁর মনে ছিলো। তিনি চান কুরআনের হাফেজা হতে। খান্দানের কেউ কুরআনের হাফেজা হয়নি তো কী হয়েছে? তিনি কেনো সেই ধারার সূচনা করতে পারেন না?

তিনি ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে কুরআন মুখস্ত শুরু করেন। তাঁর পরিশ্রম, আন্তরিকতা, দু’আ সব মিলিয়ে মাত্র ৩ বছরে খান্দানের প্রথম মেয়ে হিশেবে কুরআনের হাফেজা হবার মর্যাদালাভ করেন। [৩]

খায়রুন্নেসা সহীহ-শুদ্ধভাবে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারতেন। রামাদ্বান মাসে তিনি বাড়িতে শুধুমাত্র নারীদের তারাবীহর নামাজে ইমামতি করতেন এবং প্রতিদিন তারাবীহতে এক পারা কুরআন পড়তেন। এভাবে পুরো রামাদ্বান মাসে তারাবীহতে কুরআন খতম দিতেন অন্যান্য মহিলাদেরকে নিয়ে। [৪]

শুধুমাত্র মেয়েদের নামাজে মেয়েদের ইমামতি হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং অনেক মুজতাহিদ ইমাম এটাকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।

খায়রুন্নেসা কুরআন-হাদীসের অনেক দু’আ মুখস্ত করেন এবং বিভিন্ন প্রয়োজনের সময় সেই দু’আগুলো ব্যবহার করতেন। তিনি একটি কাব্যগ্রন্থ পান, যেই কাব্যে আল্লাহর গুণবাচক নামগুলো দিয়ে কিভাবে দু’আ করা যায় তা কবিতার মতো আছে। সেই কাব্যগ্রন্থ তিনি মুখস্ত করেন এবং সেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দু’আ করতেন।

তিনি নিজেও কবিতা লিখতেন। কবিতার মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করে আল্লাহর কাছে দু’আ করতেন। তাঁর একটি কবিতার বাংলা অনুবাদ এমন:

“দান করাটা তোমার রীতি

আমার আদত হাত পাতার

আশা যেন ভঙ্গ না হয়

ফকীরের, হে পরওয়ারদিগার!”

দু’আ নিয়ে তিনি বইও লিখেন। একজন লেখিকা হিশেবেও স্বীকৃতি অর্জন করেন।

১৯০৪ সালে খায়রুন্নেসার বিয়ে হয় দারুল উলুম নাদওয়ার একজন নাজিমের সাথে। তাঁর নাম ছিলো আব্দুল হাই; যিনি উর্দু ভাষার একজন লেখক ছিলেন। বাবার পরিবারে বেশ স্বচ্ছল থাকলেও স্বামীর পরিবারে এসে তিনি অভাব-অনটনের মুখোমুখি হোন।

জীবনের এক নতুন অভিজ্ঞতা। কিন্তু, আল্লাহর উপর ভরসাকারী এই মহীয়সী সেই অভাব-অনটনের সংসারে সুখ খুঁজতে লাগলেন। সংসারে অভাব আছে ঠিকই, কিন্তু স্বামীর পরিবারে এসে তিনি দেখতে পেলেন জ্ঞানার্জনের এক নতুন সুযোগ। স্বামীর জ্ঞান, স্বামীর সংগ্রহে থাকা নতুন নতুন বইপুস্তক দেখে অভাবের কথা অনেকটা ভুলে গেলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা তিনি লিখেন:

“এ বাড়িতে সম্পদ ছিলো না ঠিক, কিন্তু এমন সম্পদ ছিলো যার মোকাবিলায় সকল বৈষয়িক সম্পদ কুরবানি করা যায়। ইলম হলো এমন এক সম্পদ, যা লাভ করার জন্য সকল সম্পদ নিঃশেষ করলেও কম হবে।” [৫]

অভাবের সংসারে স্বামী একসময় হেকিমী (চিকিৎসা) পেশা গ্রহণ করায় পরিবারে স্বাচ্ছন্দ ফিরে আসে। তাঁর কোলজুড়ে সন্তান আসে। এক ছেলেকে বিদেশে পড়তে পাঠান। কিন্তু, বিয়ের ১৯ বছরের মাথায় ১৯২৩ সালে তাঁর স্বামী ইন্তেকাল করেন! সন্তানদেরকে নিয়ে তিনি যেনো এক অথৈ সাগরে পড়েন। তাঁর ছোটো ছেলের বয়স তখন ৯ বছর। বিদেশে থাকা ছেলের পড়ালেখা তখনো শেষ হয়নি। তাঁর পরিবারের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন তাই ভাইয়েরা।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন দ্বীন পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত আরিফুল ইসলামের “পুণ্যবতী: মহীয়সী নারীদের জীবনের গল্প” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে, ওয়াফি লাইফের এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে
আরিফুল ইসলামের পুণ্যবতী বইয়ের প্রচ্ছদ

খায়রুন্নেসা অনেকগুলো বই লিখেন। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দু’আ নিয়ে, পারিবারিক জীবন নিয়ে, রান্না নিয়ে। মাসিক পত্রিকায়ও তিনি লেখা পাঠাতেন; যা তৎকালীন সময়ে বিরল ঘটনা।

অতিরিক্ত বই পড়া ও লেখালেখি করতে গিয়ে তাঁর চোখে সমস্যা হয়। ১৯৩১ সালে তাঁর চোখের অপারেশন করা হয়। কিন্তু, জ্ঞানার্জনের অদম্য নেশা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আবারো পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন। ফলে তাঁর চোখের দৃষ্টিশক্তি আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে যায়।

খায়রুন্নেসা তাঁর ছোটো ছেলে আলীকে কুরআন শেখান, আরবি ও উর্দু ভাষার প্রাথমিক পাঠ শেখান বাড়িতেই। ছেলেকে কুরআনের বড়ো বড়ো সূরা মুখস্ত করান। নিজে কুরআনের হাফেজা হওয়ায় এই কাজ বেশ সহজে করতে পারেন। পরিবারের, আশেপাশের পরিবারের ছোটো বাচ্চাদেরকে তিনি কুরআন শেখাতেন।

ছোটোছেলে আলী অনেকসময় এশার নামাজ না পড়েই ঘুমিয়ে পড়তো। গভীর ঘুম। মমতাময়ী মা হিশেবে তিনি আর দশজন মায়ের মতো বলতেন না যে, আদরের সন্তান ঘুমাচ্ছে, ঘুমাক; তোলার দরকার নেই। ছেলে যতো গভীর ঘুমে নিমজ্জিত থাকুক না কেনো, তাঁকে তিনি ঘুম থেকে ডেকে তুলে নামাজ পড়াতেন। ফজরের নামাজের বেলায়ও কোনো ছাড় নেই। ছেলেকে নামাজ পড়ার জন্য তুলতেন, নামাজ শেষে কুরআন তেলাওয়াত করতে বলতেন।

ছেলে মাঝেমধ্যে দুষ্টুমি করে পাশের বাড়ির ছেলেকে মারধোর বা বকাঝকা করতো। তিনি ছেলের হয়ে মাফ চাইতেন না বা ‘বিচার করবো’ বলে প্রশ্রয় দিতেন না। তিনি ছেলেকে বলতেন, “তার কাছে মাফ চাও। তুমি অন্যায় করেছো।” ছেলেকে শুধু মুখে মাফ চাইতে বলতেন না, হাত জোড় করে মাফ চাইতে শেখান যাতে সে এমন অন্যায় আর না করে এবং কখনো অন্যায় করলে সেটা সংশোধনের জন্য যাতে লজ্জিত না হয়। ছেলের মধ্যে এমন অভ্যাস তিনি গড়ে তোলেন।

ছেলেকে পড়ালেখা করার জন্য পাঠান লক্ষ্মৌতে। মায়ের স্বপ্ন ছেলে অনেক বড়ো আলেম হবে। ছেলেকে শুধু পড়তে পাঠিয়েই তিনি ক্ষান্ত হোননি। ছেলেকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন। নতুন পরিবেশে গিয়ে ছেলে যাতে বিগড়ে না যায়, সে যেনো আদর্শচ্যূত না হয়, সেজন্য তাঁকে সর্বদা তাঁর পূর্ব-পুরুষদের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন।

খায়রুন্নেসার খান্দানের অনেকেই তখন ইউরোপ-অ্যামেরিকা, জাপানে গিয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করে অনেক বেশি বেতনে চাকরি করছে। কিন্তু তাঁর ছেলেকে তিনি ‘মোল্লা’ বানাচ্ছেন দেখে খান্দানের অনেকেই আফসোস করতো, তাঁকে পরামর্শ দিতো যে, ছেলেকে উকিল, ম্যাজিস্টেট বানাও। কিন্তু, তিনি কারো কথায় কান দিতেন না। ছেলেও যাতে উৎসাহ হারিয়ে না ফেলে সেজন্য তাঁকে মোটিভেশন দিয়ে তিনি চিঠি লিখেন-

“আলী, তুমি কারো কথা শুনো না। যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি আদায় করতে চাও ও আমার হক আদায় করতে চাও, তাহলে সেই সিংহপুরুষদের দিকে তাকাও যারা ধর্মীয় জ্ঞানার্জনে সারাটা জীবন ব্যয় করেছেন। তাঁদের সম্মান ও মর্যাদা কি কম ছিলো? শাহ ওয়ালীউল্লাহ সাহেব, শাহ আব্দুল আযীয সাহেব, শাহ আব্দুল কাদির সাহেব…তোমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন কতো ঈর্ষাময় ছিলো! তোমার পরিবারে এখন অনেক ইংরেজি শিক্ষিত আছে; কিন্তু এখন অনুরূপ (ধর্মীয়) শিক্ষিত কেউ নেই। আমার যদি ১০০ টি সন্তান থাকতো, তবুও আমি তাঁদেরকে এই শিক্ষা দিতাম। কিন্তু, আমার এখন তুমি আছো।”

Image Course: muslim.sg

মায়ের চিঠি ছেলের কাছে বারুদের মতো কাজ করতো। তাঁর মনে জ্ঞানার্জনের জন্য আগুন ধরাতো। জ্ঞানার্জনের তৃষ্ণা হাজারগুণ বাড়িয়ে দিতো। তিনি বলতেন,

“লক্ষ্মৌ থাকাবস্থায় আমার মা আমাকে যেসব চিঠি পাঠিয়েছেন, সেই চিঠিগুলো থেকে আমি যে জ্ঞানার্জন করেছি, সেগুলোই যথেষ্ট ছিলো।”

আগেকার মানুষ মেয়েদেরকে লেখা শেখাতো না তারা প্রেমপত্র লিখবে এই ভয়ে। কিন্তু, খায়রুন্নেসার চিঠি পড়ে তাঁর ছেলে জ্ঞানার্জনের খোরাক পায়, সে জ্ঞানার্জনে আরো আগ্রহী হয়ে উঠে। এটাই প্রমাণ করে যে, মাথা ব্যাথার ওষুধ মাথা কেটে ফেলা নয়।

ছেলে যেনো আরবিতে পারদর্শী হয় সেজন্য মা বিভিন্ন চিঠিতে তাঁকে আরবি খুব ভালোভাবে রপ্ত করার জন্য উৎসাহ প্রদান করেন। ইংরেজিকে প্রায়োরিটি দিতে গিয়ে ছেলে যেনো আরবির প্রতি অবহেলা না দেখায় সেটা বারবার মা স্মরণ করিয়ে দেন।

আপনারা জানেন, খায়রুন্নেসার সেই ছেলে কে?

সেই ছেলে এমন এক ছেলে, যিনি আরবিতে বই লিখেন এবং বলা হয়ে থাকে যে, তিনি আরবদের চেয়েও ভালো আরবি লিখতে পারতেন, আরবদের চেয়েও ভালো আরবি বলতে পারতেন। উপমহাদেশের গতো ১০০-১৫০ বছরের মাত্র পাঁচজন আলেম যদি সিলেক্ট করতে হয়, যাঁদের লেখালেখি পুরো বিশ্বজুড়ে সুখ্যাতি অর্জন করেছে, তাঁদের মধ্যে খায়রুন্নেসার ছেলে একজন। তিনি নিজে যেমন মহীয়সী ছিলেন, তেমনি গড়ে তোলেন একজন যোগ্য আলেম। তিনি ছেলেকে শুধু পড়তে পাঠাননি, কী বই, কী তাফসীর পড়তে হবে সেগুলোও লিখে দিতেন। নিয়মিত পড়াশোনার খোঁজখবর রাখতেন।

তাঁর ছেলের নাম- সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রাহিমাহুল্লাহ)।

তিনি দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার মহাপরিচালক, অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের সভাপতি, বিশ্ব মুসলিম লীগের সদস্য, বিশ্ব ইসলামি সাহিত্যের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, দারুল উলুম দেওবন্দের মজলিসে শূরার সভাপতি, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক সেন্টারের পরিচালক, মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলর ও সিন্ডিকেট সদস্য, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ার রুকন ছাড়াও অসংখ্য ধর্মীয়, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় আলেম ছিলেন যাকে অনারবদের তুলনায় আরবরা বেশি জানতো এবং তিনিই ভারতের প্রথম আলেম, যাকে সৌদি আরবের রাজ পরিবার ১৯৫১ সালে হজ্জের সময় মক্কার চাবি হস্তান্তর করেন এবং যে কাউকে সঙ্গে নেয়ার অনুমতি দেন। তার রচনাবলির সংখ্যা ৫ শতকেরও অধিক।

১৯৪৫ সালে মেরিল ফ্রস্ট নামের একজন অ্যাথলেট একটি কথা বলেন যা অনেক বিখ্যাত হয়। উক্তিটি ছিলো-

“Behind every great man there’s a woman.”

আবুল হাসান আলী নদভীর ক্ষেত্রে সেই মহীয়সী নারী ছিলেন তাঁর মা খায়রুন্নেসা। মায়ের স্বপ্ন ছিলো ছেলে আলেম হবে, অনেক মানুষ তাঁর হাতে মুসলিম হবে। তিনি ছেলেকে জিজ্ঞেস করতেন, “আলী, তোমার হাতে কেউ কি এ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেছে?” ছেলে বলতেন, “দুই-তিনজন।”

মা খায়রুন্নেসার বলতেন-

“আমি চাই দলে দলে মানুষ তোমার হাতে ইসলাম গ্রহণ করুক।”

১৯৬৮ সালে খায়রুন্নেসা ইন্তেকাল করেন।

তথ্যসূত্র:

১। আবুল হাসান আলী নদভী, আমার আম্মা, পৃষ্ঠা ১৭।

২। আবুল হাসান আলী নদভী, আমার আম্মা, পৃষ্ঠা ১৭।

৩। আবুল হাসান আলী নদভী, আমার আম্মা, পৃষ্ঠা ১৯।

৪। আবুল হাসান আলী নদভী, আমার আম্মা, পৃষ্ঠা ১৯।

৫। আবুল হাসান আলী নদভী, আমার আম্মা, পৃষ্ঠা ৩১।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন দ্বীন পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত আরিফুল ইসলামের “পুণ্যবতী: মহীয়সী নারীদের জীবনের গল্প” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে, ওয়াফি লাইফের এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

Featured Image: freepolicybriefs.org

আপনার মন্তব্য লিখুন