Skip links

গল্পে গল্পে ডানকার্ক যুদ্ধ

অ্যাডভেঞ্চার প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আমিনুল ইসলাম-এর "গল্পে গল্পে বিংশ শতাব্দী" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 14 মিনিট

পর্ব-৩৯

১৯৪০ সালের এপ্রিল-মে: সামারের গরম আবহাওয়ায় শুরু হলো যুদ্ধের নতুন ইনিংস:

১৯৪০ সালের এপ্রিল মাসে ইউরোপে সামার সিজন শুরু হয়। সামারের গরমে হিটলারের মাথাও গরম হতে শুরু করলো।

 

৮ এপ্রিল, ১৯৪০ সাল

জার্মান গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান হেইনরিখ হিমলার ফোনে হিটলারকে বললেন,

“মারাত্মক খবর আছে ফুরার”

“মারাত্মক খবর? কিসের?”

“আমার মনে হয় ব্রিটেন যুদ্ধের পাঁয়তারা করছে।”

“কীভাবে?”

“আজকে ব্রিটেনের নৌ-বাহিনী নরওয়ের সমুদ্র উপকূলে মাইন বসিয়েছে।”

“কী উদ্দেশ্যে?”

“মনে হয় তারা অতর্কিতে নরওয়ে দখল করতে চায়।”

ফোন ছেড়েই হিটলার খবর পাঠালেন জেনারেলদের কাছে। আসতে বললেন চ্যান্সেলারীতে। হিটলার পাগলের মতো অস্থিরভাবে ছোটাছুটি করতে লাগলেন ম্যাপকক্ষে। লাল-নীল পেনসিলে দাগ কাটতে লাগলেন ম্যাপের উপরে। মুছতে লাগলেন আবার সে দাগ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন ফিল্ডমার্শাল কাইটেল, রুডলফ হেস, মার্টিন বোরম্যান ও প্রচার মন্ত্রী ড: গোয়েবলস। আরম্ভ হয়ে গেলো বদ্ধ দরজায় জরুরি আলোচনা।

হিটলার প্রথমে জেনারেলদের খবরটা জানালেন। বললেন, “আমাদেরকে বেকায়দার ফেলার জন্যই ব্রিটেন নরওয়ে দখল করতে চায়। কারণ আমাদের মিল ফ্যাক্টরীতে ব্যবহৃত লোহার বেশির ভাগ আসে সুইডেন থেকে। আর সে ব্যাপারে আমরা ব্যবহার করে থাকি নরওয়ের নাভিক বন্দর। নরওয়ে একবার দখলে গেলে ব্রিটেন সুইডেনও দখল করবে। ফলে বন্ধ হয়ে যাবে সুইডেন থেকে লোহার আমদানি। বন্ধ থাকবে অস্ত্র উৎপাদন। তালা লাগবে মিল ফ্যাক্টরীতে। বেকার হয়ে পড়বে লক্ষ লক্ষ জার্মান শ্রমিক। ভেঙ্গে পড়বে আমাদের অর্থনীতি। এতসব ঘটার আগেই নরওয়ে দখল করবো আমি।”

জেনারেলরা প্রথমে আপত্তি জানান, “বিনা দোষে আমরা একটা নিরপরাধ দেশে আক্রমণ চালাবো? অনর্থক ক্ষয়ক্ষতি করবো?”

হিটলার উত্তর দিলেন, “অনর্থক বলছো কেন তোমরা। নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য কোনো কাজে হাত দেওয়া কি অনর্থক? বৃটিশ বাহিনী সাগর পাড়ি দেওয়ার আগেই আমরা নরওয়ে দখল করতে চাই। প্রয়োজনবোধে সুইডেন ও ডেনমার্কও দখল করবো। পুরো স্ক্যানডেভিয়ান দেশগুলি আমাদের দখলে থাকবে। ফিনল্যান্ড যেহেতু রাশিয়া দখল করেই ফেলেছে, সেদিকে পা বাড়াবো না আমরা।”

জার্মানি কর্তৃক নরওয়ে আক্রমণ; Courtesy: historynet.com/

জার্মানী কর্তৃক ডেনমার্ক ও নরওয়ে দখল:

৯ এপ্রিল, ১৯৪০

হিটলার সৈন্য প্রেরণ করলেন নরওয়ের উদ্দেশ্যে। বলেন, “সাগরপাড় থেকেই আক্রমন চালাও নরওয়ের মূল ভূমিতে।”

বিনা দোষে আক্রান্ত হলো ছোট্ট দেশ নরওয়ে। হিটলারের আদেশ পেয়েই নৌ, বিমান এবং স্থলবাহিনী একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়লো নরওয়ের উপর। পর্যুদস্ত করে দিলো নরওয়ের সেনাবাহিনীকে। সুযোগ দিলো না বৃটিশ সৈন্যের সাগর পাড়ি দিয়ে নরওয়ের ত্রিসীমানায় আসার। পাকাপোক্তভাবে অধিকৃত নরওয়ের সমুদ্রসীমা দখল করে থাকলো জার্মান বাহিনী। অবস্থা খারাপ দেখে ফিরে গেলো বৃটিশ যুদ্ধ জাহাজ।

মন খারাপ হলো হিটলারের। কারণ শক্তি পরীক্ষা করার সুযোগ থেকে হলেন তিনি বঞ্চিত। জাতশত্রু বৃটিশ-ফ্রান্স কে সামনাসামনি মোকাবেলা করতে না পারার কারণে বরং তিনি হলেন ম্রিয়মান।

নরওয়ে দখল করার সাথে সাথেই হিটলারের বাহিনী এবার ঝাঁপিয়ে পড়লো ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনের উপর। যুদ্ধ করাতো দূর অস্ত, হিটলারের বাহিনীর নাম শুনেই আত্মসমর্পন করে বসলো ডেনমার্ক।

মামুন জারিফকে জিজ্ঞেস করলো, “তার মানে পোল্যান্ড দখল করার পরে হিটলারের দখলে চলে আসলো নরওয়ে ও ডেনমার্ক?”

ঠিক তাই। কিন্তু যুদ্ধবাজ হিটলারের হাত নিশপিশ করছিলো কখন ফ্রান্সকে শায়েস্তা করা যাবে, এই চিন্তায়।

জেনারেলদের নিয়ে বৈঠকে বসলেন হিটলার। বললেন, “এই সেই শয়তান ফ্রান্স যারা ভার্সাই চুক্তি দিয়ে জার্মানীকে গোলামির জিঞ্জির পরিয়েছে। ফ্রান্সকে খতম না করতে পারলে আমাদের সব অর্জন বৃথা।”

জার্মানীতে ততদিনে সুপারম্যানে পরিণত হয়ে গেছেন হিটলার। লোকজন দেখলেন, হিটলার যেখানেই হাত দেন সেখানেই সাফল্য। অবলীলায় একটার পর একটা দেশ দখল করছেন তিনি। লাখ লাখ জার্মানীর তরুন সম্প্রদায় হাসিমুখে সেনাবাহিনীতে নাম লেখালো বিশ্বজয়ের অদম্য নেশায়।

১০ মে, ১৯৪০

আবার হিটলার নেচে উঠলেন মরণ খেলায়। নেমে পড়লেন এক প্রলয়ংকরী যুদ্ধে। উদ্দেশ্য ফ্রান্সকে দখল করা। কিন্তু ফ্রান্স জার্মান সীমান্ত বরাবর তৈরি করেছে দুর্ভেদ্য ম্যাজিনো লাইন। এ লাইন টপকিয়ে সরাসরি ফ্রান্সে হামলা করা কার্যত অসম্ভব। এ লাইন শেষ হলেই আরেক প্রাকৃতিক বাধা হলো আর্দেনেস বন। লম্বা লম্বা গাছগাছড়া আর ঝোঁপঝাড়ে ভর্তি।

তাহলে উপায় কি?

হিটলার নির্দেশ দিলেন, “ছোট্ট দেশ বেলজিয়ামকে দখল করে ফ্রান্স সীমান্ত বরাবর পৌঁছতে হবে। বেলজিয়ামের পড়শি সমুদ্রপারের আরেক দেশ হল্যান্ডও দখল করতে হবে। হল্যান্ড ও বেলজিয়াম দখল করতে পারলেই ফ্রান্স দখল করা আমাদের জন্য ডালভাত।”

যেই কথা সেই কাজ। সর্বশক্তি নিয়ে হিটলারের বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লো হল্যান্ড ও বেলজিয়ামের উপর। বেলজিয়ামের রাজা সাহায্য চাইলেন ব্রিটেন ও ফ্রান্সের কাছে। এবার ব্রিটেন-ফ্রান্স হিটলারের মুখোমুখি হওয়ার জন্য তৈরি। লাখ লাখ বৃটিশ ও ফরাসি সৈন্য বেলজিয়াম ও হল্যান্ড রক্ষার মিশনে নামলো। অবশ্য হিটলারের দুর্ধর্ষ বাহিনী তার আগেই দখল করে নিয়েছে আক্রান্ত দুই দেশের অনেক এলাকা।

বেলজিয়ান বাহিনীর আত্মসমর্পণ; Courtesy: wtop.com/AP

অসহায় হয়ে পড়লো ফ্রান্স: জার্মান ট্যাঙ্ক আর্দেনেস বনের বাধা দূর করলো:

এই ফাঁকে জার্মানি করলো এক মহাচালাকি। চালাকি বলা যাবে না, বলতে হবে জার্মানীর সামরিক সরঞ্জামের শ্রেষ্ঠত্বের কথা। একটু আগেই বলেছিলাম, ম্যাজিনো লাইন পার হলেই ফ্রান্সের আর্দেনেস বন অবস্থিত। ফ্রান্স ভাবছিলো, এ পথ দিয়ে সে নিরাপদ। ঘন বনের লম্বা গাছের বাধার কারণে জার্মানরা আসতে পারবে না। ব্রিটেন-ফ্রান্স ব্যস্ত হল্যান্ড-বেলজিয়াম রক্ষার মিশনে। কিন্তু জার্মানীর শক্তিশালী ট্যাংক ডিভিশন যে গাছপালা ভেঙে ফ্রান্সের ভিতরে ঢুকবে, সেটা বোধহয় ইবলিশ শয়তানেরও ধারণা ছিলো না।

মামুনের প্রশ্ন, “এটা পারলো কিভাবে জার্মানী?”

আরে! জার্মানীর ট্যাঙ্ক কি জিঞ্জিরার মাল নাকি, যে সহজে ভেঙে যাবে? জার্মানীর ট্যাঙ্কের সামনে সমস্ত গাছপালা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লো। ভেঙে পড়া গাছগুলোর উপর দিয়েই রাশি রাশি জার্মান ট্যাঙ্ক ফ্রান্সের সীমানায় ঢুকে পড়তে লাগলো।

ট্যাঙ্ক তো সবাই বানায়, কিন্তু জার্মানীর মতো এতো শক্তিশালী ট্যাঙ্ক ব্রিটেন-ফ্রান্সের নেই। রাতের আঁধারে এই দুঃসাহসিক অপ্রথাগত কাজ করলো জার্মানরা। সকাল বেলায় ফরাসিরা দেখে তাদের সীমানায় জার্মান বাহিনী। ফ্রান্স পুরোপুরি আতংকিত হয়ে ভাবলো-একি!

ফ্রান্স ব্যস্ত ব্রিটেনের সাথে ডানকার্ক বন্দর এলাকায়। সেখানে জার্মানরা যুদ্ধরত। কিন্তু ঘন বনের লম্বা গাছপালা ও ঝোঁপঝাড় ভেদ করে জার্মানীর আরেক দল সৈন্য ফ্রান্সকে অবরুদ্ধ করে ফেলবে, সেটা কে জানতো?

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী রেঁনো কেঁদেই ফেললেন। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকে জরুরি বার্তা পাঠালেন। ও আরেকটা কথা বলাই হয় নি। ১৯৪০ সালের মে মাসের ১০ তারিখে হিটলার যেদিন হল্যান্ড-বেলজিয়াম আক্রমণ করেন, সেদিনই ব্রিটেনে পতন হয় দুর্বলচিত্ত প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিন সরকারের। চেম্বারলিনের শান্তিকামী মনোভাবের কারণেই মূলত জার্মানী এতো আগ্রাসী হয়ে পড়েছে এতদিনে। ব্রিটেনবাসী তাই হিটলারকে ঠেকানোর জন্য চার্চিলকেই এই গুরুদায়িত্ব দিলো।

যেটা বলছিলাম। ফরাসি প্রধানমন্ত্রী রেঁনো চার্চিলকে পাঠানো বার্তায় বললেন- “we have been defeated. We are beaten. We have lost the battle. The road to Paris is open.”

মানে-আমরা পরাজিত হয়ে গেছি। আমরা হতোদ্যম। যুদ্ধে হেরে গেছি আমরা। প্যারিসের পথ আজ উন্মুক্ত।

কোটি কোটি ফরাসি নাগরিক পরাজয়ের প্রহর গুনছে। যে জার্মানীর কারণে ১৮৭১ সাল থেকে ফ্রান্সের নাগরিক জীবন থেকে শান্তি হারিয়ে গেছে, সেই জার্মানী আবারো আযরাইল রুপে অবতীর্ণ।

কি লাভ হলো ভার্সাই চুক্তি করে? সেই জার্মানী আবার আসছে হামলাকারী সেজে।

ফ্রান্সের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, এই জার্মানীকে ঠেকানোর কোনো সাধ্য নেই ফ্রান্সের। প্রথম মহাযুদ্ধে তাও লড়েছে ফরাসিরা, এবার আর ফ্রান্সের সেই শক্তি নাই। ২৬ লক্ষ তরুণ জনশক্তি নিহত হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে। অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু ফরাসিরা।

জনজীবনে গুজব ছড়িয়ে পড়লো। একবার খবর এলো, ফ্রান্স সরকার আত্মসমর্পন করেছে। আরেকবার খবর বের হলো, সেনাপ্রধান গ্যামেলিন আত্মহত্যা করেছেন। যাহোক নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য্য বৃটিশের ভরসায় বসে রইলো নেপোলিয়ানের দেশ ফ্রান্স।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন অ্যাডভেঞ্চার প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আমিনুল ইসলামের “গল্পে গল্পে বিংশ শতাব্দী” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

পর্ব-৪০

অবশেষে ব্রিটেন-ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সরাসরি মোকাবেলা শুরু হলো জার্মানীর:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর প্রায় ৮ মাস পর ১৯৪০ সালের মে মাস থেকেই প্রকৃতপক্ষে শুরু হলো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ। একদিকে ফ্রান্স-ব্রিটেন আর বেলজিয়ামের অবশিষ্ট সৈন্য অন্যদিকে জার্মানীর সমগ্র শক্তি। এতদিন পর জাতশত্রু ফ্রান্স ও ব্রিটেনকে নাগালে পেয়ে হিটলার হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন। বললেন, “আর কোনো কথা নয়, বিচার বিবেচনা করারও দরকার নাই। আঘাত হানো, চরম আঘাত। ফরাসী বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দাও। ব্রিটেনকে করো বিতাড়িত। সাগরের পথ খোলা রাখো, যেন সহজে তারা পালাতে পারে। তারপর অগাধ সলিলে তাদের ডুবিয়ে দাও। এখন আমরা জড়িয়ে পড়েছি অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে। আমাদের পরাজয় মানে ইউরোপের মানচিত্র থেকে জার্মানীর অবলুপ্তি। আমাদের বাহিনীর সামনে ইউরোপ মহাদেশে মাথা উুঁচ করে দাড়ানোর মতো কোনো দেশ যাতে অবশিষ্ট না থাকে। সবাই থাকবে আমাদের তাঁবেদার। অবনত মস্তকে স্যালুট জানাবে জার্মানীকে।”

হিটলারের এসব ভাষণ বেতার মারফত জেনে গেলো বিশ্ববাসী। ঘনঘন কেবিনেট মিটিং বসলো লন্ডনে আর প্যারিসে। এই দুই পুরাতন সাম্রাজ্যবাদী দেশের রয়েছে শত শত বছর অন্য দেশ শোষণ করার অভিজ্ঞতা। আজ তাদের উঠানে নতুন এক পাগলা ঘোড়ার আবির্ভাব হয়েছে। কি আর করা! মরিয়া হয়ে শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবার সিদ্ধান্ত গ্রহন করলেন তারাও। এটা যে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

ব্যাটল অব ডানকার্ক: মহাযুদ্ধের অ্যাডভেঞ্চার শুরু 

জারিফ বললো, আমার এখনকার আলোচনা বুঝতে হলে তোমাকে এখন সেনাপতিদের মতো ইউরোপের মানচিত্র নিয়ে বসতে হবে। তাহলেই ডানকার্ক বন্দরের যুদ্ধ সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা লাভ করতে পারবে। তুমি প্রথমেই ফ্রান্সের সীমানার উত্তর দিকে নজর দাও।

উত্তর দিকে ফ্রান্সের পুরো সীমানা বেলজিয়ামের সাথে মিশে গেছে। পশ্চিম দিকে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের সীমানা মিলিতভাবে উত্তর সাগরে পড়েছে। ডানকার্ক বন্দরটি ফ্রান্সের উত্তর-পশ্চিম কোনে অবস্থিত। ডানকার্কে বিচও রয়েছে, যদিও সেটা অনুকূল নয়। ডানকার্কের কাছাকাছি রয়েছে ডোভার প্রণালী যেখান থেকে ফ্রান্স আর ব্রিটেনের সীমানা দুরত্ব সবচেয়ে কম; মাত্র ১২ মাইল।

ঘটনা হলো ১৯৪০ সালের মে মাসের ১০ তারিখ থেকে জার্মানী বিদ্যুগতিতে একের পর এক দেশ দখলে নামে। জার্মানীর হাতে পতন হয় হল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গের। বেলজিয়ামকেও প্রায় গিলে ফেলেছে জার্মানরা। জার্মানীর তাড়া খেয়ে বেলজিয়ামের বাহিনী ডানকার্ক বন্দরে জড়ো হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে ব্রিটেন-ফ্রান্স ৪ লক্ষ সৈন্য নামায় ডানকার্ক বন্দরে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের পরিকল্পনা ছিলো ডানকার্ক বন্দর থেকেই জার্মানীকে বিতাড়িত করার কাজ একত্রে শুরু করবে তিন দেশ।
কিন্তু জার্মানীর মহাশক্তিশালী ট্যাংক ডিভিশন যে আর্দেনেস বনের গাছপালা ভেদ করে ফ্রান্সের ভিতরে ঢুকে পড়বে কে জানতো?

দুর্ধর্ষ জার্মানরা ফ্রান্সের ভিতরে ঢুকে বেলজিয়াম সীমান্ত বরাবর প্রায় পুরো উত্তর ফ্রান্স কব্জা করে ফেলে বিনা বাধায়।

ফলাফল?

ডানকার্কে মোতায়েন বাহিনীর সাথে অবশিষ্ট ফ্রান্সের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলো। এখন ফ্রান্স তো বটেই, ডানকার্কে মোতায়েন বৃটিশ ও বেলজিয়াম বাহিনীরও মরণ দশা।

ঘড় ঘড় আওয়াজ তুলে জার্মান গোলন্দাজ বাহিনী এগিয়ে চললো ডানকার্ক বন্দরের দিকে। পথে বেলজিয়ামের সৈন্যের মোকাবেলা করতে হলো তাদের কয়েক স্থানে।
ডানকার্ক দখল করার উদ্দেশ্যে জার্মানী পাঠালো প্রায় নব্বই ডিভিশন সৈন্য। ট্যাঙ্ক প্রেরণ করলো এক হাজারের মতো। হিটলার তার সমগ্র বিমান বাহিনীকে সক্রিয় রাখলেন। ডানকার্কের নীল আকাশ যাতে জার্মান বিমান ঢেকে ফেলতে পারে তার ব্যবস্থাও রাখলেন। যুদ্ধ জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন হিটলার।

ডানকার্কের মানচিত্র; Courtesy: https://www.thesun.co.uk/

দি মিরাকল অব ডানকার্ক: শুরু হলো ‘অপারেশন ডায়নামো’

মামুন, এই মুুহুর্তে আমি তোমাকে একটা মুভি দেখার কথা সাজেস্ট করতে পারি। ২০১৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রিস্টোফার নোলান পরিচালিত ‘ডানকার্ক’ মুভিটি দেখতে পারো। যদিও মুভির কাহিনীর বুনন ভালো নয়, ছবিতে কোনো একক নায়ক নেই; কিন্তু এই মুভিটি দেখলে ডানকার্ক বন্দরে ব্রিটেন-ফ্রান্সের অসহায়ত্ব সম্পর্কে ধারণা হবে তোমার।

আবার সেই অসহায় অবস্থা থেকে কিভাবে ৪ লক্ষ সৈন্য নিরাপদে তারা সরিয়ে নিলো সেই ঘটনারই দারুণ চিত্রায়ন আছে মুভিটিতে।

মামুন জিজ্ঞেস করলো, “সৈন্য সরিয়ে নিলো মানে? জার্মানীর সাথে যুদ্ধ হয়নি ব্রিটেন-ফ্রান্সের?

জারিফ বললো, সেজন্যই তো ডানকার্কের ঘটনা সামরিক ইতিহাসে মিরাকল নামে পরিচিত। সামান্য ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে ডানকার্ক বন্দর থেকে কিভাবে এত সৈন্যকে অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে নিলো ব্রিটেন-ফ্রান্স; সেটা মিরাকল ছাড়া আর কিছুই না।
সেই কাহিনীই শোনো এবার-

ব্রিটেন-ফ্রান্স যুদ্ধ করবে কিভাবে? জার্মানী তিনদিকে দিয়ে ঘেরাও করে ফেলেছিলো ব্রিটেন, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের সৈন্যদের। প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ সৈন্যের সামনে খোলা আছে কেবল ইংলিশ চ্যানেল। মাথার উপরে অবিরাম বোমা বর্ষন করছে জার্মান বোমারু বিমান। পেছনে সারাক্ষণ কামানের গোলা ছুঁড়ছে জার্মান গোলন্দাজ বাহিনী। ফ্রান্সের সাথে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কারণ পুরো ফ্রান্স-বেলজিয়াম সীমান্ত বরাবর ওত পেতে আছে জার্মানরা। যুদ্ধ করা দূর অস্ত-এই সাড়ে চার লক্ষ সৈন্য তিনদিক দিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে কীভাবে বেঁচে থাকবে? এটাই হয়ে উঠলো ফ্রান্স-ব্রিটেনের একমাত্র কামনা।

১৯৪০ সালের ২৬ মে থেকে ৪ জুন: The evacuation of Dunkirk

তাহলে জার্মানীর হাত থেকে বাঁচার উপায় কি?

ব্রিটেনের মসনদে তখন লৌহমানব উইনস্টন চার্চিল। তিনিই প্রথম উদ্ভাবন করলেন এক অভিনব বুদ্ধি। তিনদিক দিয়ে জার্মানরা ঘেরাও করেছে সেটা সত্য কিন্তু সাগরের দিকের পথ তো খোলা আছে। তাহলে সিদ্ধান্ত পাক্কা। এই চার লক্ষাধিক সৈন্যকে ডানকার্ক বন্দর থেকে সমুদ্রপথে ব্রিটেনের মাটিতে নিয়ে আসতে হবে।

ব্রিটেনের সমরবিশারদরা হতবাক। তারা চার্চিলকে জিজ্ঞেস করলেন, “বলেন কি? এত সৈন্যকে কিভাবে ডানকার্ক থেকে উদ্ধার করবো?”

চার্চিল বললেন, “যুদ্ধ করলে তো আর একটা সৈন্যকেও জীবিত পাবো না আমরা। তারচেয়ে বরং বন্দর খালি করে লোক নিয়ে আসলে অন্তত ৪০/৫০ হাজার লোককে তো বাঁচাতে পারবো?”

অবশেষে শুরু হলো ডানকার্ক বন্দর থেকে সৈন্য উদ্ধারকরণ প্রক্রিয়া। যার নাম হলো “Operation Dynamo”। ব্রিটেনের জলসীমায় ছোট বড় যতো নৌযান আছে, সবাই নামলো মাতৃভূমির টানে। শুরু হলো ডানকার্ক থেকে সৈন্য আনা নেওয়ার প্রক্রিয়া। প্রতিদিন হাজার হাজার সৈন্য ডানকার্ক থেকে ব্রিটেনের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমালো। জীবনের মায়া ছেড়ে দেওয়া সৈনিকেরা পেলো নতুন জীবন। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া কাপুরুষের লক্ষণ। কিন্তু এবারের পলায়ন জয়েরও অধিক।

মামুন বললো, “এখানে আমার একটা প্রশ্ন। ব্রিটেন-ফ্রান্স এত পরিকল্পনা করে ডানকার্র্ক থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার সময় পায় কিভাবে। জার্মানীর বিমান বাহিনী কি করলো তাহলে?”

জারিফ বললো, এখানে লুকিয়ে আছে আরেক মজার কাহিনী। ব্রিটেন যখন তার সেন্যবাহিনী নিয়ে পালাতে আরম্ভ করলো তখন হিটলারের জেনারেলরা তাকে ফোন করলেন, “মহামান্য ফুরার! কাপুরুষ বৃটিশদেরকে আমরা কি এখন বিমান আক্রমণ দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবো?

হিটলার উত্তর দিলেন, “কখনো নয়। গভীর সমুদ্রের পানিতে তারা নিরুপায় হয়ে ভাসছে। ইঁদুরের মতো হাবুডুবু খাচ্ছে সাগরের পানিতে। এই মুহুর্তে আমি তাদেরকে আঘাত করবো না, কারণ ডানকার্ক বন্দরের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা আমার সাথে শান্তি চুক্তি করতে আসবে। ব্রিটেনের সাথে আমি কখনো যুদ্ধ করতে চাই না। তাদের সাথে শান্তিতে বসবাস করবো। আমার যতো রাগ ওই ফ্রান্সের উপর। এই মুহুর্তে আমি যদি ব্রিটেনকে সমুদ্রের পানিতে চুবিয়ে মারি তাহলে তো আর শান্তি চুক্তি হবে না নিকট ভবিষ্যতে। ওদেরকে যেতে দাও। নিরাপদে ওরা দেশে ফিরুক। আর সুমতি ফিরুক। আমার সাথে যুদ্ধ করার সাহস যাতে তাদের আর না হয়।

সামরিক বিশারদরা পরবর্তীতে মূল্যায়ন করেছেন, “এটা ছিলো হিটলারের জীবনের অন্যতম সেরা ভুল। হিটলারের ইশারায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো সাড়ে ৪ লক্ষ সৈন্য। মনোবল ভেঙে যেতো বৃটিশদের। তাহলে হয়তো তারা শান্তি চুক্তি করতেও পারতো। এভাবে হাতের মুঠোয় শত্রুকে পেয়ে ছেড়ে দেওয়া হিটলারের চরিত্রের সাথে যায় না।”

হিটলারের জীবনে এর ফল হয়েছিলো মারাত্মক। হিটলারের সাথে শান্তি চুক্তি করাতো দূরের কথা, ডানকার্ক বন্দর থেকে প্রায় ৪ লক্ষ সৈন্য সরিয়েই গর্জন দিলো বৃটিশ সিংহ। সে কাহিনী আগামী পর্বে।

ডানকার্ক  বন্দর; Courtesy:  Imperial War Museum

পর্ব-৪১

ডানকার্ক থেকে ফিরেই বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের হুঙ্কার:

ডানকার্ক বন্দর থেকে প্রায় তিন লক্ষ ৯৮ হাজার সৈন্য ব্রিটেনে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। যার মধ্যে ফরাসি সৈন্য সংখ্যা ছিলো ১ লাখের উপর। অল্প কিছু বেলজিয়াম সৈন্য।

যেখানে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল নিজে অনুমান করেছিলেন হয়তো ৪০/৫০ হাজার সৈন্যকে অক্ষত অবস্থায় ফেরত আনা যাবে। সেই অবস্থায় ৪ লক্ষ সৈন্যকে ফেরত আনা একপ্রকার বিজয়ই বটে।

উচ্ছ্বসিত বৃটিশ গণমাধ্যম ও জনগণ ডানকার্ক থেকে ফিরে আসাকে উদযাপনের উপলক্ষ বানিয়েছিলো। কিন্তু চার্চিল জনগণকে হুঁশিয়ার করে দিলেন, “আরে! সৈন্য ফিরিয়ে এনে কোনো যুদ্ধে জেতা যায় না। আমাদেরকে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুুতি নিতে হবে।”

স্যার চার্চিল ছিলেন ইস্পাত দৃঢ় মনোবলের অধিকারী। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি জাদুকরী বক্তৃতার মাধ্যমে আহত জাতির মনে আশার সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হিটলারের সাথে কোনোরকম আপোষে যেতে রাজি ছিলেন না তিনি। হিটলারের সাথে যে কোনো রকম আলোচনাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

চার্চিল ব্রিটিশ জাতিকে বোঝাতে পেরেছিলেন, “বৃটিশ জাতি বারবার এরকম যুদ্ধ পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলো কিন্তু বীরত্ব আর মনোবলের কারণে বৃটিশ জাতিকে কেউ হারাতে পারেনি। নেপোলিয়ানও তো ছিলেন দিগ্বীজয়ী বীর। তাকে শেষমেষ পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে মরতে হয়েছিলো বৃটিশদের সাহসিকতার কারণেই।

আরে! পরশুদিনের নব্য ধনী জার্মানীর এই মাস্তানির উদ্ধত আচরণের জবাব ব্রিটিশজাতি দিবেই। শত শত বছর যাবত বিশ্বের বুকে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে ব্রিটেন। আর তাকে পরাজিত করতে চায় এই হিটলার?

হতেই পারে না! নেপোলিয়ান তো ছিলেন শিক্ষিত, সর্বকালের অন্যতম সেরা সমরকুশলী ও মেধাবী মানুষ। তাঁর মতো ব্যক্তি যেহেতু বৃটিশের কাছে পরাজিত হয়েছে তাহলে হিটলারের মতো একজন বদ্দ পাগল ও অর্ধশিক্ষিত লোককে এতো ভয় কিসের?

এরকম কথা বলে চার্চিল বৃটিশ জাতির মনোবল চাঙ্গা করেছিলেন। শুধু তাই নয়, ডানকার্ক বন্দর থেকে সৈন্য সরানোর পর চার্চিল জাতির উদ্দেশ্যে যে ভাষণ দিয়েছিলেন আহত জাতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য সে ছিলো এক মহৌষধ।

আমি এখানে চার্র্চিলের ভাষণের একটা অংশের উদ্ধৃতি দিচ্ছি। চার্চিল বলেছিলেন,

“[We] shall not flag or fail. We shall go on to the end, we shall fight in France, we shall fight on the seas and oceans, we shall fight with growing confidence and growing strength in the air, we shall defend our Island, whatever the cost may be, we shall fight on the beaches, we shall fight on the landing grounds, we shall fight in the fields and in the streets, we shall fight in the hills; we shall never surrender.”

যার বাংলা অনুবাদটা এরকম-“ব্যর্থ অথবা পিছপা হবো না আমরা। আমরা এর শেষ দেখে ছাড়বো, আমরা ফ্রান্সে যুদ্ধ করবো, আমরা সাগর-মহাসাগরে যুদ্ধ করবো, দৃপ্ত আত্মপ্রত্যয় ও জাগ্রত শক্তি নিয়ে আমরা আকাশে যুদ্ধ করবো, আমরা আমাদের দ্বীপপুঞ্জ রক্ষা করবো। যতো ত্যাগ তিতিক্ষাই সহ্য করতে হোক না কেন আমরা বিচে যুদ্ধ করবো, আমরা অবতরণ ভূমিতে যুদ্ধ করবো, আমরা পদাতিক বাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করবো এবং রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ করবো, আমরা পাহাড়ে পাহাড়ে যুদ্ধ করবো। আমরা কখনও আত্মসমর্পন করবো না।

চার্চিলের এই ভাষণ শুনে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠলো বৃটিশ জাতি। হিটলারের সাথে তোষামোদী করার কোনো প্রয়োজনই বোধ করলো না বৃটিশরা।

হিটলারের মহাবিজয়: ফ্রান্সের শোচনীয় পরাজয়

এদিকে ডানকার্ক বন্দর থেকে সেনা অপসারণের পর থেকেই ফ্রান্সের অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়লো। বড় একটা সেনাদল ব্রিটেনের মাটিতে। বাকীরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে ফ্রান্সের ভিতরেই। পুরো উত্তর সীমান্ত জার্মানরা দখল করে বসে আছে। সময় এখন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস দখল করার। সেনাবাহিনী পরিচালনা করার মনোবল নেই ফ্রান্সের।

১৪ জুন, ১৯৪০-

নাৎসী বাহিনীর স্বস্তিকাশোভিত পতাকা উড়তে থাকে প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায়। জার্মানীর অপমানের দলিল-ভার্সাই চুক্তির মূলকপি উদ্ধার করে হিটলারের কাছে পাঠানো হয়। ১০ লক্ষ ৫০ হাজার ফরাসি সৈন্য সেনানিবাস সমেত বন্দী হয় জার্মানীর কাছে।

ফ্রান্সের মতো এক মহাশত্রুকে পরাজিত করে জার্মানরা শুরু করে বুনো উল্লাস।

কিন্তু আসল খেলা তখনও বাকী। জুন মাসের ১৭ তারিখ নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ফিল্ড মার্শাল পেঁতা। পেঁতা ছিলেন প্রথম মহাযুদ্ধের বীর সেনানী। কিন্তু এবার তিনি হিটলারের সাথে সন্ধিস্থাপনে উৎসাহী। তিনি ঘোষণা করেন যে জার্মানীর কাছে আত্মসমর্পনের জন্য প্রস্তুুত তিনি।

এ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয় সেনাপতি চার্লস দ্য গলের সাথে। দ্য গল-আমৃত্যু জার্মানীর বিরুদ্ধে লড়াই করার পক্ষে মত দেন তিনি। পেঁতার কাছে সাহায্য না পেয়ে তিনি লন্ডন চলে যান।

ডানকার্ক উদ্ধার অপারেশন; Courtesy: ullstein bild via Getty Images

ফ্রান্সের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিশোধ নিলেন হিটলার:

সেই ক্যাম্পেগের বন! সেই ট্রেনের বগি!

মাত্র ২২ বছর আগের ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর যে ট্রেনের বগিতে বসে পরাজিত জার্মানীকে আত্মসমর্পনের শর্তগুলো শুনিয়েছিলেন ফ্রান্সের জেনারেল মার্শাল পেঁতা, সেই বগিতে বসেই এবার জার্মানীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হলো ফ্রান্সকে। হিটলারের জন্য এর চেয়ে মধুর প্রতিশোধ আর কি হতে পারে?

সেই বনের সেই ট্রেনের ঠিক সেই বগিতে বসে ১৯৪০ সালের ২১ জুন বিজয়ী হিটলার গাম্ভীর্যের সাথে পরাজিত ফ্রান্সের কর্মকর্তাদের নতুন সন্ধির শর্তগুলো শুনালেন।
স্বয়ং হিটলার উপস্থিত তার সব সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে। সেই ঐতিহাসিক ট্রেনের বগিখানা এতোদিন রক্ষিত ছিলো বিজয়ের প্রতীক হিসেবে ফ্রান্সের জাদুঘরে। হিটলারের আদেশে বগিখানা জাদুঘর থেকে নিয়ে আসা হয়েছিলো সেখানে।

ফ্রান্সের প্রতিনিধি পেঁতা উক্ত ঐতিহাসিক ট্রেনের নির্দিষ্ট কক্ষে প্রবেশ করেই হিটলারকে জানালেন অভিবাদন। হিটলার প্রত্যুত্তর করলেন না সে পর্যন্ত।

সন্ধিচুক্তির শর্তগুলো পড়া শেষ হতেই ব্যান্ডের বাজনার সাথে সাথে আরম্ভ হলো জার্মানীর জাতিয় সঙ্গীত। হিটলার নেমে পড়লেন বগি থেকে। ফরাসি কর্মকর্তারাও অনুসরণ করলেন তাকে। কিন্তু হিটলার পুরোপুরি উপেক্ষা করলেন তাদের। এক নজর তাকালেনও না পেছন ফিরে ফরাসি নেতাদের দিকে। পরাজয়ের বেদনা যে কতো মর্মান্তিক তা মর্মে মর্মে উপলব্দি করলেন ফরাসি প্রতিনিধিরা।

এদিকে ফ্রান্সের এই বেহাল দশায় হিটলারের বন্ধু ইতালির একনায়ক মুসোলিনীও ব্রিটেন-ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। যদিও বেশ কয়েকদিন আগের ঘটনা সেটা। ১৯৪০ সালের ১০ জুন হিটলারের সমর্থনে মুসোলিনী যুদ্ধে নামলেন।

ফ্রান্সের মহাবিপদ। শেষমেশ হিটলার মুসোলিনীকে ধমক দেন, কেন তিনি ফ্রান্স আক্রমণ করলেন। সব কাজ শেষ করার পর মুসোলিনী কেন বিজয়ের বখরা নিতে আসলেন। সেজন্য মুসোলিনীকে তীব্র ভাষায় গালিগালাজ করলেন হিটলার।

১৯৪০ সালের ২৫ জুন থেকে জার্মানি-ফ্রান্স-ইতালি এই তিন দেশের সমন্বয়ে একটা আপোষমুলক চুক্তি হয়। ফ্রান্সের মাটি আপাতত শান্ত হয়।

কিন্তু শান্ত হলে কি হবে, জার্মানীর কাছে এই পরাজয় ফ্রান্সের জন্য ছিলো খুবই লজ্জাজনক ঘটনা। জার্মানরা ফ্রান্সকে দুই ভাগে ভাগ করে। পাঁচভাগের তিন ভাগ ছিলো জার্মানদের দখলে, আর দুই ভাগ তাঁবেদার পেঁতার সরকারের অধীনে থাকে।

জার্মানরা ইচ্ছা করলেই পুরো ফ্রান্স দখল করতে পারতো। কিন্তু করেনি নিজের স্বার্থে। কারণ, ফ্রান্সের আছে বিরাট কলোনী। অনেক দেশকে লুটেপুটে খাচ্ছিলো বহু বছর ধরে। জার্মানরা ভাবলো, ফ্রান্সের ভিতরেই যেহেতু রাজাকার পাওয়া গেছে, কি দরকার পুরো ফ্রান্স দখল করে কলোনীগুলোকেও শত্রু বানাবার?

তাঁবেদার সরকারের কাজ ছিলো জার্মানদের সহায়তা করা, দেশের প্রশাসন চালানো ও বিশ্বব্যাপী জার্মানরা যে আগ্রাসন চালিয়েছিলো সে ব্যাপারে সহায়তা করা।

সে যাই হোক, ফ্রান্সের এই ঘোর দুর্দিনে লন্ডন থেকে নির্বাসিত সরকার চালাচ্ছিলেন চার্লস দ্য গল। তিনি ব্রিটেনের সাথে মিলে জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটাকেই একমাত্র ব্রত বলে ধরে নিলেন। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর দ্য গল হয়ে উঠেন ফ্রান্সের মহানায়ক। তাঁবেদার পেঁতার বিচার হয় ট্রাইব্যুনালে। সে কাহিনী যথাসময়ে বলবো।

কিন্তু হিটলার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিলেন না!

ফ্রান্স জয়ের পরেই হিটলার বিজয় অভিযান শেষ করতে পারতেন। তিনি ফ্রান্সের পরাজয়কে মূলধন করে ব্রিটেন এবং রাশিয়ার সঙ্গে করতেন একটা আপোষ রফা। ভালো ব্যবহার করতে পারতেন রাজ্যসমূহের সঙ্গে। তাহলে অবশ্যই জার্মানীর অপমানজনক পরাজয় তিনি এড়াতে পারতেন। সত্যিকর সমৃদ্ধশালী ও মর্যাদাবান দেশ হিসাবে গড়ে তুলতে পারতেন জার্মানীকে। আজ যে ধিকৃতি তিনি পাচ্ছেন, তার পরিবর্তে পেতেন নব জার্মানীর জনক হিসেবে সন্মান, সারা বিশ্বের শ্রদ্ধা। কিন্তু যা হবার নয়, তা হয় না। ইতিহাস বার বার ফিরে আসে একইভাবে, নিয়মমাফিক পথে। শিক্ষা দেয় বড় নিষ্ঠুরভাবে। কিন্তু সে শিক্ষা অবিবেচক, আত্মঅহংকারী, ক্ষমতালোভী ও অত্যাচারীদের কার্যক্রম পরিবর্তন করতে পারে না। তাই তাদের জীবনে শেষ পর্যন্ত নেমে আসে করুণ অথচ স্বাভাবিক পরিণতি। নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তারা পৃথিবীর বুক থেকে।

সময় থাকতে শিক্ষা গ্রহন করা ও আখের গুছিয়ে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ। পৃথিবীর আদিকাল থেকে মনীষীরা এই একই কথা বলে আসছেন যুগে যুগে। কিন্তু অতীতে যেমন সে খয়রাতি উপদেশ কর্ণপাত করেনি অহংকারী ডিক্টেটরগণ, হিটলারও করলেন না তেমনি। ক্ষমতার দম্ভে ভুলে গেলেন তিনি ইতিহাসের শিক্ষা ও মনীষীদের উপদেশ। তাইতো হিটলারের এই পরিণতি।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন অ্যাডভেঞ্চার প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আমিনুল ইসলামের “গল্পে গল্পে বিংশ শতাব্দী” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

Featured Image: Time

আপনার মন্তব্য লিখুন