Skip links

সংক্রামক রোগ ও মহামারীর ইতিহাস

অন্যধারা থেকে প্রকাশিত মো. আরিফ আদনান সালিম এর "মহামারীর ইতিহাস" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 31 মিনিট

সাধারণ মহামারী বনাম বৈশ্বিক মহামারী

বিভিন্ন ধরনের সংক্রামক রোগ সভ্যতার ইতিহাসকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। অনেক ক্ষেত্রে সভ্যতা ও সংস্কৃতির বাঁকবদলে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বিভিন্ন মহামারী। আদিকালে সেই এথেন্সের প্লেগ থেকে শুরু করে জাস্টিনিয়ানের যুগে এসেও তার তাণ্ডব কমেনি। অন্যদিকে স্প্যানিশ ফ্লু কিংবা ব্ল্যাক ডেথের কথা সবারই কম-বেশি জানা আছে। ইতিহাসের পাতায় এ বিষয়গুলো তুলনামূলক অনুচ্চারিত, তবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে সুবিদিত।

সভ্যতার সূচনাপর্ব থেকেই মানুষ নানা ধরনের মহামারীর সম্মুখীন হয়েছে। তবে প্রতিবার মহামারী শেষ হয়ে গেলে তার কারণ ও ক্ষতি থেকে শিক্ষা নেয়নি। পরে আবার যখন নতুন করে কোনো মহামারীর মুখোমুখি হয়েছে তখন আগের মহামারীগুলোর কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি ক্ষতির পরিমাণ নিয়েও চিন্তা করেছে। একারণে নানা ধরনের সতর্কতা সত্ত্বেও মানুষ মহামারীগুলোকে এড়াতে পারেনি।

বিশ্বের নানা দেশে এখন পর্যন্ত যে মহামারীগুলো হয়েছে তার মধ্যে প্রাণঘাতী কয়েকটি মহামারী রাজনৈতিক ও ভৌগেলিক সীমারেখা অতিক্রম করে ছড়িয়েছে নানা দেশে। বিস্তারের পরিধির উপর নির্ভর করেই এর নামকরণ হয়েছে। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গবেষকগণ প্রথম যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন তা হচ্ছে কোনটি সাধারণ মহামারী (Epidemic) আর কোনটির বিস্তৃতি বৈশ্বিক পরিসরে (Pandemic)।

সাধারণ মহামারী একটি দেশ কিংবা ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যেই অল্পকাল বিস্তৃতিতে শেষ হয়ে যায়। তবে বৈশ্বিক মহামারীর ভৌগোলিক সীমানা ও সময়গত বিস্তার থাকে অনেক বেশি। যেমন: ২০১৪ সালে আফ্রিকার নানা দেশে সার্স, মার্স, এবোলা যেভাবে ছড়িয়েছিল তাকে সাধারণ মহামারী তথা এপিডেমিক হিসেবে ধরা যায়। একইভাবে ২০১৯-২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে যে ভয়াবহ মহামারী নভেল করোনা ভাইরাস তথা কোভিড-১৯ ছড়িয়েছে সেটাকে বলা যায় প্যানডেমিক তথা বৈশ্বিক মহামারী।

একইভাবে ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জাতে যেভাবে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে সেটাকে বলা যেতে পারে প্যানডেমিক। এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে ইউরোপের ব্ল্যাক ডেথেরও। অনেক গবেষক এপিডেমিক এবং প্যান্ডেমিককে একই ধাঁচে ব্যাখ্যা করে থাকেন। তবে কেউ কেউ এটাকে আলাদা করার জন্য সহজ পথ বাতলে দিচ্ছেন। এপিডেমিক প্যানডেমিক হয়ে ওঠে নিচের বৈশিষ্ট্যগুলোর মাধ্যমে-

১. ভৌগোলিক পরিসরে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ব্যাপ্তি, বিশেষত পুরো বিশ্ব।
২. অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হবে।
৩. প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন কোনো ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়া এই রোগ ছড়ায়।
৪. মানুষ এই রোগ থেকে নিজেকে রক্ষার ব্যাপারে খুব কম ধারণা রাখে।
৫. অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
৬. সমাজ কাঠামোতে ভাঙন ধরে, ক্ষতি হয় অর্থনীতির।

মহামারীর সংজ্ঞায়ন নিয়ে বিতর্ক

এপিডেমিক এবং প্যানডেমিক মূলত একধরনের ঘটনা। এটা বিভিন্ন ঘটনার মতো একবার আসে এবং চলে যায়। যদি তা-ই হয় তবে যক্ষ্মা কিংবা এইডসের সংক্রমণকে কী বলা হবে? এগুলোকে চিহ্নিত করা হচ্ছে এন্ডেমিক হিসেবে। একবার সংক্রামক ব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর আর যাওয়ার কোনো নাম নেই ।

সেই রোগগুলোকে চিহ্নিত করা হয় এন্ডেমিক হিসেবে। আর মশার কামড়ে ফি বছর হাজার হাজার মানুষ ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হয়ে যে মারা যাচ্ছে তার কি হবে? এক্ষেত্রে প্যানডেমিকের প্রচলিত সংজ্ঞার মধ্যে না পড়েও লাখো মানুষের প্রাণ যাচ্ছে এই রোগগুলোতে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে এগুলোর সংজ্ঞায়নের চেষ্টা চলছে।

২০০৯ সালের দিকে বেশ বিতর্ক উঠেছিল ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে। অনেক গবেষক একে মহামারী হিসেবে স্বীকার করতে নারাজ, তবে কেউ কেউ মনে করেন এটি এক প্রাণঘাতী মহামারী। এক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে আরও অনেক ‘সংস্থা-প্রদত্ত’ মতামতের মধ্যেও নানা পার্থক্য দৃশ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিভিন্ন অ্যালার্জির সংক্রমণ থেকেও অগণিত মানুষের মৃত্যু হয়। নির্দিষ্ট দেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে এই মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটে বলে বাস্তবতা আড়ালেই রয়ে যায়।

বিশ্বের অন্য দেশের কথা বাদ দিলে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় মানুষের ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কথা বলা যেতে পারে। প্রতিবছর বাংলাদেশের অগণিত মানুষ মারা গেলেও এই ডেঙ্গু জ্বরকে মহামারী হিসেবে চিহ্নিত করতে দেখা যায় না। এই বিষয়গুলো সামনে রেখে কেউ কেউ আলাদা আটটি মানদণ্ড নির্ধারণ করেন মহামারীর জন্য। সেসবের মধ্যে রয়েছে- বিস্তৃত ভৌগোলিক পরিসর (Wide geographic extension), রোগ সঞ্চালন (Disease movement), আক্রান্তের উচ্চহার এবং ভয়াবহতা (High attack rates and explosiveness), খুব অল্প সংখ্যক মানুষের প্রতিরোধ সক্ষমতা (Minimal population immunity), নভেল করোনা ভাইরাস সংক্রমণের মতো নতুনত্ব (Novelty), সংক্রমণের ক্ষমতা (Infectiousness), সংক্রমণ প্রবণতা (Contagiousness) এবং নির্মমতা (Severity)।

রোগের ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যায় যক্ষ্মা, এইচআইভি এইডস এবং ম্যালেরিয়ার সংক্রমণে প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছেন। তবে বারংবার ভাইরাস প্রোফাইল বদল ঘটালেও সংক্রমণের হিসেবে এটা নতুন কিছু নয়। এই রোগ কোনো এলাকায় ভয়াবহ রূপ ধারণ করলেও অন্য এলাকা তার থেকে মুক্ত থাকে। ফলে তাদের ছড়িয়ে পড়াকে ক্ষেত্র বিশেষে নতুন মনে হতে পারে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে যাচাই করতে গেলে এগুলোকে রোগ হিসেবে নতুনই বলা যায়। ১৯৫০ সালের দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সবচেয়ে বড় উদ্যোগগুলো নিতে দেখা যায় ম্যালেরিয়া দূরীকরণে। এরপর ১৯৭০ কিংবা ১৯৮০ সালে একই ম্যালেরিয়া নতুনভাবে বিশ্বের নানা দেশকে গ্রাস করে। তখন নানা দেশে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাংকের অধীনে কর্মরত গবেষকরা ম্যালেরিয়া প্রসঙ্গে বিচিত্র অভিমত ব্যক্ত করেন।

তাদের হিসেবে এই ভাইরাস বারংবার নতুনভাবে ফিরে আসছে। তবে তার শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্যগুলো আগের মতোই থেকে যাচ্ছে। ম্যালেরিয়ার মতো এইচআইভি এইডস বিশ্বের নানা দেশে ভয়াবহভাবে ছড়িয়েছে। স্থানিক ভিন্নতায় এ রোগটিকে অনেকেই ভয় পেয়ে থাকেন। তবে নতুন প্রজাতির ভাইরাস শনাক্ত করা হয়নি অযুহাতে একে মহামারী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে একরকম কার্পণ্য দেখা যায়।

এপিডেমিক ও প্যানডেমিকের ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয়কে পরস্পর সম্পর্কিত মনে করা হয়। শুরুতে একটি রোগের প্রাদুর্ভাব যেমন থাকে, সময়ের আবর্তে; সেখানে অনেক পরিবর্তন দৃষ্টিগোচর হয়। বিশেষত, ১৯ শতকে এসে ওষুধ শিল্পে একটি বিপ্লব ঘটে গেছে।

বিভিন্ন প্রতিষেধক, এন্টিবায়োটিক ভ্যাক্সিন আবিষ্কার মানুষকে অনেকটা নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ করে দিয়েছিল। সর্বশেষ চীনের উহান থেকে কোভিড-১৯ তথা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের আগে পর্যন্ত পুরো বিশ্বের মানুষ যাই হোক অন্তত মহামারী থেকে নিরাপদ ছিল।

অনেকে দাবি করছেন, করোনা ভাইরাস আর কিছুই না, এটা এক ধরনের ভয়ানক জীবাণু অস্ত্র যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য প্রয়োগ করা হয়েছে। তাদের ভাষ্যে চীন এই ভাইরাস বিশ্বজুড়ে ছড়িয়েছে অর্থ-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একক আধিপত্য বিস্তারের জন্য। এর বিপরীতে চীন তাদের উপর আনীত অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে।

এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বের নানা দেশ যেখানে ধুঁকছে, সেখানে প্রথম থেকে নিয়ম মেনে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনাম অনেকটাই সফল। অন্য দেশ যেখানে সারি সারি লাশ গণনায় ক্লান্ত, তার বিপরীতে অস্টেলিয়াকে অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত থাকতে দেখা গিয়েছে। ভেষজ ওষুধের সুখ্যাতি রয়েছে শ্রীলঙ্কার। তারাও শুরু থেকে সতর্ক অবস্থানে থেকে প্রায় প্রতিরোধ করে ফেলেছে করোনার সংক্রমণকে।

বিভিন্ন সময়ে যে মহামারীর প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা গিয়েছে তার সঙ্গে বর্তমান করোনা বিস্তারের অনেক মিল রয়েছে। এজন্য প্রাসঙ্গিক আলোচনার অংশ হিসেবে উপরোক্ত ঘটনা বর্ণনার প্রয়োজন রয়েছে।

এপিডেমিক, এন্ডেমিক ও প্যান্ডেমিকের মধ্যে পার্থক্য: মহামারীর ইতিহাস

Image Course: Shutter Stock

মহামারী প্রতিকারে ভ্যাকসিন এবং অন্যান্য ব্যবস্থা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন অ্যানথ্রাক্স এবং জলাতঙ্ক নিয়ে ক্লান্ত তখন ফ্রান্সের লুই পাস্তুর (Louis Pasteur) এর প্রতিরোধে পুরোপুরি সফল হন। তাঁর আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনের কারণে অগণিত গরু, ছাগল, ভেড়াসহ রক্ষা পায় ডেইরি ও পোল্ট্রি শিল্প। তার এ আবিষ্কারের পথ ধরে সফলতার দেখা পান জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট কখ (Robert Koch)।

তিনি বিভিন্ন রোগের পেছনে বিদ্যমান ব্যাকটেরিয়া চিহ্নিত করে এ থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দিয়েছিলেন। তার আবিষ্কারের ফলে যক্ষ্মার মতো সংক্রামক রোগ থেকে মুক্তি পায় বিশ্বের মানুষ। রবার্ট কখের আবিষ্কারের পর একটা পর্যায়ে সংক্রমণের পরিমাণ কমে যায়। তারপর উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে সক্ষম দেশগুলোতে যা-ই হোক অন্তত কুষ্ঠোর মতো রোগ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।

মহামারী সৃষ্টির পেছনে বিদ্যমান কারণ শনাক্ত করার অভাবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা গণহারে মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। পরবর্তীকালে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া এই ধরনের সংক্রামক রোগের পেছনে দায়ী বলে শনাক্ত করা হয়। রোগের কারণ সম্পর্কে উপযুক্ত ধারণা লাভের পর তা থেকে উত্তরণের পথ খোঁজেন চিকিৎসকরা।

প্লেগ, যক্ষ্মা ও ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের পেছনে বিদ্যমান জীবাণুগুলোকে আলাদাভাবে শনাক্ত করার পর গবেষকরা চেষ্টা করেছিলেন এগুলোর উপযুক্ত প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য। রোগ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীদের মনে তা প্রতিকারের বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়। তারা এই ধারণা সামনে রেখে প্রায় প্রতিটি মহামারীর টিকা ও ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছেন। ধীরে ধীরে জৈব প্রযুক্তি ও জীন প্রকৌশল বিদ্যার উৎকর্ষ মানুষকে উন্নত জীবনের পথ দেখায়।

ল্যাবরেটরিতে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণা মানুষের আত্মবিশ্বাস বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। একটা সময় তারা বিশ্বাস করতে শেখে যে তাদের পক্ষে যেকোনো ধরনের ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভব। পরবর্তীকালে ক্ষতিকর বিভিন্ন জীবাণুর বিরুদ্ধে একে একে জয়ী হয় তারা। বায়োমেডিসিনের উপর নির্ভরশীলতাই মূলত মানুষকে এ সফলতার পথ দেখিয়েছে বলে বোদ্ধাদের ধারণা।

১৭২০ সালের প্লেগ মহামারীর কথা স্মরণে নেয়া যায়। এখানে নানা সমস্যার মধ্যে দারিদ্র্য মূল ভূমিকা রেখেছে। দারিদ্র্যের কারণে মানুষের পক্ষে আক্রান্তদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা সম্ভব হয়নি। তারা জীবন বাঁচানোর তাগিদে রোগ ও রোগীর সঙ্গে বাস করেছে। ফলাফল হিসেবে মহামারী একবার বিস্তার ঘটার পর তার সংক্রমণে বিস্ফোরণ লক্ষ করা যায়।

দারিদ্র্যের সঙ্গে অর্থাভাব যেমন সম্পর্কিত, তেমনি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্ষুধা। অপুষ্টি থেকে নানা রোগব্যাধির সৃষ্টি হয় যা মানুষকে একটা পর্যায়ে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়। এ ধরনের রোগব্যাধির শিকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিম্ন আয়ের মানুষ। অন্যদিকে বেশিরভাগ মহামারী আবার বিশেষ আঞ্চলিক পরিসরে বিস্তার ঘটে।

এথেন্সের প্লেগ থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে জাস্টিনিয়ান প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু কিংবা ব্ল্যাক ডেথের মতো মহামারী যেসব এলাকাকে আক্রান্ত করেছিল সবচেয়ে বেশি, সম্প্রতি করোনা সংক্রমণের পর ঐ অঞ্চলগুলোতেই এর ব্যাপ্তি সবচেয়ে বেশি। উদাহরণ হিসেবে ইউরোপের নানা দেশ, বিশেষত, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালির কথা বলা যায়। এই দেশগুলো করোনা সংক্রমণে একেবারে নুয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে পরাশক্তি জার্মানরা কলেরা থেকে শুরু করে প্লেগ প্রতিক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধে যেমন সফল ও সক্রিয় ছিল, এবারের করোনা সংক্রমণের পরেও তারা তাদের সক্ষমতা জানান দিয়েছে নতুন করে। লাখে লাখে মানুষের রোগ পরীক্ষার পাশাপাশি শনাক্ত রোগীদের অন্যদের থেকে আলাদা করে তারা করোনা সংক্রমণ থেকে অনেকটাই রক্ষা করতে পেরেছে জার্মানিকে।

করোনা সংক্রমণে অনেকটাই ধুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র। হিসেব করলে দেখা যাবে ঐতিহাসিকভাবে মহামারী মোকাবেলায় তাদের সক্ষমতা ছিল নিতান্ত কম। কলেরা থেকে মুক্তির শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও সেখানকার জনমনে কলেরা নিয়ে ভয় ও অস্বস্তি কাজ করে। আধুনিক ওষুধ ব্যবহারে রোগমুক্তি ঘটলেও উপযুক্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলা সমাজের মানুষ বারংবার নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে বিজ্ঞানকে প্রকৃতির কাছে অসহায় করে তুলছে।

অনেক উন্নত দেশে এইচআইভি এইডসের যে সংক্রমণ তার সঙ্গে বিজ্ঞানের উৎকর্ষকে মেলানো কঠিন। অনিয়ন্ত্রিত যৌনাচার তথা যৌন জীবনের যথেচ্ছাচার থেকে এই রোগ বিস্তার ঘটেছে বেশিরভাগ উন্নত অর্থনীতির দেশে। সেসব দেশে মানুষ অর্থাভাবে না খেয়ে মরছে না। কিন্তু অর্থের কু-প্রভাবে তারা ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনের পাশাপাশি যৌনতার ক্ষেত্রে যথেচ্ছাচারে লিপ্ত হয়ে সর্বনাশ ডেকে এনেছে নিজেদের। এর বিপরীতে আফ্রিকার নানা দেশের ভঙ্গুর সমাজেও একইভাবে এইচআইভি এইডসের বিস্তার লক্ষ করা গিয়েছে।

মহামারী নিয়ে আতঙ্ক এবং সন্দেহ

মানুষের অভিবাসন ও স্থানান্তরের মতো সময়ের পরিক্রমায় সংক্রামক রোগের স্থানান্তরও চোখে পড়ার মতো। ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে দেখা যায়, একটি বিশেষ রোগ তার হটস্পট থেকে সরে গেলেও বিশ্ব থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে বিশেষ স্থান থেকে সরে গিয়ে একই রোগ বিশ্বের অন্য দেশে আরও ভয়াবহ আঙ্গিকে ফিরে এসেছে। যেমন, একটা সময় ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষের মৃত্যুর কারণ ছিল যক্ষ্মা।

রবার্ট লুই স্টিভেনসনের মতো নন্দিত অনেক লেখক কলেরা এবং যক্ষ্মায় মারা গিয়েছেন। এন্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পর ইউরোপের নানা দেশ থেকে এই রোগগুলো নিমূল হয়ে গেলেও তার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায় এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকার নানা দুর্বল অর্থনীতির দেশে। অনেকে রোগের এই বিস্তারের পেছনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অদৃশ্য হাত রয়েছে বলে মনে করেন। কেউ কেউ আবার এটাকে নিছক ওষুধ ও ভ্যাক্সিন বিক্রেতা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ঘৃণ্য বাণিজ্যিক স্বার্থসিদ্ধির উপায় বলে মনে করেন।

ভ্যাক্সিন ও টিকাকেন্দ্রিক যে ঘৃণ্য রাজনীতি কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে সেগুলোকে অস্বীকারের সুযোগ নেই। তবে তার অর্থ এই নয় যে মহামারী থেকে মুক্তির জন্য ওষুধের ব্যবহার এবং মেডিক্যাল রিসার্চের কোনো প্রয়োজন নাই। যেমন, ১৯৬০ সালের দিকে উদ্ভাবিত ‘ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি (Oral rehydration therapy))’ কিছু দেশের কলেরা আক্রান্ত মানুষের জন্য জীবন রক্ষার পাথেয় হয়েছিল।

কিন্তু বিশ্বের কোটি মানুষ যে পানি পান করে সেখানে গিয়ে মিশছে মানুষের পায়খানা। এর থেকে নতুন করে লাখো মানুষ আবার আক্রান্ত হলে তাদের চিকিৎসা করার আগেই মৃত্যুমুখে ঢলে পড়তে দেখা যাচ্ছে। এই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে বলা যায় শুধু ওষুধ ও আবিষ্কার নয়, রোগ প্রতিরোধ করতে গেলে সামজিক অবস্থান থেকে সাড়াদানও সমান জরুরি। উদাহরণ হিসেবে বিশ্বের নানা দেশে ম্যালেরিয়া প্রাদুর্ভাবের প্রারম্ভিক কারণগুলোর বৈপরিত্যের কথা বলা যেতে পারে। কারণ মানুষের জীবন ধারণের সঙ্গে এই সামাজিক অবস্থান অনেকাংশে সম্পর্কিত।

হঠাৎ কোনো এলাকার মহামারী ছড়ালে মানুষের মনে যে আতঙ্ক ও ভয় দেখা যায়, তার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয়না অনেকের জন্য। ‘বনের বাঘের হাত থেকে রেহাই পেলেও কেউ কেউ প্রাণ দিয়ে বসেন মনের বাঘের কাছে’। এইচআইভি এইডস সামাজিক ক্ষেত্রে বিশেষ যন্ত্রণার সৃষ্টি করেছিল। আমেরিকার নানা স্থানে এইডস ছড়িয়ে পড়ার পর ঐ অঞ্চলের মানুষকে নানা স্থানে সামজিকভাবে হেয় হতে হয়েছে। অনেক অঞ্চলের মানুষকে এই সময় বলির পাঁঠা বানো হয়েছে।

প্লেগের সময় ইহুদিদের বিরুদ্ধে অনেক ধরনের প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছিল। কেউ কেউ দাবি করেছে, এরা পানিতে বিষ ঢেলে দিয়ে এই রোগ ছড়িয়েছে। প্লেগ সৃষ্টি ও বিস্তারের জন্য অনেক স্থানে ইহুদিদের হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পরেও এই প্রবণতা বাদ যায়নি। দিল্লীতে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের তবলীগ জামায়াতের মানুষকে এই রোগ ছড়ানোর পেছনে দায়ী করে হিংসা ও প্রচারণা চলেছে সমান তালে।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন অন্যধারা থেকে প্রকাশিত মো: আদনান আরিফ সালিম এর “মহামারীর ইতিহাস” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা বুকশেয়ারের এই লিঙ্কে
সালিম অর্ণব এর মহামারীর ইতিহাস বইয়ের প্রচ্ছদ

মহামারীর উপর ঔপনিবেশিকতার প্রভাব

মহামারী ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা যাচাই করে নেয়া উচিত। বিশেষত, কারা কীভাবে রোগাক্রান্ত হচ্ছে সেটা খুঁজে দেখা জরুরি। ইউরোপ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে পালে পালে বণিকরা রওনা দেয় এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা ও লাতিন আমেরিকার নানা দেশে। তারা সেখানে গিয়ে উপনিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে লুণ্ঠন শুরু করে।

নিজ দেশে নানা ধরনের অশান্তি ও যুদ্ধবিগ্রহের বাইরে মহামারী থেকে মুক্ত থাকার জন্য অনেকেই এসব দেশের উপনিবেশকে বেছে নিয়েছিল। তারা মনে করতো, পুরাতন বিশ্বের দেশগুলোর জন্য নতুন বিশ্বের দেশে কোনো রকম মহামারী নেই। বিশেষত, কলেরা এবং গুঁটিবসন্তের মতো প্রাণঘাতী রোগ সেসব উপনিবেশে ছিল না বললেই চলে।

শিল্পায়নের ছোঁয়া নেই, পাশাপাশি বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিশুদ্ধ জীবনযাপনের কারণে ঐসব এলাকার মানুষ রোগমুক্ত ছিল। ধীরে ধীরে উপনিবেশের প্রভাবে তাদের জীবন আকস্মিক বদলে যায়। একইসঙ্গে ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় তাদের সঙ্গে যে দ্বৈরথ, সেখানে বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে হাজির হয় নানা মহামারীও। এক্ষেত্রে রোগের প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে এর বাহকেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

বিশ শতকের প্রথম দশকগুলোকে আফ্রিকার নানা দেশ যক্ষ্মার বিষয়ে একেবারেই অজ্ঞ ছিল। বলতে গেলে তাদের ওখানে কারও যক্ষ্মায় মৃত্যু ঘটেছে এমন খবর তেমন একটা পাওয়া যায় না। তারপরেও উপনিবেশবাদী ইউরোপীয়রা বর্ণবাদের বিষ ছড়াতে থাকে যক্ষ্মা নিয়ে।

তারা প্রচার করে, কালো চামড়ার আফ্রিকানদের মধ্যে এই মরণব্যাধি আছে। শুধুমাত্র সাদা চামড়ার লোকেরাই ঐ রোগ থেকে মুক্ত। তবে ইউরোপের ঘৃণ্য দাস ব্যবসায়ীরা জানতো, ম্যালেরিয়া হলে তাদের তুলনায় আফ্রিকার কালো চামড়ার মানুষেরা অনেক বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে রোগের বিরুদ্ধে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাদা চামড়ার মানুষের তুলনায় অর্ধেকের বেশি কালো চামড়ার মানুষকে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত হয়েও বেঁচে থাকতে দেখা যায়।

এদিকে গবেষণায় দেখা যায় চার ধরনের প্যারাসাইট মানুষের ম্যালেরিয়া সৃষ্টির জন্য দায়ী। (Four kinds of malaria parasites infect humans: Plasmodium falciparum, P. vivax, P. ovale, and P. malariae.) প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপ্যারাম, ভাইভ্যাক্স, ওভালি এবং ম্যালেরি এই চার জাতের জীবাণুকে শনাক্ত করা হয় ম্যালেরিয়া সংক্রমণের জন্য। এই চার ধরনের জীবাণুর সংক্রমণের বিরুদ্ধে যেকোনো ইউরোপের মানুষের তুলনায় আফ্রিকার মানুষের প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হওয়া সত্ত্বেও তারা বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হতে থাকে। তারা আবিষ্কারের পরেও প্রচার করতে থাকে যে দূষিত বাতাস থেকে ম্যালেরিয়া ছড়ায়, আর এই বাতাস বহন করে আনছে কালো চামড়ার আফ্রিকান মানুষ। এই অপপ্রচারের পাশাপাশি কঠিন শাস্তিও পেতে হয়েছে অনেক কালো চামড়ার মানুষকে।

বিজ্ঞানের নানা আবিষ্কারের বিপরীতে মানব সভ্যতায় নানা উন্নয়ন ঘটলে মনোজাগতিক ক্ষেত্রে সে রকম দৈন্য এখনও কাটেনি। তাই বিশ্বের অনেক উন্নত অর্থনীতির দেশে এখনও সাধারণ মানুষ প্লেগকে স্রষ্টার দেয়া গজব তথা পাপের শাস্তি হিসেবে মনে করা হয়। গুঁটিবসন্ত কিংবা কলেরার ক্ষেত্রেও মানুষের ধারণা অনেকটা তেমন। যেমন, ১৯৯০ সালে ভারতে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর হিন্দু-মুসলিম পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়েছিল।

তারা পরস্পরকে রোগ সংক্রমণের জন্য দায়ী এবং পাপী হিসেবে প্রচার করছিল। মাদাগাস্কার অঞ্চলে এখনও নিয়মিত প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখে প্রমাণ করা যায় এসব রোগ এখনও পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়নি, কিন্তু সময়ের সঙ্গে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে অভিবাসিত হয়েছে।

আাধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মহামারীর বিস্তার

আধুনিক রাষ্ট্রের বিকাশের সঙ্গে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ও মহামারী বিস্তারের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। সম্প্রতি করোনা সংক্রমণে নুয়ে পড়া ইতালির অতীত অনেক মহামারীর চিহ্ন বহন করছে।

এই ধরনের নানা রোগ থেকে নাগরিকদের নিরাপদে রাখতে ১৫ শতকের দিকে ইতালির সিটি স্টেট ‘বোর্ড অব হেলথ’ গঠন করেছিল। তারা প্লেগের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার উদ্দেশ্যেই এই বোর্ড গঠন করে বলে অনেকের অনুমান। এরপর উনিশ শতকে কলেরা ছড়িয়ে পড়ার পরেও একইভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে তা প্রতিরোধের উদ্যোগ নেয়া হয়।

আক্রান্ত মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সবার জন্য টিকা ও ভ্যাক্সিন নিশ্চিত করা হয়। রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পর্যন্ত পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মৃত্যু তাদের এ পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করে থাকতে পারে।

ঘনবসতির পাশাপাশি জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত বাদে এর প্রাদুর্ভাব অতটা প্রকট হতে পারে না। ফলে কোনো সংক্রামক রোগ মহামারীতে রূপ নিতে গেলে ঐ অঞ্চলে ঘনবসতি ও প্রচুর জনসংখ্যার পাশাপশি বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত থাকা লাগে।

যেমন, সম্প্রতি ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণ দিয়ে এটার সহজ ব্যাখ্যা দেয়া যায়। চীনের উহান থেকে অন্য প্রদেশে যে যাতায়াত তার মাধ্যমেই করোনাভাইরাস পুরো চীনকে আক্রান্ত করেছে। এরপর বিশ্বের নানা দেশের সঙ্গে চীনের যে যোগাযোগ তার মাধ্যমে এই সংক্রামক রোগ রূপ নিয়েছে বৈশ্বিক মহামারীতে।

ইউরোপের নানা দেশ, যেমন ইতালি, স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে গিয়ে এর ভয়াবহতা আঁচ করা গেছে চূড়ান্তভাবে। একইদিক থেকে দেখলে যুক্তরাষ্ট্রকে সংক্রমিত করার পর এই রোগের ভয়াবহতা সব সীমানা অতিক্রম করেছে। এক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে ঐসব দেশের যোগাযোগ না থাকলে এই রোগ কোনোভাবেই সেখানে গিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ হরণ করতে পারতো না।

মানুষের স্থায়ী আবাসন তৈরির পর সভ্যতার ইতিহাসে যখন তারা প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক বাণিজ্য শুরু করেছিল, তখন থেকেই এই ধরনের রোগের বিস্তার। এক দেশের মানুষ বাণিজ্যিক কারণে অন্যদেশে গিয়েছে। তখন তাদের বাণিজ্যিক উপকরণের পাশাপাশি রোগের জীবাণু ও সংক্রমণও স্থানান্তরিত হয়েছে।

সংক্রামক রোগের টিকে থাকার জন্য বাহকের প্রয়োজন হয় যেখানে একজন মানুষ থেকে অন্যজনের শরীরে সংক্রমণের মাধ্যমে তা টিকে থাকে। কিন্তু একজন সংক্রমিত মানুষ যদি আরেকজন সুস্থ মানুষের সংস্পর্শে না আসেন, তবে সেখানেই এর কার্যক্রম সীমিত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে রোগাক্রান্ত ব্যক্তি যদি মারা যান কিংবা তার শরীরে প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি হয় দুইভাবেই রোগের নির্মূল ঘটতে পারে।

যেমন, গুঁটি বসন্ত এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা বিশ্বের নানা দেশের মানুষের জন্য এখনও ভয়াবহ মরণব্যাধি। তাদের শরীরে এই রোগ প্রতিরোধের উপযুক্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না। এমনকি উপযুক্ত টিকা ও ভ্যাক্সিন দেয়ার পরেও সেখানে এই দুটি রোগের তা-বলীলা কমেনি। একইভাবে ১৪ শতকের দিকে বিশ্বের নানা দেশের যোগাযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে প্লেগ বিস্তারের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।

অন্যদিকে ১৮ শতকের শিল্পায়নের যুগে ইউরোপের জনবহুল শহরগুলো হয়ে ওঠে যক্ষ্মা ছড়িয়ে পড়ার প্রাণকেন্দ্র। বিশ্বের নানা দেশে এইডস ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে এক দেশ থেকে অন্যদেশে মানুষের যাতায়াতকে দায়ী করা হয়। আরেকদফা ইতিহাসের পাতা পেছন দিক থেকে উল্টালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ের কথা স্মরণ করতে হয়। তখন বিশ্বের নানা দেশে মানুষের যাতায়াত বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ১৯১৮ সাল থেকে ছড়িয়ে পড়া ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারীর বৈশ্বিক সংক্রমণ।

বিশ্বের নানা দেশে মহামারী ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ যার মাধ্যমে এক অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলে গমন করে। এবার মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই সেটা নিয়ে লিখেছেন, মানুষকে সতর্ক করেছেন। তারপরেও মানুষ এগুলো থেকে সতর্ক না হয়ে বারংবার অনেকটা একইভাবে মহামারী ছড়িয়ে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের প্রাণহরণের স্বাক্ষী হয়েছে। মহামারীর প্রত্যক্ষদর্শী, রবার্ট লুই স্টিভেনসন কিংবা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতো সাহিত্যিক, কবি, স্মৃতি লেখক, রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তি, আমলা, সাংবাদিক, ইতিহাস গবেষক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃবিজ্ঞানী রোগতত্ত্ববিদ মহামারী বিষয়ে তাদের বিশ্লেষণ লিখে মানুষকে সতর্ক করেছেন।

তারা মহামারীর প্রাদুর্ভাব থেকে এর বিস্তৃতির নানা কারণ নথিভুক্ত করলেও সেগুলো থেকে মানুষ শিক্ষা নেয়নি। এমনকি অনেক ধর্ম প্রচারক মহামারীর ব্যাপারে তার অনুসারীদের সতর্ক করেছেন। তারপরেও মানুষ নিয়ম না মেনে মানব সভ্যতার জন্য একের পর এক বিপদ ডেকে এনেছে।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিশ্বের নানা দেশের মানুষকে তাদের জৈবিক দারিদ্র্যরেখার উপরে টেনে তুলেছে। তারপরেও বিশ্বের নানা স্থানের দুর্ভিক্ষ পীড়িত নিতান্ত কম নয়।

মহামারী রোগের ভাইরাস যেভাবে সংক্রমিত হয়

Image Course: dw.com

মহামারী বিস্তারের রাজনৈতিক কারণ

গভীর পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই দুর্ভিক্ষ ও অনাহারের ঘটনা যতটা না প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘটে, তার থেকে ঢের দায়ী স্বার্থান্বেষী মহলের অপচেষ্টা। সংক্রামক রোগ থেকে সময়ের আবর্তে বৈশ্বিক মহামারী সৃষ্টির পেছনেও অনেক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দায়ী। একজন মানুষ যেমন তার চাকরি হারালেই না খেয়ে মরে যায় না, তেমনি একটি স্থানে কোনো সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে তা রাতারাতি কোনো কারণ ছাড়া মহামারীতে রূপ নেয় না।

একজন চাকরিচ্যুত মানুষ তার বাঁচার অবলম্বন হিসেবে বিভিন্ন ধরনের লাইফ ইন্সুরেন্স, স্কিম ও বীমা থেকে সাহায্য নিতে পারেন। কিন্তু সমন্বিতভাবে একটি দেশের প্রেক্ষিতে চিন্তা করতে গেলে পুরো পরিস্থিতিই বিপরীত। আমরা আফ্রিকার প্রেক্ষাপট থেকে বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। যে দেশে মূল্যবান ধাতুর খনির সংখ্যা বেশি, সেখানেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা প্রায় সমানুপাতিক হারে বিরাজমান।

অপেক্ষাকৃত অনুর্বর কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদের ভরপুর এসব দেশের মানুষের যা-ই হোক অন্তত অনাহারে মরার কোনো কারণ নেই। তারপরেও তারা দিনের পর দিন না খেয়ে থাকে। প্রয়োজনীয় অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের জন্য তাদের কাছেই হাত পাতে যারা আদতে ঐ দেশটি থেকে মূল্যবান সম্পদ যুগের পর যুগ ধরে লুটে নিচ্ছে। এসব দেশে একবার খরা কিংবা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে তার থেকেও ফয়দা নেয়ার চেষ্টা করে ব্যবসায়ীরা। তাদের সামান্য চেষ্টাতেই খাদ্যাভাব প্রকট আকার ধারণ করে, বাজার থেকে গায়েব হয়ে যায় ওষুধ কিংবা প্রায় সব নিত্য প্রয়োজনীয় উপকরণ।

তারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা খুঁজতে গিয়ে বিপন্ন করে তোলে লাখো মানুষের জীবন। তাদের স্বার্থসিদ্ধির বলি হতে হয় অগণিত নিষ্পাপ নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ ও শিশুকে।

ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ কীভাবে একটি জাতিকে বিপন্ন করে তোলে উপযুক্ত উদাহরণ হতে পারে যুদ্ধরত বিভিন্ন দেশ, ভূমিকম্প কিংবা সুনামি আক্রান্ত এলাকা কিংবা ঝড়ের কবলে পড়া জনপদ। সেখানে প্রাকৃতিক কিংবা মানবসৃষ্ট কারণে যে দুর্যোগ তার থেকে উত্তরণ ঘটাতে বিশ্ববাসীর ত্রাণ তৎপরতা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়। এতে করে কিছু মানুষ প্রাণে বেঁচে গেলেও ক্ষুধা আর অনাহার হয়ে ওঠে বেশিরভাগ মানুষের নিত্যসঙ্গী। এই ক্ষুধা আর অনাহারের কারণ দায়িত্বে থাকা কিছু মানুষের সীমাহীন ক্ষুধা আর দখলদার মনোভাব। এরা সবকিছুই লুটতরাজের মাধ্যমে নিজের করে নিতে চায়।

আফ্রিকার একটি দেশে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা দেখে অনেক দেশের শিশুরা তাদের টিফিনের খরচ থেকে অর্থ বাঁচিয়ে ত্রাণ পাঠায়। আর সেই ত্রাণ মেরে দিতে দেখা যায় সেখানকার কোনো রাজনৈতিক নেতা কিংবা পাতিনেতাকে। ভয়াবহ শীতের তাণ্ডব থেকে অসহায় শিশুদের বাঁচাতে যে কম্বল বিশ্ববাসী বিপন্ন দেশগুলোতে পাঠায়, একটা সময় সেগুলো গিয়ে শোভা পায় ঐসব দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বসার ঘরের কার্পেট হিসেবে। অনেকে গোশালা কিংবা আস্তাবলে পশুকে রাখার স্থানেও ঐ কম্বল বিছিয়ে রাখার ধৃষ্টতা দেখায়।

তাই দুর্যোগে না হোক, তার থেকে সুযোগ নিতে চেষ্টাকারীদের অপতৎপরতার বলি হয়ে প্রাণ দিতে হয় অনেক অসহায়কে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো যেকোনো সংক্রামক রোগ ও মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পরেও বাস্তবতাও অভিন্ন। মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর কাউকে যেমন প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টায় লিপ্ত থাকতে দেখা যায়, কেউ কেউ মানুষের এই দুর্বলতাকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে নিতে চায়।

রোগ বিস্তারের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির শঙ্কা যেমন প্রকট হয়, কেউ কেউ এর আড়ালে ওষুধ, টিকা ও ভ্যাক্সিনের বাণিজ্য বিস্তারের সম্ভাবনা খুঁজে ফেরে। তাদের এ কর্মভূমিকা মহামারী আক্রান্ত জনপদে প্রতিটি মানুষের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘাঁ হয়ে দেখা দেয়। সম্পদের অসম বণ্টন মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি রোগ বিস্তারের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাইরে অনেক উন্নত দেশও এর আওতায় পড়ে।

যেমন, ইউভাল নোয়াহ হারারির মতে, ফ্রান্সের মতো দেশেও প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ অপুষ্টিজনিত জটিলতার পাশাপাশি বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। গাণিতিক হিসেবে এই সংখ্যামান তাদের মোট জনগণের ১০ শতাংশের কিছুটা বেশি। দেশের উন্নয়ন, আর্থিক সমৃদ্ধি ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবনের বিপরীতে এদের অবস্থানকে অনেকটা প্রদীপের নিচের অন্ধকার হিসেবে দেখা হয়। এরা সকালে ঘুম থেকে ওঠে এক অনিশ্চয়তার বোঝা মাথায় নিয়ে। তারা যখন কাজের খোঁজে ঘর থেকে বের হয় তখন যেমন দুপুরের খাবারের কোনো নিশ্চিত সম্ভাবনা থাকে না।

তেমনি এদের বেশিরভাগ রাত কাটাতে হয় অভুক্ত অবস্থায়। তারা শুধু ক্ষুধা থেকে মুক্তির জন্য যে খাবার খায় তা রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। তারা পেট ভরার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমাণ শর্করা জাতীয় খাবার গলাধ:করণ করে। সেখানে অতি প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ কিংবা আমিষ একেবারে থাকে না বললেই চলে।

অপর্যাপ্ত খাবার যদিও তাদের দেশে দুর্ভিক্ষের কথা বলছে না, এগুলো প্রতিটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে শূন্যের কোটায় নিয়ে যায়। অপুষ্টিতে ভুগতে থাকা একজন মানুূষ যদি কোনোক্রমে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন, তার পক্ষে ঐ রোগ থেকে উত্তরণ ঘটানো একেবারেই অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে।

অপুষ্টিজনিত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত প্রতিটি দেশের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। ফ্রান্সের প্যারিসে মূল শহরের বাইরে যে ঘিঞ্জি বসতি, যুক্তরাষ্ট্রে নিউ ইয়র্কের ডাউনটাউন, ভারতের মুম্বাইয়ের ধারাবি বস্তি কিংবা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বেগুনবাড়ি-আগারগাঁও-কমলাপুরের বস্তি; কার্যত তেমন কোনো পার্থক্য নেই। বাইরে থেকে উন্নত বিশ্বের ঝলমলে আলো আর চাকচিক্য এখানকার ক্ষুধা আর দারিদ্র্যকে আড়াল করতে পারেনি। এখানে দুর্ভিক্ষ নেই কিংবা মানুষ সরাসরি না খেয়ে মরছে না। তবে উপযুক্ত খাবারের অভাবে যে পুষ্টিহীনতা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে তা তাদের তিল তিল করে মৃত্যুর দুয়ারে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর এই ধরনের এলাকায় বসবাসকারী মানুষ সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে থাকে। ক্ষুধা আর অপুষ্টিতে নুয়ে থাকা জীবনে কোনো সংক্রামক রোগ কিংবা মহামারী ছোবল হানলে তারা কীটপতঙ্গের মতো ঝাঁকে ঝাঁকে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়ে।

কোভিড-১৯ এর পূর্বে চীনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

চীনের উহান প্রদেশে কোভিড-১৯ তথা করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার আগে চীনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করা জরুরি। হাজার বছর ধরে চীনের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও শাসন কাঠামোতে যতোই পট পরিবর্তন ঘটুক একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য তাদের পিছু ছাড়েনি। সহজ দুটি শব্দে সেটাকে চিহ্নিত করা হয় ‘ক্ষুধা’ ও ‘দুর্ভিক্ষ’ হিসেবে। সাম্রাজ্যের যুগ থেকে শুরু করে সমাজতন্ত্র আদতে চীনের মানুষের ভাগ্যবদল বলতে যা হওয়ার কথা সেটা হয়নি।

তারা আর্থিক, রাজনৈতিক, সামরিক কিংবা প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে যতটা উন্নত অবস্থানে আরোহণ করুক না কেনো কিছু কিছু প্রদেশে ক্ষুধা আর খাদ্যাভাব এখনও পিছু ছাড়েনি। ফলে অপুষ্টি এবং রোগের সংক্রমণ তাদের নিত্যসঙ্গী। ১৯৫৮-৬১ সালের দিকে চীনে যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল তাতে প্রায় এক কোটি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তীকালে তাদের কম্যুনিস্ট সরকার যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল সেখানেও খাদ্যাভাবের লেখচিত্রে ক্রমশ অধোঃগতিই দৃষ্টিগোচর হয়েছে।

১৯৭৪ সালে ইতালির রোমে প্রথমবারের জন্য বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনে চীনের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ায় চীন। তারা শিল্প খাতকে গুরুত্ব দিয়ে আর্থিক উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হলেও পরিবেশ দূষণ সেখানে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। সময়ের আবর্তে তারা ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কিছুটা সফল হলেও দূষিত পানি, বায়ু ও মাটি তাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।

অপুষ্টিজনিত কারণে চীনের বেশিরভাগ মানুষ একটা সময় যেমন নানা রকম রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে, তেমনি আর্থিক সমৃদ্ধির যুগে গিয়ে লাগামহীন দূষণের মুখে পড়ে তারা এই রোগশোক থেকে উত্তরণ ঘটাতে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। সম্প্রতি ২০২০ সালে এসে আর্থিকভাবে অপেক্ষাকৃত সমৃদ্ধ চীনের উহান প্রদেশ থেকে করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে।

রোগটির বৈশ্বিক বিস্তৃতি লাভের এই পর্যায়ে ঐতিহাসিক পরিসর থেকে বিষয়গুলোর পর্যালোচনা আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চীনের উহানে করোনা মহামারী প্রতিরোধ

Image Course: newstatesman.com

সংক্রামক রোগের বিস্তারে খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা

সংক্রামক রোগ বিস্তৃতির জন্য ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিপরীতে অতিরিক্ত খাওয়ার বদভ্যাসও অনেকাংশে দায়ী। ইউভাল নোয়াহ হারারির বক্তব্যটি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।

তিনি উচ্চবিত্তের সঙ্গে নিম্নবিত্তের খাদ্যাভাসের তুলনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘Indeed in most countries today overeating has become a far worse problem than famine. In the eighteenth century Marie Antoinette allegedly advised the starving masses that if they ran out of bread, they should just eat cake instead. Today, the poor are following this advice to the letter. Whereas the rich residents of Beverly Hills eat lettuce salad and steamed tofu with quinoa, in the slums and ghettos the poor gorge on Twinkie cakes, Cheetos, hamburgers and pizza.’

হারারির বর্ণনায় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে অপুষ্টির থেকেও বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে রাক্ষসের মতো অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা। ১৮ শতকের দিকে রানী মেরি অ্যান্টোইনেট বলেছিলেন ‘প্রজাদের মধ্যে যারা রুটি খেতে পারছে না, তারা কেক খেলেই তো পারে’।

বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষ রানী মেরির সেই উক্তিটিকে সত্য জেনেছে। অনেক ধনী যেখানে বেঁচে থাকার তাগিদে লেটুস পাতা, বিভিন্ন সবজি আর সালাদের উপর দিন পার করছে তার বিপরীতে বস্তিবাসীর আহার তালিকায় যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন পদের কেক, স্যান্ডউইচ, মাংসের স্টেক, হ্যামবার্গার আর পিৎজা।

একটা সময় বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে মানুষ না খেয়ে শুকিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ার কথা জানা যায়। সম্প্রতি অতিরিক্ত তেল-চর্বি, শর্করা, আমিষ আর কোলেস্টেরল জাতীয় খাবার খাওয়ার ফলে পেট ঢোল হয়ে হাঁসফাস করে বিভিন্ন রোগের সহজ শিকারে পরিণত হয়ে মরছে তারাই।

২০২০ সালে করোনা মহামারীর প্রভাবে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রাথমিক অবস্থা পর্যালোচনা করাটা জরুরি। এর মাত্র অর্ধযুগ আগে ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান বলছে, যেখানে ৮৫ কোটি মানুষ অপুষ্টিজনিত জটিলতায় ভুগছে, তার বিপরীতে ২১০ কোটি মানুষ অতিরিক্ত ওজন নিয়ে ধুঁকছে। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের অর্ধেক মানুষ অতিরিক্ত ওজনের কারণে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছেন।

২০১০ সালের একটি পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ ইঙ্গিত নিয়ে হাজির হয়েছে। এ হিসেবে উক্ত বছরটিতে পুরো বিশ্বের ১০ লাখ মানুষ যেখানে ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষের শিকার হয়ে মারা গিয়েছে, তার বিপরীতে ৩০ লাখ মানুষকে মরতে হয়েছে মুটিয়ে যাওয়া সম্পর্কিত নানা জটিলতায়।

তবে সম্প্রতি করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্যে ব্যাপক বদল লক্ষ করা যাচ্ছে। নানা ধরনের সংক্রামক-অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর বিপরীতে অনাহার-অর্ধাহার আর দুর্ভিক্ষের মৃত্যুটাও বেড়ে গিয়েছে বহুগুণে।

অনাহার-অপুষ্টিতে ধুঁকতে থাকা কিংবা অতিরিক্ত আহারের বিপরীতে মুটিয়ে যাওয়া বিশ্ববাসীর জন্য উভয় সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে। এই দুটি কারণেও দিন দিন মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে কমতে ধীরে ধীরে শূন্যের কোটায় চলে যাচ্ছে। ফলে কোনোভাবে মহামারীর বিস্তার ঘটলে দুই ধরনের মানুষই খুব দ্রুত আক্রান্ত এবং মৃত্যুমুখে পতিত হয়ে এর ভয়াবহতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সংক্রামক রোগের বিস্তারে যোগাযোগ ব্যবস্থার ভূমিকা

এদিকে সহজ যোগাযোগ পুরো বিশ্বকে অনেকটা হাতের মুঠোয় এনে দিলেও তাতে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে ঢের। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও কর্মকর্তা, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও কর্মকর্তা, গবেষক, শিক্ষক, বণিক কিংবা তীর্থযাত্রীরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রতিনিয়ত ভ্রমণ করছেন।

অনুসন্ধিৎসু চোখে দেখতে গেলে বোঝা যায় তারাই বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রতিটি সংক্রামক রোগের ভয়াবহ জীবাণু। তারা জানতেন একটু অসতর্ক হলে কতটা ভয়াবহ দুঃসময় এসে হাজির হতে পারে তাদের জন্য। প্রত্যেকেই মনে শঙ্কা নিয়ে চলতো যেকোনো মুহুর্তে তার শরীরে মরণব্যাধী বাসা বাধতে পারে। কিংবা কোনো রকম সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব এক ঝটকায় তার পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে।

তারপরেও এই বিষয়টি প্রাচীন এথেন্সের কিংবা ফ্লোরেন্সের মানুষরা যেমন অনুভব করতে না পেরে প্রাণঘাতী প্লেগের মুখে পড়েছেন, তেমনি এখনকার বিশ্বে চীনের উহানে করোনা ছড়িয়ে পড়ার পরেও সবার বোধোদয় হয়নি। বরং সময়ের পরিক্রমায় চীনের ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে এক দেশ থেকে অন্যত্র ছড়িয়েছে করোনার ভয়াবহ মৃত্যুতাণ্ডব।

১৩৩০ সালের দিকে মাছিবাহিত একধরনের ব্যাকটেরিয়া ইয়ারশিনিয়া পেস্টিস (Yersinia pestis) মানুষের শরীরে বিশেষ ধরনের প্লেগের সংক্রমণ ঘটায়। পূর্ব কিংবা মধ্য এশিয়ার কোনো একটি দেশে এই রোগের বিস্তার শুরু হয়েছিল। তারপর মাছি এবং বিশেষ ধরনের ইঁদুরের শরীরে ভর করে তা ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ার পুরোটা থেকে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকার নানা অংশে।

তবে এই রোগ তার ভয়াবহতার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁঁছাতে দুই দশকের মতো সময় নেয়। মাত্র চার বছরের তাণ্ডবে (১৩৪৭-১৩৫১ খ্রি.) পুরো ইউরোপকে এক অর্থে ছত্রখান করে দেয় এই প্লেগ। ব্ল্যাক ডেথ নামে ইতিহাসে স্থান করে নেয়া এই রোগে মারা গিয়েছিলেন প্রায় ৭.৫ কোটি থেকে ২০ কোটি মানুষ। বিভিন্ন ইতিহাসের গবেষকের সূত্র এবং প্রত্নতাত্ত্বিক খননের পর প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণে এই রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করা যায়।

ধরা হয়, এই রোগের তাণ্ডবে ইউরেশিয়ার প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষের প্রাণ যায় এ মহামারীতে। তখনকার দিনের ইংল্যান্ডে প্রতি দশজন মানুষের মধ্যে চারজনের প্রাণহানি ঘটেছিল এই রোগে আক্রান্ত হয়ে। প্লেগ ছড়িয়ে পড়ার আগে তাদের জনসংখ্যা যেখানে ছিল ৩৭ লক্ষ তা রোগের সংক্রমণ শেষে ২২ লক্ষে গিয়ে দাঁড়ায়। ফ্লোরেন্স নগরের এক লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন এই রোগে।

মহামারী বনাম ধর্ম, কুসংস্কার এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্ব

মহামারী প্লেগ যখন ব্ল্যাক ডেথ নামের আর্তনাদে রূপ নেয় তখন পুরো বিশ্বের মানুষ তার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে। নিরুপায় হয়ে মানুষ বিশ্বের নানা স্থানে সমবেত হয়ে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করতে থাকে। মানুষ তখনও ভাইরাস কিংবা ব্যাকটেরিয়াকে শনাক্ত করতে পারেনি বলে দায়ী করেছে কখনও দূষিত বাতাসকে।

ক্ষেত্রবিশেষে ধিক্কার দিয়েছে তাদের ভাগ্যকে কিংবা মনে করেছে  স্রষ্টা তাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছেন। তারা বিভিন্ন প্রেত সাধনা ও অশরীরি আত্মার প্রভাব বিশ্বাস করায় তাদের মনে বদ্ধমূল ধারণা হয় অশক্তির প্রভাবে এই রোগ ছড়াচ্ছে। তারা কেউ চিন্তাও করতে পারেনি দৃশ্যমানতার থেকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো জীবাণুর পক্ষে এমন ভয়াবহ রোগ ছড়ানো সম্ভব।

ফলে তারা সমবেত প্রার্থনা কিংবা শোক উৎসবে যখনই জড়ো হয়েছে সেখান কয়েকগুণ বেশি দ্রুততায় বিস্তার লাভ করেছে এই মহামারী। ১৩৪৯ সালে ব্ল্যাক ডেথের ভয়াবহতা থেকে গুজব সৃষ্টি হয় যে ইহুদিরা এই রোগ ছড়িয়েছে। তারা রোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বিশ্ব থেকে খ্রিস্টানদের নাম-নিশানা মুছে দিয়ে নিজেদের আধিপত্য নিশ্চিত করতে চায়। ইউরোপের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়া গুজব একটা পর্যায়ে এসে গণহত্যায় রূপ নেয়।

প্রথম দিকে গুজবকে মানুষ তেমন আমলে নেয়নি। কিন্তু একটা পর্যায়ে তারা আঁচ করতে থাকে ইউরোপের খ্রিস্টানরা যেভাবে প্লেগে আক্রান্ত হয়েছে তার তুলনায় ইহুদিদের মধ্যে সংক্রমণ নেই বললেই চলে।

এর পেছনে অনেকগুলো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকলেও খ্রিস্টানরা সেটাকে আমলে নেয়নি। ক্রুসেডের মাধ্যমে নির্বিচারে মুসলিম হত্যার অভিজ্ঞতা তারা নতুন করে ঝালিয়ে নেয় ইহুদিদের উপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে। ইহুদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় স্বাভাবিকভাবেই সমাজের অন্যান্য মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল।

তারা আক্রান্ত কিংবা মৃত কোনো খ্রিস্টানের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করায় অনেকটা নিরাপদ থাকে প্লেগ থেকে। চোলাই মদ কিংবা ঐ ধরনের পানীয় থেকে তারা দূরে থাকতো। অন্যদিকে ইঁদুর কিংবা শুকরের মতো রোগ বিস্তারকারী প্রাণির সংস্পর্শ থেকেও তারা দূরে ছিল।

পাশাপাশি গোসলের ক্ষেত্রে একরকম বাধ্যবাধকতা থাকায় তারা অনেকটাই পরিচ্ছন্ন থাকতে পেরেছে। ফলে যে প্লেগ ইউরোপের খ্রিস্টানদের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিতে বসেছিল তার থেকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ থাকে ইহুদিরা। ফলে যখন সুইজারল্যান্ড থেকে গুজব রটে যে জনৈক ইহুদি কুয়ার মধ্যে বিষ ঢেলে দিয়ে এই রোগ ছড়িয়েছে তখন তা ইউরোপের বেশিরভাগ সাধারণ খ্রিস্টান বিশ্বাস করে।

ক্যাথলিকদের স্বর্গরাজ্য জেরুজালেম দখলের ব্রত নিয়ে তারা যে ক্রুসেড শুরু করেছিল ব্ল্যাক ডেথ তাকে অনেকটা থমকে দিয়েছিল। এবার এই রোগ সৃষ্টির পেছনে ইহুদিদের জড়িত থাকার গুজব ছড়িয়ে পড়লে তারা নতুন করে হাতিয়ার তুলে নেয়। তারা ইউরোপের নানা স্থানে ইহুদীদের বসতিগুলোকে আক্রমণ করে বসে। মুগুর এবং কুড়াল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া খ্রিস্টানদের নৃশংসতা প্লেগের ভয়াবহতাকে ছাপিয়ে যায়।

তারা প্লেগ থেকে নিরাপদ থাকায় বেছে বেছে বিভিন্ন ইহুদি পরিবারের উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে স্ট্রসবার্গ গণহত্যার (Strasbourg massacre) কথা বলা যায়। মনে করা হয়, এই গণহত্যায় একটি কক্ষে ৯০০ ইহুদিকে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। ইহুদিরা অনেকগুলো সূত্র উল্লেখপূর্বক দাবি করে এই ৯০০ জনের প্রত্যেককেই জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলে উন্মত্ত জনতা।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে পোপ ষষ্ঠ ক্লিমেন্ট দ্রুততার সঙ্গে বুল তথা তার মতামত জারি করতে বাধ্য হন। তিনি পুরো ইউরোপের অসহায় ইহুদিদের উপর খ্রিস্টানদের এই উন্মত্ততার প্রতিবাদ জানিয়ে তা অবিলম্বে বন্ধ করার আহবান জানান। পাশাপাশি তিনি এটাও ঘোষণা করেন যে ‘খ্রিস্টানদের কৃতকর্মে মহান স্রষ্টা তাদের উপর রুষ্ট হয়েছেন, ফলে এই রোগ গজব হিসেবে নাজিল হয়েছে’।

প্রাণঘাতী বিভিন্ন মহামারী

‘শৈশবের রোগ (Childhood diseases)’ নামে অনেক রোগব্যাধি এখনও প্রচলিত যেগুলোর উপযুক্ত পরীক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ সেভাবে নেই বললেই চলে। ফলে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে বিশ শতকের আগে পর্যন্ত বেশিরভাগ শিশু তাদের বয়োসন্ধিকাল অতিক্রম করার আগেই মৃত্যুবরণ করেছে। শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাত্রায় দেখা যায় কান, হাত-পা, চোখসহ বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ (Ear Infections, Glue Ear, Croup, Hand, Foot, and Mouth Disease, Pinkeye, Candida albicans infection, Candida parapsilosis infection, Cytomegalovirus infection, diphtheria, human coronavirus infection, respiratory distress syndrome, measles, meconium aspiration syndrome, metapneumovirus (hMPV) infection, Necrotizing enterocolitis, Gonorrhea infection of the newborn, parainfluenza (PIV) infection, pertussis, poliomyelitis, prenatal Listeria, Group B streptoccus infection, Tay–Sachs disease, tetanus, Ureaplasma urealyticum infection, respiratory Syncytial Virus infection, rhinovirus; common cold)  যা অনেক ক্ষেত্রে শিশুমৃত্যুর সম্ভাবনাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেকের মধ্যে এই ধরনের রোগের লক্ষ্মণ প্রাথমিকভাবে দেখার পর চিকিৎসায় সেরে যায। তবে পরবর্তীকালে তা আরও বড় রকমের জটিলতা নিয়ে হাজির হতে পারে।

আর্থিক সমৃদ্ধির অপব্যবহার মানুষের জন্য বড় রকমের সর্বনাশ ডেকে আনে। কিছু মানুষের যৌন জীবনের অশান্তি, অতৃপ্তি আর বহুগামিতার বিপরীতে যে আপত্তিকর সংসর্গ তা থেকে বিশ্বজুড়ে বিস্তারলাভ করতে দেখা যায় এইডস রোগের। গত কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে বড় ব্যর্থতা এই এইডসের ভ্যাক্সিন না বের হওয়া। ১৯৮০ সালের দিকে প্রথম প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হওয়ার পর অন্তত ৩ কোটি মানুষ এই রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ কোটি মানুষ নানা দেশে মারা গিয়েছে। অন্যদিকে যারা এই রোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে যান তাদের পার করতে হয় ভয়াবহ রকম মানবেতর জীবন।

গুঁটি বসন্ত কিংবা স্প্যানিশ ফ্লুর ক্ষেত্রে মানুষ আক্রান্ত হওয়ার অল্প সময়ের ব্যবধানে চূড়ান্ত লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। কেউ কেউ সেভাবেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন বলে এসব মহামারীর গল্পগুলোও সেখানে শেষ হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে এইডস আক্রান্ত মানুষ দীর্ঘদিন কোনোরকম লক্ষ্মণ প্রকাশ না করেও বেঁচে থাকেন। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এভাবে চলতে গিয়ে তাদের মাধ্যমে আক্রান্ত হচ্ছেন অগণিত মানুষ।

তবে মজার বিষয় এইচআইভি ভাইরাস সরাসরি কাউকে মেরে না ফেলে তার শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারে নষ্ট করে দেয়। ফলে যারা এই রোগ নিয়ে বেঁচে আছেন তাদের সাধারণ মৃত্যু হবে এমনটা ভাবার কারণ নাই। এইচ আইভি ইনফেকশন শরীরের সব প্রতিরোধ ক্ষমতা এক ধাক্কায় শেষ করে দিতে পারে। ফলে সাধারণ কোনো ছোট খাট রোগ হলেও তার থেকে মুক্তি না পেয়ে মানুষ উল্টো অবিশ্বাস্য দ্রুততায় মৃত্যুমুখে পতিত হয়।

১৯৮১ সালে নিউ ইয়র্কের একটি হাসপাতালে মারা যাওয়া ঐ দুই রোগীর কথা বলা যায়। তারা কয়েক মাস কিংবা বছরখানেক আগে এইডসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর সময় এদের একজনকে দেখানো হয় ক্যান্সারের রোগী অন্যজন নিউমোনিয়া আক্রান্ত। শুরুতে এই রোগ নিয়ে কেউ কেনো ধারণা লাভ করতে না পারলেও বছর দুয়েক পরে এর গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা জন্মায়। তারা এর শনাক্তকরণের পাশাপাশি নিরাপদ থাকার বিভিন্ন উপায় বাতলে দিতে থাকেন। ফলে আরও বছর দশেকের মাথায় এই রোগ প্রাণঘাতী মহামারী থেকে বদলে গিয়ে যন্ত্রণাদায়ক এক রোগে রূপ নেয়। অন্যদিকে তা নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যক মানুষের মধ্যে সীমিত হয়ে যায় যাদের বেশিরভাগ যৌন বিকারগ্রস্ত। সবথেকে বড় কথা, এই এইডসের উৎপত্তি মাত্র চারশ বছর আগে ১৫৮১ সালের দিকে হলে তা কী রকম ভয়াবহ মহামারীতে রূপ নিত সেটা চিন্তা করলেও গায়ে কাঁটা দেয়। তারপরেও ফি বছর যতজন মানুষ এই রোগের কারণে মারা যাচ্ছেন সেটা নিতান্ত কম নয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত থেকে মহামারীর পর্যালোচনা করতে গেলে যীশুর জন্মের প্রায় ৪৩০ বছর আগের আফ্রিকায় প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল অদ্ভুত এক মৃত্যুদূতের। লিবিয়া, ইথিওপিয়া আর মিসর ঘুরে তা গিয়ে ঠাঁই নেয় পেলোপনেসিয়ান যুদ্ধের রণাঙ্গণে। শরীরে প্রচ- জ্বর, ভয়ানক পিপাসা থেকে শুরু করে গলা ও জিহবা রক্তাক্ত হওয়া কিংবা ত্বক লালচে হয়ে যাওয়ার পর শরীরের নানা স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হতে থাকে এই রোগে আক্রান্তদের।

প্রথমে এটাকে টাইফয়েড জ্বর হিসেবে চিহ্নিত করে এথেনিয়ানরা যে ভুল করেছিল, তার খেসারত দিতে হয় স্পার্টানদের কাছে যুদ্ধে হেরে। এথেন্সের প্লেগ মহামারীর পর ৫৪১ খ্রিস্টাব্দের মিসরে প্রথম মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া রোগটি স্থান করে নেয় ফিলিস্তিন ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যজুড়ে। এরপর পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে মৃত্যুদূত হয়ে দেখা দেয় এই প্লেগ।

সম্রাট জাস্টিনিয়ান তখন রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাইজেন্টাইনকে একীভূত করার চেষ্টা চালিয়েও মহামারীর কারণে ব্যর্থ হন। প্রায় দুই শতাব্দীকাল স্থায়ী এই রোগের ‘জাস্টিনিয়ান প্লেগ’ নামকরণ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিনের মৃত্যুতাণ্ডব চালিয়ে যাওয়া এই মহামারীতে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৬ শতাংশ তথা ৫ কোটির মতো মানুষের প্রাণ যায়। জাস্টিনিয়ান প্লেগের বাহক হিসেবে ইঁদুরের কথা বলা হয় যা জনপদের মধ্যে চলতে গিয়ে এ রোগের বিস্তার ঘটায়।

সময়কাল বিচারে বেশ আগে থেকেই বিশ্বের নানা স্থানে কুষ্ঠরোগের অস্তিত্ব থাকলেও খ্রিস্টীয় এগারো শতকে তথা মধ্যযুগের ইউরোপে তা প্রাণঘাতী মহামারীর রূপ নেয়। ব্যাকটেরিয়াজনিত কুষ্ঠ অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পূর্বে প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে পরিচিত ছিল। এখনও প্রতি বছরে লাখ লাখ মানুষ কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হলেও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে প্রাপ্য সফলতার কারণে আগের মতো প্রাণঘাতী হতে পারে না।

ব্ল্যাক ডেথ (The Black Death) নামে কুখ্যাত প্লেগ মহামারীতে ১৩৫০ সালে দিকে তৎকালীন বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল। এটি একধরনের বুবোনিক প্লেগ যার বিস্তারের জন্য নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে দায়ী করা হয়। প্রথমে এশিয়া অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার পর তা পশ্চিমে গিয়ে একপর্যায়ে পুরো ইউরোপকে আক্রান্ত করে।

এই প্লেগের সংক্রমণে মৃত্যুহার এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে রাস্তাঘাটে মানুষের লাশ পড়ে ছিল। একটা পর্যায়ে এসব লাশ পচে-গলে আরেক ভয়াবহ সঙ্কটের জন্ম দেয়। বলা যেতে পারে শুধু এই ব্ল্যাক ডেথের কবলে পড়ে তৎকালীন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। ১৫১৯ সালের দিকে মেক্সিকোতে ছড়িয়ে পড়া গুঁটিবসন্ত মহামারীতে মারা গিয়েছিলেন প্রায় ৮০ লাখের মতো মানুষ।

১৬৩৩ সালের ইংল্যান্ড এই একই রোগে ধুঁকেছে বেশ কয়েকটি বছর। এরপর ‘দ্য গ্রেট প্লেগ অব লন্ডনে’র বিস্তার ঘটেছিল ১৬৬৫ সালের দিকে। আগের মতো এবারেও বুবোনিক প্লেগের চরিত্র নিয়ে আসা এ মহামারীতে লন্ডনের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের মৃত্যু ঘটেছিল। প্রাথমিকভাবে এই প্লেগের উৎস হিসেবে কুকুর-বিড়ালের কথা ওঠায় রোগের আতঙ্কে নির্বিচারে শহরের সব কুকুর-বিড়ালকে হত্যা করেও শেষ রক্ষা হয়নি। লন্ডনের বন্দর এলাকা থেকে ছড়িয়ে আস্তে আস্তে পুরোটা গ্রাস করে এই সংক্রমণ।

১৮১৭ সালের দিকে কলেরা রোগের প্রথম মহামারীর শুরুটা হয়েছিল রাশিয়ায়। শুরুর দিকে রাশিয়াতে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এই কলেরায়। দূষিত পানির মাধ্যমে এই রোগ পরে ব্রিটিশ সেনাদের মধ্যে ছড়িয়ে গিয়ে ঠাঁই নেয় ভারতেও। বিভিন্ন ব্রিটিশ উপনিবেশের পাশাপাশি স্পেন, আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, জাপান, ইতালি, জার্মানি ও আমেরিকায়ও কলেরা ছড়িয়ে পড়ে মহামারী আকারে। তখন সব মিলিয়ে এসব অঞ্চলে প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল।

বিশ্বের নানা দেশ মিলিয়ে প্রায় ২২-২৩ লাখ লোক মারা গিয়েছিলেন এই মহামারীর কবলে পড়ে। ১৭৯৩ সালে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় মহামারীতে রূপ নেয় ইয়েলো ফিভার। এই মহামারীর মুখে পড়ে পুরো নগরের ১০ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন এই মহামারীতে। এরপর তৃতীয় প্লেগ মহামারী দেখা গিয়েছিল ১৮৫৫ সালে। চীন থেকে শুরু হয়ে পরে তা ভারত ও হংকংয়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে।

পুরো বিশ্বের প্রায় দেড় কোটি মানুষ এই মহামারীর শিকার হলেও তা ভারতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছিল। সাইবেরিয়া ও কাজাখস্তানে সূত্রপাত হওয়া রাশিয়ান ফ্লু ভয়াবহতার চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছায় ১৮৮৯ সালে গিয়ে। ফ্লুর মাধ্যমে সৃষ্ট প্রথম এ মহামারী পরে মস্কো হয়ে ফিনল্যান্ড ও পোল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। একপর্যায়ে এই ফ্লুর মাধ্যমে ইউরোপে দেখা দেয় ভয়াবহ মহামারী যার তা-ব সাগর পার হয়ে উত্তর আমেরিকা ও আফ্রিকাকে স্পর্শ করে। এক বছরের মধ্যে এই রোগে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

১৯১৮ সালের কুখ্যাত মহামারী স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে পুরো বিশ্বের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এই ফ্লু উত্তর আমেরিকা হয়ে ইউরোপে ছড়ালেও স্পেনের মাদ্রিদে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া থেকে এর নাম দেয়া হয়েছিল ‘স্প্যানিশ ফ্লু’। এক বছরের মাথায় ১৯১৯ সালের গ্রীষ্মে যখন এই রোগের প্রকোপ কমে আসে তার আগেই মারা গিয়েছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। তখনও সালফা ড্রাগস ও পেনিসিলিন আবিষ্কার হয়নি বলে স্প্যানিশ ফ্লু অত্যন্ত প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছিল। স্পেনের মোট ৮০ লাখ মানুষ এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন যার বিপরীতে বিশ্বব্যাপী আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ কোটি।

১৯৫৭ সালে হংকং থেকে চীনে ছড়িয়ে পড়ে এশিয়ান ফ্লু নামের মহামারী। পরে তা মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যে ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। ১৯৫৭ সালের দিকে ছড়িয়ে পড়া এ মহামারী প্রথম বছর প্রায় ১৪ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। তবে এর পরের বছরে তথা ১৯৫৮ সালের শুরুর দিকে এশিয়ান ফ্লু দ্বিতীয়বারের মতো মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১১ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এক যুক্তরাষ্ট্রেই এশিয়ান ফ্লুতে মারা গিয়েছিলেন প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার মানুষ। যা-ই হোক, ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পূর্বে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায়নি।

১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো এইডস শনাক্ত করার পর থেকে এইডসে বিশ্বব্যাপী সাড়ে তিন কোটি মানুষের মৃত্যুর খবর জানা যায়। মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংসকারী এ রোগটিও ১৯২০ সালের দিকে পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়েছিল বিশেষ ভাইরাসের মাধ্যমে। ২০০৯ সালে বিশ্বজুড়ে বিস্তার ঘটতে দেখা যায় সোয়াইন ফ্লু’র। এই ফ্লুতে ১৮,৫০০ মানুষ মারা গিয়েছে বলে অনেক সূত্র দাবি করে।

কেউ কেউ মনে করে প্রকৃত সংখ্যা হবে ৫ লাখ ৭৫ হাজারের কাছাকাছি। ২০১০ সালে হাইতিতে ভয়ংকর এক ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। এই ভূমিকম্পের তাণ্ডব পরে কলেরা মহামারী রূপ নিলে ১০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন ঐ সময়ে। এরপর ২০১২ সালে এসেও থামেনি মৃত্যুতাণ্ডব। এমনিক এ বছরেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে ভাইরাসজনিত রোগ হামে মারা গিয়েছিলেন ১ লাখ ২২ হাজার মানুষ।

একই বছর পুরো বিশ্বে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ যক্ষ্মায় মারা যায় ১৩ লক্ষ মানুষ। অন্যদিকে শুধুমাত্র টাইফয়েড জ্বরেই প্রতিবছর মারা যাচ্ছেন ২ লাখ ১৬ হাজার মানুষ। এরই মাঝে ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়ানো ইবোলা মহামারীর মাধ্যমে মারা গিয়েছেন অন্তত ১১,৩০০ জন। তবে এই ইবোলাতেই কি শেষ? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া অনেক পরের কথা, কেউ কেউ এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলাটাও অন্যায় মনে করছেন।

ধরে নেয়া যেতেই পারে এইডসের পাশাপাশি আরও অনেক রোগ আছে যা প্রতিবছর অনেক মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। এর মধ্যে গত শতকের প্রাণঘাতী মহামারী ম্যালেরিয়া এখন অনেক স্তিমিত হয়ে আসলেও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। তবে এটা সত্য যে বর্তমান বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষ যে রোগে মারা যাচ্ছেন তার সিংহভাগ অসংক্রামক। আর এই অসংক্রামক রোগের মধ্যে যেমন রয়েছে ক্যান্সার এবং হার্টের জটিলতা, তেমনি কেউ কেউ বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়ে মৃত্যুকে আপন করে নিচ্ছেন।

কোভিড-১৯ এবং মাহামারী রোগের ভবিষ্যত

অনেক গবেষক দীর্ঘদিন থেকে আশঙ্কা করছেন ব্ল্যাক ডেথের মতো ভয়াবহ কোনো মৃত্যুর শীতলতা নিয়ে ধেয়ে আসছে নতুন মহামারী। কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি যে প্লেগ আর কখনেই ফিরে আসবে না। তবুও মানুষ এ কথা ভেবে একটু স্বস্তি পায় যে চিকিৎবিজ্ঞানের সঙ্গে মহামারী যে রেসকোর্সে প্রতিনিয়ত দৌড়ে যাচ্ছে সেখানে মহামারীর আগেই ফিনিশিং লাইন স্পর্শ করতে পারবেন চিকিৎসকরাই। ফলে মানুষের সঙ্গে মহামারীর যে ঘোড়দৌড়, বেঁচে থাকার এ লড়াইয়ে জয়ী হতে দেখা গিয়েছে মানুষকেই। তার পরেও সার্স, মার্স, ইবোলা সে শঙ্কা থেকে মানুষকে কিছুটা মুক্ত করতে পারলেও করোনা একেবারে জেঁকে বসেছে।

কোভিড-১৯ তথা নভেল করোনার কারণে চীনের উহান থেকে যে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছিল তা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে একঅর্থে বিশ্বের পুরোটা গ্রাস করে নিয়েছে। বিশেষত, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন মৃত মানুষের পাশাপাশি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দেখলে আৎকে উঠে স্মরণ করতে হয় মেক্সিকোর গুঁটি বসন্ত কিংবা স্প্যানিশ ফ্লুর সময়ের কথা। বিজ্ঞানীরা বরাবরই শঙ্কা দেখেছেন পুরাতন ভাইরাস মিউটেশনের মাধ্যমে চরিত্র বদলে সক্রিয় হয়ে ওঠার ব্যাপারে। আরও ভয়ের ব্যাপার ঐসব জীবাণু পশুর শরীরে দীর্ঘদিন অবস্থান করে সেখান থেকে মিউটেশন ঘটানোর মাধ্যমে মানুষের শরীরে আবার ফিরে আসতে পারে।

সেক্ষেত্রে তারা সবার আগে ক্ষতিগ্রস্ত করবে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে। পাশাপাশি সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতাকে শেষ করে দিতে পারবে তারা। পরিবেশের উপর মানুষের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এসব ভাইরাস দ্রুত তাদের প্রকৃতি পরিবর্তন করে নিচ্ছে। তারা অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করছে নানাভাবে। এক্ষেত্রে সংক্রামক রোগের জীবাণুর সঙ্গে ওষুধের দৌড়ে কে কাকে পিছে ফেলছে কিংবা কে এগিয়ে থাকছে তা বলা অসম্ভব, কারণ এখানে ফিনিশিং লাইনটা অজানা রয়ে গিয়েছে।

জীবাণুর বিরুদ্ধে যে লড়াই সেখানে ডাক্তাররা ভাগ্যের উপর সব ছেড়ে দিয়ে আঙুল চুষছেন এমনটা নয়। বিজ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই শুধু লাভের অঙ্কটা হিসেব করতে জানে এমন নয়। বিজ্ঞানের প্রয়োজনে কেউ একজন অদৃষ্টের উপর নির্ভর করে কোনো আবিষ্কারের নেশায় একের পর এক কেমিক্যাল টেস্টটিউবে ঢালতেই পারে।

সে ক্ষেত্রে ফলাফল কি হতে পারে সেটা জানা কিংবা আগে থেকে অনুমান করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু একজন ডাক্তার যখন একইভাবে কোনো টেস্ট টিউবে কেমিক্যাল মেশান, তাঁর সামনে একবুক আশা থাকে নতুন কোনো ওষুধ আবিষ্কারের; যা মানুুষকে রক্ষা করতে পারে বিপদাপন্ন জীবনের তাণ্ডবের মুখ থেকে।

প্রতি বছরের গবেষণায় তাই ডাক্তাররা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাতায় নতুন নতুন লাইন যুক্ত করে যাচ্ছেন যা প্রাণঘাতী মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের বারংবার সফল করেছে। তাই করোনা আসার আগে কেউ অনুমান করতে পারেনি যে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে এমন নাকানি-চুবানি খেতে হবে। তারা বরাবর মনে করেছে মিউটেশনের মাধ্যমে জীবাণুর আক্রমণের সক্ষমতা ফিরে আসলেও তাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা সম্পন্ন ওষুধ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা আগেই আবিষ্কার করে ফেলতে সক্ষম হবেন।

‘নভেল করোনা’ তথা কোভিড-১৯ সর্বনাশের সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে। সারি সারি লাশ দেখার পর মানুষ নতুন করে বিজ্ঞানকে গুরুত্বহীন করে দিয়ে ধর্ম বিশ্বাস, কুসংস্কার ও অপচিকিৎসাকেই পাথেয় মনে করছে। মেক্সিকোর গুঁটি বসন্ত মহামারীতে পুরো শরীরে যেমন পাতা বাটা কিংবা বিটুমিনের প্রলেপ দেয়ার কথা জানা যায়।

তেমনি এই একুশ শতকে এসে ভারতের যোগী রামদেব তার চ্যালাদের বলছে গোমূত্র পান করলে করোনা ছাড়ে! সাবান দিয়ে হাত ধোয়া দেখে আকৃষ্ট হয়ে গণ্ডমূর্খ রাজনৈতিক গডফাদাররা পর্যন্ত ডাক্তার বনে গেছে। তাদের মধ্যে থেকে কেউ-বা জানাচ্ছে অপারেশন করে বাইরে এনে ফুসফুস ধোয়ার কথা। অনেক ধর্মযাজক ডেটল-স্যাভলন পান করাচ্ছে।

তাদের কেউ কেউ করোনার সঙ্গে আলাপনের উদ্ভট কাহিনীর পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভিতরে দাঁড়িয়ে আজগুবি সূত্র স্বপ্নে পাওয়ার কথা বলছে। অনেক ধর্মীয় নেতা এই রোগকে নিছক উড়িয়ে দিয়ে যেমন বলছে ‘ধর্মপ্রাণ মানুষের এই রোগ হলে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ মিথ্যা হয়ে যাবে’। তেমনি অনেক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা তার আবেগকে লাগাম দিতে না পেরে আগাম বলে দিয়েছিলেন ‘আমরা করোনার থেকে শক্তিশালী’।

২০১৫ সালের দিকে যুগান্তকারী আবিষ্কার হিসেবে ধরা হচ্ছে টেইজোব্যাকটিন (Teixobactin) ধাঁচের অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার। ডাক্তারদের অনেকে দাবি করেছেন এই অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে ভাইরাসের মধ্যে যেগুলোর রেজিস্ট্যান্স বেশি সেগুলো থেকে মুক্তি মিলবে সহজে। এর বাইরে আরও অনেক ওষুধ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যা আগের তুলনায় অনেক দ্রুত এবং কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ কাজ করে।

অনেক ল্যাবরেটরিতে এখন কাজ করা হচ্ছে ন্যানো রোবট নিয়ে। এই রোবট কাজে লাগানো সম্ভব হলে তার সহায়তায় রক্ত¯্রােতে মিশে থাকা জীবাণুকে সহজে ধ্বংস করা যাবে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে অসুস্থতা নির্ধারণ করে উপযুক্ত চিকিৎসা দেয়াও সম্ভব হবে। জীবাণুরা লক্ষ-কোটি বছর ধরে টিকে থাকার লড়াই করে আসছে। তাদের এই লড়াইয়ের শিকার হয়ে প্রাণ দিয়েছেন অগণিত মানুষ।

তবে ন্যানো রোবট আবিষ্কার হয়ে গেলে এই লড়াই অনেকটাই শেষ হয়ে আসবে বলে ধারণা করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। এটা প্রাথমিক পর্যায়ে থাকতেই বিজ্ঞানীরা ইবোলার মতো রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ বাতলে দিয়েছেন। তবে করোনার অদ্ভুত বিস্তার সবাইকে থমকে দিয়েছে নিঃসন্দেহে। পর্যালোচনা করতে গেলে সু প্রাচীন কাল থেকে শুরু করে আজ অবধি মাত্র কয়েকটি মহামারীর নাম শুনলে ইতিহাস হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। সেখানে বিষঃনিশ্বাসের প্রথম ধাপে যে নামগুলো মনে আসবে তার মধ্যে স্প্যানিশ ফ্লু আর ব্ল্যাক ডেথের পরেই উচ্চারিত হচ্ছে ‘নভেল করোনাভাইরাস’ সংক্রমণের কথা।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন অন্যধারা থেকে প্রকাশিত মো: আদনান আরিফ সালিম এর “মহামারীর ইতিহাস” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা বুকশেয়ারের এই লিঙ্কে

Featured Image: #####

আপনার মন্তব্য লিখুন