Skip links

ইমোশনাল মার্কেটিং: হালাল সাবানের মাজেজা

আদর্শ থেকে প্রকাশিত মুনির হাসান এর "ইমোশনাল মার্কেটিং" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 4 মিনিট

গেল শতকের, নব্বই দশকের কথা। হুট করে একটি দেশি কোম্পানির সাবান বাঘা বাঘা বহুজাতিক কোম্পানির সাবানকে পেছনে ঠেলে দিয়ে মার্কেট দখল করে নিল। এটাও কী সম্ভব? 

হ্যাঁ সম্ভব। ভারতের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধ, সিপাহি বিদ্রোহের কথা জানেন তো? ১৮৫৭ সালের আগে থেকেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও সামরিক নানা কারণে দেশি সিপাহিদের মন তেতে ছিল। সেই ক্ষোভের আগুনে ঘৃতাহুতি দিল এনফিল্ড নামক এক রাইফেল (Enfield Rifle)। এই রাইফেলে যে কার্তুজ (Cartridge) ব্যবহার করা হতো, তার খোলসটি দাঁতে কেটে রাইফেলে ভরা লাগত। গুজব রটে যায়, এই কার্তুজে গরু ও শুয়োরের চর্বিমেশানো আছে। এটি শুনে মুসলিম ও হিন্দু সিপাহিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং এই টোটা ব্যবহার করতে অস্বীকার করে বসে। শুরু হয়ে যায় এমন বিদ্রোহ, ইতিহাসে যা মহাবিদ্রোহ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। 

সাবান তৈরিতেও পশুর চর্বি ব্যবহার করা হয় এ রকম একটি গুঞ্জন বাজারে চাউর ছিল। আর পশুর চর্বি শুনলেই আমাদের সন্দেহ হয়, শুয়োরের চর্বি নাকি (মহাবিদ্রোহের সেই লোকশ্রুতি হয়তো এর কারণ)? এই সন্দেহ নিয়েও লোকজন কিন্তু সাবান ব্যবহার করত। কারণ তাদের কাছে কোনো বিকল্পও ছিল না। ঠিক এ সুযোগটিই লুফে নেন সৈয়দ আলমগীর। তিনি অ্যারোমেটিক বিউটি সোপ প্যাকেটের গায়ে লিখে দেন ‘একমাত্র ১০০ ভাগ হালাল সাবান’।

এর পরের ইতিহাস মার্কেটিং গুরু ফিলিপ কটলারেরও জানা। মার্কেটিংয়ের বাইবেলখ্যাত তার ‘প্রিন্সিপলস অব মার্কেটিং’ বইয়ের ১৩তম সংস্করণে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়। হালাল সাবানের এই আইডিয়াটি বিশ্বব্যাপী এতটাই স্বীকৃতি লাভ করে যে, এখনো ইউরোপ-আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের খাবারের দোকানগুলোতে হালাল মিট, হালাল শপ ইত্যাদি ব্যানার, সাইনবোর্ড লাগানো হয়। 

হালাল সাবান - ইমোশনাল মার্কেটিং বই থেকে নেওয়া আর্টিকেল

Image Course: alhannah.com

এখন প্রশ্ন হচ্ছে হালাল সাবানের মতো আবেগীয় বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসে প্রচার-প্রচারণা এবং মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি তৈরি করলে কি সেটা অনেক ভালো হয়? 

উত্তর হচ্ছে, হয়। ইমোশনাল মার্কেটিং আনকোরা কোনো বিষয় নয়। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ইমোশনাল মার্কেটিং নিয়ে কাজ-কারবার হচ্ছে। বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মার্কেটিং বিভাগগুলো এসব পড়ায়, কেস স্টাডি করে। কাজেই ব্যাপারটা নতুন নয়। 

তবে, আমি একাডেমিক ও তাত্ত্বিক জায়গা থেকে না দেখে, প্রায়োগিক জায়গা থেকে এটা দেখার চেষ্টা করেছি। আমাদের বেশির ভাগ নতুন উদ্যোক্তারই মার্কেটিংয়ে খুব একটা বাজেট থাকে না। তা ছাড়া প্রায় সবাই ওয়ানম্যান আর্মি। তারা কীভাবে এ ধরনের মার্কেটিংয়ের সুবিধা পেতে পারে। উদ্যোক্তাবান্ধব দেশগুলোতে ডামিস বা হাবলুদের জন্য প্রচুর বইপত্র লেখা হয়। আমাদের দেশে এর বড়ই আকাল। ফলে অনেক উদ্যোক্তা এখনো মার্কেটিংকে আলাদা কিছু ভাবে। আমার ‘গ্রোথ হ্যাকিং মার্কেটিং’ বইয়ে আমি চেষ্টা করেছি এ কথাটা বলতে যে মার্কেটিং কিন্তু এখন আর আলাদা কোনো বিষয় নয়।

যেকোনোভাবে কাস্টমারদের কাছে পৌঁছানোর নামই মার্কেটিং। সেটি যদি হয় ওয়েবসাইট ঠিক করে, টুইকিং করে, ডিজাইন চেঞ্জ করে তাহলেও সেটা মার্কেটিং। সেটি যদি হয় ই-মেইলে বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা চালানো তাহলেও সেটা মার্কেটিং। আবার এ রকম যদি হয় যে মোড়কটা পাল্টে ফেললেও সেখানে একটা ভালো লিড পাওয়া যাবে তাহলে সেটাও মার্কেটিং! আমার এসব উদ্ভট ধারণার কারণ হলো আমি মার্কেটিংয়ের ছাত্র নই। ফলে, আমি মার্কেটিংয়ের প্রথাগত ধারণার বৃত্তে বন্দী নই।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই মার্কেটিংয়ের জন্য কাস্টমারের আবেগকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়? যদিও আবেগ একটি ক্ষণস্থায়ী ব্যাপার। তাই শুধু আবেগকে কাজে লাগিয়ে যেমন দীর্ঘদিন বাজার ধরে রাখা যায় না আবার ঠিক তেমনি খুব মানসম্মত প্রোডাক্ট দিয়েও কিন্তু কাস্টমারের আস্থা অর্জন করা যায় না। এর সঙ্গে বাড়তি কিছুদরকার। সেই বাড়তি কিছুকীভাবে তৈরি করা যেতে পারে তা নিয়ে অনেক কিছু ভাবার আছে। একটা বিষয় আমরা সব সময় খেয়াল রাখি সেটা হলো কীভাবে আমরা আরও ভালো করতে পারি। 

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন আদর্শ থেকে প্রকাশিত মুনির হাসান এর “ইমোশনাল মার্কেটিং: কাস্টমারকে আজীবন ধরে রাখার উপায়” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে
মুনির হাসানের ইমোশনাল মার্কেটিং বইয়ের প্রচ্ছদ

আমাদের দেশে আবেগকে ব্যবহার করে খুব ভালো ব্যবসা করেছে আজাদ প্রোডাক্টস। আজাদ প্রোডাক্টস তাদের যে কার্ডগুলো তৈরি করত তার মূল কাস্টমার ছিল তরুণ-তরুণী—যাদের কাছে প্রেম-ভালোবাসার মতো আবেগী বিষয়গুলো ছিল মুখ্য। আর এই আবেগকে পুঁজি করেই কিন্তু আজাদ প্রোডাক্টসের সব উপাদান তৈরি হয়েছে। বিশ্বজুড়েই এমন আবেগের অনেক কারবারি আছে যাদের মধ্যে হলমার্ক অন্যতম। হলমার্ক পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো গ্রিডিংস কার্ড কোম্পানি। তারা প্রায় ১০০ বছর ধরে কার্ড তৈরি করে যাচ্ছে। তো, এটা হলো আবেগীয় বিষয়কে পুঁজি করে ব্যবসা করা। 

বিজয় দিবসের প্রাক্কালে দেখা যায় অসংখ্য ফেরিওয়ালা রাস্তায় রাস্তায় জাতীয় পতাকা বিক্রি করছে এবং জনগণ কিনছেও দেদার। (আমার প্রিয় দৃশ্যগুলোর একটি)। আবার আমাদের দেশে ফটোর ফ্রেম বাঁধাইয়ের দোকানগুলোতে গেলে দেখা যায়, মক্কা-মদিনাসহ বেশ কিছু তীর্থস্থান বা উপাসনালয়ের ছবির বেশ কাটতি। এর সঙ্গে সম্পর্ক কিসের? আবেগের। কিন্তু এই আবেগের ব্যবহারই কী যথেষ্ট? না। যেকোনো প্রোডাক্টের ক্ষেত্রে আবেগটাকে ব্যবহার করে কাস্টমারের সঙ্গে একটা স্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করতে হবে; কাস্টমারকে জয় করে নিতে হবে, নিজের করে নিতে হবে; যাতে কাস্টমার আজীবন আপনার হয়ে থাকে। এই যে নিজের করে নেওয়ার এবং আজীবন আপনার হয়ে থাকার যেসব উপায় সেসব উপায়ের অন্যতম হলো ইমোশনাল মার্কেটিং। 

প্রশ্ন হচ্ছে এই ইমোশনাল মার্কেটিংটা আসলে কি কোনো কাজে লাগে? এটা নিয়ে সামনে আগানোর কি কোনো সুযোগ আছে? গ্রোথ হ্যাকিং মার্কেটিং লিখতে গিয়ে আমি যে জিনিসটা খেয়াল করেছি সেটা হচ্ছে, ইন্টারনেট সুবিধার ফলে বিশ্বজুড়ে মার্কেটিংয়ে একটা ব্যাপক ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। ডিজিটাল মার্কেটিং, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং—এই সবকিছুবিষয় কিন্তু পুরোনো ধ্যান ধারণাকে পাল্টে ফেলছে। আপনি যদি এ বিষয়টাকে খেয়াল না করেন তাহলে কিন্তু আপনি হেরে যাবেন। বাংলাদেশে এমন কোনো পত্রিকা নেই যেটির মাধ্যমে আপনি কোটি লোকের কাছে পৌঁছাতে পারবেন। কিন্তু কিছু টেকনিক ও খরচাপাতি করলে ফেসবুকের মাধ্যমে সেটি সম্ভব। বাংলাদেশের এখন প্রায় সোয়া চার কোটি লোক ফেসবুক ব্যবহার করে। প্রশ্ন হচ্ছে তাদের ব্যবহার করার জন্য যদি আবেগকে ব্যবহার করা যায়, তাদের মধ্যে যদি কোনো রকমের আবেগীয় বিষয় ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তাহলে প্রচারণাটা খুব ভালো হবে কি না? 

আমাদের ধারণা ও পরিসংখ্যান সব কিন্তু এর পক্ষেই যায়।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন আদর্শ থেকে প্রকাশিত মুনির হাসান এর “ইমোশনাল মার্কেটিং: কাস্টমারকে আজীবন ধরে রাখার উপায়” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

Featured Image: gearycompany.com

আপনার মন্তব্য লিখুন