Skip links

ধনী হওয়ার প্রথম ধাপ: থিংক অ্যান্ড গ্রো রিচ

সূচীপত্র থেকে প্রকাশিত নেসার আমিনের অনুবাদে নেপোলিয়ন হিলের "থিংক অ্যান্ড গ্রো রিচ" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 22 মিনিট

স্বর্ণ থেকে তিনফুট দূরে

(জীবনে) ব্যর্থ হওয়ার একটি সাধারণ কারণ হলো সাময়িক বাধা পেয়েই হাল ছেড়ে দেয়ার অভ্যাস। (পরবর্তীতে) প্রতিটি মানুষই সেই ভুলের জন্য কোনো না কোনো অপরাধবোধে ভোগে।

আর. ইউ. ডার্বির এক চাচা ছিলেন। যখন (চারদিকে) স্বর্ণ আবিষ্কার হচ্ছিল, তখন তাকে স্বর্ণ আবিষ্কারের নেশায় পেয়ে বসে। তিনি স্বর্ণ খুঁজতে পশ্চিমে গিয়েছিলেন এই আশায় যে, তিনি (স্বর্ণের খনি) খনন করবেন এবং ধনী হয়ে যাবেন। তিনি (সম্ভবত) কখনো শুনেননি যে, পৃথিবীতে যত স্বর্ণ আছে তার চেয়ে অনেক বেশি স্বর্ণের মজুত আছে মানুষের মস্তিষ্কে। (অন্যদের মত) তিনি একটি জায়গা দখলে নিয়ে বেলচা ও ভারি কুড়াল নিয়ে কাজে নেমে গেলেন। কাজটি ছিল কঠোর (পরিশ্রমের), কিন্তু স্বর্ণের প্রতি লোভের তুলনায় কিছুই নয়।

কয়েক সপ্তাহ বেশ খাটা-খাটুনির পর অবশেষে পুরস্কার মিলল তিনি চকচকে স্বর্ণের আকরের খোঁজ পেলেন (ডার্বির চাচা)। কিন্তু স্বর্ণের আকর মাটির ওপরে তোলার জন্য তার দরকার ছিল (ভারি) যন্ত্রপাতি। তিনি নীরবে খনিচাপা দিয়ে মেরিল্যান্ডের উইলিয়ামসবার্গে নিজ বাড়িতে ফিরে এলেন। তিনি কী (খুঁজে) পেয়েছেন সে সম্পর্কে আত্মীয়-স্বজন ও কিছু প্রতিবেশীকে জানালেন। তারা তাঁকে মেশিন ক্রয় করার জন্য টাকা ধার দিল। এরপর জাহাজে চাপিয়ে দেয়া হলো সেই যন্ত্রপাতি। ডার্বি এবং তার চাচা খনিতে কাজ করার জন্য ফিরে গেলেন।

খনি থেকে প্রথমবারের মতো আকরিক (সোনা) তোলা হলো এবং সেগুলোকে গলিয়ে ফেলার জন্য জাহাজে করে পাঠিয়ে দেয়া হলো। (গলানো আকরিক থেকে যে পরিমাণ সোনা পাওয়া গেল) তা থেকে বোঝা গেল যে, তারা কলোরাডোর অন্যতম সমৃদ্ধ স্বর্ণখনির সন্ধান পেয়েছেন। আর কয়েক গাড়ি আকরিক তুলতে পারলেই তাদের সব দায়-দেনা শোধ হয়ে যাবে। তারপরই (আসবে) শুধুই লাভ আর লাভ।

কিন্তু যন্ত্র যতই নিচে যাচ্ছে ডার্বি আর তার চাচার আশাও তত ওপরে উঠছে! যেন হঠাৎ করেই সব ঘটে গেল। স্বর্ণ আকরের ধমনী স্রেফ উধাও হয়ে গেছে! তারা রংধনুর (খনির) শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছান, কিন্তু (দেখেন) স্বর্ণপাত্রে আর কিছুই নেই! স্বর্ণ ধাতুশিরা খুঁজে বের করার জন্য তারা প্রাণপণে খনি খুঁড়ে যেতে লাগলেন, কিন্তু পুরোপুরি ব্যর্থ হলেন।

অবশেষে তারা হাল ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা কয়েক ডলারের বিনিময়ে যন্ত্রপাতিগুলো এক ভাঙারি (বা পুরানো লোহা-লক্কর) দোকানদারের কাছে বিক্রি করে দেন এবং ট্রেনে চড়ে বাড়ি ফিরে আসেন। (সাধারণত) যারা ভাঙারির ব্যবসা করেন তারা বোকা (বা নির্বোধ) ধরনের হয়, কিন্তু এই লোকটি সে রকম নয়। তিনি (খনিটি পরীক্ষা করার জন্য) একজন খনন প্রকৌশলীকে ডেকে আনেন এবং তিনি খানিকটা হিসেব-নিকেশ করে নিলেন। উদ্যোগটি ব্যর্থ হওয়ার কারণ সম্পর্কে প্রকৌশলী তাকে ধারণা দিয়ে বললেন যে, এর মালিকরা (ডার্বির চাচা ও ডার্বি) ‘ফল্ট লাইন’ (fault lines) সম্পর্কে জানতো না। প্রকৌশলী হিসাব-নিকাশ করে দেখালেন যে, ডার্বিরা যেখানে খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করে দিয়েছে তার তিন হাত দূরেই ছিল সেই (বহুল প্রত্যাশিত) ‘ভেইন’ বা (স্বর্ণের) ধাতুশিরা!

ভাঙারির মালিক সেই একই খনির স্বর্ণ (উত্তোলন ও) বিক্রি করে মিলিয়ন ডলারের মালিক বনে যান। কারণ সে হাল ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ ডেকে নিয়ে এসেছিল। আর. ইউ. ডার্বির প্রচেষ্টাতেই বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল, আর তিনি সে সময় ছিলেন একজন (অনভিজ্ঞ) তরুণ। মেশিন কেনার টাকা এসেছিল তার আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। কারণ তারা তাকে বিশ্বাস করতো। ডার্বি তাদের ডলার ফেরৎ দিয়েছিল, যদিও এতে তার অনেক বছর লেগে যায়।

এর বহু (বছর) পর, মি. ডার্বি তার ক্ষতি পুষিয়ে নেন, যখন তিনি আবিষ্কার (অনুধাবন) করতে সক্ষম হন যে, (চাইলে) আকাংক্ষাকে স্বর্ণে পরিণত করা যায়। জীবন বীমা বিক্রির ব্যবসায় গিয়ে তিনি এটা বুঝতে পারেন।

ডার্বি মনে রেখেছেন যে, তিনি তার বিরাট সৌভাগ্যকে হারিয়ে ফেলেছিলেন, কারণ তিনি স্বর্ণ থেকে তিন ফুট দূরে গিয়ে থেমে গিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরে তিনি মুনাফা অর্জন করেছিলেন। নিজ অভিজ্ঞতার কথা মনে রেখে তিনি নিজেকে বলতেন, ‘আমি স্বর্ণ থেকে তিন ফুট দূরে গিয়ে থেমে গিয়েছিলাম, কিন্তু লোকজনকে বীমা কেনার কথা বললে তারা যদি ‘না’ করে, তখন আমি কখনোই থেমে যাবো না’।

ডার্বি ৫০ জনেরও কম মানুষের একটি দল নিয়ে বছরে মিলিয়ন ডলারের বেশি জীবন বীমা বিক্রি করেন। তিনি এই লেগে থাকার শিক্ষা পেয়েছেন ‘খনির ব্যবসা’ ত্যাগ করা থেকে।

যে কোনো মানুষের জীবনে সাফল্য আসার আগে, তাকে অবশ্যই কিছু সাময়িক পরাজয় (বাধা) মোকাবিলা করতে হয়, সম্ভবত কিছু ব্যর্থতাও। যদি পরাজয় কোনো মানুষকে ছাপিয়ে যায়, তখন সহজ ও যুক্তিসঙ্গত বিষয় হলো ঐ কাজটি ছেড়ে দেয়া। বেশিরভাগ মানুষ ঠিক এটাই করে।

(কিন্তু) এদেশের পাঁচশত সফল ব্যক্তি (এই বইয়ের) লেখককে জানিয়েছেন যে, সবচেয়ে কঠিন বাধার এক কদম পরেই তাদের বড় বড় সাফল্যগুলো এসেছে। ব্যর্থতা হলো লৌহ কঠিন অনুভূতি এবং চতুর প্রকৃতির একটি কৌশল। যখন একজন সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন এটি তাকে ল্যাং মেরে খুব মজা পায়।

ধনী হওয়ার সহজ উপায় - স্বর্ণ থেকে তিন ফুট দূরে - Three feet away from gold

Image Course: soartosuccess.eliteexpertsnetwork.com

পঞ্চাশ পয়সায় অধ্যবসায়ের শিক্ষা

এর কিছুদিন পর ডার্বি ‘হার্ড নকস্ বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে তার সনদ (ডিগ্রি) অর্জন করেন এবং তিনি স্বর্ণখনির ব্যবসা থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে লাভবান হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় আরও একটি ঘটনা থেকে তিনি নিজের কাছে প্রমাণ করেন যে, ‘না’ এর মানে সবসময় ‘না’-ই হতে হবে এমন নয়।

(কোনো) এক দুপুরবেলায় তিনি তার চাচার পুরানো ধাঁচের গম পেষাণোর মিলে সহায়তা করছিলেন। তার চাচার বিশাল খামারে কিছু কৃষ্ণাঙ্গ মানুষও বাস করতো। খামারের দরজা খোলা ছিল, (এমন সময়) নীরবে এক কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকের কন্যা হেঁটে এসে দরজার কাছে অবস্থান নিল।

চাচা তার দিকে তাকালেন, শিশুটিকে দেখে কর্কশকণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী চাও তুমি?’

ভীরু গলায় শিশুটি বললো, ‘আমার মা বলেছেন, তাকে পঞ্চাশ সেন্ট (পয়সা) দিতে’।

‘আমি দিতে পারবো না’ – চাচা কড়াভাবে স্বরে উত্তর দিলেন এবং বললেন, ‘যাও এখন, বাড়িতে যাও’।

শিশুটি বললো ‘আচ্ছা’, কিন্তু সে সেখান থেকে এক ইঞ্চিও নড়লো না। চাচা তার কাজে চলে গেলেন। তিনি তার কাজে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন যে, শিশুটি চলে গেছে কি-না সেদিকে খেয়াল করতে পারেননি। কিছুক্ষণ কাজ করার পর ফিরে এসে দেখেন, শিশুটি তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। তিনি হুংকার ছেড়ে তাকে বললেন, ‘আমি না তোমাকে বাড়ি যেতে বলেছিলাম! এখনি যাও, নইলে আমি তোমাকে চাবুক মারবো’।

শিশুটি উত্তর দিল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে’। কিন্তু সে এক ইঞ্চিও নড়লো না।

চাচা কলের মুখে এক বস্তা শস্য ফেলতে যাচ্ছিলেন। তিনি (মাটি থেকে) একটা কাঠের টুকরা তুলে নিয়ে রাগত স্বরে শিশুটির দিকে ধেয়ে গেলেন।

(এই দৃশ্য দেখে) ডার্বি নিঃশ্বাস বন্ধ করে রইল। সে নিশ্চিত ছিল যে, সে একটা হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী হতে যাচ্ছে। (কারণ) সে তার চাচার হিংস্র্র রাগ সম্বন্ধে জানে। সে (আরও) জানে যে, দেশের এই অংশে সাধারণত কৃষ্ণাঙ্গ শিশুরা শ্বেতাঙ্গদের (কোনো কিছুর) বিরোধিতা করে না।

চাচা যখন সেই স্থানে পৌঁছালো, যেখানে শিশুটি দাঁড়িয়েছিল, তখন শিশুটি দ্রুত এক কদম এগিয়ে এলো, চাচার চোখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উচ্চকণ্ঠে বললো, ‘আমার মায়ের সেই পঞ্চাশ সেন্ট লাগবেই’।

চাচা (তখন) দাঁড়িয়ে পড়লেন, প্রায় এক মিনিট শিশুটির দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর আস্তে করে হাতের লাঠিটি মাটিতে ফেলে দিলেন, তার পকেটে হাত দিলেন, আধা ডলার বের করলেন এবং শিশুটির হাতে দিলেন। শিশুটি ডলার নিল, ধীরে ধীরে পেছন ফিরে দরজা দিয়ে চলে গেল এবং লোকটির (ডার্বির চাচা) ওপর থেকে চোখ সরলো না, যাকে সে এইমাত্র জয় করেছে।

শিশুটি চলে যাওয়ার পর চাচা একটি বক্সের ওপর বসলেন এবং দশ মিনিটের অধিক সময় ধরে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

তিনি বিস্ময় নিয়ে শিশুটির সাহসের কথা চিন্তা করছিলেন – শিশুটি যেন তাকে চাবুকাঘাত করে গেছে। মি. ডার্বিও কিছু ভাবছিলেন। জীবনে তিনি প্রথমবারের মতো দেখলেন যে, একটি কৃষ্ণাঙ্গ শিশু একজন প্রাপ্তবয়স্ক শ্বেতাঙ্গ মানুষের ওপর রাজত্ব করে গেল। সে এটা কীভাবে করতে পারলো? কী এমন ঘটেছিল যে, তার চাচা হিংস্র্রতা হারিয়ে ফেললেন এবং একটি অনুগত ভেড়ার মত হয়ে গেলেন। শিশুটির মধ্যে কী এমন অদ্ভুত শক্তি কাজ করলো যে সে তার মুনিবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারলো? এই একই ধরনের আরও কিছু প্রশ্ন ডার্বির মতেন উদয় হলো। কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরেও তিনি এর উত্তর খুঁজে পাননি।

বিস্ময়কর হলেও (সত্যি যে), সে পুরানো কারখানার সেই স্থানেই গ্রন্থকারকে এই গল্পটি বলা হয়েছিল, যে স্থানে ডার্বির চাচা চাবুকাঘাত খেয়েছিলেন। এটাও বিস্ময়কর যে, আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে সেই শক্তিকে জানার জন্য গবেষণা করেছি, যা দিয়ে একজন অজ্ঞ ও অশিক্ষিত কৃষ্ণাঙ্গ শিশু একজন (শ্বেতাঙ্গ) বুদ্ধিমান মানুষকে জয় করতে পারলো।

সেই পুরানো দুর্গন্ধময় কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে ডার্বি পুনরায় আমাকে অসাধারণ জয়ের গল্পটি বললো এবং জানতে চাইলো, ‘আপনি এ থেকে কী পেলেন? সেই শিশুটি কী এমন অদ্ভুত শক্তি ব্যবহার করলো যে কারণে আমার চাচাকে সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে দিল?’

এই প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া যাবে এই বইতে বর্ণিত বিভিন্ন সূত্রগুলোতে। উত্তরটি (বইতে) পরিপূর্ণভাবেই দেয়া হয়েছে। পরিপূর্ণ বিবরণ ও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে এজন্য যে, যাতে যে কেউ এটা বুঝতে পারে এবং একই (ধরনের) শক্তি কাজে লাগাতে পারে, যা সেই ছোট্ট শিশুটি দুর্ঘটনাবশত প্রয়োগ করেছিল।

আপনার মনকে সজাগ রাখুন, এবং সেই ক্ষমতাটিকে পর্যবেক্ষণ করুন, যা শিশুটিকে রক্ষা করেছিল। বইয়ের পরবর্তী অধ্যায়ে আপনি সেই শক্তির এক ঝলক দেখতে পারেন। এই বইয়ের কোথাও না কোথাও আপনি একটি আইডিয়া (নতুন ধারণা) খুঁজে পাবেন, যা আপনার উপলব্ধির ক্ষমতাকে দ্রুততর করে তুলবে। এই অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতাকে আপনার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিন, আপনার নিজের লাভেরই জন্য। হয়তো বইয়ের প্রথম অধ্যায়েই এই শক্তির সচেতনতা আপনার মধ্যে আসতে পারে, অথবা পরবর্তী কোনো অধ্যায়ে পেতে পারেন এই শক্তি। এটি একটি একক ধারণা (আইডিয়া) হিসেবে আসতে পারে, অথবা এটি আসতে পারে পরিষ্কার রূপ ধরে, কিংবা (নির্দিষ্ট) উদ্দেশ্যের আকারে। আবার (এমনও হতে পারে যে), এটা আপনাকে আপনার অতীত ব্যর্থতা বা পরাজয়ের অভিজ্ঞতা থেকে এমন কোনো শিক্ষা হয়ে আপনার সামনে আসবে, যাতে আপনি আপনার সকল ব্যর্থতাকে জয় করতে পারেন।

আমি যখন মি. ডার্বিকে সেই কৃষ্ণাঙ্গ শিশুটির অবচেতনভাবে ব্যবহৃত শক্তির কথা বর্ণনা করলাম, তখন তিনি দ্রুত জীবন বীমার একজন বিক্রয়কর্মী হিসেবে তার অভিজ্ঞতাগুলোকে স্মরণ করলেন এবং খোলামেলাভাবেই তিনি স্বীকার করেন যে, এই ক্ষেত্রে তার সাফল্য ছিল অবধারিত। কারণ এটা কোনো ছোটো বিষয় নয়, যা তিনি শিখেছেন সেই ছোট্ট শিশুর কাছ থেকে।

ডার্বি উল্লেখ করেন, ‘যতবারই আমি কোনো জীবন বীমার পলিসি বিক্রিতে বাধার সম্মুখীন হয়েছি, ততবারই আমি সেই শিশুটিকে ময়দার কলের ভেতরে আত্মরক্ষার্থে বড় বড় চোখে রোষ ভরা দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। তখন আমি নিজেকে বলেছি, ‘এই বিক্রয়টা আমাকে করতেই হবে। আমার বিক্রয়ের মধ্যে যতগুলো ভাল বিক্রয় হয়েছে তার বেশিরভাগই হয়েছে (প্রথমে) লোকে আমাকে ‘না’ বলার পর।

তিনি স্মরণ করেন, স্বর্ণ থেকে তিন ফুট দূরে গিয়ে থেমে যাওয়ার ভুলের কথা। তিনি বলেন, ‘সেই অভিজ্ঞতাটা আমার জন্য ছিল শাপে বর। এটা আমাকে কোনো কাজের পেছনে লেগে থাকতে শিখিয়েছে, তা যত কঠিন কাজই হোক না কেন। (জীবনে) কোনো কিছুতে সাফল্য পাবার জন্য এ শিক্ষাটি আমার (বড়ই) দরকার ছিল।

ডার্বি ও তার চাচা, কৃষ্ণাঙ্গ শিশু ও স্বর্ণের খনির এই গল্প সন্দেহাতীতভাবে শত শত লোকে পাঠ করবে, যারা জীবন বীমা বিক্রয় করে জীবিকা নির্বাহ করে। (বর্তমান বইয়ের লেখক) মনে করেন, ডার্বি তার নিজের জীবনের এই দুই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বছরে মিলিয়ন ডলারেরও বেশি জীবন বীমা (পলিসি) বিক্রয় করতে সক্ষম হন।

জীবন বড়ই অদ্ভুত এবং কখনো কখনো তা অকল্পনীয়! সাধারণ অভিজ্ঞতাগুলোতেই সাফল্য ও ব্যর্থতার শিকড় গ্রোথিত থাকে। মি. ডার্বির অভিজ্ঞতাগুলো ছিল খুবই সাধারণ জায়গায় এবং অনেকটাই সহজ, তবুও তিনি জীবনে লক্ষ্যের দেখা পেয়ে গেলেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তার জীবনের মতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই দুই নাটকীয় অভিজ্ঞতা থেকে তিনি লাভবান হয়েছেন। কারণ তিনি এগুলোকে বিশ্লেষণ করেছেন এবং (খুঁজে) পেয়েছেন সেই শিক্ষা, যা এই ঘটনাগুলো তাকে শেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু (আমি চিন্তা করছি) সেই লোকটির কী হবে যার সময় নেই, ব্যর্থতাকে বিশ্লেষণ করে জ্ঞান নেয়ার  যা তাকে সাফল্যের দিকে ধাবিত করতো?

সে কখন শিখবে কীভাবে ব্যর্থতাকে সাফল্যের সিঁড়িতে রূপান্তর করা যায়?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার জন্যই এই বইটি লেখা হয়েছে। উত্তরটি বর্ণনা করা হয়েছে তেরোটি সূত্রের মাধ্যমে। কিন্তু মনে রাখবেন, যতই আপনি পড়বেন, যে উত্তর আপনি খুঁজছেন, যা জীবনের অদ্ভুত ঘটনায় আপনার মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে; হয়তোবা উত্তরগুলো আপনি পেতে পারেন আপনারই মনের মধ্যে থাকা কোনো আইডিয়া (ধারণা), পরিকল্পনা, অথবা উদ্দেশ্যের মধ্যে, যা (বইটি) পড়তে পড়তে আপনার মনে উদয় হতে পারে।

(শুধু) একটি ভালো আইডিয়াই (ধারণা) সাফল্য বয়ে আনার জন্য যথেষ্ট। এই বইয়ে যে সূত্রগুলো বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলো সর্বোৎকৃষ্ট এবং সবচেয়ে বাস্তবসম্মত বলে পরিচিত, যা আপনার বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার মতো পথ তৈরি করতে এবং সেই অনুযায়ী চলতে আপনাকে সচেতন (ও সহায়তা) করবে।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন সূচীপত্র থেকে প্রকাশিত নেসার আমিন এর অনুবাদে নেপোলিয়ন হিল এর “থিংক অ্যান্ড গ্রো রিচ” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে
থিংক অ্যান্ড গ্রো রিচ Think and Grow Rich বইয়ের প্রচ্ছদ

ধনী হওয়ার প্রথম ধাপ

ত্রিশ বছরের বেশি আগে এডুইন সি. বার্নেস যখন মালবাহী রেলে করে নিউ জার্সির অরেঞ্জ এলাকায় অবতরণ করেন, (তখন) সম্ভবত তাঁকে দেখতে ভবঘুরের মতো লাগছিল। কিন্তু তাঁর চিন্তা-ভাবনাগুলো ছিল রাজার মত।

রেলপথ থেকে তিনি যখন থমাস এ এডিসনের কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর সক্রিয়তা ছিল। তিনি নিজেকে এডিসনের সামনে দাঁড়ানো দেখতে পান। তিনি নিজেই শুনছেন যে, তিনি এডিসনকে তাঁকে একটি কাজের সুযোগ দেয়ার অনুরোধ করছেন, যা ছিল তাঁর আজন্ম স্বপ্ন। বিখ্যাত এই আবিষ্কারকের (এডিসন) ব্যবসায়িক সহযোগী হওয়া ছিল তাঁর জ্বলন্ত আকাংক্ষা।

বার্নেসের আকাংক্ষা একটি আশা নয়! একটি চাওয়াও নয়! এটি ছিল একটি তীব্র অনুভূতি, যা আকাংক্ষারূপে প্রতিনিয়ত স্পন্দিত হচ্ছিল, যা অন্য সবকিছুকেই অতিক্রম করছিল। এই আকাংক্ষা ছিল সুনির্দিষ্ট।

এডিসনের কাছে তিনি যে আকাংক্ষা উপস্থাপন করেন তা নতুন কিছু ছিল না। বহু আগ থেকেই এটি বার্নেসের আধিপত্যশীল আকাংক্ষা ছিল। এই আকাংক্ষাটি যখন প্রথম তার মনে উদয় হয়, তখন হয়তো এটি ছিল (শুধু) একটি চাওয়া। কিন্তু তিনি যখন এডিসনের সামনে দাঁড়ান, তখন এটি শুধু একটি চাওয়া রইল না।

কয়েক বছর পর, এডুইন সি. বার্নেস একই কার্যালয়ে আবার এডিসনের সামনে দাঁড়ালেন, প্রথম যেখানে তিনি আবিষ্কারকের সাথে দেখা করেন। এবার তাঁর আকাংক্ষা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। তিনি তখন এডিসনের সঙ্গে ব্যবসা করছিলেন। তাঁর জীবনের কর্তৃত্বশীল সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব সত্য।

আজকে যাঁরা বার্নেসকে চিনেন, তাঁরা সবাই তাঁকে ঈর্ষা করে, কারণ জীবন তাঁকে বড় হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তারা বার্নেসকে দেখছেন তাঁর বিজয়ের (বা সাফল্যের) দিনগুলোতে, কিন্তু বার্নেসের সাফল্যের কারণ অনুসন্ধান করে দেখার কষ্ট তারা নিতে চান না।

বার্নেস সফল হয়েছিলেন, কারণ তিনি (নিজের জন্য) একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন। এর পেছনে তিনি দিয়েছেন (তাঁর) সর্বশক্তি, সর্ব প্রচেষ্টা। (অর্থাৎ) সবকিছই দিয়েছেন শুধু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য। যেদিন তিনি এডিসনের সাথে দেখা করতে আসেন সেদিনই তিনি তাঁর সহযোগী হয়ে যাননি। (প্রথমে) সবচেয়ে ছোট ধরনের কাজ করেই তাঁকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল, যতক্ষণ না এটি তাঁর অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে তাঁকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

তিনি যেই সুযোগটি খুঁজছিলেন সেটি সামনে আসতে পাঁচ বছর পার হয়ে গেল। সেই বছরগুলোতে তাঁর সামনে ছিল না কোনো আশার রশ্মি, ছিল না তাঁর আকাংক্ষা পূরণ হওয়ার মতো একটি প্রত্যাশা। বার্নেস ছাড়া আর সকলেই মনে করেছিল যে, সেও এডিসনের ব্যবসায়ের চাকার আরেকটি পেরেকে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সেখানে কাজ করার প্রথম দিন থেকেই প্রতিটি মুহূর্তে বার্নেস এডিসনের ব্যবসায়িক সহযোগী হওয়ার ইচ্ছা মনের মধ্যে পুষে রেখেছেন।

কোনো একটি নির্দিষ্ট আকাংক্ষার শক্তির এটি একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। বার্নেস তাঁর লক্ষ্য অর্জনে জয়ী হয়েছিলেন, কারণ তিনি অন্য কিছু হওয়ার পরিবর্তে এডিসনের ব্যবসায়িক সহযোগী হতে চেয়েছিলেন। সেই উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তিনি একটি পরিকল্পনা তৈরি করেন। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো তিনি তাঁর পেছনের সকল সেতু পুড়িয়ে ফেলেন (যেগুলোকে লক্ষ্য অর্জনের পথে বাধা মনে করেছেন)। তিনি তাঁর আকাংক্ষার ওপর ততক্ষণ (দৃঢ়ভাবে) দাঁড়িয়েছিলেন যতক্ষণ এটি তাঁর জীবনের তীব্র আবেশে পরিণত হয়। অবশেষে হয়েছেও তাই (অর্থাৎ তাঁর আকাংক্ষা পূর্ণ হয়েছে)।

যখন তিনি (বার্নেস) অরেঞ্জ এলাকায় এলেন, তখন তিনি নিজেকে বলেননি যে, ‘আমি এডিসনকে রাজি করাবো যাতে তিনি আমাকে কোনো রকম একটি চাকরি দেন।’ (বরং) তিনি বলেছিলেন, ‘আমি এডিসনের সাথে দেখা করবো এবং এটি তাঁর নজরে আনবো যে, আমি এখানে তাঁর সাথে ব্যবসা করতে এসেছি।’

তিনি বলেননি, ‘আমি এখানে কয়েক মাস কাজ করবো, কিন্তু যদি কোনো উৎসাহ না পাই, আমি কাজ ছেড়ে দেব এবং অন্য কোথাও চাকরি খুঁজে নেব। (বরং) তিনি বলেছিলেন, ‘যে কোনো জায়গা থেকেই আমি কাজ শুরু করবো। এডিসন আমাকে যাই বলবে তার সবই করবো, কিন্তু সবকিছুর মধ্যেও (একদিন) আমি একদিন তাঁর (ব্যবসায়িক) সহযোগী হবোই।’

তিনি বলেননি, ‘আমি আরেকটি সুযোগের জন্য আমার নাক-কান খোলা রাখবো, যদি আমি এডিসনের প্রতিষ্ঠান থেকে যা পেতে চাই তা পেতে ব্যর্থ হই।’ (বরং) তিনি বলেছিলেন, ‘এই পৃথিবীর মধ্যে আর কিছুই নেই একটি জিনিস ছাড়া, যা আমি পেতে বদ্ধপরিকর, তা হলো থমাস এ. এডিসনের ব্যবসায়িক সহযোগী হওয়া। আমি আমার পেছনের সকল সেতু (বাধা) পুড়িয়ে ফেলবো, এবং আমি নিজ যোগ্যতায় যা পেতে চাই তার জন্য আমি আমার পুরো ভবিষ্যৎ বাজি রাখবো।’

তিনি ফিরে যাওয়ার মত কোনো রাস্তা খোলা রাখলেন না। হয় তিনি জিতবেন, না হয় হারবেন!

এটাই হলো বার্নেসের সফলতার কাহিনি!

অনেক আগের কথা, একজন মহান যোদ্ধা এমন একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হন যে, যখন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া জরুরি হয়ে পড়ে, যা যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর সফলতাকে নিশ্চিত করবে। তিনি শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে নিজ সৈন্যবাহিনীকে প্রেরণ করতে যাচ্ছিলেন। শত্রুদের সেনাসংখ্যা ছিল তাঁর সেনাসংখ্যার চেয়েও বেশি। তিনি তাঁর সৈন্যদের জাহাজে উঠালেন এবং শত্রুর দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। সৈন্য ও মালামাল (যুদ্ধাস্ত্র) নামানোর পর তিনি তাদেরকে বহনকারী জাহাজগুলোকে পুড়িয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন। যুদ্ধের শুরুতে তিনি সৈন্যদের বললেন, ‘আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, জাহাজগুলো ভস্মিভূত হয়ে গেছে। এর মানে হলো যদি না আমরা যুদ্ধে জিততে পারি, তাহলে আমরা এই সমুদ্রের কূল ত্যাগ করতে পারবো না! এখন আমাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই – হয় আমাদের জিততে হবে, না হয় আমরা মারা পড়বো! (অবশেষে প্রাণপণে লড়ে) তাঁরা (সেই যুদ্ধে) জয়লাভ করেছিল।

প্রত্যেক ব্যক্তিই যে কোনো উপায় অবলম্বন করে (জীবনযুদ্ধে) জয়ী হতে চায়, তাঁদের অবশ্যই (সেই সেনাপতির মত) পেছনের সকল জাহাজ জ্বালিয়ে দিতে হবে এবং (ব্যর্থ হয়ে) ফিরে যাওয়ার সকল পথ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে। শুধু এভাবেই একজন মানুষ তাঁর মনকে স্থির রাখতে পারে, যাকে বলে জয়ের জন্য তীব্র আকাংক্ষা, যা (জীবনে) সফলতা অর্জনের জন্য অত্যাবশ্যক।

একবার (যুক্তরাষ্ট্রের) শিকাগোতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। অগ্নিকাণ্ডের পর সেই সকালবেলায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে একদল ব্যবসায়ী তাঁদের দোকানের অবশিষ্ট মালামালগুলো ভস্মিভূত হয়ে যেতে দেখছিলেন। (এরপর) তাঁরা এক সভায় মিলিত হয় এই সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যে, তাঁরা কি নতুন করে দোকানগুলো নির্মাণ করবেন, না-কি শিকাগো ছেড়ে চলে গিয়ে দেশের অন্য কোনো অধিক সম্ভাবনাময় স্থানে ব্যবসা শুরু করবেন। শুধু একজন ব্যক্তি (মার্শাল ফিল্ড) ছাড়া বাকি সকলেই সিদ্ধান্ত নিলেন যে তাঁরা শিকাগো ছেড়ে চলে যাবেন।

যে ব্যবসায়ী ঐ স্থানে থেকে গিয়ে পুনরায় দোকান নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি তাঁর দোকানের (পুড়ে যাওয়া) অবশিষ্ট অংশের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘ভদ্রমহোদয়গণ, ঠিক এই জায়গাতেই আমি বিশ্বের সবচেয়ে বড় দোকান গড়ে তুলবো, যতবার পুড়ে যাক এটা কোনো ব্যাপার না’।

এটা প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের ঘটনা। সেই (জায়গায়) দোকান নির্মিত হয়েছিল। এটা আজও দাঁড়িয়ে আছে, স্থির মানসিক শক্তির এক বিশাল স্মৃতিস্তম্ভরূপে, যা তীব্র আকাংক্ষা হিসেবে পরিচিত। (দোকান পুড়ে যাওয়ার পর) মার্শাল ফিল্ড সহজেই সেই কাজটি করতে পারতেন যা অন্য ব্যবসায়ীরা করেছিলেন। যখন সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে এবং ভবিষ্যৎ অন্ধকারময় মনে হয়েছিল, তখন সেই ব্যবসায়ীরা (আশা) ছেড়ে দিয়েছেন এবং যেখানে কাজ করা সহজ মনে হয়েছে তারা সেখানে চলে গেছেন।

মার্শাল ফিল্ড এবং অন্যান্য ব্যবসায়ীদের মধ্যকার এই পার্থক্য ভালো করে চিহ্নিত করে রাখুন, কারণ এটাই সেই পার্থক্য যা এডিসনের প্রতিষ্ঠানে কাজ করা হাজার হাজার তরুণদের থেকে এডুইন সি. বার্নেসকে সম্মানিত বা আলাদা করেছে। এটাই সেই পার্থক্য যা বাস্তবিক জীবনে ব্যর্থ হওয়া লোকদের থেকে যাঁরা সফল তাঁদেরকে সম্মানিত বা আলাদা করে।

প্রত্যেকটি মানুষই যখন সে (জীবনে) অর্থের মূল্য বোঝার বয়সে উপনীত হয়, (তখনই) সে এটা (অর্থ) পেতে চায়। কিন্তু চাইলেই তো আর ধনী হওয়া যায় না। কিন্তু স্থির মানসিক অবস্থার মধ্য দিয়ে ধনী হওয়ার আকাংক্ষা, যা (ব্যক্তির) একটি বাতিক হয়ে ওঠে, তারপর (দেখা যায়) মানুষ ধনী হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট পন্থায় পরিকল্পনা করে এবং ব্যর্থতাকে পাশে জায়গা না দিয়ে সেই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নে লেগে থাকে, আর এভাবেই মানুষ ধনী হয়।

থমাস আলভা এডিসন এবং তার সহকারী এডুইন সি বার্নস

Image Course: deepstash.com

যে পদ্ধতিতে ধনী হওয়ার আকাংক্ষা আর্থিক মূলে রূপান্তরিত হয় তা নির্দিষ্ট ছয় ধাপে গঠিত হয়, যা বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য। ধাপগুলো হলো:

প্রথমত: আকাংক্ষা অনুযায়ী আপনার মনকে স্থির করুন ঠিক আপনি কত অর্থ চান। এভাবে বলার দরকার নেই যে, ‘আমি অনেক টাকার মালিক হতে চাই’। অর্থাৎ অর্থ পাওয়ার পরিমাণ নির্দিষ্ট করুন। (অর্থের পরিমাণ নির্দিষ্ট করার একটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে, যার বর্ণনা পরবর্তী অধ্যায়ে দেয়া হবে)।

দ্বিতীয়ত: আপনি যে পরিমাণ অর্থ অর্জনের আকাংক্ষা করছেন তার বিপরীতে আপনি কী (পরিশ্রম বা মেধা) দিতে চান তা নিশ্চিত করুন, (এটাই সত্য যে, বিনামূল্যে বা বিনা পরিশ্রমে কিছু পাওয়া যায় না)।

তৃতীয়ত: একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করুন যেদিন আপনি আপনার আকাক্সিক্ষত অর্থ পেতে চান।

চতুর্থত: আপনার আকাংক্ষা পূরণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করুন এবং আপনি প্রস্তুত থাকুন বা না থাকুন তখন কাজ শুরু করুন এবং সেই পরিকল্পনাকে কর্মে পরিণত করুন।

পঞ্চমত: আপনি কী পরিমাণ অর্থ অর্জন করতে চান তা স্পষ্ট করে একটি কাগজে লিখুন। এই অর্থ কবে নাগাদ উপার্জন করতে চান তার একটি সময়সীমা নির্ধারণ করুন। অর্থ অর্জনের বিপরীতে আপনি কী (পরিশ্রম ও মেধা) দিতে চান তা লিখে রাখুন এবং যে পরিকল্পনা অনুযায়ী আপনি অর্থ উপার্জন করতে মনস্থির করেছেন তার বর্ণনা দিন।

ষষ্ঠত: আপনার লিখিত বিবরণ উচ্চস্বরে পাঠ করুন,   প্রতিদিন দুইবার করে – একবার রাতে ঘুমাবার আগে, আরেকবার সকালে ঘুম থেকে উঠার পর। যখন আপনি এটি পড়বেন, অনুভব করবেন এবং বিশ্বাস করবেন, দেখবেন আপনি সেই অর্থ অর্জনের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছেন।

(ধনী হওয়ার জন্য) উপরোক্ত ছয়টি নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ষষ্ঠ অনুচ্ছেদটি ভালো করে পর্যবেক্ষণ ও অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি হয়তো বলতে পারেন, অর্থ পাওয়ার আগেই অর্থ পেয়ে গেছেন। (কিন্তু) এমনটি ভাবা আপনার জন্য অসম্ভব ব্যাপার। এখানেই আপনার তীব্র আকাংক্ষা আপনাকে সহায়তা করতে আসবে। আপনি যদি সত্যিই এরূপ তীক্ষ্ণভাবে আপনার আকাংক্ষিত অর্থ চান যে তা আপনার বাতিকে পরিণত হয়েছে, তাহলে আপনি যে অর্থগুলো পাবেন এটা আপনার নিজেকে বোঝানো কঠিন হবে না। বিষয়টা হলো আপনাকে (মন থেকে) অর্থটা চাইতে হবে এবং এটা পাওয়ার জন্য এতটাই দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে উঠবেন যে, নিজেকে বোঝাতে পারবেন আপনি অর্থটা পাবেন।

(প্রকৃতপক্ষে) যাঁরা ‘অর্থ সচেতন’ থাকেন তাঁরাই ধনী হয়ে ওঠেন। ‘অর্থ সচেতনতার’ মানে হলো অর্থের প্রতি আকাংক্ষা কোনো একজনের মনের মধ্যে এতটাই দৃঢ়ভাবে গ্রোথিত হয়ে যায় যে, সে দেখতে পায় যে সে অর্থগুলো পেয়ে গেছে।

যাঁরা মানব মনে কাজ করার সূত্রগুলো সম্পর্কে জানে না, তারা (এক অর্থে) অনভিজ্ঞ, তাঁদের কাছে উপরোক্ত নির্দেশনাগুলো অবাস্তব মনে হতে পারে। এটা তাঁদের কাজে লাগতে পারে, যাঁরা উপরোক্ত ছয়টি ধাপের সামর্থ্য বুঝতে ব্যর্থ হবেন না।

আপনার অবগতির জন্য বলছি, যে তথ্যটি (নির্দেশনাগুলো) আপনাদের দেয়া হয়েছে সেগুলো নেয়া হয়েছে অ্যান্ডু কার্নেগির কাছ থেকে। তিনি একটি ইস্পাত কারখানায় একজন সাধারণ শ্রমিক হিসেবে (কর্মজীবন) শুরু করেছিলেন। দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় জীবন শুরু করা সত্ত্বেও উপরোক্ত সূত্রগুলো কাজে লাগানোর কারণে এটা তাঁকে শত মিলিয়ন ডলারের মালিক বানিয়ে দেয়।

এটা জেনে আপনি হয়তো আরও উপকৃত হবেন যে, এই ছয়টি ধাপ থমাস এ. এডিসনও মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি তাঁর দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তা শুধু অর্থ উপার্জনেই দেখাননি, বরং এই ছয়টি ধাপ ব্যবহার করে যে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন করা যায় তা তিনি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।

এই ধাপগুলো অনুসরণ করতে কোনো ‘কঠোর পরিশ্রম’ করা লাগে না। এগুলোর জন্য কোনো কিছু উৎসর্গও করতে হয় না। এগুলো অনুসরণ করলে আপনি অন্যের কাছে হাস্যকর কিংবা আপনি সবকিছু সহজেই বিশ্বাস করে ফেলেন এমন ব্যক্তিতে পরিণত হবেন না। এমনকি এই ধাপগুলো অনুসরণ করতে আপনাকে অনেক বেশি শিক্ষিত হতে হবে না। কিন্তু সফলতার সাথে এই সূত্রগুলো অনুসরণ করতে হলে আপনার যথেষ্ট কল্পনাশক্তি থাকতে হবে, যাতে আপনি দেখতে ও বুঝতে পারেন যে, ধনী হতে পারাটাকে সুযোগ, ভালো ভাগ্য এবং অদৃষ্টের ওপর ছেড়ে দেয়া যায় না। আপনাকে অবশ্যই অনুধাবন করতে হবে যে, যাঁরা বিরাট সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তাঁরা অর্থ অর্জনের আগে প্রথমে নিশ্চিতভাবে কিছু স্বপ্ন দেখেছেন, আশা করেছেন, চেয়েছেন, আকাংক্ষা করেছেন এবং পরিকল্পনা করেছেন।

আপনি সম্ভবত ভালোভাবেই জানেন যে, ঠিক এই মুহূর্তে আপনি ধনী হতে পারবেন না, যদি না আপনি সেই অর্থ পাওয়ার আকাংক্ষাকে জাগিয়ে তুলতে পারেন এবং বিশ্বাস করছেন যে, আপনি সেই অর্থ পাবেনই।

আপনি সম্ভবত আরও ভালোভাবেই জানেন যে, সভ্যতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব মহান নেতাই স্বপ্নদর্শী ছিলেন।

খ্রিষ্টান ধর্ম বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে সর্বাধিক সম্ভাবনাময়ী ক্ষমতা, কারণ এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তীব্র স্বপ্নদর্শী। শারীরিকরূপে রূপান্তর হওয়ার আগে মন ও আত্মার বাস্তব অবস্থা দেখার ক্ষেত্রে তাঁর ছিল (তীক্ষ্ণ) দৃষ্টি ও কল্পনাশক্তি।

যদি আপনি বিরাট পরিমাণের অর্থ আপনার কল্পনায় না দেখেন, তাহলে আপনি কখনোই আপনার ব্যাংক-ব্যালেন্সে তা দেখতে পাবেন না।

এখন আমরা যারা ধনী হওয়ার প্রতিযোগিতায় রয়েছি, আপনি জেনে উৎসাহিত হবেন, যে পরিবর্তিত বিশ্বে আমরা বসবাস করছি তা চায় নতুন ধারণা (আইডিয়া), কাজ করার নতুন পথ, নতুন নেতা, নতুন উদ্ভাবক, শেখার নতুন পদ্ধতি, বাজারজাতকরণের নতুন পদ্ধতি, নতুন বই, নতুন সাহিত্য, রেডিওর জন্য নতুন ফিচার, টেলিভিশনের জন্য নতুন ধারণা (আইডিয়া)।

এসব (পরিবর্তিত) চাহিদা নতুন ও ভালো কিছুর জন্য। এসব জয় করার জন্য একজন ব্যক্তির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট গুণ থাকতে হবে, আর তা হচ্ছে উদ্দেশ্যের নির্দিষ্টতা। এছাড়া থাকতে হবে সে যা চায় সে বিষয়ে (পর্যাপ্ত) জ্ঞান এবং এটি পাওয়ার জন্য তীব্র আকাংক্ষা।

(মার্কিন) ব্যবসায়ে মন্দা নির্দেশ করে একটি যুগের শেষ হয়েছে এবং আরেকটি যুগের জন্ম নিচ্ছে। এই পরিবর্তিত বিশ্ব চায় সেই সকল সত্যিকারের স্বপ্নদর্শীদের, যারা তাদের স্বপ্নকে কর্মে পরিণত করবেন। এই সত্যিকারের স্বপ্নদর্শীরাই সভ্যতার পথ প্রদর্শক হিসেবে ছিলেন এবং থাকবেন।

আমরা যারা ধনী হওয়ার আকাংক্ষা পোষণ করি, আমাদের মনে রাখা উচিত যে, এই বিশ্বের সত্যিকারের নেতারা সবসময় পৌরুষদীপ্ত ছিলেন, যাঁরা  অনুভবনীয় ও অদেখা শক্তিকে তাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করেছেন। সেই শক্তিগুলোকে (বা চিন্তার তরঙ্গশক্তিকে) রূপান্তর করেছেন সুউচ্চ ভবন, শহর, কারখানা, বিমান, অটো-মোবাইল এবং সম্ভাব্য সকল আকারে, যাতে মানুষের জীবন আরও আরামপ্রদ হয়ে ওঠে।

আজকে স্বপ্নদর্শীদের যে দুটি বাস্তবিক গুণ থাকা দরকার তা হলো ধৈর্য ও উদার মন। যাঁরা নতুন ধারণাকে (আইডিয়া) গ্রহণ করতে ভয় পায়, তাঁরা শুরু করার আগেই অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। (পরিবেশ) অগ্রদূতদের জন্য আর কখনো এতটা অনুকূলে ছিল না, যেমনটি আজ রয়েছে। সত্যিই তো, আজকে আমাদেরকে আর সেই বনে-জঙ্গলে ভরা ভূমি (নতুন করে) জয় করতে হবে না, যেমনটা করতে হতো মালটানার গাড়ির দিনগুলোতে। কিন্তু এখন বিশাল আকারের ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং কল-কারখানা গড়ে তুলতে হবে এবং (জীবনকে) নতুনের পথে নির্দেশিত করতে হবে এবং (আগের চেয়ে) আরও ভাল উপায়ে (তা করতে হবে)।

ধন-সম্পদ অর্জনে আপনি যে পরিকল্পনা করবেন, তাতে এমন কাউকে নিবেন না যে আপনার স্বপ্নকে ভর্ৎসনা করবে। পরিবর্তিত এই বিশ্বে বড় বাধাগুলোকে জয় করার জন্য আপনাকে অবশ্যই অতীতের অগ্রদূতদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিতে হবে, যাঁদের স্বপ্ন সভ্যতাকে সব দিয়েছিল – যার যে মূল্য সে অনুযায়ী। এই সাহসই আমাদের নিজ দেশের জীবনে রক্তের মতো বয়ে চলেছে – আপনার এবং আমার সুযোগ রয়েছে আমাদের নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করার এবং আমাদের প্রতিভাকে বাজারজাত করার।

আমরা যেন ভুলে না যাই, (ক্রিস্টোফার) কলম্বাস এক অজানা বিশ্বের স্বপ্ন দেখেছিলেন, এই রকম একটি বিশ্ব আবিষ্কারের নেশায় নিজের জীবনবাজি রেখেছিলেন এবং (অবশেষে সেই দেশটি) তিনি আবিষ্কার করেছিলেন।

প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ কোপারনিকাস বিশ্বের নানান রূপ দেখার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং তিনি তা দেখাতে (বা উন্মোচন করতে) সক্ষম হন। তিনি যখন সেই বিশ্ব জয় করে দেখালেন তখন তাঁকে কেউ ‘অবাস্তববাদী’ বলে গাল পাড়েনি। বরং তার পরিবর্তে পৃথিবী তাঁর বন্দনা করেছে। এটা আরও একবার প্রমাণ করে যে, “SUCCESS REQUIRES NO APOLOGIES, FAILURE PERMITS NO ALIBIS.”

আপনি যে কাজটি করতে যাচ্ছেন সেটি যদি (আপনার কাছে) সঠিক (মনে) হয় এবং কাজটিতে আপনার বিশ্বাস থাকে, তাহলে আপনি এগিয়ে যান এবং কাজটি করুন। আপনার স্বপ্নকে ছড়িয়ে দিন। কোনো কাজে সাময়িক বাধা আসার পর লোকজন কী বললো সেটি আমলে নেবেন না। সম্ভবত সেই সব লোকেরা জানে না যে, ‘প্রত্যেকটি ব্যর্থতাই তার সমান একটি সাফল্যের বীজ নিয়ে আসে’।

Image Course: moneysmartguides.com

হেনরি ফোর্ড (প্রথমে ছিলেন) একজন দরিদ্র ও অশিক্ষিত মানুষ। তিনি একটি ‘হর্সলেস ক্যারেজ’ বা ঘোড়াবিহীন গাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। অনুকূল পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়াই তাঁর সামনে যেসব যন্ত্রপাতি ছিল তা নিয়েই কাজে নেমে পড়লেন। আর এখন তাঁর সেই স্বপ্নের সাক্ষ্য সারা পৃথিবীকে বেঁধে ফেলেছে। আজ পর্যন্ত যত লোক এসেছে তাঁদের মধ্যে তিনিই সম্ভবত (স্বপ্নের) চাকাগুলোকে কর্মে পরিণত করেছেন। কারণ তিনি তাঁর স্বপ্ন পূরণে কখনো ভয় পেতেন না।

থমাস আলভা এডিসন এমন একটি বাতি তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা বিদ্যুৎ দিয়ে চলবে। তিনি তাঁর স্বপ্নকে কার্যে রূপান্তর করার জন্য প্রথমে প্রায় দশ হাজার বার ব্যর্থ হন, তারপরও নিজ অবস্থানে দাঁড়িয়েছিলেন (বা দৃঢ় ছিলেন)। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত (নিজ অবস্থানের ওপর) দাঁড়িয়েছিলেন, যতক্ষণ না তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবিক রূপ দেয়া যায়। (এ থেকে প্রমাণিত হয় যে) প্রকৃত স্বপ্নদর্শীরা কখনো কোনো কাজ ছেড়ে দেন না!

ওয়েলান একটি চেইন অব সিগার স্টোর (বড় দোকান) গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন এবং তিনি তাঁর স্বপ্নকে কার্যে পরিণত করেন। বর্তমানে (১৯৩০ সালের দিকে) ইউনাইটেড সিগার স্টোর আমেরিকার সেরা একটি কর্ণারে পরিণত হয়েছে।

আব্রাহাম লিংকন কৃষ্ণাঙ্গদের মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি সেই স্বপ্নকে কার্যে রূপান্তর করার জন্য নেমে পড়েন। যদিও তিনি তাঁর স্বপ্নের বাস্তবতা – উত্তর ও দক্ষিণের মানুষের মাঝে সৃষ্ট বন্ধন দেখে যেতে পারেননি।

রাইট ভাতৃদ্বয় এমন একটি একটি যন্ত্র তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা (মানুষকে নিয়ে) আকাশে উড়ে বেড়াবে। আজ বিশ্বব্যাপী যে কেউ তাঁদের স্বপ্ন পূরণের প্রমাণ দেখতে পাবে।

মার্কনি এমন একটি ব্যবস্থার (সিস্টেম) স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা ইথারের অনুভবনীয় শক্তিকে ধরতে পারবে। এটা সত্য যে, তাঁর সেই স্বপ্ন ব্যর্থ হয়নি। সারা পৃথিবীতেই আমরা আজ ওয়ারলেস ও রেডিও দেখতে পাচ্ছি। এটা (রেডিও) বিশ্বের প্রত্যেক জাতির মানুষকে অপরের প্রতিবেশী বানিয়ে দিয়েছে। এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে এমন একটি ব্যবস্থা (মিডিয়াম) দিয়েছে, যার মাধ্যমে তিনি একই সময়ে এবং অল্প সময়ের নোটিশে আমেরিকার সব মানুষের সাথে কথা বলতে পারেন।

আপনি জেনে খুবই অবাক হবেন যে, মার্কনি যখন ঘোষণা করলেন তিনি এমন একটি সূত্র আবিষ্কার করতে পেরেছেন যার মাধ্যমে তিনি কোনো তারের সাহায্য ছাড়াই এবং সরাসরি বাহ্যিক যোগাযোগের মাধ্যম ছাড়াই বাতাসের সাহায্যে (এক স্থান থেকে অন্য স্থানে) বার্তা প্রেরণ করতে পারবেন, তখন তাঁর বন্ধুরা তাঁকে (পাগল ভেবে  তাঁর মানসিক অবস্থা) পরীক্ষা করার জন্য মানসিক হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল।

বিশ্ব এখন নতুন নতুন আবিষ্কার দেখে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আর যাঁরা বিশ্বকে নতুন ধারণা (আইডিয়া) দেন, সেই সব স্বপ্নদর্শীরা কোনো পুরস্কারের আশা করেন না।

‘বেশিরভাগ বড় আবিষ্কারগুলোই প্রথমে, কিছু সময়ের জন্য ছিল কেবলই একটি স্বপ্ন।’

‘একটি বীজের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকে (বিশাল) এক ওক গাছ। পাখিরা অপেক্ষা করে ডিমের ভেতর এবং আমাদের আত্মার সবচেয়ে বড় দর্শনটাই বেরিয়ে আসে একটি জাগ্রত দেবদূত হয়ে। (মূলত) স্বপ্নগুলো হলো বাস্তবতার চারাগাছ।’

জেগে উঠুন এবং নিজেকে প্রকাশ করে বলুন যে, আপনিও এই পৃথিবীর একজন স্বপ্নদর্শী। আপনার তারকাগুলো (স্বপ্ন) এখন উদয় হচ্ছে। বিশ্বমন্দা আপনার জন্য সেই সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে, যার জন্য আপনি অপেক্ষা করছিলেন। এটা মানুষকে শিখিয়েছে নম্রতা, ধৈর্য এবং উদার মানসিকতা।

বিশ্ব আজ বহু সুযোগে পরিপূর্ণ, যা আগের স্বপ্নদর্শীরা জানতেন না।

একজন স্বপ্নদর্শীর যাত্রা শুরু হয় একটি তীব্র আকাংক্ষার মধ্য দিয়ে, যাকে কার্যে পরিণত করতেই হবে। উদাসীনতা, আলস্য কিংবা উচ্চাকাক্সক্ষার অভাবের মধ্যে স্বপ্ন জন্ম নেয় না।

আপনি হয়তো (কোনো কারণে) হতাশ হয়েছেন, মন্দায় সময় পরাজয়ের মুখে চলে গিয়েছেন, আপনি অনুভব করছেন যে, আপনার বিরাট হৃদয় ভেঙে চুরমার হয়ে রক্তাক্ত হয়ে গেছে। সাহস সঞ্চার করুন, এই সকল অভিজ্ঞতা আপনাকে আধ্যাত্মিক ধাতুতে পরিণত করবে, যাকে অর্থ-সম্পদ দিয়ে তুলনা করা যায় না।

এই বিষয়ও মনে রাখবেন যে, যারাই জীবনে সফল হয়েছেন, তারা প্রায় সবাই বাজেভাবে (তাদের যাত্রা) শুরু করেছিলেন এবং লক্ষ্যের কাছে পৌঁছার আগে তাদের বহু হৃদয়-ভাঙা সংগ্রাম পাড়ি দিতে হয়েছে। যারা সফল হয়েছেন কিছু সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার পর তাদের (জীবনে) বিশেষ মোড় (টার্নিং পয়েন্ট) এসেছে, যার মাধ্যমে তারা তাদের ‘অন্য গুণাবলি’ সম্পর্কে জানতে পেরেছেন।

(ইংরেজ লেখক) জন বানিয়ান-এর লিখিত ‘দ্য পিলগ্রিমস প্রগ্রেস’ (The Pilgrim’s Progress) ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম সেরা এক সৃষ্টিশীল রচনা। বানিয়ান এই বইটি লিখেছিলেন ধর্মীয় কোনো একটি বিষয়ে তাঁর ভিন্নমতের কারণে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে জেলে যাওয়ার পর।

ও হেনরি তাঁর ভেতর ঘুমিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হন যখন তিনি বড় ধরনের দুর্ভাগ্যের মুখে পড়েন এবং ওহাইও রাজ্যের কলম্বাসের একটি জেলে কারারুদ্ধ ছিলেন। দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে তিনি যখন জেলখানায় নিক্ষিপ্ত হন, তখন তিনি তাঁর ভেতরের ‘অন্য মানুষে’র সাথে পরিচিত হন এবং কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে নিজেকে একজন লেখকরূপে আবিষ্কার করেন। অথচ দুঃখজনকভাবে তিনি ছিলেন (আইনের দৃষ্টিতে) অপরাধী এবং নির্বাসিত একজন মানুষ।

জীবন বড়ই অদ্ভুত এবং অবিরত পরিবর্তনশীল। অসীম বুদ্ধিমত্তার (ঈশ্বর প্রদত্ত জ্ঞান) পথগুলো এতটাই অদ্ভুত যে, নিজ মেধাকে আবিষ্কার করার আগে এবং কল্পনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ধারণাগুলো (আইডিয়া) তৈরি করার নিজস্ব ক্ষমতা পাওয়ার আগে ব্যক্তিকে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রণা সহ্য করার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

বিশ্ববিখ্যাত আবিষ্কারক ও বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসন ছিলেন সাধারণ একজন টেলিগ্রাফ চালক (অপারেটর)। লক্ষ্যে পৌঁছার আগে তিনি অসংখ্যবার ব্যর্থ হয়েছিলেন। অবশেষে তিনি তাঁর ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা প্রতিভাকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হন।

চার্লস ডিকেন্স (তাঁর জীবন) শুরু করেন কালো পাত্রে পেস্ট লেভেল (নামপত্র) লাগানোর (কাজের) মধ্য দিয়ে। তাঁর প্রথম প্রেমের হৃদয় বিদারক ঘটনা তাঁর মনের গভীরে নাড়া দেয় এবং এটাই তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা লেখকে রূপান্তরিত করে। সেই হৃদয় বিদারক ঘটনা প্রথম লিপিবদ্ধ করেন ডেভিড কপারফিল্ড। ভালোবাসার হতাশামূলক ঘটনায় সাধারণত পুরুষরা মদ্যপানের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং নারীরা দুর্বিষহ জীবন-যাপন করেন। কারণ বেশিরভাগ মানুষই কখনো শিখেনি কীভাবে তাঁদের তীব্র অনুভূতিগুলোকে গঠনমূলক উপায়ে স্বপ্নে রূপান্তর করা যায়।

জন্মের কিছু সময় পরেই হেলেন কিলার বধির, বোবা ও অন্ধ হয়ে যান। তাঁর এতো বড় দুর্ভাগ্য সত্ত্বেও তিনি তাঁর নাম ইতিহাসের পাতায় অমোচনীয়ভাবে লিখে গেছেন। তাঁর পুরো জীবন এই সাক্ষ্যই দেয় যে, কেউই কখনো পরাজিত হয় না, যতক্ষণ না পরাজয়কে বাস্তবে স্বীকার করে নেয়া হয়।

রবার্ট বার্নস ছিলেন একজন অশিক্ষিত, গ্রাম্য বালক। তিনি দারিদ্র্যের অভিশাপে পিষ্ট ছিলেন এবং একজন ঝগড়াটে মধ্যপ ব্যক্তি হিসেবে বেড়ে উঠতে থাকেন। তাঁর এই ধরনের জীবন-যাপনের কারণে পৃথিবীর রূপ আরও ভাল হয়েছে। কারণ তিনি সুন্দর সুন্দর চিন্তাগুলো তাঁর কবিতায় লিপিবদ্ধ করেছেন এবং কাঁটা স্থাপন করে সেই জায়গায় একটি গোলাপ রোপণ করেছেন।

বোকার টি. ওয়াশিংটনের জন্ম হয় এক দাসরূপে। তাঁকে জাত ও বর্ণের কারণে নানা অসুবিধা পোহাতে হয়েছিল। যেহেতু তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল, সব সময় ও সব বিষয়ে তাঁর ছিল উন্মুক্ত মন, ছিলেন একজন স্বপ্নদর্শী মানুষ, সেহেতু তিনি (তাঁর) পুরো জাতির ওপর চমৎকার চাপ রেখে গেছেন।

বেথোভেন ছিলেন বধির, মিল্টন ছিলেন অন্ধ। কিন্তু তাঁদের নামগুলো আজীবন (ইতিহাসের পাতায়) রয়ে যাবে। কারণ তাঁরা স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং তাঁদের স্বপ্নগুলোকে পরিকল্পিত চিন্তায় রূপান্তরিত করেছিলেন।

পরবর্তী অধ্যায়ে যাওয়ার আগে, আপনার মনে আশা, আস্থা, সাহস ও ধৈর্যের আলো প্রজ্জ্বলিত করুন। যদি আপনার মনে এগুলো সৃষ্টি হয় এবং যে সূত্রগুলো (উপরে) বলা হয়েছে সে অনুযায়ী কাজ করার অনুভূতি তৈরি হয়, তাহলে আর বাকি সবকিছু আপনার কাছে চলে আসবে, যখন আপনি সেগুলোর জন্য প্রস্তুত হবেন।

কোনো একটা কিছু চাওয়া এবং সেটা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কেউই কোনো একটা কিছুর জন্য প্রস্তুত হতে পারে না, যতক্ষণ না সে বিশ্বাস করে যে সে এটা অর্জন করতে পারবে। (কোনো কিছু অর্জনের জন্য) মনের অবস্থার ওপর বিশ্বাস থাকতে হবে, আশা বা চাওয়াই যথেষ্ট নয়। বিশ্বাসের জন্য প্রয়োজন উন্মুক্ত (উদার) মন। আবদ্ধ মন আপনাকে আস্থা, সাহস এবং বিশ্বাস অর্জনে উৎসাহ যোগাবে না।

মনে রাখবেন, জীবনে উচ্চাশা, প্রাচুর্য ও উন্নতি চাইতে তেমন কোনো প্রচেষ্টার দরকার হয় না, যতটা দরকার হয় দুর্দশা ও দারিদ্র্যকে মেনে নিলে।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন সূচীপত্র থেকে প্রকাশিত নেসার আমিন এর অনুবাদে নেপোলিয়ন হিল এর “থিংক অ্যান্ড গ্রো রিচ” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

Featured Image: mashvisor

আপনার মন্তব্য লিখুন