Skip links

মুগ্ধতায় ইমাম গাজ্জালি

ইলহাম থেকে প্রকাশিত মাসুদ শরীফের "মুগ্ধতায় ইমাম গাজ্জালি" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 4 মিনিট

অকাজে ব্যস্ততা

ইমাম গাজ্জালির উদ্ধৃতি:

দুনিয়ার ব্যাপারে নিরাসক্ত থেকে পূর্ণ হয় ধার্মিক মানুষ। এ ধরনের মানুষেরা আল্লাহর খুব অন্তরঙ্গ। তাদের কাছে সেজন্য সাধারণ ধার্মিক মানুষদের ভালো ভালো কাজও মন্দ!

দুনিয়াবিরাগী এবং দুনিয়াকামী—উভয়েই দুনিয়াতে কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু সেই ব্যস্ততা আল্লাহ বাদে অন্য কিছুতে মানে নিজের আর মহীমান আল্লাহর মাঝে এক পাঁচিল তুলে রাখা। নইলে এমনিতে তো আল্লাহ আর আমাদের মাঝে কোনো দুরত্ব নেই। তিনি তো আমাদের ঘাড়ের রগের চেও কাছে। জাগতিক কোনো জায়গায় তিনি বন্দি নন যে তাঁর আর আমাদের মাঝে কোনো বাধার পাঁচিল তৈরি হতে পারে। তাঁকে ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হওয়া মানেই তাই অদৃশ্য এক পাঁচিলের আবছায়া। নিজেকে নিয়ে, নিজের কামনা নিয়ে ব্যস্ত হওয়া মানে আল্লাহ বাদে অন্য কিছু নিয়ে ব্যস্ত হওয়া। যতক্ষণ এই ব্যস্ততা থাকবে, ততক্ষণ সে আবছায়া কাটবে না। আত্মপ্রেমে মজে থাকা মানুষ যেমন আল্লাহ থেকে দূরে, আত্মঘৃণায় ডুবে থাকা ব্যক্তিও তেমন আল্লাহ থেকে দূরে। দুধরনের লোকই তাঁকে বাদে অন্য কিছুতে নিমজ্জিত।

সূত্র: ইহিয়া উলুমিদ-দিন, বৈরুত: দারুল-মাআরিফা, পৃষ্ঠা ৩।

শাইখ মুস্তাফা আবু সাওয়ির ব্যাখ্যা:

মহীয়ান গরীয়ান আল্লাহ আমাদের সবচে কাছে। জাগতিক স্থানকালের গণ্ডিতে তিনি আবদ্ধ নন। তাঁর অসীম জ্ঞানে তিনি সবসময় সাথে আছেন আমাদের। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমরা সবসময় হয়তো তাঁর সাথে থাকতে চাই না। ছোটখাটো নিত্যনৈমত্তিক বিষয় নিয়ে আমাদের মনোযোগ সরে যায় তাঁর থেকে। একদল লোক বস্তুবাদে মজে থেকে দূরে থাকে। আরেক দল লোক বস্তুবাদকে ঘৃণা করেও দূরে থাকে। কী আশ্চর্য মানুষ!

যে-চিন্তা, যে-কাজ আল্লাহর জন্য করা হয় না, সেটাই তাঁর আর আমাদের মাঝে দেয়াল। দুনিয়ার বিষয়আশয় সম্বন্ধে নিরাসক্তি তাই আমাদের নিয়ে যায় আল্লাহর নিকটে। আমাদের চরিত্র হয় এত নিখুঁত, দুনিয়াবি চিন্তা হয় মামুলি।

মূলত আমাদের কামনা, আমাদের খায়েশ তাঁর থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দেয়। আমাদের মাঝে অনেকে আছেন, নিজেকে যারা বড় ভালোবাসেন। আত্মগরিমায় ভোগেন তারা। কথায় কথায় ‘আমি’। প্রতিটা কাজে ‘আমি’। সেলফি, ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রামে আমরা ব্যস্ত নিজেদের আদর্শ ‘মূর্তি’ তৈরিতে। মানুষের কল্যাণের কোনো চিন্তা এতে থাকে না। এসবেই ঘুরপাক খায় তাদের দুনিয়া। এদের ঠিক বিপরীত প্রান্তে আছেন আরেকদল মানুষ, নিজেদের নিয়ে যারা হতাশ।

এদের উভয়দলের সমস্যা হলো বিশাল এই মহাজগতের বিপুলা নিদর্শন তারা দেখতে পান না। তারা বুঝতে পারেন না, এগুলো সব নির্দেশ করে মহান আল্লাহর দিকে। অযাচিতভাবে যারা ‘ভালোবাসেন’ এবং ‘ঘৃণা করেন’, কৃত্রিম এই বাধার নিগড় থেকে তাদের মুক্ত করতে হবে নিজেদের। সব ধরনের অকাজের ব্যস্ততা ফেলে ফিরে যেতে হবে সুমহান আল্লাহর রাজদুয়ারে।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন ইলহাম থেকে প্রকাশিত , মাসুদ শরীফ অনুদিত মুস্তাফা আবু সাওয়ির “মুগ্ধতায় ইমাম গাজ্জালি” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

পরপারের আবাদ

ইমাম গাজ্জালির উক্তি:

অন্তরগুরুরা জানেন, এই পৃথিবী পরজীবনের ক্ষেত। অন্তর হলো মাটি। সেই মাটিতে বোনা হয় ইমানের চারা। আনুগত্যমূলক কাজগুলো দিয়ে জমি চাষ হয়, আগাছা পরিষ্কার হয়, সেচের জন্য তৈরি করা হয় নালা। দুনিয়াতে নিমজ্জিত বেখেয়ালি অন্তর যেন লবণাক্ত জলাভূমি। কোনো ফসল সেখানে ফলে না।

বিচারদিনে, ফসল তোলার দিনে, যে যতটুকু জমি চাষ করেছে, সে ততটুকু ফসলই তুলতে পারবে। আর এই জমিতে ইমানের ফসল ছাড়া আর কোনো ফসল ফলবে না।

মন অপবিত্র থাকলে, চরিত্র খারাপ থাকলে ইমান খুব একটা কল্যাণকর হয় না। ঠিক যেমন লবণাক্ত জলাভূমিতে কোনো ফসল হয় না।

ফসল ফলার ব্যাপারে একজন চাষীর আশার সঙ্গে তুলনা করা যায় ক্ষমাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তির আশাকে। একজন চাষী প্রথমে উর্বর জমি খোঁজেন। এরপর তাতে সুস্থ চারা লাগান। সময়ে সময়ে সেচ দেন। আগাছা পরিষ্কার করেন। চারাগাছ বড় হতে বাধার সৃষ্টি করতে পারে, এমন সবকিছু থেকে ক্ষেতকে রক্ষা করেন।

এরপর সুমহান আল্লাহর দিকে হাত মেলে তাকিয়ে থাকেন বজ্রপাত বা ফসলের কোনো রোগ যেন ক্ষেতের ক্ষতি না করে। এই অপেক্ষার নাম আশা।

কিন্তু চাষী যদি উঁচু লবণাক্ত জলাভূমিতে আবাদ করতেন, যেখানে পানি পৌঁছে না; তিনি যদি চারাগাছের কোনো যত্ন না নিতেন, কিন্তু ঠিকই বসে বসে অপেক্ষা করতেন, তা হলে তার এই অপেক্ষার নাম আশা নয়; নির্বুদ্ধিতা, বিভ্রম।

তিনি যদি পানির সুবিধাহীন অনাবৃষ্টি-প্রবণ উর্বর জমিতে চাষ করে বৃষ্টির অপেক্ষায় বসে থাকেন, তার এই অপেক্ষাও আশা নয়; আকাশকুসুম কল্পনা।

২০. ইহিয়া উলুমিদ-দিন, বৈরুত: দারুল-মাআরিফা, পৃষ্ঠা ১৪৩।

শাইখ মুস্তাফা আবু সাওয়ির ব্যাখ্যা

মানুষের অন্তর দুরকমের। একধরনের অন্তর উর্বর জমির মতো। এই অন্তরে ফসল ফলার সম্ভাবনা ভালো। এমন জমিতে চাষ করে আশা করা যৌক্তিক। তবে অমন জমিতেও কেউ যদি ঠিকমতো সেচ না দেন, ফসলের যত্ন না নেন, অমন জমি উর্বর হলেও সেখানে ফসলের আশা করা আকাশকুসুম কল্পনা।

আরেকধরনের অন্তর হলো লবণাক্ত জলাভূমির মতো। এমন জমিতে ফসল বোনার চিন্তা করাও বোকামি।

জন্মের সময় প্রতিটি শিশুর অন্তর থাকে পরিচ্ছন্ন উর্বর। কিন্তু একসময় তার বাবা-মা এবং সামাজিক পরিবেশের প্রভাবে তার অন্তরে জমতে থাকা আগাছা। জমি যতই উর্বর হোক, চারা যদি নষ্ট হয়, কী হবে তাতে? ক্ষয়রোগে ধরা বীজ যেন অসুস্থ চিন্তার মানুষের অন্তর।

সুন্দর আচরণের বীজ খুঁজে পাওয়া যাবে কুরআন-সুন্নায়। আল্লাহর আনুগত্য করে, ভালো ভালো কাজ করে, নিয়মিত তাঁর স্মরণ করে অন্তর পরিশুদ্ধ রেখে আমরা সে-বীজ বপন করতে পারি আমাদের অন্তর-জমিনে। এই বীজের ফসল তোলা যাবে পরজীবনে।

একটা চারাগাছের বেড়ে ওঠার বিভিন্ন পর্যায়ের তুলনা করে এ-জীবনের বাস্তবতা মেলে ধরেছে কুরআন: ﴾শোনো, দুনিয়ার জীবন তো কেবল এক ধোঁকা, খেলতামাশা আর মোহ। নিজেদের মধ্যে টাকাপয়সা আর লোকবলের নোংরা প্রতিযোগিতা। এ যেন পানির ছোঁয়ায় সজীব হয়ে ওঠা ফসল—দেখে কৃষকের মুখে সে কী আনন্দ। কিন্তু একসময় তো ঠিকই তা শুকিয়ে যায়। খড় রঙে পরিণত হয় খড়কুটোয়। পরজীবনে যেমন আছে ভয়ংকর শাস্তি, তেমনি আছে আল্লাহর ক্ষমা আর সন্তুষ্টি। দুনিয়ার এ জীবন তো নিছক এক মায়া।﴿ [৫৭:২০]

আল্লাহর ক্ষমাকাঙ্ক্ষীদের হওয়া উচিত বুদ্ধিমান চাষীদের মতো। প্রথমে সে সুস্থ বীজ (ভালো ভালো কাজ) বপন করে। এরপর আগাছা পরিষ্কার করে (অপরাধ থেকে দূরে থাকে) অপেক্ষায় থাকে ফসলের (জান্নাতের)।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন ইলহাম থেকে প্রকাশিত , মাসুদ শরীফ অনুদিত মুস্তাফা আবু সাওয়ির “মুগ্ধতায় ইমাম গাজ্জালি” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

Featured Image: yenihaberden.com

আপনার মন্তব্য লিখুন