Skip links

সাইরাস: পাহাড় বেয়ে নেমে আসা বিপ্লবের বারুদ

আদর্শ থেকে প্রকাশিত আহমেদ দীন রুমির "সাইরাস: একজন জাতির পিতা, আইনপ্রণেতা ও মুক্তিদাতার জীবন" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 6 মিনিট

আর্টিকেলটি আপনি চাইলে অডিও পডকাস্ট হিসেবেও শুনতে পারেন:

অডিওটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক। অডিওটি শুনতে ভালো লাগলে সাবস্ক্রাইব করুন তার “ইতিহাসের গল্প” চ্যানেল এবং অনুসরণ করুন তার ইতিহাসের গল্প ফেসবুক পেজ

আনশান [১] ফিরে এসেছে সাইরাস। আগেও ফিরে এসেছিল একবার। বালক হিসেবে। সেই পালক পিতামাতা মিত্রাদেতেস আর তার স্ত্রী স্পাকোর কাছ থেকে। কিন্তু এবার আরও ভিন্নভাবে। সুঠাম শরীর, পরিপক্ব চিন্তাশক্তি, দুর্নিবার সাহস আর অপরিমেয় বিনয়ের সমাবেশ নিয়ে। ইতিমধ্যে আকিমেনিড গোত্রের অভিজাত ফারনাসপেসের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হলো তার। রাজধানী একবাটানায় এত দিন থাকার পরেও মিদিয়ার কারও সঙ্গে সাইরাসের বিয়ে হয়নি। অস্তাইজেস চাননি উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ভাগিদার তৈরি করতে। কন্যা পারসিক হলে মিদিয়ার মসনদের দিকে তাদের হস্তক্ষেপ পড়বে না। মিদিয়াবাসীও তাদের গ্রহণ করবে না।

একই সঙ্গে সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতী হওয়া মেয়েদের জন্য বিরল গুণ। পারসিক অভিজাত ফারনাসপেসের মেয়ে কাসান্দানা সেই গুণের অধিকারী। সাইরাসের সঙ্গে হৃদয়ের ভারসাম্য স্থাপনে বেগ পেতে হয়নি। ৫৫৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তার কোলে এক পুত্রসন্তানের আগমন ঘটে। পিতার প্রতি শ্রদ্ধা হিসেবে নাম রাখা হয় ক্যামবিসেস। পারস্যের লোকমুখে তখন সাইরাসের নাম। আর মিদিয়ার রাজধানীতে চলছে অন্য হিসাব-নিকাশ।

হারপাগাস বেঁচে আছে। শিশু সাইরাসকে হত্যা না করার দায়ে সন্তানহীন হওয়ার দণ্ডে দণ্ডিত সেই হারপাগাস [২]। দণ্ডিত নিজের প্রিয় পুত্রের গোশত খাওয়ার দণ্ডে। সেদিন চুপ করে সব হজম করে গেলেও অস্তাইজেসকে ক্ষমা করেনি। ব্যক্তিগত ক্ষোভটা তেতে ওঠে অস্তাইজেসের দিনকে দিন কঠোর হয়ে ওঠা শাসনব্যবস্থায়। দরবারের অনেকের মধ্যেই বেড়ে উঠছে অসন্তোষের বীজ। বাড়ছে দুঃশাসন আর নৈরাজ্য।

হারপাগাস দরবার এবং সেনাবাহিনীতে উচ্চতম পদে আসীন। তার ওপর ভরসা করেন রাজা। দরবারের অভিজাত কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করেন হারপাগাস। তাদের অভিমত খুব একটা আলাদা না। অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অবস্থানও কাছাকাছি। নেহাত সাহস নেই বলেই কেউ কিছু করছে না। রাজরক্ত থেকে যোগ্য উত্তরাধিকারী খুঁজে বের করা দরকার, এ বিষয়ে সবাই একমত।

যথার্থ হিসেবে মসনদের হকদার সাইরাস। কেবল পারসিক হওয়ার কারণে তখতের সমীকরণ অন্যদিকে হেলে গেছে। এগিয়ে গেছে অস্তাইজেসের ছোট মেয়ে আমিতিসের দুই পুত্র। সাইরাসের মা মান্দানার বোন আমিতিস। বোন আমিতিসের নামের সঙ্গে মিলিয়ে কন্যার নাম রেখেছিলেন অস্তাইজেস। বোনের বিয়ে হয় ব্যাবিলন সম্রাট নেবুকাদনেজারের সঙ্গে। কন্যার বিয়ে হয় সম্ভ্রান্ত মিদিয়ান বংশোদ্ভূত স্পিতামাসের সঙ্গে। কন্যাদানের সঙ্গে উপঢৌকন হিসেবে অস্তাইজেস তাকে রাজধানী মিদিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করেন। আমিতিসের দুই পুত্রের রক্তে আভিজাত্য। অথচ এখনো শিশু মাত্র। অস্তাইজেস মারা গেলে তাদের পক্ষে দায়িত্ব গ্রহণ করবে স্পিতামাস। সাইরাস মিদীয় না হওয়ার দরুন মসনদের দৌরাত্ম্যে অনুপস্থিত।

পারস্যে সাইরাসের সমাধি; Image Course: irannewswire.org

যোগ্যতা আর জনপ্রিয়তার দিক থেকেও সাইরাস অপ্রতিদ্বন্দ্বী। একবাটানায় থাকার সময়েই তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল হারপাগাসের। পারস্যে ক্রমবর্ধমান শক্ত অবস্থান তাকে আরও বিশ্বাসী করে তোলে। তা ছাড়া দুজনেই অস্তাইজেসের থেকে আঘাতপ্রাপ্ত। সাইরাসের কাছে নিয়মিত যাতায়াত করতে থাকে হারপাগাস। পাঠাতে থাকে বিভিন্ন উপহার ও ইনাম। নিয়মিত জানায় অস্তাইজেসের সীমা লঙ্ঘন আর স্বেচ্ছাচারের কথা।

মিদিয়ার অভিজাতদের মধ্য থেকে মাজারেসের মতো অনেকেই তাকে সমর্থনের আশ্বাস দেয়। আসলে এই আশ্বাসটা ছিল একরকম এগিয়ে আসা। মিদিয়া সাইরাসের মায়ের বংশ আর পারসিকরা পিতার। উভয়েই যদি সমান প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে সাইরাসকে মসনদে আনে, তাহলে ক্ষমতায় মিদিয়া এবং পারসিকদের সমান অংশগ্রহণ থাকবে। ঐকমত্যে পৌঁছানো অভিজাতরা এই অংশগ্রহণটাই চেয়েছে। চায়নি মিদীয়রা পারসিকদের দাসে পরিণত হোক। পরিস্থিতি একটা পর্যায়ে এনে হারপাগাস সাইরাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইল।

সাইরাস পারস্যে। রাস্তায় রাস্তায় পাহারা। কোনো রকম সন্দেহের উদ্রেক ঘটানো ছাড়া কীভাবে সাইরাসকে সংবাদ দেওয়া যায়? হঠাৎ যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল হারপাগাসের মাথায়। একটা খরগোশ এনে খুব সতর্কতার সঙ্গে হত্যা করা হলো। যতটা সম্ভব পশমে দাগ না লাগিয়ে ফাড়লো পেট। ঢুকিয়ে দেওয়া হলো জরুরি চিঠি। চিঠিতে নিজের বক্তব্য আর মিদিয়ার পরিস্থিতি জানান দেওয়া। পেটটা সেলাই করে বিশ্বস্ত চাকরের হাতে তুলে দিল হারপাগাস। একটা জাল দিয়ে দিল সঙ্গে। বাইরে থেকে শিকারির মতো দেখায়। নির্দেশনা ছিল খরগোশটি যেন নিজে গিয়ে সাইরাসকে উপহার দেয়। সাইরাস যেন নিজে কাটে। কাটার সময় যেন পাশে কেউ না থাকে।

যথাসময়ে হাজির হলো দূত। হারপাগাসের কথা অনুসারেই কাজ হলো। সাইরাস খরগোশ গ্রহণ করে নিজের হাতে কাটে। পেট থেকে বের হয় গোপন পত্র। সাইরাস চোখ বোলাতে থাকে চিঠিতে।

‘ক্যামবিসেসের পুত্র সাইরাস, তুমি খোদার প্রিয়। এ জন্যই ভাগ্য তোমাকে মহান ভবিষ্যতের জন্য নির্বাচিত করেছে। না হলে শৈশবে অলৌকিকভাবে বেঁচে যেতে না। অস্তাইজেসকে শাস্তি দেওয়ার সময় হয়ে গেছে। সেদিন মতলব হাসিলে সে সফল হলে তোমার মৃত্যু হতো। তোমার বেঁচে থাকার জন্য আমি আর খোদা দায়ী। তোমার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হয়েছিল, তা নিশ্চয়ই তোমার অজানা নেই। এটাও ভুলে যাওনি যে, তোমাকে হত্যা না করে রাখালের হাতে তুলে দেয়ায় আমাকে কী পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে।

‘এখন যা বলছি মেনে নাও, অস্তাইজেসের গোটা সাম্রাজ্য তোমার। পারস্যবাসীদের বুঝিয়ে বিদ্রোহী করে তোলো। মিদিয়ার বিরুদ্ধে বেরিয়ে পড়ো অভিযানে। যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অস্তাইজেস আমাকেই সেনাপতি করুন কিংবা কোনো অভিজাত ব্যক্তিকে, তোমার তাতে অসুবিধা হবে না। অভিজাতরাই প্রথম তাকে ত্যাগ করে তোমার পক্ষে যোগ দেবে। সাহায্য করবে ক্ষমতা পরিবর্তনে। নিশ্চিত থাকো, আমাদের পক্ষ থেকে আমরা প্রস্তুত। এবার তোমার পালা। দ্রুত করো।’

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন আদর্শ থেকে প্রকাশিত আহমেদ দীন রুমির “সাইরাস: একজন জাতির পিতা, আইনপ্রণেতা ও মুক্তিদাতার জীবন” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

চিঠি পেয়ে যেন মহাসমুদ্রে পড়ল সাইরাস। অস্তাইজেসের দূত হয়ে কাদুসিদের কাছে যাওয়ার সময় ওয়েবারেসের কথা মনে পড়ে। পারসিকদের জেগে ওঠার কথা হচ্ছিল। আজ হারপাগাসের চিঠি। মঞ্চ প্রস্তুত করে যেন আহ্বান জানানো হচ্ছে তাকে। আনশানের জনগণের জাগরণ প্রয়োজন। অথচ ব্যাপারটা সরাসরি ঘোষণা করার মতো না। পারস্যে সফল বিদ্রোহের জন্য বুদ্ধি বের করল সাইরাস। একটা চিঠি লেখা হলো। বর্ণনার ধরনটা এমন যে, অস্তাইজেস তাকে পারস্য ফৌজের অধিনায়ক মনোনীত করেছেন। পারস্যের বিশেষ ব্যক্তিদের ডেকে পড়ে শোনালেন। একটি দিন ধার্য করে দেওয়া হলো। সব পারসিক পুরুষ সেদিন কুড়াল নিয়ে হাজির হবে।

হুকুম তামিল হলো। নির্ধারিত দিনে সবাই হাজির কুড়াল নিয়ে। তাদের নিয়ে বনের গভীরে প্রবেশ করল সাইরাস। কাটাবনে ঢাকা এবড়োথেবড়ো জায়গাটা সূর্যাস্তের আগেই সাফ করার হুকুম দিল। জমির আয়তন আঠারো থেকে বিশ ফার্লং। বাহিনী সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনিতে ডুবে রইল। কখনো গাছ কাটা, কখনো তা জ্বালিয়ে দেওয়া আবার কখনো জমি সমান করা। বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হয়নি বললেই চলে। খাবার দেওয়া হয়েছে নামমাত্র। রাতে কাজ শেষ হলে সবাইকে বিদায় দেওয়া হলো। পরের দিন গোসল করে আবার হাজির হতে হবে।

পরদিন সাইরাস ঘটাল অন্য আয়োজন। পিতার সব ভেড়া, বকরি ও গরু জমায়েত করল এক জায়গায়। জবেহ করে রান্নার ব্যবস্থা সাজানো হলো। সংগ্রহ করা হলো সবচেয়ে ভালো মদ ও রুটি। আমন্ত্রিত ব্যক্তিরা এসে দেখে এলাহি কাণ্ড। সব ধরনের খাবার থরে থরে রাখা। খেতে দেওয়া হলো ঘাসের ওপর। পারসিক জনতা সারাটা দিন পার করল ভোজ আর আমোদে। গতকালের পরিশ্রমের কারণে আজকের উচ্ছ্বাস যেন আরও বেশি অর্থপূর্ণ। সন্ধ্যার দিকে তাদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে সাইরাস। ‘কোন দিনটা ভালো লেগেছে, গতকাল নাকি আজ?’ প্রায় এক বাক্যে জানিয়ে দিল সবাই। প্রথম দিনটাকে পছন্দ আর দ্বিতীয় দিনকে অপছন্দ করার কোনো মানে নেই। দুইটা দিন এক রকম না। প্রথম দিন ছিল বিশ্রামবিহীন খাটুনি। আর দ্বিতীয় দিন বিরতিবিহীন আনন্দ। অবশ্যই তুলনায় দ্বিতীয় দিন শ্রেষ্ঠ।

এটাই প্রত্যাশা করেছিল সাইরাস। জোরালো ভাষায় ঘোষণা করল এবার, ‘হে পারস্যবাসী, নিয়তি তোমাদের এমন পরিস্থিতিতেই দাঁড় করিয়েছে। যদি তোমরা আমাকে অনুসরণ করো, এর চেয়ে হাজার গুণ সমৃদ্ধ হবে জীবন। সেখানে কোনো ধরনের দাসত্ব নেই। আর যদি আমাকে অমান্য করো, গতকালের মতো অজস্র কাজ হবে তোমাদের ভবিষ্যৎ। তোমাদের মুক্ত করার জন্য আমি বিধাতা কর্তৃক নিয়োজিত। হতে পারে মিদিয়া শক্তিশালী এবং বিশাল। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে তোমরা তাদের চেয়ে পিছিয়ে না। তোমাদের যা বলছি, তা সত্য। বিজয় তোমাদের। অস্তাইজেসের চাপিয়ে দেওয়া দাসত্বের জোয়াল ছুড়ে ফেলে দাও।’

মিদিয়ার অধীনতার বিরুদ্ধে পারসিকরা দীর্ঘদিন ধরে বিক্ষোভ প্রকাশ করেছে। শেষমেশ একজন অধিনায়ক পেল। স্বাধীনতার সম্ভাবনাকে মোবারকবাদ জানাল উৎসাহের সঙ্গে। প্রত্যেক গোত্রপতি সৈন্য ও অস্ত্র সংগ্রহে মনোযোগ দিল। যদিও এই সময় ক্যামবিসেস জীবিত; বস্তুত শাসনকর্তার আসনে সাইরাস। পিতা বয়সের ভারে শারীরিকভাবে অসুস্থ। তা ছাড়া রাজনৈতিকভাবেও সহজ মানুষ। পারসিকরা সাইরাসের আনুগত্যেই মিদিয়ার শাসন থেকে মুক্ত হতে বিদ্রোহের পতাকা তুলে ধরল।

টিকা

[১] আনশান পার্বত্য অঞ্চল। পারস্যের রাজধানী। পারস্য মিদিয়ার করদ রাজ্য।

[২] বহু আগে অস্তাইজেস হারপাগাসের হাতে শিশু সাইরাসকে তুলে দিয়ে হত্যা করতে বলে। হারপাগাস সেই আদেশ পালনে ব্যর্থ হয়। পরিণামে তার একমাত্র পুত্রকে হত্যা করে অস্তাইজেস। প্রাসাদে ভোজের আয়োজন করে সেই পুত্রের মাংস দিয়ে আপ্যায়ন করে পিতা হারপাগাসকে।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন আদর্শ থেকে প্রকাশিত আহমেদ দীন রুমির “সাইরাস: একজন জাতির পিতা, আইনপ্রণেতা ও মুক্তিদাতার জীবন” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

Featured Image: watchjerusalem.co.il

আপনার মন্তব্য লিখুন

  1. Not pleasant reading. felt like poor translation from english book.