Skip links

শক্তির সংরক্ষণশীলতা: পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক এক বিমূর্ত ধারণা

প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত উচ্ছ্বাস তৌসিফের অনুবাদে রিচার্ড ফাইনম্যানের "সিক্স ইজি পিসেস" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 28 মিনিট

শক্তি কী?

প্রকৃতিতে এমন একটা জিনিস ঘটে—আপনি চাইলে এটাকে নীতিও বলতে পারেন—যেটা প্রাকৃতিক সকল ঘটনার পেছনেই কলকাঠি নাড়ে। আজ পর্যন্ত এর কোনো ব্যতিক্রম পাওয়া যায়নি। আমাদের জানা মতে, এটা একেবারে শতভাগ সঠিক। এর নাম শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি। এই নীতি বলে, এমন একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ আছে—প্রকৃতিতে বিভিন্ন ধরণের পরিবর্তন হলেও যার মোট পরিমাণের কোনো পরিবর্তন হয় না। এই পরিমাণটিকে আমরা বলি ‘শক্তি’। এটা খুবই অ্যাবস্ট্রাক্ট বা বিমূর্ত ধরনের আইডিয়া। কারণ, এটা মূলত একটা গাণিতিক নিয়ম। অথচ এটা এমন এক সংখ্যাগত পরিমাণের কথা বলছে, কিছু একটা ঘটলেও যার কোনো পরিবর্তন হয় না।

এটা কিন্তু কোনো প্রক্রিয়া বা মেকানিজমের বর্ণনা না। এখানে নির্দিষ্ট করে কিছু বলাও হয়নি। শুধু একটা অদ্ভুত সত্যি এই যে, আমরা চাইলে হিসেব করে একটা সংখ্যাগত পরিমাণ বের করে নিতে পারি। তারপর চুপচাপ প্রকৃতিকে কারিকুরি করতে দেখতে পারি। এবং কারিকুরি শেষ হলে পরে হিসেব করলে আমরা দেখব, সেই সংখ্যাটা একই আছে। একটুও বদলায়নি। (সাদা ঘরের হাতির মতো আরকি। কী চাল, তা না জানলেও, অনেকগুলো চাল দেয়ার পরেও দেখা যাবে হাতিটা কোনো একটা সাদা ঘরেই আছে। এটাই দাবার নিয়ম।) পুরো আইডিয়াটাই যেহেতু বিমূর্ত, একটা উদাহরণ থেকে আমরা ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করব।

একটা বাচ্চার কথা ভাবুন। ধরা যাক, তার নাম ‘ডেনিস ভয়ংকর’! ওর কাছে কিছু ব্লক আছে, যেগুলো অবিনশ্বর এবং এদেরকে কোনোভাবে খন্ড করাও যাবে না। প্রত্যেকটা দেখতে হুবহু একরকম। ধরা যাক, ওর কাছে এরকম ২৮টা ব্লক আছে। মা ওকে ২৮টা ব্লকসহ একটা রুমে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন। দিনশেষে, কিছুটা কৌতুহল নিয়ে ওর মা গুণে দেখতে চাচ্ছিলেন, এখন আর কয়টা ব্লক আছে। খুব যত্ন করে ব্লকের সংখ্যা গোণার পর উনি খুবই বিষ্ময়কর একটা জিনিস আবিষ্কার করলেন— ডেনিস যত যাই করুক, ব্লকের সংখ্যা সেই ২৮টাই রয়ে যাচ্ছে। এরকম বেশ কয়েকদিন গেল। হঠাৎ একদিন উনি দেখলেন, কেবল ২৭টা ব্লক আছে। খুঁজে দেখা গেল, আরেকটা ব্লক কার্পেটের নিচে পড়েছিল। তারমানে, ব্লকের সংখ্যা যে একই আছে, সেটা বোঝার জন্য তাকে আগে সবকিছু খুঁজে দেখতে হয়েছে।

আরো কিছুদিন পর, একদিন দেখা গেল, কেবল ২৬টা ব্লক আছে। তদন্ত করে দেখা গেল, দিনের কোনো এক সময় জানালা খোলা হয়েছিল। বাকি ২টা ব্লক কোনোভাবে বাইরে পড়ে গেছে। একটু খোঁজাখুঁজি করার পর ব্লক ২টা বাইরেই পাওয়া গেল। আরেকদিন গুণতে গিয়ে ভদ্রমহিলা টের পেলেন, ব্লকের সংখ্যা ৩০ হয়ে গেছে! বেচারি খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। অনেক খোঁজ-খবরের পর জানা গেল, বাসায় ব্রুস এসেছিল। সে সাথে করে ওর ব্লকগুলো নিয়ে এসেছিল এবং তার মধ্যেকার দুটো ভুলে এখানেই ফেলে গেছে।

বাড়তি ব্লকগুলো সরিয়ে ফেলার পর ভদ্রমহিলা জানালা বন্ধ করে দিলেন। এমন ব্যবস্থা করলেন যেন ব্রুস আর আসতে না পারে। দেখা গেল, সবকিছু ঠিকঠাক ভাবেই চলছে। তারপর হঠাৎ একদিন গুণতে গিয়ে দেখেন, ব্লক আছে কেবল ২৫টা। রুমে একটা খেলনার বাক্স ছিল। উনি যখনই বাক্সটা খুলতে গেলেন, ডেনিস চিৎকার জুড়ে দিল, ‘আমার বাক্স খুলো না!’ বেচারি পড়লেন বিপাকে। বাক্স খুলে দেখারও উপায় নেই। কিন্তু কৌতুহল ঠিকই রাস্তা খুঁজে নেয়৷ মহিলা এক দারুণ বুদ্ধি করলেন। উনি জানতেন, প্রতিটা ব্লকের ওজন ৩ আউন্স। আর, আগে একবার বাক্সটা মেপে দেখেছিলেন তিনি। তখনো ডেনিসের ব্লক হারায়নি, ২৮টাই ওর কাছে ছিল। মহিলার মনে পড়ল, বাক্সটার ওজন ছিল ১৬ আউন্স। তাহলে, পরীক্ষা করার জন্য যেটা করতে হবে, তা হলো—প্রথমে বাক্সটা মেপে দেখতে হবে। সেখান থেকে ১৬ বিয়োগ করে ৩ দিয়ে ভাগ করতে হবে। তাহলে, ব্যাপারটা দাঁড়ালো:

(যে কয়টা ব্লক ছেলের কাছে আছে) + ((বাক্সের ওজন) – ১৬ আউন্স) / ৩ আউন্স = ধ্রুবক —– (৪.১)

তারপর আরেকদিন নতুন সমস্যা দেখা গেল। মানে, সমস্যা একই, কিছু ব্লক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, বাথটাবের ময়লা পানির লেভেল বা উচ্চতা কিছুটা বদলে গেছে। বাচ্চাটা আসলে কিছু ব্লক পানিতে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু পানি এতো ময়লা যে, ওর মাঝে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ভাবতে গিয়ে তিনি বুঝলেন, সূত্রটায় আরেকটা পদ যোগ করে পানির মধ্যে কয়টা ব্লক আছে, সেটা বের করে ফেলা যায়। উনি জানতেন, পানির আগের উচ্চতা ছিল ৬ ইঞ্চি। এবং প্রতিটা ব্লক পানিতে ফেললে এর উচ্চতা ১/৪ ইঞ্চি করে বেড়ে যায়। তাহলে নতুন সূত্রটা হবে:

(যে কয়টা ব্লক ছেলের কাছে আছে) + [(বাক্সের ওজন) – ১৬ আউন্স] / ৩ আউন্স + [(পানির নতুন উচ্চতা) – ৬ ইঞ্চি] / (১/৪ ইঞ্চি) = ধ্রুবক —– (৪.২)

ভদ্রমহিলার জগত এখানে ধীরে ধীরে জটিল হয়ে উঠছে। তো, যেসব ক্ষেত্রে উনি সরাসরি তাকিয়ে দেখতে পারছেন না, সেসব ক্ষেত্রে ব্লকের সংখ্যা হিসেব করে বের করার জন্য নতুন সব পদ যুক্ত করে তৈরি করছেন আগের চেয়ে জটিল কিন্তু কার্যকরী সূত্র। ফলে শেষ পর্যন্ত ওনাকে একটা জটিল সূত্র ধরে ‘কাজ’ করতে হচ্ছে। এখানে কাজ মানে, একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ হিসেব করে বের করা। এবং ঠিকভাবে হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে, পরিমাণটা শেষ পর্যন্ত একই থাকছে।

শক্তির সংরক্ষণশীলতার সঙ্গে এই উদাহরণের সম্পর্ক কী? এই ঘটনাটা থেকে সবচেয়ে বিমূর্ত যে জিনিসটা আগে বুঝে নিতে হবে, সেটা হলো, এখানে আসলে কোনো ব্লক-ই নেই! ৪.১ আর ৪.২ থেকে প্রথম পদটা সরিয়ে ফেললে দেখা যাবে, আমরা বেশ কিছু অদ্ভুত এবং বিমূর্ত জিনিস একসঙ্গে করে হিসেব-নিকেশ করেছি।

এই উদাহরণটা যে বিষয়গুলোর কথা বলে, তা হলো: এক, আমরা যখন শক্তির হিসেব করি, কখনো কখনো এর কিছু অংশ সিস্টেম থেকে বেরিয়ে যায়, আবার কখনো বাইরে থেকে কিছু শক্তি ভেতরে চলে আসে। এখন, শক্তির সংরক্ষণশীলতা, মানে এর পরিমাণ যে একই আছে—সেটা নিশ্চিত করার আগে আমাদেরকে সতর্কভাবে দেখে নিতে হবে, যেটুকু বেরিয়ে গেছে সেটা যেন বাদ পড়ে না যায় বা অতিরিক্ত যেটা চলে এসেছে, সেটা যেন হিসেবে ঢুকে না পড়ে।

দ্বিতীয়ত, শক্তির বেশ কিছু রূপ আছে। যেমন, মহাকর্ষীয় শক্তি, গতি শক্তি, তাপ শক্তি, ইলাস্টিক শক্তি, বৈদ্যুতিক শক্তি, রাসায়নিক শক্তি, বিকিরন শক্তি, পারমাণবিক শক্তি, ভরশক্তি। এদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা সূত্র আছে। আমরা যদি এখানের সবগুলো সূত্রকে এক করে ফেলি, দেখা যাবে শক্তির রূপান্তর ছাড়া এদের মাঝে আর কোনো পার্থক্য নেই। তারমানে, সবার জন্য মূল সূত্রটা আসলে একই—শুধু শক্তির রূপান্তরের কারণে কিছু পরিবর্তন হচ্ছে।

এখানে একটা জিনিস বুঝে রাখাটা খুব জরুরী। আমাদের বর্তমান যে পদার্থবিজ্ঞান, সেই হিসেবে শক্তি জিনিসটা আসলে কী—তা আমরা জানি না। আমাদের কাছে এমন কোনো চিত্র নেই, যেখান থেকে দেখা যাবে শক্তি নির্দিষ্ট আকৃতির বা নির্দিষ্ট পরিমাণের কোনো বুদবুদের মতো করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চলে যাচ্ছে। জিনিসটা মোটেও এভাবে কাজ করে না। তবে হ্যাঁ, আমাদের কাছে কিছু সূত্র আছে, যেটা দিয়ে আমরা কিছু সংখ্যাগত পরিমাণ হিসেব করতে পারি। আর, এই সবগুলো সংখ্যাকে যোগ করলে আমরা ব্লকের সেই ‘২৮’-ই পাব [মানে, মোট পরিমাণটা]—যেটা সবসময় একই হবে। কিন্তু জিনিসটা এতই বিমূর্ত যে, তার এত রূপ বা এতগুলো সূত্র থাকার কারণ বা প্রক্রিয়া নিয়ে সে আমাদেরকে কিচ্ছু বলে না।

বইয়ের লেখক রিচার্ড ফাইনম্যান; Image Course: Six Easy Pieces

মহাকর্ষীয় বিভব শক্তি

শক্তির সবগুলো রূপের সূত্র জানা থাকলেই কেবল শক্তির সংরক্ষণশীলতার ব্যাপারটা বোঝা যায়। এখানে আমি পৃথিবী পৃষ্ঠের কাছাকাছি মহাকর্ষীয় শক্তির সূত্রটা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। এটাকে এমনভাবে প্রতিপাদন করতে চাই, যার সঙ্গে ইতিহাসের [মানে, আমরা এতোদিন ধরে চোখ বুজে যেভাবে প্রতিপাদন করে এসেছি, সেটার] কোনো সম্পর্ক নেই। বরং সাধারণ যুক্তির ধাপে পা দিয়ে ধীরে ধীরে সূত্রটা প্রতিপাদনের চেষ্টা করব আমি।

এই পদ্ধতিটা এই লেকচারের জন্যই বিশেষভাবে বানানো হয়েছে, যাতে আপনারা একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ভালোভাবে বুঝতে পারেন—কেবল কিছু সাধারণ তথ্য এবং যুক্তির ধাপ বেয়ে আমরা প্রকৃতির ব্যাপারে অনেক কিছু জেনে নিতে পারি। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীরা যুক্তির ধাপ ধরে কীভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছান, এই উদাহরণ থেকে সে ব্যাপারেও কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। বাষ্প ইঞ্জিনের কর্মদক্ষতা নিয়ে মিস্টার কার্নোর দারুণ একটা যুক্তি আছে। সেটার মতো করেই এই উদাহরণটা সাজানো হয়েছে। (আপনারা সম্ভবত এরমধ্যেই বুঝতে পেরেছেন, তাত্ত্বিক যে যুক্তিগুলো ধরে ধরে আমরা ফলাফলে পৌঁছাচ্ছি, সেটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, রেজাল্ট বা ফলাফলটা এখানে আমাদের কাছে অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।)

একটা ভারোত্তোলন যন্ত্রের কথা ভাবুন। এই যন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হলো, এরা একটা ভারকে নিচে নামানোর মাধ্যমে আরেকটা ভারকে উপরে তুলতে পারে। এবার আসুন, আমরা একটা হাইপোথিসিস বা প্রকল্প তৈরি করি। ভারোত্তোলন যন্ত্রের কাজকর্মের মধ্যে পার্পেচুয়াল মোশন বা অবিরাম গতি কোনোভাবেই আসতে পারবে না। (সত্যি বলতে, শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতির একটা সাধারণ কথাও এটাই যে, অবিরাম গতি বলতে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।) তবে, আমাদেরকে একটু সতর্কভাবে এই ‘অবিরাম গতি’ জিনিসটাকে সঙ্গায়িত করতে হবে।

প্রথমে আসুন, ভারোত্তোলন যন্ত্রের জন্য অবিরাম গতি কী হবে, সেটা বুঝে নেই। ধরুন, আমরা অনেকগুলো ভার ওঠা-নামা করানোর পর যন্ত্রটাকে ঠিক আগের অবস্থায় নিয়ে থামিয়েছি। দেখা যাচ্ছে, মোট হিসেবে যন্ত্রটা কিছু ভার উঠিয়ে থেমে গেছে—তাহলে এখানে আমরা অবিরাম গতিযন্ত্র পাব। কারণ, এই ভার ব্যবহার করে, মানে নামিয়ে, আমরা আরো কিছু কাজ করতে পারব।

কিন্তু এখানে দুটো শর্ত আছে। এক, যন্ত্রটাকে এক্কেবারে ঠিক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে। এবং দুই, এই উঠানো ভারের পেছনে কেবল যন্ত্রটা ছাড়া আর কারো কোনো ভূমিকা থাকতে পারবে না—মানে, ভারটুকু উঠানোর পেছনে বাইরে থেকে কোনো শক্তি নেয়া যাবে না। ডেনিসের ঘরে যেমন বাড়তি ব্লক পাওয়ার পরে দেখা গেল, ওগুলো ব্রুস দিয়ে গেছে—এরকম হতে পারবে না আরকি। ছবি ৪-১ এ একটা সরল ভারোত্তোলন যন্ত্র দেখানো হয়েছে।

ছবি ৪-১: সরল ভারোত্তলন যন্ত্র

এই যন্ত্রটা তিন একক ভারী জিনিস উঠাতে পারে। যন্ত্রের এক পাল্লায় আমরা তিন একক ভার রেখেছি, আরেক পাল্লায় রেখেছি এক একক। কিন্তু যন্ত্রটাকে আসলেই কাজ করাতে হলে বাম দিকের পাল্লাটা থেকে একটুখানি ভার সরিয়ে নিতে হবে। আবার উল্টোটাও করা যায়। একটু বুদ্ধি করে একক ভরের কিছু অংশ সরিয়ে রাখলে, তিন একক ভরের পাল্লাটাকে নিচের দিকে নামিয়ে, একক ভরের পাল্লাটাকে উপরের দিকে ওঠানো সম্ভব। সত্যি বলতে, আমরা যদি ‘বাস্তব’ কোনো ভারোত্তলন যন্ত্র দিয়ে এই কাজ করতে চাই, তাহলে একক ভরের মাঝ থেকে কিছু সরিয়ে রাখার চেয়ে বরং অল্প একটু ভর যোগ করে দিলেই যন্ত্রটা কাজ করতে শুরু করবে।

কিন্তু আপাতত আমরা সেদিকে যাব না। কারণ, যন্ত্র আদর্শ হলে অতিরিক্ত কিছু দেয়া দরকার হয় না। আদর্শ যন্ত্র মানে, তাত্ত্বিকভাবে যন্ত্রটার যেমন হওয়ার কথা। বাস্তবে আদর্শ যন্ত্রের কোনো অস্তিত্ব নেই। বাস্তবে আমরা যেসব যন্ত্র ব্যবহার করি, এরা একদিক থেকে অবশ্য প্রায় প্রত্যাবর্তী ধরনের। মানে, এই যন্ত্র যদি একক ভার নামিয়ে তিন একক ভার তুলতে পারে, তাহলে তিন একক ভার নামিয়ে প্রায় একক ভারকেও একই পরিমাণ উপরে তুলতে পারবে।

আমরা মনে করি, দুই ধরনের যন্ত্র আছে। কিছু যন্ত্র প্রত্যাবর্তী না—এর মধ্যে বাস্তব সব যন্ত্রই পড়ে। আর, কিছু যন্ত্র প্রত্যাবর্তী—কিন্তু আমরা যত ভালোভাবেই চেষ্টা করি, যত যত্ন নিয়েই আমাদের বিয়ারিং, লিভার ইত্যাদি ডিজাইন করি না কেন, বাস্তবে এরকম যন্ত্র বানানো আসলে সম্ভব হয় না। কিন্তু আমরা মনে করি, হয়তো আসলেই এমন কিছুর অস্তিত্ব আছে—পুরোপুরি প্রত্যাবর্তী যন্ত্র—যেটা একক (এক পাউন্ড বা অন্য কোনো এককে এক একক) ভার, একক দূরত্ব নামাতে নামাতে, সেই সময়ের মধ্যেই তিন একক ভার সমান দূরত্ব উপরে উঠাতে পারে।

ধরা যাক, আমাদের কাছে সেরকম একটি প্রত্যাবর্তী যন্ত্র আছে, A-যন্ত্র। এই যন্ত্রটি তিন একক ভারকে X-একক উচ্চতায় উঠাতে পারে। এদিকে, ধরুন, আমাদের কাছে আরেকটি B-যন্ত্র আছে। যেটা ঠিক প্রত্যাবর্তী না। এই যন্ত্রটি একক ভারকে একক উচ্চতা পরিমাণ নামিয়ে, তিন একক ভারকে Y-একক পরিমাণ উঠাতে পারে। আমরা প্রমাণ করতে পারি, Y-এর পরিমাণ কোনোভাবেই X-এর চেয়ে বেশি হবে না। তারমানে, একটা প্রত্যাবর্তী যন্ত্র কোনো ভারকে যেটুকু উচ্চতায় তুলতে পারবে, সেই একই পরিমাণ ভারকে তারচেয়ে বেশি উচ্চতায় তোলার মতো কোনো যন্ত্র বাস্তবে বানানো সম্ভব না।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত উচ্ছ্বাস তৌসিফের অনুবাদে রিচার্ড ফাইনম্যানের “সিক্স ইজি পিসেস” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। এছাড়া বিশেষ ছাড়ে বইটি পেতে চাইলে যোগাযোগ করুন বুকশেয়ার অথবা বইনগর পেজের ইনবক্সে। 

প্রশ্ন হলো, কেন? উত্তরটা বোঝার জন্য চলুন, উল্টো দিক থেকে শুরু করা যাক। ধরে নেই, Y-এর উচ্চতা X-এর চেয়ে বেশি। কিন্তু আমরা সেজন্য B-যন্ত্র দিয়ে একক ভারকে একক উচ্চতা পরিমাণ-ই নামিয়েছি। যার ফলে তিন একক ভার Y-পরিমাণ উঁচুতে উঠে গেছে। এখন আমরা চাইলে সেই ভারটুকুকে আবার Y থেকে X-উচ্চতায় নামিয়ে এনে [যেহেতু আগেই ধরে নিয়েছি, Y-এর উচ্চতা X-এর চেয়ে বেশি] কিছু শক্তি উপরি বা ফাও পেতে পারি। সেই শক্তি ব্যবহার করে আমাদের প্রত্যাবর্তী A-যন্ত্রটিকে উল্টো চালিয়ে দিলে, তিন একক ভারকে আবার X-দূরত্ব নামিয়ে, একক ভারটিকে একক উচ্চতায় উঠিয়ে ফেলতে পারি আমরা। এর ফলে একক ভারটা আগের জায়গাতে-ই ফিরে এলো, আর যন্ত্রটাও আবার ব্যবহারোপযোগী, মানে ‘তিন একক ভার নামাতে প্রস্তুত’ অবস্থায় ফিরে গেল!

তারমানে, Y-এর উচ্চতা X-এর চেয়ে বেশি হলে আমরা পারপেচুয়াল মোশন বা অবিরাম গতি পেয়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমরা আগেই ধরে নিয়েছিলাম, বাস্তবে অবিরাম গতি থাকা সম্ভব না। এখান থেকে আমরা সিদ্ধান্তে আসতে পারি, Y কোনোভাবেই X-এর চেয়ে উঁচু হবে না। অর্থাৎ আমরা যত কারিকুরি করেই যন্ত্র বানাই না কেন, প্রত্যাবর্তী যন্ত্রই সবচেয়ে ভালো কাজ করবে।

এখান থেকে আরেকটা সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। সকল প্রত্যাবর্তী ভারোত্তোলন যন্ত্রই একই অবস্থায় একই ভরের জিনিসকে ঠিক একই উচ্চতায় উঠাবে। এটা বোঝার জন্য ধরে নেই, B-যন্ত্রটিও প্রত্যাবর্তী। একটু আগে যে আমরা প্রমাণ করলাম—Y, X এর চেয়ে উঁচু না—এটা ঠিকই আছে। এখন আমরা শুধু উল্টোভাবে যুক্তি দিয়ে দেখাতে চাচ্ছি যে, X-ও Y এর চেয়ে উঁচু না। এটা দেখানোর জন্য আমরা যন্ত্রগুলোকে উল্টোভাবে ব্যবহার করব। এটা বেশ ভালো একটা পর্যবেক্ষণ হিসেবে কাজ করবে। কারণ, এখন ভিন্ন ভিন্ন যন্ত্রের ভেতরের মেকানিজম বা কলকব্জার দিকে না তাকিয়েও যন্ত্রগুলো নির্দিষ্ট কোনো কিছুকে কতটুকু উঁচুতে তুলছে—সেটা পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ পাব আমরা।

তারমানে, কেউ যদি অনেকগুলো লিভার এবং নানারকম কলকব্জাসহ এমন একটা বিশাল যন্ত্র বানায়, যেটা একক ভারকে একক দূরত্ব নামানোর ফলে তিন একক ভারকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব উঠাতে পারে; আবার একটা সরল যন্ত্রও যদি একই কাজ করতে পারে এবং মৌলিকভাবে সরল যন্ত্রটা যদি প্রত্যাবর্তী হয়—তাহলে দুটোর মধ্যে তুলনা করার সাথে সাথেই আমরা বুঝতে পারব, বিশাল যন্ত্রটা তিন একক ভারকে কোনভাবেই বেশি উঁচুতে উঠাতে পারবে না। বরং কিছুটা কম উঠাতে পারবে। আবার, বিশাল যন্ত্রটাও যদি প্রত্যাবর্তী হয়, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবেই জেনে যাব, এই যন্ত্রটা তিন একক ভারকে ঠিক কতটুকু উঁচুতে উঠাতে পারবে।

সহজ ভাষায় বললে: যেভাবেই চালানো হোক আর যেভাবেই বানানো হোক না কেন, এক পাউণ্ড ভারী কিছুকে এক ফুট দূরত্ব নামানোর ফলে তিন পাউণ্ড ভারী কিছুকে উপরে উঠাতে পারে—এমন সকল প্রত্যাবর্তী যন্ত্র সবসময়ই এই তিন পাউণ্ডকে একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠাবে। ধরে নেই, এই উচ্চতাটা হলো X। এমনিতে এই নীতিটা সার্বজনীনভাবে কাজে লাগানোর জন্য কিন্তু বেশ উপযোগী। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—X কী?

ছবি ৪-২ : একটি প্রত্যাবর্তী যন্ত্র

ধরে নেই, আমাদের কাছে একটা প্রত্যাবর্তী যন্ত্র আছে। এটাও একক ভারকে নামানোর ফলে তিন একক ভার উঠাতে পারে। ছবি ৪-২ তে দেখা যাচ্ছে, আমরা একটা র‍্যাকের মধ্যে তিনটা বল রেখেছি। এই র‍্যাকটাকে আবার নাড়ানো যায় না। এদিকে, একটা ১ ফুট উঁচু কাঠের পাটাতনের উপর একটা বল রাখা আছে। এখন, আমাদের যন্ত্রটা এই বলটাকে একক দূরত্ব—এখানে ১ ফুট—নামালে তিনটা বলকে উপরে তুলতে পারে। বলগুলি তোলার সময় রাখার জন্য এমন একটা বাক্স রাখা আছে, যাতে একটা মেঝে এবং দুটো খোপ আছে—যার প্রতিটার মধ্যেকার দূরত্ব হলো X। আবার র‍্যাকটার প্রতিটা তাকের দূরত্বও X।

তাহলে (ক) প্রথমে আমরা বলগুলিকে আনুভূমিকভাবে, মানে সমতল বরাবর গড়িয়ে দেব। বলগুলি তাহলে র‍্যাক থেকে সোজা বাক্সের খোপে গিয়ে পড়বে। (খ) আমরা যেহেতু উচ্চতার কোনো পরিবর্তন করিনি, তাই ধরে নিচ্ছি, এখানে [মানে, ক-তে] কোনো শক্তি ব্যয় হয়নি। এবারে প্রত্যাবর্তী যন্ত্রটা কাজ শুরু করবে। পাটাতনের উপরে রাখা বলটাকে মেঝেতে নামিয়ে এনে, বাক্সটাকে X দূরত্ব উঁচুতে তুলে ফেলবে। (গ) চিত্র দেখলে বোঝা যাবে, র‍্যাকের উপরেও একটা বল রাখার ব্যবস্থা আছে। এখন, বাক্সের খোপগুলি আর র‍্যাকের তাকগুলি আবারো আনুভূমিকভাবে একই সমতল বরাবর আছে। তাহলে এবারে আমরা বলগুলিকে বাক্স থেকে র‍্যাকের দিকে গড়িয়ে দেব। (ঘ) বলগুলি র‍্যাকের উপরের তিন তাকে বসে গেলে আমরা যন্ত্রটাকে আবারো নতুন করে কাজ করার উপযোগী অবস্থায় পেয়ে যাচ্ছি।

এখন আমাদের বল তিনটা আছে র‍্যাকের উপরের তিন তাকে, আর একটা বল আছে মেঝেতে। এখন একটা অদ্ভুত জিনিস বলি। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে, তিনটার মধ্যে দুটো বলকে আমরা তুলিইনি। খেয়াল করুন, ২ এবং ৩ নম্বর তাকে আগে থেকেই বল ছিল। তারমানে, ফলাফলটা দাঁড়াচ্ছে, এখানে একটা বলকেই কেবল 3X দূরত্ব তোলা হয়েছে। এখন 3X যদি ১ ফুটের চেয়ে বেশি উঁচু হয়ে থাকে, তাহলে [খেয়াল করে দেখুন, পাটাতনে রাখা বলটা কিন্তু ১ ফুট উপরেই রাখা ছিল] বলটাকে ১ ফুট উচ্চতায় নামিয়ে আনলেই আমরা কিছু বাড়তি শক্তি পেয়ে যাব, যেটা ব্যবহার করে আমরা যন্ত্রটাকে ঠিক আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে ফের কাজের উপযোগী করে ফেলতে পারব।

ফলে, যন্ত্রটা আবারো তিন একক ভারোত্তলনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। মানে, 3X এর মান যদি ১ ফুটের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে আমরা অবিরাম গতি পেয়ে যাচ্ছি। তাই, 3X এর মান ১ ফুটের বেশি হতে পারবে না। একইভাবে আমরা যন্ত্রটাকে উল্টো করে চালিয়ে এটাও দেখাতে পারি যে, ১ ফুটের মান 3X এর চেয়ে বেশি হতে পারবে না। হলে আবারো সেই অবিরাম গতি চলে আসবে। এটা দেখাতে পারি, কারণ, আমাদের এই যন্ত্রটা প্রত্যাবর্তী।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে? 3X, ১ ফুটের চেয়ে বেশিও না, কমও না। সমান। এখান থেকে আমরা X এর মান বের করতে পারি। X =  ১/৩ ফুট। তাহলে, সাধারণভাবে বলা যায়: একটা প্রত্যাবর্তী যন্ত্র চালাতে গিয়ে এক পাউন্ড ভর নিচে নামালে পরে সেটা p পাউন্ড ভরকে (ওই নির্দিষ্ট দূরত্ব/p) উচ্চতায় উঠাতে পারে।

একটু ভিন্নভাবে বলা যাক। আমরা একটু আগে যে ফলাফলটা পেলাম, সেটার কথা ভাবি। ৩ পাউন্ডকে তার উচ্চতা [মানে, যেটুকু উঠানো হয়েছে, এ ক্ষেত্রে X] দিয়ে গুণ করলে সেটা ১ পাউন্ডকে যেটুকু নামিয়ে আনা হয়েছে [এ ক্ষেত্রে ১ ফুট], তার সমান হবে। আমরা যদি এখন সবটুকু ভরকে নিয়ে, তারা মেঝে থেকে যে উচ্চতায় আছে—তা দিয়ে গুণ করে দেই; তারপর যন্ত্রটাকে কাজ করতে দিয়ে, আবারো সব ভরকে তাদের নতুন উচ্চতা দিয়ে গুণ করি, দেখা যাবে ফলাফলে কোনো পরিবর্তনই আসেনি। [সহজে বললে: উঠানোর সময়ের ভর ও উচ্চতার গুণফল, অন্যপাশে নামানোর সময়ের ভর ও উচ্চতার গুণফলের সমান।] (আমরা যদি একটা ভরকে নামিয়ে অনেকগুলো ভর উঠাই, তখন এই উদাহরণটাকে ব্যবহারের জন্য জেনারেলাইজ করতে হয় আরকি। আমরা একটু আগেই দেখেছি, এটা মোটেও কঠিন কাজ না।)

যাই হোক, সকল ভর আর উচ্চতার গুণফলকে আমরা বলি গ্র‍্যাভিটেশনাল পটেনশিয়াল এনার্জি বা মহাকর্ষীয় বিভবশক্তি। কোনো বস্তুকে পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে উপরে উঠালে, সেটা পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক বা টানের জন্য যে শক্তি অর্জন করে, তা-ই মহাকর্ষীয় বিভবশক্তি। আমরা যদি পৃথিবী থেকে অনেক অনেক উপরে উঠে না যাই, তাহলে মহাকর্ষীয় বিভবশক্তির সূত্রটা হবে,

(কোনো বস্তুর মহাকর্ষীয় বিভবশক্তি) = (ওজন) × (উচ্চতা)   —–   (৪.৩)

যুক্তির দিক থেকে চিন্তা করলে, এভাবে ভাবাটা কিন্তু দারুণ। এখানে একমাত্র সমস্যা হচ্ছে, এটা হয়তো সত্যি নাও হতে পারে। (কারণ, আমাদের যুক্তির সাথে তাল মেলানোর কোনো ঠেকা প্রকৃতির নেই।) মানে ধরুন, পারপেচুয়াল মোশন বা অবিরাম গতি তো সম্ভব হতেও পারে, তাই না? আমাদের সব ধরে নেয়া যে ঠিক হবে, এমন তো কোনো কথা নেই। কিংবা হয়তো আমরা যুক্তির কোনো জায়গায় ভুল করেছি, এমনও তো হতে পারে। সে জন্য পুরো জিনিসটা পরীক্ষা করে দেখাটা খুবই জরুরি। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, আমাদের যুক্তিটা ঠিকই আছে।

কোনো কিছুর সঙ্গে স্থানগতভাবে সম্পর্কিত শক্তিকে [মানে, স্থানের পরিবর্তনের জন্য শক্তির মান পরিবর্তন হলে] বলে বিভবশক্তি। তবে আমরা এতোক্ষণ যেটা নিয়ে কথা বললাম, সেটা ছিল মহাকর্ষীয় বিভবশক্তি। আবার, আমরা যদি মহাকর্ষের বিপরীতে কাজ না করে বৈদ্যুতিক শক্তির বিপরীতে কাজ করতাম—অনেকগুলো লিভার দিয়ে কিছু চার্জ থেকে অন্য কিছু চার্জকে ‘তুলে’ নিতাম—তাহলে এই শক্তিটাকে আমরা বলতাম ইলেক্ট্রিক্যাল পটেনশিয়াল এনার্জি বা বৈদ্যুতিক বিভবশক্তি। জেনারেলাইজ করে, মানে একদম সাধারণভাবে বললে, শক্তির পরিবর্তন মানে—বল গুণন বলটা কতটুকু দূরত্ব পর্যন্ত কাজ করেছে। এটাকে সমীকরণ হিসেবে এভাবে লেখা যায়:

(শক্তির পরিবর্তন) = (বল) × (যেটুকু দূরত্ব জুড়ে বলটা ক্রিয়াশীল ছিল)  —–  (৪.৪)

এই কোর্স ধরে আগানোর সময় আমরা এরকম বিভিন্ন ধরণের শক্তি নিয়ে কথা বলব।

ছবি ৪-৩ : হেলানো তল

বিভিন্ন অবস্থায় শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি ব্যবহার করে ‘কী হতে যাচ্ছে’—এ ব্যাপারে সহজেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। হাইস্কুলে থাকতে আমরা কপিকল আর লিভার নিয়ে অনেক অনেক নীতি শিখেছি, সূত্র মুখস্ত করেছি। একেক সূত্র একেক জায়গায়, একেক অবস্থায় ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এখন তো বোঝাই যাচ্ছে যে, এই সব নীতি আসলে একই জিনিস। কপিকল-লিভার সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য ৭৫ রকমের সূত্র মুখস্ত করার কোনো দরকারই ছিল না।

চট করে একটা সহজ উদাহরণ দেখে নেয়া যাক। ধরি, একটা মসৃন হেলানো তল আছে, যেটা আসলে একটা ত্রিভূজের অংশ। ত্রিভূজটার তিনবাহুর দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৩, ৪ এবং ৫ একক (ছবি ৪-৩)। হেলানো তলটার উপরে আমরা কপিকল দিয়ে ১ পাউন্ডের একটা ভার ঝুলিয়ে দিলাম। কপিকলের অন্যপাশে, ত্রিভূজের লম্ব বরাবর ঝুলিয়ে দিলাম একটা W ভার। এখন আমরা জানতে চাই, হেলানো তলের উপরের ১ পাউন্ডের সাথে সমতা করার জন্য W-এর কতটা ভারী হওয়া দরকার। তো, এটা আমরা কীভাবে বের করব?

যদি বলি, জিনিসটা সমতা বা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থাতেই আছে এবং আমাদের যন্ত্রটা প্রত্যাবর্তী, ফলে জিনিসটা উপরে-নিচে উঠানামা করতে পারে, তাহলে আমরা কিছু অবস্থার চিত্র নিয়ে ভেবে দেখতে পারি। শুরুতে, (ক) ১ পাউন্ডের ভারটা থাকবে হেলানো তলের একেবারে নিচে আর W ভারটা থাকবে একেবারে মাথায়। এখন W যদি নিচের দিকে পড়তে শুরু করে, আমাদের ১ পাউন্ডের ভারটা একেবারে মাথায় উঠে আসবে এবং W একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বরাবর নিচে নেমে যাবে। (খ) এখন, W আগে যে তলে ছিল, সেই তল থেকে হিসেব করলে এই দূরত্বের মান [ফুট হিসেবে] হবে ৫ ফুট। তারমানে, আমরা ১ পাউন্ডের ভারটাকে ৩ ফুট উপরে তুলেছি আর W পাউন্ডকে ৫ ফুট নিচে নামিয়েছি। সুতরাং, W = ৩/৫ ফুট।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এটা আমরা বের করেছি শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি ব্যবহার করে। বলের বিভিন্ন উপাংশ ব্যবহার করে কিন্তু করিনি। তবে, চালাকি জিনিসটা আসলে আপেক্ষিক। উপরের ফলাফলটা চাইলে আরো দারুণ এক পদ্ধতি ব্যবহার করে বের করা যেত। এটা আবিষ্কার করেছিলেন স্টেভিনাস এবং জিনিসটা তাঁর কবর ফলকে খোদাই করে লেখা আছে। ছবি ৪-৪ থেকে এটা বোঝা যাবে যে, W এর মান ১ ফুটের তিন-পঞ্চমাংশই হওয়ার কথা। কারণ, শেকলটা ত্রিভূজের চারপাশে ঘুরতে পারে না।

দেখেই বোঝা যাচ্ছে, শেকলের নিচের অংশটা নিজে নিজেই একটা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় আছে। তারমানে, হেলানো তল বরাবর শেকলের গায়ের পাঁচটা গোলক ভারের টান, লম্ব বরাবর এর তিনটা গোলক ভারের টানের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখছে। জিনিসটা যে সবসময় ঠিক এমনই হবে, তা নয়; বরং অতিভুজ আর লম্বের অনুপাতের সমান হবে। এই ছবিটা দেখলে, W এর মান যে এখানে ৩/৫ হবে, সেটা এমনিতেই বুঝে যাওয়ার কথা। (কবরের জন্য আপনিও যদি এমন একটা এপিটাফ পেয়ে যান, তাহলে দারুণ হবে কিন্তু! কী বলেন?)

ছবি ৪-৫ : একটি স্ক্রু জ্যাক

এবারে আসুন, আরেকটু জটিল একটা সমস্যার মধ্যে শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতিটা খাটে কিনা, তা দেখে নেয়া যাক। ছবি ৪-৫ এ একটা স্ক্রু-জ্যাক দেখানো হয়েছে। ২০ ইঞ্চি লম্বা একটা হাতল দিয়ে স্ক্রুটাকে ঘুরাতে হয়। আর, স্ক্রুটার গায়ের প্রতি ইঞ্চিতে দশটা খাঁজ আছে [মানে, ১ ইঞ্চি উঠাতে হলে এটাকে ১০ বার বা ১০ দাগ ঘুরাতে হয়]। এখানে আমরা জানতে চাচ্ছি, হাতলে কতটুকু বল প্রয়োগ করলে ১ টন বা ২০০০ পাউন্ড উঠানো যাবে।

এখন, আমরা যদি ১ টন ভারকে ১ ইঞ্চি উঠাতে চাই, তাহলে হাতলটাকে ১০ বার ঘোরাতে হবে। একবার ঘুরলে হাতলটাকে ১২৬ ইঞ্চির মতো ঘুরতে হয়। তাহলে, ১০ বারের জন্য হাতলটাকে ১২৬০ ইঞ্চি মতোন ঘুরতে হবে। আমরা যদি এখানে বিভিন্ন ধরণের কপিকল ইত্যাদি ব্যবহার করি, তাহলে হাতলের শেষ মাথায় অজানা W ভার ব্যবহার করেই ১ টন ভারকে উঠিয়ে ফেলতে পারব। স্বাভাবিকভাবেই, এই অজানা W এর ভর হবে নিতান্ত অল্প। হিসেব করলে দেখা যাবে, W এর মান হবে ১.৬ পাউন্ডের কাছাকাছি। [যেহেতু ১ টন = ২০০০ পাউন্ড, আর হাতলটাকে ১২৬০ ইঞ্চি ঘুরতে হয়েছে, সুতরাং W = ২০০০/১২৬০ = ১.৫৮৭ পাউন্ড বা প্রায় ১.৬ পাউন্ড।] এই ফলাফলটাও কিন্তু আমরা শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি ব্যবহার করেই পেয়েছি।

ছবি ৪-৬ : একপাশ আটকানো লোহার বার

এবারে আরেকটু জটিল একটা সমস্যা দেখা যাক। ছবি ৪-৬ তে জিনিসটা দেখানো হয়েছে। ৮ ফিট লম্বা একটা রড বা লোহার বারকে একপাশে ঠেক দিয়ে রাখা হয়েছে। বারটার ঠিক মাঝখানে আছে ৬০ পাউন্ডের একটা ভার। আর, যেখানে ঠেক দিয়ে রাখা হয়েছে, তার থেকে ২ ফিট দূরে আছে ১০০ পাউন্ডের আরেকটা ভার। কথা হচ্ছে, সমতায় রাখার জন্য আমাদেরকে বারের এই মাথাকে কতটা ভার দিয়ে ধরে রাখতে হবে? আগেই বলি, এখানে আমরা বারটার নিজের ভার হিসেবে ধরব না, শুধু বাড়তি ভারগুলোর কথা ভাবব।

তো, ধরা যাক, এই মাথায় একটা কপিকল লাগিয়ে ওরমধ্যে একটা W ভার ঝুলিয়ে দিয়েছি। তাহলে, এখন প্রশ্নটা হবে—সমতায় রাখার জন্য W এর ভর কত হওয়া প্রয়োজন? ধরে নেই, এই ভারটা এমনিতে যে কোনো দূরত্ব সমান নিচেই ঝুলে থাকতে পারবে। তবে আমাদের সুবিধার জন্য ধরে নিচ্ছি, এটা ৪ ইঞ্চি নিচে গিয়ে ঝুলে আছে। তাহলে এখন আমাদের বারে রাখা ভারদুটো ঠিক কতটা উপরে উঠে যাবে?

পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, ঠিক মাঝখানের ৬০ পাউন্ডের ভারটা ২ ইঞ্চি এবং ১০০ পাউন্ডের ভারটা ১ ইঞ্চি উপরে উঠে গেছে। তাহলে আমাদের যে নীতিটা আছে—মোট ভর গুণন দূরত্ব বা উচ্চতার মোট পরিবর্তন সবসময় একই থাকে, মানে এদের যোগফল সবসময়ই শূন্য হয়—সেটা ব্যবহার করলে পাব: W × ৪ ইঞ্চি (নিচের দিকে), যোগ ৬০ পাউন্ড × ২ ইঞ্চি (উপরের দিকে), যোগ ১০০ পাউন্ড × ১ ইঞ্চি (উপরের দিকে) সমান শূন্য। [উপরের দিককে ধনাত্মক ধরা হয়েছে। তাই নিচের দিক হবে ঋণাত্মক, এটা বোঝাতে এখানে বিয়োগ চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে।] অর্থাৎ:

(-4W) + (2×60) + (1×100) = 0,                       W = 55 lb      —–       (৪.৫)

অর্থাৎ, বারটাকে ভারসাম্যে রাখতে হলে W এর মান ৫৫ পাউন্ড হতে হবে। এভাবে আমরা ‘ভারসাম্যের নীতি’ বের করে নিতে পারি। মানে, জটিল ব্রিজের মতো করে রাখা ভারগুলো নিয়ে তৈরি এই সমস্যাটির সমাধান করে, ব্রিজটাকে একটা স্থিরাবস্থায় রাখতে পারি। এভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টাকে বলে ‘দ্য প্রিন্সিপ্যাল অফ ভার্চুয়াল ওয়ার্ক’। কারণ, এখানে যুক্তি প্রয়োগের জন্য আমাদের কল্পনা করতে হয়েছে যে, ব্রিজটার আটকানো মাথা কিছুটা হলেও নড়ছে, উপরের দিকে উঠছে—যদিও বাস্তবে জিনিসটা নড়ে না এবং [মাথাটা যেহেতু ঠেক দেয়া জায়গাটার সঙ্গে আটকানো, তাই] এটাকে নাড়ানো সম্ভবও না। আমরা এখানে খুবই সামান্য এক কাল্পনিক গতিকে ব্যবহার করেছি, যাতে শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি ব্যবহার করা যায়।

গতিশক্তি

এবারে আমরা আরেক ধরনের শক্তি নিয়ে কথা বলব। এটা বোঝার জন্য একটা পেন্ডুলামের কথা ভাবা যাক (ছবি ৪-৭)। আমরা যদি সবটা ভারকে [মানে পেন্ডুলামটাকে] একপাশে টেনে ধরে ছেড়ে দেই, জিনিসটা সামনে-পিছে দুলতে থাকবে। তো, এভাবে গতিশীল থাকা অবস্থায় যে কোনো একপাশ থেকে কেন্দ্রে যাওয়ার সময় সে উচ্চতা হারাতে থাকে [মানে, কিছুটা নিচে নেমে যায়]। তাহলে, এর মধ্যেকার বিভবশক্তিটুকু কোথায় যাচ্ছে?

পেন্ডুলাম যখন একেবারে কেন্দ্রে থাকে—অর্থাৎ যাত্রাপথের সবচেয়ে নিচু বিন্দুতে অবস্থান করে—তখন এর মধ্যেকার মহাকর্ষীয় শক্তি নেই হয়ে যায় [কারণ, এখানে সারফেস বা তুলনা করার জন্য তল হিসেবে এই সর্বনিম্ন বিন্দুটিকেই ধরা হয় এবং মহাকর্ষীয় বিভবশক্তি এই বিন্দুর সাপেক্ষেই হিসেব করা হয়। তারমানে, ঠিক এই বিন্দুতে অবস্থানকালে পেন্ডুলামটির উচ্চতার মান শূন্য, ফলে এর মধ্যেকার বিভবশক্তির মানও হবে শূন্য]। তারপরেও পেন্ডুলাম কিন্তু থেমে যায় না, বরং আবারো উপরের দিকে উঠতে থাকে। তারমানে, মহাকর্ষীয় শক্তিটা এখানে নিশ্চয়ই অন্য কোনো শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। যারা পেন্ডুলামকে ঘুরতে দেখেছেন, তাদের এমনিতেই বোঝার কথা যে, পেন্ডুলামের আবার উপরে ওঠার পেছনে এর গতির ভিন্নতার ভূমিকা আছে। অর্থাৎ, পেন্ডুলামটা যখন একেবারে নিচের বিন্দুতে পৌঁছাচ্ছে, আমরা তখন সেখানে মহাকর্ষীয় শক্তিকে অন্য কোনো শক্তিতে রূপান্তরিত হতে দেখছি।

ছবি ৪-৭ : পেন্ডুলাম

এখন আমাদের এমন একটা সমীকরণ দরকার, যেটা গতির শক্তি নিয়ে কাজ করতে পারে। প্রত্যাবর্তী যন্ত্র নিয়ে আমাদের আলোচনা এবং যুক্তিগুলোর কথা মনে আছে তো? থাকলে নিশ্চয়ই বুঝতেই পারছেন, গতিশীল অবস্থায় একদম নিচের বিন্দুতে থাকা কালে পেন্ডুলামের মধ্যে নিশ্চয়ই একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত থাকে, যেটা ব্যবহার করে সে কেবল একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ উঁচুতেই উঠতে পারে। এর সঙ্গে সে কোন পথ ধরে উপরে উঠছে বা এর পেছনে কী ধরনের মেশিনারি বা যান্ত্রিক কারিকুরি কাজ করছে—তার কোনো সম্পর্ক নেই।

আমাদের কাছে অবশ্য এরকম একটা সমতাকরণ সূত্র আছে। ওই যে, বাচ্চাদের ব্লকের জন্য যেমন সূত্র লিখেছিলাম, সেরকম। মানে, এখানে আমরা আমাদের শক্তির সংরক্ষণশীলতা সূত্রটারই একটুখানি ভিন্ন রূপ লিখব, যেটা এই ‘সঞ্চিত শক্তি’টাকে প্রকাশ করতে পারবে। জিনিসটা আসলে বেশ সহজ। একদম নিচের বিন্দুতে গতিশক্তি সমান সমান পেন্ডুলামের ভর গুণন সে যেটুকু উঁচুতে উঠতে পারে। তাহলে এটাকে সূত্র-আকারে এভাবে লেখা যায়, গতিশক্তি বা কাইনেটিক এনার্জি, K.E. = WH।

কিন্তু এখানে আমাদের এমন একটা সমীকরণ দরকার, যেটা আমাদেরকে কোনো বস্তুর গতির সঙ্গে সম্পৃক্ত উচ্চতার ব্যাপারে জানাতে পারবে। নির্দিষ্ট বেগ আছে—এমন কিছু দিয়েই শুরু করা যাক। ধরে নেই, জিনিসটা কেবল সরল পথেই একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় ওঠে। জিনিসটা কী, তা আমরা এখনো জানি না, কিন্তু এর উচ্চতা সবসময়ই এর বেগের উপরে নির্ভর করে—এটুকু আমরা জানি। এমন হলে, এর জন্য একটা সমীকরণ আছে। এখন, V বেগে চলমান কোনো বস্তুর গতিশক্তির সমীকরণ বের করার জন্য আগে অবশ্যই জিনিসটা কতটুকু উঁচুতে উঠতে পারে—সেটা হিসেব করে, তার ভর দিয়ে গুণ করতে হবে। দেখা যাবে, জিনিসটাকে এভাবে লেখা যায়:

K.E. = WV2/2 g      (৪.৬)

বলে রাখা ভালো, গতির যে শক্তি আছে, এই ব্যাপারটার সঙ্গে আমরা যে মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের মধ্যে আছি—এর কোনো সম্পর্ক নেই। বেগ যেখান থেকেই আসুক, তাতে এই সমীকরণে কোনো পরিবর্তন আসে না। বিভিন্ন ধরণের বেগের জন্য এটা একটা সাধারণ সমীকরণ। ৪.৩ আর ৪.৬ এর দুটো সুত্রই অ্যাপ্রোক্সিমেট বা ‘প্রায় সঠিক’ সমীকরণ। কারণ, এক, উচ্চতা অনেক অনেক বেশি হলে এরা ভুল ফলাফল দেবে। যেমন, উচ্চতা এতো বেশি যে, মহাকর্ষ তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে—এরকম জায়গায় এরা সঠিক ফলাফল দেবে না। দুই, প্রবল বেগে চলমান বস্তুদের ক্ষেত্রে আপেক্ষিকতা নীতি অনুযায়ী এদেরকে কিছুটা সংশোধন করতে হয়। কিন্তু সব হিসেব নিকেশ করে আমরা যখন শেষ পর্যন্ত একেবারে সঠিক সমীকরণে এসে পৌঁছাই, সেটাও কিন্তু সেই একই কথাই বলে। শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি শতভাগ সঠিক।

শক্তির অন্যান্য রূপ

এভাবে আমরা শক্তির অন্যান্য রূপের উদাহরণও দেখতে পারি। যেমন, ইলাস্টিক শক্তির কথাই ধরা যাক। কোনো স্প্রিংকে টেনে নামাতে হলে আমাদেরকে কিছু কাজ করতে হয়, যাতে নামানোর পরে এটা দিয়ে কিছু ভার উঠানো যায়। সেজন্য ছড়ানো অবস্থায় এটার কিছু কাজ করতে পারার সম্ভাবনা থাকে। এ ক্ষেত্রে আমরা যদি উত্তোলিত ভার আর উচ্চতা গুণ করি, দেখব, হিসেব মিলছে না। কিছু একটা যোগ করতে হবে। তাহলে, স্প্রিংটাকে যে টেনে ধরে রাখা হয়েছে—এই ব্যাপারটার সঙ্গে সমতা [বা কাটাকাটি] হয়ে যাবে।

তো, কোনো স্প্রিংকে যখন টেনে ছড়িয়ে রাখা হয়, তখন ইলাস্টিক শক্তির সমীকরণ ব্যবহৃত হয়। কথা হলো, এখানে শক্তির পরিমাণটা ঠিক কত? ছেড়ে দিলে দেখা যাবে, স্প্রিং যখনই সাম্যবিন্দু পেরিয়ে যাবে, তখন ইলাস্টিক শক্তি গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হতে থাকবে। এবং পুরোটা সময় জুড়ে ইলাস্টিক শক্তির স্প্রিংকে সংকুচিত-প্রসারিত করা আর গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হওয়া চলতেই থাকবে। (কিছু মহাকর্ষীয় শক্তিও টুকটাক কাজ করবে—কিন্তু এটুকুকে অগ্র‍্যাহ্য করেই এই পরীক্ষাটা আমরা করতে পারি।)

সবটুকু ইলাস্টিক শক্তি খরচ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত এটা চলতেই থাকবে। আহহা! এতোক্ষণ ধরে ছোট্ট একটু ভর দিয়ে অনেকটা বড় ভরকে নাড়াচ্ছিলাম আমরা, বলছিলাম যন্ত্র প্রত্যাবর্তী হতে পারে কিংবা এরা অবিরাম একইভাবে কাজ করে যেতে পারে। আসলে আমরা প্রতারণা করছিলাম! এখন তো স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছি, যন্ত্র একসময় থেমে যায়। কথা হচ্ছে, স্প্রিং যখন ওঠা-নামা বন্ধ করে দেয়, তখন এই শক্তি যায় কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে শক্তির আরেকটি রূপের কথা চলে আসে: তাপ শক্তি।

স্প্রিং বা লিভারের মধ্যে কেলাস থাকে। এই কেলাস তৈরি হয় অনেক অনেক পরমাণু মিলে। যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ তৈরি করার সময় এবং এদেরকে জুড়ে দেওয়ার সময় কেউ চাইলে অনেক যত্নের সঙ্গে চেষ্টা করে দেখতে পারে, যেন কোনো কিছু অন্য যন্ত্রাংশের উপর দিয়ে গড়িয়ে যাওয়ার সময়, এর মধ্যেকার পরমাণুরা লাফালাফি কাঁপাকাঁপি না করে। এটা করতে হলে অবশ্য অসম্ভব যত্নশীল হতে হবে। সাধারণত যখন কিছু গড়িয়ে যায়, পৃষ্ঠতলের অসমতা, উঁচু-নিচুর জন্য দুই তলের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি, ঘর্ষণ হয়। ফলে এদের মধ্যেকার পরমাণুরা লাফালাফি শুরু করে দেয়। আমরা এই শক্তিটার হিসেব রাখতে পারি না।

গতি কমে আসার পর পরমাণুগুলোকে এলোমেলো এবং খানিকটা দ্বিধান্বিতভাবে লাফালাফি করতে দেখে হিসেবের তাল হারিয়ে ফেলি। অর্থাৎ এর মধ্যে গতিশক্তি এখনো রয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু এরসঙ্গে দৃশ্যমান গতির কোনো সম্পর্ক নেই। কী দারুণ স্বপ্নের মতো একটা ব্যাপার! আহ! [দৃশ্যমান গতি ছাড়া গতিশক্তি থেকে যাওয়াটা আপাত দৃষ্টিতে পারপেচুয়াল মোশন বা অবিরাম গতি বলে মনে হতে পারে। আসল ঘটনা অবশ্য ভিন্ন। সেজন্যেই ফাইনম্যান এ নিয়ে একটুখানি মজা করেছেন।—অনুবাদক]

কিন্তু গতিশক্তি যে এখনো রয়ে গেছে, এটা আমরা জানছি কীভাবে? দেখা গেল, স্প্রিং বা লিভার [অব্যবহৃত অবস্থার চেয়ে] বেশি গরম কিনা, সেটা আপনি চাইলে থার্মোমিটার দিয়ে বের করতে পারেন। আর, গরম থাকার মানে হচ্ছে, নির্দিষ্ট পরিমাণ গতিশক্তি এখানে অবশ্যই বৃদ্ধি পেয়েছে। শক্তির এই রূপটাকেই আমরা ‘তাপ শক্তি’ বলি। কিন্তু আমরা জানি, এটা আসলে শক্তির সেরকম নতুন কোনো রূপ না। এটা সেই গতিশক্তিই—কিন্তু এই গতিটা বাইরে থেকে দেখা যায় না। কারণ, এটা আসলে আভ্যন্তরীণ [অণু-পরমাণুর] গতি।

(এখানে একটা ঝামেলা আছে। বাস্তবে আমরা যখন বড়সড় এক্সপেরিমেন্টগুলো করি, শক্তির সংরক্ষণশীলতা বা নিত্যতার সূত্রের প্রমাণ আমরা চাইলেই দেখাতে পারি না। আর, প্রত্যাবর্তী যন্ত্র তো কোনভাবেই বানাতে পারি না। কারণ, বড়সড় কোনো যন্ত্রাংশ বা কিছু একটাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরাতে গেলে পরমাণুগুলো আর একেবারে স্থির বসে থাকে না। ফলে, পারমাণবিক ব্যবস্থার মধ্যে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ গতি তৈরি হয়। এটা আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না। তবে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি—যেমন, থার্মোমিটার—দিয়ে চাইলে মাপতে পারি।)

শক্তির আরো অনেক রূপ আছে। কিন্তু এদের ব্যাপারে এখনই অতটা বিস্তারিতভাবে বলা যাবে না। ছোট্ট করে একটু বলি। যেমন, বৈদ্যুতিক চার্জ বা আধানকে কাছে টানা এবং দূরে সরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত শক্তিকে বলে ‘বৈদ্যুতিক শক্তি’। আছে রেডিয়েন্ট এনার্জি বা ‘বিকিরণ শক্তি’। এটা মূলত আলোর শক্তি। তবে, আমরা জানি, এটি বৈদ্যুতিক শক্তিরই একটি রূপ। কারণ, আলোকে চাইলে তড়িৎচুম্বক ক্ষেত্রের আন্দোলন বা নড়াচড়া হিসেবে প্রকাশ করা যায়। আবার, রাসায়নিক বিক্রিয়া থেকে আসে ‘রাসায়নিক শক্তি’।

সত্যি বলতে, ইলাস্টিক শক্তিও অনেকটা রাসায়নিক শক্তির মতো। কারণ, রাসায়নিক শক্তি হলো, পরমাণুদের পরস্পরকে আকর্ষণের শক্তি। ইলাস্টিক শক্তিও তাই। আমাদের আধুনিক জ্ঞান বলে: রাসায়নিক শক্তির দুটো অংশ আছে। এক, পরমাণুর ভেতরে ইলেকট্রনের গতিশক্তি। আর দুই, ইলেকট্রন-প্রোটনের মিথস্ক্রিয়ার ফলে তৈরি বৈদ্যুতিক শক্তি। অর্থাৎ রাসায়নিক শক্তির একটা অংশ হলো গতিশক্তি, আর বাকিটা বৈদ্যুতিক শক্তি। তারপর আছে নিউক্লিয়ার এনার্জি বা ‘পারমাণবিক শক্তি’। এটি নিউক্লিয়াসের মধ্যেকার বিভিন্ন কণার [প্রোটন-নিউট্রন] বিন্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমাদের কাছে এই শক্তি হিসেব করার জন্য সমীকরণ ঠিকই আছে, কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো মৌলিক নীতি আমাদের জানা নেই। আমরা জানি, এটা বৈদ্যুতিক, মহাকর্ষীয় কিংবা খাঁটি রাসায়নিক শক্তি না। কিন্তু এটা যে আসলে কী, তা আমরা জানি না। দেখে মনে হয়, এটি শক্তির ভিন্ন আরেকটি রূপ।

পরিশেষে, আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত গতিশক্তির নীতিগুলোর কিছুটা পরিবর্তিত একটি রূপ আছে—ইচ্ছে হলে আপনি অবশ্য একে অন্যকিছুও বলতে পারেন। এর মাধ্যমে গতিশক্তিকে ‘ভরশক্তি’ নামের এক ধরণের শক্তির সঙ্গে সমন্বিত করা হয়েছে। কোনো বস্তুর কেবল অস্তিত্ত্ব থাকলেই এর মধ্যে কিছু শক্তি থাকে। আমার কাছে যদি স্থির, আপাতত নিষ্ক্রিয় একটি পজিট্রন এবং একটি ইলেকট্রন থাকে—মহাকর্ষ বা অন্যান্য জিনিসের কথা আপাতত ভুলে যান—এরা একসঙ্গে মিলিত হয়ে উধাও হয়ে গেলে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ ‘বিকিরণ শক্তি’ বেরিয়ে আসবে। এই পরিমাণটা হিসেব করা যায়। শুধু বস্তুর ভর জানা লাগে। জিনিসটা কী, তার উপর এই শক্তি নির্ভর করে না—আমরা দুটো জিনিসকে উধাও করে দিয়ে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি পেয়েছি, এই হচ্ছে কথা। এই সমীকরণটি প্রথম বের করেছিলেন আইন্সটাইন, E = mc2

আমাদের আলোচনা থেকে একটা জিনিস তো এতোক্ষণে নিশ্চয়ই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণ করার জন্য শক্তির সংরক্ষণশীলতা নীতি দারুণ কাজের জিনিস। সবগুলো সমীকরণ না জেনেই, বেশ কিছু উদাহরণ থেকে এটা আমরা দেখেছি। যদি সব ধরণের শক্তির জন্য প্রযোজ্য সকল সমীকরণ আমাদের জানা থাকে, অনেক গভীরে না গিয়েও আমরা সহজেই বিশ্লেষণ করে দেখতে পারব, [অনেকগুলো নমুনা প্রক্রিয়ার মধ্যে] কতগুলো প্রক্রিয়ার ঠিক করে কাজ করার কথা। সেজন্যেই সংরক্ষণশীলতা বা নিত্যতার সূত্রগুলো এতো আকর্ষণীয়।

এখন, সহজাতভাবেই প্রশ্ন আসবে, পদার্থবিজ্ঞানে আর কী কী নিত্যতার সূত্র আছে? শক্তির নিত্যতার সূত্রের মতো আরো দুটি নিত্যতার সূত্র আছে। একটি হলো, লিনিয়ার মোমেন্টাম বা সরলরৈখিক ভরবেগের নিত্যতা সূত্র। আরেকটি অ্যাঙ্গুলার মোমেন্টাম বা কৌণিক ভরবেগের নিত্যতা সূত্র। এদের ব্যাপারে আমরা পরে বিস্তারিত জানব।

শেষ বিশ্লেষণটায় [ইলেকট্রন-পজিট্রন মিলে বিকিরণ শক্তির বেরিয়ে আসার ঘটনায়] আমরা নিত্যতার সূত্র গভীরভাবে বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারিনি শক্তির সংরক্ষণশীলতা। শক্তিকে আমরা এখানে নির্দিষ্ট সংখ্যক ছোট বুদবুদ হিসেবে দেখি না। কিন্তু আপনারা হয়তো ফোটনের এরকম বুদবুদের গুচ্ছ হিসেবে বেরিয়ে আসার কথা শুনেছেন। শুনেছেন, একটা ফোটনের শক্তির পরিমাণ বের করার জন্য কম্পাংককে প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবক দিয়ে গুণ করতে হয়। এটা সত্যি। তবে আলোর কম্পাংক যেহেতু যে কোনো কিছুই হতে পারে, তাই শক্তিকে যে একটা সুনির্দিষ্ট পরিমাণের হতে হবে—এরকম কোনো নীতি নেই।

ডেনিসের ব্লকের কথা মনে আছে? ওগুলোকে যেরকম নির্দিষ্ট সংখ্যক হতে হতো, এখানে সেরকম কিছু নেই। তারমানে, আমরা বর্তমানে যেটুকু বুঝি, সেই হিসেবে একটি ফোটনের মধ্যে যে কোনো পরিমাণ শক্তিই থাকতে পারে। অর্থাৎ, এই মুহুর্তে আমরা এই শক্তিকে ‘গণনা করার মতো কিছু’ বলে মনে করি না। বরং এটাকে কেবল একটা গাণিতিক পরিমাণ বলে ভাবি। শুনেই বোঝা যাচ্ছে, এটা আসলে বিমূর্ত এবং উদ্ভট ধরণের একটা পরিস্থিতি।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জগতে দেখা যায়, শক্তির সংরক্ষণশীলতা মহাবিশ্বের আরেকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত—কোনো কিছুই পরম সময়ের উপরে নির্ভর করে না। ‘একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমরা একটা এক্সপেরিমেন্ট গুছিয়ে নিয়ে, করে দেখতে পারি। পরে কখনো আবার সেই একই এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে পারি। দুইবারই এক্সপেরিমেন্টটা একইভাবে কাজ করবে এবং এ থেকে একই ফলাফল আসবে।’—এটা আসলেই শতভাগ সত্যি কিনা, আমরা জানি না। যদি ধরে নেই, এটা সত্যি এবং এরসঙ্গে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নীতি যুক্ত করি, তাহলে এ থেকে যুক্তির ধাপ বেয়ে শক্তির নিত্যতা সূত্রে পৌঁছাতে পারব। জিনিসটা বেশ মজার হলেও এটা বোঝা একটু কঠিন। এবং এটা ব্যাখ্যা করাও ঠিক সহজ কাজ না।

বইয়ের লেখক রিচার্ড ফাইনম্যান; Image Course: http://wemustbuild.org/

যাই হোক, অন্যান্য নিত্যতা সূত্রও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় ভরবেগের নিত্যতা যে প্রস্তাবনার সঙ্গে যুক্ত, তা হলো: এক্সপেরিমেন্টটা কোথায় করা হচ্ছে, তার উপরে কিছু নির্ভর করে না, ফলাফল সব জায়গায় একই হবে। ভরবেগের নিত্যতার ক্ষেত্রে যেমন স্থানের ভিন্নতার জন্য ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়ে না, তেমনি শক্তির নিত্যতার ক্ষেত্রে কালের ভিন্নতার জন্য ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়ে না।

আবার, আমরা যদি যন্ত্রপাতিকে কৌণিকভাবে ঘুরিয়েও দেই, এতেও ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়ে না। সে জন্য কৌণিক যে কোনোরকম বিন্যাসের প্রতি মহাবিশ্বের অপরিবর্তিত থাকাটা কৌণিক ভরবেগের নিত্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলি ছাড়া আরো তিনটি নিত্যতার নীতি আছে। এখন পর্যন্ত আমরা যতটুকু জানি, সেই হিসেবে এরা শতভাগ সঠিক। এবং এদেরকে বোঝাও বেশ সহজ। কারণ, প্রকৃতিতে এদেরকে [ডেনিসের] ব্লকের মতো গণনা করা যায়।

তিনটির প্রথমটি হলো চার্জ বা আধানের নিত্যতা। এর মানে, আপনার কাছে কয়টি ধনাত্মক আধান আর কয়টি ঋণাত্মক আধান আছে, সেটা গুণে নিয়ে, ধনাত্মক আধান থেকে ঋণাত্মক আধানের সংখ্যাকে বিয়োগ করে যে সংখ্যাটি পাবেন—সেটা কখনোই বদলাবে না। আপনি হয়তো একটা ধনাত্মক আধানকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে পারেন, তাহলে সঙ্গে একটা ঋণাত্মক আধানও সরে যাবে—কিন্তু মোট হিসেবে আপনি ঋণাত্মক আধানের চেয়ে বেশিসংখ্যক ধনাত্মক আধান তৈরি করতে পারবেন না। বাকি দুটো নীতিও একইরকম—এর একটি হলো, ব্যারিয়নের নিত্যতা নীতি। প্রকৃতিতে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক স্ট্রেঞ্জ কণা আছে, যেমন নিউট্রন বা প্রোটন—এদেরকে ব্যারিয়ন বলে।

প্রাকৃতিক যে কোনো বিক্রিয়ার শুরুতে আমরা যদি গুণে দেখি, এতে মোট কয়টি ব্যারিয়ন অংশ নিচ্ছে, বিক্রিয়া শেষে ঠিক ততটি ব্যারিয়নকেই বেরিয়ে আসতে দেখা যাবে। বলে রাখা ভালো, এখানে আমরা অ্যান্টিব্যারিয়নকে -১ ব্যারিয়ন বলে ধরে নিয়েছি। এরকম আরেকটি নীতি হলো লেপ্টনের নিত্যতা নীতি। ইলেকট্রন, মিউ মেসন এবং নিউট্রিনো কণাদেরকে বলে লেপ্টন। প্রকৃতিতে আবার অ্যান্টিইলেকট্রনও আছে। এর নাম পজিট্রন, এবং একে আমরা -১ লেপ্টন বলব। একইভাবে বিক্রিয়ার শুরুতে এবং শেষে লেপ্টনের সংখ্যা গুনলে দেখা যাবে, সংখ্যাটা একই আছে। বদলায়নি। অন্তত এখন পর্যন্ত আমরা তাই দেখে এসেছি।

এই হচ্ছে আমাদের ছয়টি নিত্যতা বা সংরক্ষণশীলতার নীতি। এর তিনটি কিছুটা জটিল, এবং এদের সঙ্গে স্থান-কালও যুক্ত। বাকি তিনটি খুবই সহজ, কারণ, এদেরকে চাইলে গুনে ফেলা যায়।

এখানে একটা জিনিস বলে রাখা দরকার। মোট শক্তির সংরক্ষণশীলতা বা নিত্যতা আর মানুষের ব্যবহারোপযোগী শক্তির পরিমাণ মোটেই এক না। দুটো একেবারে ভিন্ন ব্যাপার। সাগরের পানির মধ্যেকার পরমাণুতে অনেক আন্দোলন, লাফালাফি নিয়মিতই হচ্ছে। কারণ, সাগরের একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা আছে। কিন্তু অন্য কোথাও থেকে শক্তি এনে প্রয়োগ না করে এই সব পরমাণুকে একটা নির্দিষ্ট গতিতে আন্দোলিত করা এক কথায় অসম্ভব।

সেজন্যেই প্রকৃতিতে শক্তির মোট পরিমাণ সংরক্ষিত হলেও মানুষের ব্যবহারোপযোগী শক্তিকে অত সহজে সংরক্ষণ করা যায় না। ব্যবহারোপযোগী শক্তির পরিমাণ যে নীতিগুলো দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়, তাদেরকে বলে ল’স অফ থার্মোডায়নামিক্স বা তাপগতিবিদ্যার নীতি। এরমধ্যেকার একটি কনসেপ্ট বা ধারণা হলো এনট্রপি। যেটা বলে, তাপগতীয় প্রক্রিয়া আসলে অপ্রত্যাবর্তী।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটা দিয়ে শেষ করি। ব্যবহারোপযোগী শক্তির সরবরাহ আমরা কোত্থেকে পাই? এগুলি আসে মূলত সূর্য, বৃষ্টি, কয়লা, ইউরেনিয়াম এবং হাইড্রোজেন থেকে। সূর্য বৃষ্টি তৈরি করে, কয়লাও তৈরি করে—অর্থাৎ এই সবকিছুর মূলে আছে ওই সূর্য। শক্তির মোট পরিমাণ সংরক্ষিত হলেও প্রকৃতিকে এ নিয়ে একদকমই আগ্রহী মনে হয় না। সূর্য থেকে সে অকল্পনীয় শক্তি চারপাশে ছড়িয়ে দেয়। তবে এর মধ্যেকার প্রতি দুই বিলিয়নে মাত্র এক [একক] অংশ পৃথিবীতে এসে পড়ে।

প্রকৃতিতে শক্তির নিত্যতা আছে ঠিকই, কিন্তু সে এর থোড়াই কেয়ার করে। অনেক শক্তি সে চারপাশের সবদিকে ছড়িয়ে দেয়, খরচা করে প্রতিনিয়ত। আমরা এরইমধ্যে ইউরেনিয়াম এবং হাইড্রোজেন থেকে শক্তি সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এসব কেবল বিস্ফোরক এবং ভয়ংকরসব পরিস্থিতিতে ব্যবহৃত হয়েছে। থার্মোনিউক্লিয়ার বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেনকে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করা গেলে প্রতি সেকেন্ডে ১০ কোয়ার্টস [মানে, এক গ্যালনের এক চতুর্থাংশ] পানি থেকে যে পরিমাণ শক্তি সংগ্রহ করা যাবে, হিসেব করে দেখা গেছে, তা পুরো যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত বৈদ্যুতিক শক্তির সমান।

[কারণ, পানিতে হাইড্রোজেন থাকে]। প্রতি মিনিটে ১৫০ গ্যালন প্রবাহমান পানি ব্যবহার করতে পারলে, বর্তমানে পুরো যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যেটুকু শক্তির চাহিদা আছে, তার পুরোটা মেটানো সম্ভব। অর্থাৎ এটুকু পানি থেকেই এই বিপুল পরিমাণ শক্তি সরবরাহ করা সম্ভব। শক্তির চাহিদা নিয়ে আমাদের সারাক্ষণ যে দুশ্চিন্তা, সেটা থেকে আমাদেরকে মুক্ত করার দায়িত্বটা তাই পদার্থবিজ্ঞানীদের কাঁধেই পড়ে। তাদেরকেই বের করতে হবে, এটা কীভাবে করা যায়। তবে হ্যাঁ, এটা করা সম্ভব।

তথ্যনির্দেশ

রিভার্সেবল বা প্রত্যাবর্তী যন্ত্র: যে যন্ত্র প্রত্যাবর্তী প্রক্রিয়া মেনে কাজ করে, তাই প্রত্যাবর্তী যন্ত্র। একটা কাজ, ধরা যাক, আমরা একটা আইসক্রিমকে গলাব। তো, গলানোটা হলো আমাদের মূল কাজ। এর বিপরীত কাজ কী? আইসক্রিমটাকে ঠান্ডা করা, তাই তো? এখন, মূল কাজ আর এর বিপরীত কাজের পরিমাণ এবং প্রয়োজনীয় শক্তির মান যদি সমান হয়, তাহলে সেটাই প্রত্যাবর্তী প্রক্রিয়া। এই উদাহরণে, আইসক্রিমটাকে গলাতে এবং ঠান্ডা করতে যদি সমান তাপ লাগে—তাহলে প্রক্রিয়াটা প্রত্যাবর্তী। বাস্তবে প্রত্যাবর্তী প্রক্রিয়া পাওয়া যায় না। আমরা বলি, বাস্তব সব প্রক্রিয়া প্রত্যাবর্তী।

কার্নো ইঞ্জিন: বিজ্ঞানী কার্নো একটি প্রত্যাবর্তী তাপ-ইঞ্জিনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এটিই কার্নোর ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিনটি কার্নো চক্র নামে একটি নিয়ম মেনে কাজ করে। চক্রের অর্ধেক সময় একদিকে কাজ হয়, বাকি অর্ধেক সময় কাজ হয় উল্টো দিকে। প্রথম দিককে ধনাত্মক এবং দ্বিতীয় দিককে ঋণাত্মক ধরে নিলে দেখা যায়, ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক কাজ এবং তাপের মান সমান। তাই যোগ করলে, চক্র শেষে মোট কাজ ও তাপের মান শূন্য হয়ে যায়।

পার্পেচুয়াল মোশন বা অবিরাম গতি: প্রত্যাবর্তী প্রক্রিয়া থেকেই আমরা দেখি, একদিকে যেটুকু শক্তি দেয়া হচ্ছে, উল্টোদিকে ফিরে আসার সময় সবটা শক্তিই ফেরত পাওয়া যাচ্ছে। ফলে, চক্র বা পুরো কাজের শেষে মোট শক্তির মান ধনাত্মক আর ঋণাত্মকে কাটাকাটি হয়ে শূন্য হয়ে যাচ্ছে। চক্র শেষে যদি এই মান শূন্য না হয়ে কিছু অতিরিক্ত শক্তি থেকে যেত, তাহলে এই শক্তিটা হতো আমাদের উপরি পাওনা। এই শক্তি ব্যবহার করে যে গতি তৈরি করা যেত, তাই অবিরাম গতি। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যাবর্তী প্রক্রিয়াই সম্ভব হয় না, উপরি পাওয়া তো দূরের কথা! সে জন্যই আমরা বলি, অবিরাম গতি সম্ভব নয়।

স্টেভিনাস: সাইমন স্টেভিন একাধারে গণিতজ্ঞ, প্রকৌশলী ও পদার্থবিজ্ঞানী ছিলেন। বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ও এক্সপেরিমেন্টাল—দুই ক্ষেত্রেই তিনি অবদান রেখেছেন। হেলানো তলের ওপরে তাঁর করা ল’ অফ ইকুইলিব্রিয়াম বা ভারসাম্যের নীতির প্রমাণটি ‘দ্য এপিটাফ অফ স্টেভানিস’ নামে বিখ্যাত।

সরলরৈখিক ভরবেগ: ইংরেজিতে বলে লিনিয়ার মোমেন্টাম (Linear Momentum)। সরল রেখা বরাবর কোনো বস্তুর ভর ও বেগের গুণফলই সরলরৈখিক ভরবেগ।

কৌণিক ভরবেগ: ইংরেজিতে বলে অ্যাঙ্গুলার মোমেন্টাম (Angular Momentum)। কোনো বস্তুর ভর ও কৌণিক বেগের গুণফলই কৌণিক ভরবেগ। কোনো বস্তু যখন বৃত্তাকারে ঘোরে, তখন সে যেহেতু ‘কোণ’ ঘুরছে, তাই তার কৌণিক ভরবেগ থাকে।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত উচ্ছ্বাস তৌসিফের অনুবাদে রিচার্ড ফাইনম্যানের “সিক্স ইজি পিসেস” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। এছাড়া বিশেষ ছাড়ে বইটি পেতে চাইলে যোগাযোগ করুন বুকশেয়ার অথবা বইনগর পেজের ইনবক্সে। 

Featured Image: sconten

আপনার মন্তব্য লিখুন