Skip links

এক প্রশংসিত বালকের অভ্যুদয়

দাঁড়িকমা থেকে প্রকাশিত মুহাম্মদ সৈয়দুল হক এর "প্রশংসিত: সিরাতে রসুলুল্লাহ নিয়ে আধুনিক উপন্যাস" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 5 মিনিট

গ্রীষ্মের উত্তপ্ত দুপুর। গাছের ছায়ায় বসেছিল বালক। সামনে বিস্তৃত প্রান্তর। পাথুরে জমি। মাঝে মাঝে বৃক্ষের ঘনঘটা। উন্মুক্ত আকাশে দুয়েকখণ্ড শুভ্র মেঘের আনাগোনা। প্রকৃতির সাথে বালকের আলাপ জমে উঠেছে। আরবের গাছ। খুব একটা ডালপালায় পূর্ণ না। তবু যতটা সম্ভব শাখা-প্রশাখা প্রসারিত করে বালককে অভিবাদন জানাতে ব্যস্ত। সূর্যটা বেশ চটে আছে। রোদের তীব্রতা প্রখর। শুষ্ক আবহাওয়া। গাছের ছায়া যথেষ্ট নয়। কোথা থেকে একখণ্ড মেঘ উড়ে এসে গাছের উপর জুড়ে বসল।

দূর থেকে বহিরা নীরবে অবলোকন করছে। শাখা-প্রশাখাগুলি ঝুঁকে-ঝুঁকে পড়ছে। সম্মানে নতশির। যেন আপনা-আপনি ভেঙে আসন হতে চায়। পাতাগুলি দিয়ে আরাম-কেদারা বানিয়ে সেখানে বালককে বসিয়ে মহানন্দে মেতে উঠতে চায়। বহিরার ধৈর্যের বাঁধ আর টেকে না। লোক পাঠায়। বালককে গির্জায় আনে। সেঁ এসেছে সুদূর মক্কা থেকে। গন্তব্য সিরিয়া। যেখানটায় বিশ্রাম নিচ্ছিল সেটা বুসরা। পাশের গির্জাটার তত্ত্বাবধায়ক বৃদ্ধ বহিরা। সে নিরেট খ্রিষ্টান। আপন ধর্মে বেশ পণ্ডিত। খ্রিষ্টীয় রীতিতে তাঁর পরিচয় পাদরি বা ‘ধর্মযাজক’। সে ইতোমধ্যে বালকের কাফেলাকে নিমন্ত্রণ জানিয়েছে। কাফেলার লোকজন বহিরার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। বালক যেন ভিআইপি গেস্ট! তাঁকে বসানো হলো আলাদা জায়গায়। উপাদেয় পরিবেশিত। বালক খাওয়া শুরু করেছে। ছোটো ছোটো গ্রাসে। ধীরে-সুস্থে…

বহিরা অপলক নয়নে তাকিয়ে। বালকের চেহারায় বুঝি তারার মেলা। তা থেকে চাঁদের মতো স্নিগ্ধ আলোর বিচ্ছুরণ ঘটছে। চওড়া ললাট। ললাটের ঘামবিন্দু মুক্তো-সদৃশ। সূর্যের আলোকরশ্মিতে চিকচিক করে জ্বলছে। ভ্রুকুটি ধনুকের ন্যায়। চোখজোড়ায় স্বর্গীয় মায়ার সমাবেশ। দৃষ্টির সে কী প্রখরতা! চাহনির সে কী দৃঢ়তা! চোখে চোখ রাখা-ই দায়। ঠোঁটের ওঠা-নামাতে দাঁতের আংশিক দেখা যাচ্ছে। তা থেকে সূর্যরশ্মি চমকিত হচ্ছে। কাঁধ পর্যন্ত শ্যামলবরণ চুল। ঈষৎ কোঁকড়ানো। হালকা বাতাসে সমুদ্রের তরঙ্গের ন্যায় দুলছে।

চুলের সাথে সাথে বহিরাও উড়ে চলেছে। পৃথিবীর বাইরের কোনো অচিনপুরে। অন্য লোকালয়ে। যেখানে স্বর্গীয় দূতেরা আসর জমায়। নাতিশীতোষ্ণ সে রাজ্য কেবল বহিরা ও বালকের। মনে মনে বহিরার প্রার্থনা—এ আসর দীর্ঘ হোক। এ আসরে বালকের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দিতে পারাই তার আজন্মের পরম সৌভাগ্য।

সহসা বালকের মাঝে অন্য এক মানুষকে দেখতে পায় সে। যার অপেক্ষা বহুকাল যাবৎ করে চলেছে। অমাবস্যার পর পৃথিবীবাসী যেরূপ চাঁদের প্রতীক্ষায় থাকে। সে প্রতীক্ষার প্রহর বুঝি শেষ হলো। কাঙ্ক্ষিত সে চাঁদ আজ তার দোরগোড়ায়। অতএব, তাঁকে মন ভরে দেখা চাই। তাঁর স্নিগ্ধ আবেশ যত পারা যায় নেয়া চাই। এরূপ স্বর্গীয় আবেশ যে বহিরা তার জন্মে কখনো পায়নি।

কিন্তু আবেশে খেই হারালে চলবে না। বালকের কাছে বহিরার বহুকিছু জানার আছে। ধীরে ধীরে কাছে যায়। আলতো করে পিঠে হাত বোলায়। উৎসুক নয়নে প্রশ্ন করে যায়—আপনার বাড়ি কোথায়, কী করেন, খান কী, ঘুমান কখন, অবসর কীভাবে কাটে… প্রশ্নের আর শেষ নেই। বালকও মোলায়েম বচনে উত্তর দিতে থাকে। উত্তর শুনে বহিরা চমকায়, কেঁপে কেঁপে ওঠে, অবাক হতে থাকে।

প্রশ্নে শেষ নয়, আরও পরখ করা চাই। আস্তে আস্তে শরীরের কাপড় উল্টায়। আহা! শরীরে কী সুঘ্রাণ! কস্তুরির চেয়েও অধিক। পিঠের উপরিভাগে দুকাঁধের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় বহিরার চোখ আঁটকে যায়। কিছুটা উঁচু বৃত্তাকার এক মাংসপিণ্ড। বহিরা দৃষ্টিকে আরো গভীর করে। খালি চোখে যা দেখা যায় না, তা দেখার চেষ্টা করে। কী যেন দেখেও ফেলে।

বহিরার প্রশ্ন এবার আবু তালিবের প্রতি। আবু তালিব বালকের চাচা। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। দীর্ঘদেহী ভদ্রলোক। মক্কার হাশিম গোত্রের বিখ্যাত আবদুল মুত্তালিবের পুত্র। কাফেলায় বালকের একমাত্র অভিভাবক। প্রশ্ন তাই তার প্রতি—

-আপনি তাঁর কী হন?
– বাবা।
– সম্ভবত ভুল বলছেন!
– না মানে, চাচা হই।
– তাঁর বাবার কী হয়েছিল?
– তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেছেন।
– হ্যাঁ হ্যাঁ, এমনটাই তো হবার কথা। এমনটাই তো লেখা ছিল।
– কিন্তু কেন? কোথায় কী লেখা আছে?
– সে প্রশ্ন ঐ সমস্ত গাছকে করুন, যে-সব গাছ চলার পথে তাঁর প্রতি অবনত হচ্ছিল। আকাশের ঐ মেঘখণ্ডকে জিজ্ঞেস করুন, যেটি তাঁকে অনবরত ছায়া দিয়ে যাচ্ছিল। ঐ সমস্ত পাথরখণ্ডকে করুন, যেগুলো তাঁকে অনবরত সালাম দিচ্ছিল। আমার সৃষ্টিকর্তার শপথ! এ কোনো সাধারণ বালক নয়। আমি নিশ্চিত, এই-ই সেই বালক, যাঁর ভবিষ্যদ্‌বাণী আমার ধর্মগ্রন্থে করা হয়েছিল।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন দাঁড়িকমা থেকে প্রকাশিত মুহাম্মদ সৈয়দুল হক এর “প্রশংসিত: সিরাতে রসুলুল্লাহ নিয়ে আধুনিক উপন্যাস” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই উপন্যাসেরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে, অথবা ওয়াফিলাইফের এই লিঙ্কে, অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে
রাসুল (সা) এর জীবনীমূলক উপন্যাস প্রশংসিত এর প্রচ্ছদ

ইতিহাসের পাতায় ঢুকে পড়া যাক এবার। পৃথিবীতে বালকের আগমন ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ। চান্দ্রমাস রবিউল আউয়ালের ১২ তারিখ। সোমবার দিন ও রাতের মধ্যভাগে। আঁধার যখন ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করে। প্রকৃতি যখন তার রূপ প্রকাশে নববধূর ন্যায় ঘোমটা খুলতে থাকে। পাখিরা যখন জেগে উঠে গান ধরে। ফুলকলিরা যখন প্রস্ফুটিত হতে প্রস্তুতি নেয়। আঁধারবিদারি সূর্যোদয়ের পূর্বমুহূর্ত। আরবিতে এই সময়ের নাম ‘সুবহে সাদিক’।

তবে ইতিহাস এখানেই শেষ না। আরও ঢের বাকি। মানব-সৃষ্টির সূচনাতে যাওয়া যাক। পৃথিবীতে প্রেরিত প্রথম মানব ও প্রথম নবী আদম আলাইহিস সালামের ঘটনা। আল্লাহ তাঁকে পরম যত্নে সর্বোত্তম আকৃতি দিয়ে বানালেন। অতঃপর রুহকে পাঠানো হলো তাঁর শরীরে। কিন্তু এ কী! রুহ ঘুরেফিরে খোদার দরবারে। ব্যাপার কী? ফিরে আসা কেন? রুহ উত্তর করে—এ আমায় কোথায় পাঠালেন? এ দেহ বড়ো অন্ধকার। আমার দ্বারা তাতে বসবাস সম্ভব না।

অতঃপর একখণ্ড নুর আদমের ললাটে স্থাপিত হলো। লাইট পেয়ে মাটির পিঞ্জিরা আলোকিত হলো। রুহ এবার ঠাঁই নিল ঠিকঠাক। সে নুরের দীপ্তি কিছুটা প্রকাশিত, বাকিটা লুকানো। কিন্তু সে নুরের পরিচয় কী? যাঁকে পেয়ে আদম আলাইহিস সালাম আলোকিত হলেন। হাদিসের ভাষ্যে সে নুর আল্লাহর আদি সৃষ্টি। যখন আসমান-জমিন, মাটি-পানি, হাওয়া-আগুন সৃষ্টি হয়নি। সহজ কথায় যখন এক খোদা ব্যতীত অন্য কিছু ছিল না। সৃষ্টিকর্তা পরম মমতায় তাঁর নাম রেখেছেন ‘মুহাম্মদ’। প্রশংসিত। যাঁর প্রশংসা সর্বকালে সর্বত্র চলমান। সৃষ্টির পরপরই আল্লাহর প্রশংসা করে সিজদাবনত হন বিধায় তাঁর নাম হয় আহমদ। সর্বাধিক প্রশংসাকারী। পড়ি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এটি দরুদ। তাঁর নাম নিলে দরুদ পড়তে হয়। এটিই বিধির বিধান।

বাবা আদমের ললাটে করে পৃথিবীতে সে নুরের আগমন তাঁর সাথেসাথেই। ক্রমান্বয়ে নবীদের মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হতে হতে বাবা আবদুল্লাহর কপালে। সেখান থেকে মা আমেনার রেহেমে। অতঃপর ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল। জান্নাত থেকে মা হাওয়া, আছিয়া, মারইয়াম ও হাজেরা মা আমেনার খেদমতে হাজির। মা আমেনা দেখেন—তাঁর ঘর থেকে এক অদ্ভুত আলোকরশ্মি পৃথিবীময় ছেঁয়ে গেল। সে আলোয় খালিচোখে রোমান সাম্রাজ্যের প্রাসাদ দেখা যায়। দেখা যায় কাবা শরিফ তাঁর ঘরের দিকে ঝুঁকে আছে। তিনটি পতাকা উড়ছে পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিম এবং কাবার ছাদ বরাবর। এদিকে শয়তান অনবরত কাঁদছে। পারস্যের মন্দিরে হাজার বছর ধরে জ্বলতে থাকা আগুন হঠাৎ-ই নিভে যায়। রাজপ্রাসাদের দেয়ালে ফাটল ধরে ধ্বসে যায় চৌদ্দটি গম্বুজ!

হ্যাঁ, মা আমেনার রেহেম ছেড়ে শিশুনবী ধরার বুকে। মানুষরূপে।

নিখিল-বিশ্ব ওরে আয় ছুটে আয়,
আমেনার কোলে দেখ্ নুর চমকায়।
চওড়া ললাট-মাঝে স্রষ্টার বাণী,
দুচোখ-গভীরে তাঁর মুক্তোর খনি।

চিবুক অতলে তাঁর মনোহারী বাঁশি,
দুঠোঁট ঠিকরে বেরোয় স্বর্গের হাসি।
শিরোপরে দেখনারে নুরিকেশ ওড়ে,
যেন ভ্রমরের গুঞ্জন গোলাপের ’পরে।

দেখ্ দেখ্—হাসে সেঁ! দেখ্ ঐ হাসি—
দাঁতের কোটরে যেন রূপরাজ শশী!
ও সে হাত নাড়ে, সাথে নাড়ে পা,
সৃষ্টিজগৎ দুলে ধিন ধিন তা!

ওরে দেখে যা। আয় তোরা শুনে যা—
কে সেঁ? কোন সে রাজন এলো…
জগৎ-সূর্য; না না, পূর্ণশশী যে
তারকারাজির ভিড়ে উজ্জ্বল সেঁ!

হেরে তাঁর নুরি রূপ এই ধরাপর
মরে ওরে লাজে মরে দিবা-নিশাকর।
রূপরাশির আধার সেঁ—রূপোত্তম
গুণবিকিরণী গুণরাজ ঐ—গুণোত্তম।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন দাঁড়িকমা থেকে প্রকাশিত মুহাম্মদ সৈয়দুল হক এর “প্রশংসিত: সিরাতে রসুলুল্লাহ নিয়ে আধুনিক উপন্যাস” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই উপন্যাসেরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে, অথবা ওয়াফিলাইফের এই লিঙ্কে, অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

Featured Image: moroccoworldnews.com

আপনার মন্তব্য লিখুন