Skip links

বাঙ্গালির বিপ্লবের সন্ধানে

একাদেমীয়া প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ফাহাম আব্দুস সালামের “বাঙ্গালির মিডিওক্রিটির সন্ধানে” বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 10 মিনিট

বাঙালি বারে বারে প্রথম থেকে শুরু করতে চায়। কেননা সে তার পূর্বতর ভুল ও মিথ্যা ভরা অচলায়তনকে প্রশ্ন করতে অপারগ, মোকাবেলা করতে অনিচ্ছুক। সে মনে করে যে নতুন একটা শুরুর মানে হোলো যা কিছু তার কীর্তি, তা সব তামাদি হয়ে যাওয়া। বিশ্বাস তার নিশ্চিত যে ভুলকে ডিজঔন করা হোলো সঠিকত্বের পথে সংক্ষিপ্ততম ও একমাত্র পথ। ধ্বংসই তার চোখে শ্রেষ্ঠ সমতাকারী – তাই ধ্বংস ছাড়া নতুন কিছু শুরু – তার কাছে অলীক ভাবনা।

আঠারো বছরের প্রেমে মোহ, কাম আর ভালোবাসাকে আলাদা করা যতোটা কঠিন তার চেয়ে বেশী কঠিন বাঙালির দেশপ্রেমে ঘৃণা, ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা, সাম্য আর কৌশলী শঠতাকে আলাদা করা। বিপত্তি হোলো, সে আলাদা করার অনিচ্ছার মাঝেই দেশপ্রেমের প্রাবল্য অনুভব করে। তার বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্যকে শুদ্ধের প্রতি আসক্তি বলে মনে করে প্রথম থেকে শুরু করার এই ইচ্ছাকে ভক্তি সহকারে নাম দিয়েছিলো ‘বিপ্লব’।

কিন্তু

নিয়োলিবারেলিজমের এই ঘনঘটা কালে ‘বিপ্লব’ শব্দটা অবিস – বগলের চুলের মতো অশোভন অতিরিক্ত; খুঁজে পেতে হয় তাকে একটা ৩৬-২৪-৩৬ মাপের শব্দ। বাঙালির চিরদিনের ফ্যান্টাসি তাই নতুনতর এক শব্দে শোভিত হয়: ‘পরিবর্তন’। পরিবর্তনে সব কিছু বদলে যাবে, বদলে যাওয়াটাই ভবিতব্য – শুধু তার নিজের আদিপনা ছাড়া।

বাঙালির বিপ্লবের গন্তব্য একটাই: সবাই, সবকিছু তার নিজের মতো হয়ে উঠবে। সমতা আর সাম্যের মানে তার কাছে হোলো কাতারে-কাতারে, লাখে-লাখে তার নিজের ক্লোন কিলবিল করবে। আর যারা অন্য রকম, অন্য বিশ্বাসের – তাদের সে “কিল বিলের” মতো কচু কাটা করবে। কারণ তার স্বপ্নের মঙ্গল রাষ্ট্রে ভিন্ন মত মানেই বিদূষক, প্রতিবন্ধক। এই প্রতিবন্ধককে টপকানো তার লক্ষ্য না কেননা সেজন্য কসরত করতে হবে – সে চায় কোনো এক শক্তিমান, যার দোষগুলো ঠিক তারই মতো কিন্তু গুণগুলো হবে পৌরাণিক – তিনি এসে এই প্রতিবন্ধক “উপড়ে” দেবেন।

সে বাস করে সমাজে, সে বোঝে সমাজ এবং তার অস্তিত্ব সমাজে পোঁতা কিন্তু স্বপ্ন দেখে রাষ্ট্রের। সে স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তাকে রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা বলে গুলিয়ে ফেলে। কেননা প্রয়োজন বোধ করার আগেই, পলিটি হয়ে ওঠার আগেই – সে পেয়ে গেছে একটা রাষ্ট্র। সে রাষ্ট্রে তার নিজের অওকাদ হোলো প্রজাসুলভ, নাগরিকসুলভ না। নাগরিকের রাষ্ট্রে সুবিধা যেমন আছে, দায়ও আছে অনেক। প্রজার রাষ্ট্রে কোনো দায় থেকে না, থাকে শুধু কর্তব্য আর কিছু প্রিভিলেজ – দুটোই ঊর্ধ্বতনের ঠিক করে দেয়া। নাগরিকের রাষ্ট্র “হয়ে ওঠার” জিনিস, সেখানে সে উপস্থিত থাকে ঔনার হিসেবে। প্রজার রাষ্ট্র “করে দেয়ার” জিনিস, যেখানে সে উপস্থিত থাকে – স্বভাবতই – সুযোগ-সন্ধানী খেলোয়াড় হিসেবে।

সে কোনোদিনও নাগরিক হতে পারে না, সে হয় বাসিন্দা। বাসিন্দার ভাবজগতে প্রক্সিমিটি হোলো সব থেকে দৃশ্যমান নির্ণায়ক কেননা একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রমিত হোলে “অপর” বাসিন্দা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এই “অপর” বাসিন্দা তার চোখে সংখ্যা থেকে মানুষ হয়ে ওঠে কেবলমাত্র ধর্ম কিংবা ভাষার দোহাই থেকে, কখনোই নাগরিকত্বের কারণে না। লিগাল  কোডের  দার্শনিক ব্যাখ্যা তার ভেতরে কোনো ধরনের ওভার-আর্চিং দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে না। সে বোঝেই না যে শাস্তির বাইরেও লিগাল  কোডের একটা গন্তব্য আছে। যে কারণে বাঙালির একমাত্র রাষ্ট্রের একজন মন্ত্রী সর্বসম্মুখে বলতে পারেন যে একজন পূর্বতর প্রধানমন্ত্রীকে দেশ থেকে বের করে দেয়া উচিত। কারণ তার মনে রাষ্ট্র হোলো খুব বড় ধরনের একটা গ্রাম, যার ঢোকার ও বের হওয়ার মুখে খুব বড় একটা মেঠো পথ আছে। যখন সে গ্রামের কেউ এমন কোনো অপরাধ করে যার ব্যাখ্যা গ্রামবাসীর জানা নেই তখন বয়োজ্যেষ্ঠরা তাকে গ্রাম থেকে বের করে দিলে সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস শুরু করবে বলে মনে করা হয়। এই মেঠো পথটার অপর প্রান্ত, যেটা অন্ধকারে মিলিয়ে যায়, সেটা গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে “বাস্তবতা” বটে কিন্তু “বিবেচ্য” না।

এই অবিবেচ্যতাকে বরাদ্দ রেখে সে রাষ্ট্র গঠন করে, বিপ্লবের স্বপ্নও দেখে – স্পর্ধা মাত্রই “অদ্ভুত”, কিছু স্পর্ধা অদ্ভুততর। তা সেই বিপ্লব বস্তুটা কী?

Image Course: Badrul Hasan Tanjil/ Flicks

বাঙালি কখনো এলাবোরেট স্বপ্ন দেখতে পারে না – তার জন্য প্রস্তুতির প্রয়োজন। তার স্বপ্ন হোলো তাৎক্ষণিকতার স্বৈরাচার – অর্ধেক তার দেখা, তার অর্ধেক তার স্বপ্ন। আর সেই সিকিস্বপ্নের পুরোটাই হোলো ধ্বংসের ছক। সে এমন কোনো অলৌকিক কসরতের  আরাধনা করে যার তোপে হাজির সুবিধাপ্রাপ্তরা সব “নাই” হয়ে যাবে।

এই নাই হয়ে যাওয়াটাও খুব মজার বিষয়। এক সময় সে মনে করতো যে এদের হত্যা করা উচিত – তাহলেই না বিপ্লবের ন্যায্যতা। এখনও যে সে অন্যরকমদের মৃত্যু চায় না, তা না; কিন্তু হত্যা করে পার পাওয়া আজকের দুনিয়ায় খুব কঠিন। তাই সে তার দৃশ্যকল্পকে একটু ঘষামাজা করেছে। এখন সে চায় এই ডার্টি জবটা রাষ্ট্রই করুক – আইন দিয়েই করুক।

আইন যদি বলে যে তার প্রতিপক্ষের পাদ মারার অধিকার নেই, সে বিচলিত হয়ে যায় তার প্রতিপক্ষ পাদ মারলে, বিচার চেয়ে বসে আইন ভাঙার অপরাধে।  আইনের উৎস ও ন্যায্যতা প্রশ্নে আলাভোলা কলোনিয়াল, মাথায় তেল দিয়ে সাতলানো চুলের সুবোধ বালক, কিন্তু আইন ভাঙ্গলে সাজা কী – সে প্রশ্নে একদম কামোচ্ছল তাগড়া পুরুষ – সতত উদগীরণমুখ।

তার কলোনিয়াল মাথার সব থেকে বড় চিহ্ন হোলো আইন-ফেটিশ। কলোনিয়াল মাথা মনে করে যে সব কিছুর জন্য আইন দরকার, পাদ মারা এবং পাদের থেকে রক্ষা পাওয়া – দুটোর জন্যেই আইনের প্রয়োজন আছে। কারণ সে সত্যি সত্যিই মনে করে যে আজকে যদি একজনের পাদ থেকে নিস্তার না পাওয়া যায়, কালকে তাহলে দশজনের পাদ থেকে কীভাবে রক্ষা করবো (কলোনিয়াল মন ঐকিক নিয়মে তুখোড়)?  তার মন বলে, একজনের পাদ উপদ্রব – কিন্তু দশজনেরটা – বিপ্লব। কাজেই আইন দাগা। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিচারপতিরা শক্তিমানের প্রতি পরমব্রতী; বিচার করার চেয়ে বিহিত করার দিকে তাদের ঝোঁকটা একটু বেশী। পোক্ত ব্যবস্থা আর কী!

গর্দভদের সংবিধানে সবসময় সর্বোচ্চ সংখ্যক আইন ও সংশোধনী থাকতে হয়। গর্দভরা নিরাপদ হওয়ার চেয়ে নিরুপদ্রব হওয়াকে বড় পাওয়া মনে করে।

যে প্রশ্নটা প্রাসঙ্গিক সেটা হোলো কীভাবে আমরা আধুনিক জীবনে অভ্যস্ত হয়েও আদিম গোত্রীয় চিন্তাকে প্রশ্রয় দেই? কীভাবে নাগরিক শেকড়হীনতার মাঝেও এতো সার্থকভাবে সামষ্টিক আদিপনাকে লালন করি? পশ্চিমের লাইফ স্টাইল আমাদের এতো প্রিয় অথচ পশ্চিমের লিবারেল থটস কেন আমাদের বিন্দুমাত্র টলাতে পারে না?

এর উত্তর অন্তত আমার কাছে হোলো – ভাষা। লিঙ্গুইস্টিক রেলেটিভিটি বলে একটা হাইপোথিসিস আছে, যেখানে ধারণা করা হয় যে মানুষের ওয়ার্ল্ড ভিউ তার ভাষা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অর্থাৎ একটা ভাষার গঠন তার ভাবনাকে প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত করে। কুৎসিত সরলীকরণে বলা যায়, যা আপনার ভাষায় নেই – সেটা আপনার ভাবনায়ও  নেই।

যেমন ধরুন কোনো ভাষায় যদি ক্রিয়ার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কাল যদি না থেকে কেবল একটিই ক্রিয়া থাকে তাহলে সে ভাষার মানুষেরা “সময়”কে আমাদের মতো করে নির্দিষ্ট ঘটনার সাথে সমন্বয় করে আলাদা করার ভাবনা পোষণ করবে না। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো যে লিঙ্গুইস্টিক রেলেটিভিটির বিভিন্ন দাবী বিভিন্ন সময়ে ভাষাবিদরা নাকচ করেছেন কিন্তু সে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। ব্যক্তিগতভাবে, যখন আমি লিঙ্গুইস্টিক রেলেটিভিটির নামগন্ধও জানতাম না, তখনও এই একই উপসংহারে পৌছেছিলাম (আমি কোনো ভাষাবিদ নই এবং ভাষাতত্ত্বে যে আমার কোনো প্রশিক্ষণ নেই সেটা বলে রাখা ভালো)।

একটা ছোট্ট ও প্রায় অপ্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেয়া যাক। বাংলাদেশের শিক্ষিত মানুষ অপর সমগোত্রীয়কে যে অপবাদটি ছুড়ে সবচেয়ে স্বস্তি বোধ করেন, আমার ধারণা, সেটা হোলো “অসভ্য”। কিন্তু এই কটূক্তিতে কেউ মনোক্ষুণ্ন হয়েছেন এমন অপবাদ শোনা যায় না বললেই চলে। মজার ব্যাপার হোলো দু’শ বছর আগে এভাবে যে কাওকে অভিযুক্ত করা যায় সে ধারণাটাই হাজির ছিলো না। তা কীভাবে এই শব্দটি মগজে ঠাই নিলো?

দীপেশ চক্রবর্তীর কাছেই শুনেছিলাম মনে হয় – উনবিংশ শতকে ভারতবর্ষের শিক্ষিত মানুষেরা প্রথম অনুধাবন করেন যে য়োরোপীয়ানরা যে অর্থে “civilisation” শব্দটি ব্যবহার করেন সে অর্থ প্রকাশ করার মতো কোনো শব্দ তাদের স্থানীয় ভাষায় নেই। অর্থাৎ সমাজের অর্থনৈতিক, নৈতিক, আইনী বিকাশ এবং মন ও মগজের উৎকর্ষ অর্থে যে civilisation – তার দ্যোতক কোনো শব্দ আমাদের নেই। তাহলে একটা শব্দ বানাতে হয়।

সংস্কৃতে সভ্য শব্দটার অর্থ হোলো “সদস্য”। ছোটো বঙ্গে এই অর্থে শব্দটি এখনও ব্যবহৃত হয় (যেমন সংসদের সভ্য) । সদস্য অর্থটি মাথায় রেখে পার্টিসিপেন্ট এর এক্সটেনশান হিসেবে আমরা সভ্যতা শব্দটি আবিষ্কার করি এবং কৃত্রিমভাবে এই শব্দটির সীমানা নির্ধারণ করি য়োরোপীয়ানরা যে সীমানায় “civilisation” ব্যবহার করেন, ঠিক সেই নিরিখে।

ইংরেজিতে civil থেকে civilisation এর উৎপত্তি। কিন্তু আমরা ‘সভ্যতা’ আবিষ্কারের পর দেখলাম যে, যে ব্যক্তি সভ্যতার অনুগামী, অর্থাৎ মন ও মগজের উৎকর্ষ যার হাসিল হয়েছে তাকে নির্দিষ্ট করার মতো কোনো শব্দ তো পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা আরেকটা কৃত্রিম শব্দ আবিষ্কার করলাম। যেহেতু আমরা civilisation এর মানে সভ্যতা নির্ধারণ করেই ফেলেছি সেহেতু civil মানে শিষ্টও। সুতরাং সভ্যর অর্থ হিসাবে ‘সদস্য’ থাকলো আবার ‘ সাধুজন’ও জুড়ে বসলো। প্রথমে একটা গোজামেলে শব্দ বানানো, তারপর সেই গোজামেলে শব্দকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আরেকটি গোজামেলে শব্দের আবিষ্কার।

আশা করি বুঝতে পেরেছেন কেন “অসভ্য” গালিটি শুনলে কারো গায়ে লাগে না।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন একাদেমীয়া প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ফাহাম আব্দুস সালামের “বাঙ্গালির মিডিওক্রিটির সন্ধানে” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

কিন্তু প্রশ্নটি শুধু গালির না, আমরা কী অর্থে “সভ্যতা” বুঝি তারও। একান্তই আমার ব্যক্তিগত ধারণা – আমাদের মনে “সভ্যতা”র সাথে কোনো “শর্তের” সংশ্লিষ্টতা নেই। আমাদের মনে সভ্যতার সীমানা নির্ধারিত হয় শুধুমাত্র অর্থনৈতিক, সময় ও কংক্রীটের ব্যবহার দ্বারা। অর্থাৎ যে রাষ্ট্র যতো ধনী, যতো বেশীদিন ধরে ধনী এবং যারা যতো বেশীসংখ্যক প্রকাণ্ড ইমারত ও ব্রীজ তৈরি করেছে তাদের সভ্যতা ততো অগ্রসর। আমাদের কাছে সভ্যতার সাথে লিগাল ও মোরাল কোডের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই, অনর্থকরী বড় আবিষ্কারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

আর অন্যদিকে সভ্য মানে হোলো ভদ্র-মধ্যবিত্ত; কোনো গরীব মানুষ যতোই ভদ্র হোক, সে সভ্য হতে পারে না (সম্ভবত যেহেতু সে লুঙ্গি পরে বাইরে যায়) – আর বড়লোক সভ্য হোলে বাঙালি তাকে “মহান” মেনে স্বস্তি পায়। তবে “অসভ্য” হওয়ার এখতিয়ার মোটামুটি সবারই আছে। এই দিকটাতে বাঙালি খুবই গণতান্ত্রিক। মূলত মেয়েদের বুকের দিকে তাকালে, মলেস্ট করলে, কোনো মেয়ে উত্তেজনা ও ঈর্ষাবর্ধক কাপড় পরলে এবং সর্বোপরি কুরুচিপূর্ণ শব্দ (যেমন নুনু, ভোদা), গালাগাল (যেমন চুতিয়া) ও ইঙ্গিত প্রয়োগ করলে যে কেউ অসভ্য হতে পারেন।

সুবিধাপ্রাপ্তরা কখনো পরিবর্তন চায় না – স্বভাবতই। আর সুবিধাহীনের অভিমান সবার ওপর – সে বোঝে যে ইনসাফের অভাবে, বিদ্যমান পাওয়ার-স্ট্রাকচারের কারণেই সে সুবিধাহীন। তাই সে ধ্বংস দেখতে চায়। সে মনে করে যে ধ্বংসের পরে যা অবশিষ্ট তা অনিবার্যভাবে শুদ্ধ, প্রতিশ্রুত। এখানে, ঠিক এখানেই তার ভাবালুতার পরাক্রমে শব্দার্থের অভিস্রবণ হয়, শব্দগুলো ঠিক তার আবেগের মতো একে অন্যের সাথে মিলিয়ে যায়। সে ভুলে যায় যে ধ্বংস কেবল ধ্বংসের প্রতিশ্রুতিই বহন করে; ধ্বংসজাত সাম্যে কোনো অবশিষ্টের প্রতিশ্রুতি নেই।

ধ্বংসের আয়োজনে প্রয়োজন কেবল রাগ; কিন্তু সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন প্রতিভা। প্রতিভার অভাবকে বাঙালি হতচ্ছাড়া ভেবেছে এমন অপবাদ কেউ দিতে পারবে না। তাই ধ্বংসের পরের পর্যায়ে কী হবে এ নিয়ে তার কোনো ধারণা নেই, না থাকাটাকেও সে সঙ্গত মনে করে। কারণ: তার মাথায় সামষ্টিকতার অবিভেজ্যতা এসে ঠেকে সমাজে, রাষ্ট্রে না – সমাজ তো আর ঠিক ধ্বংস হয় না। তার সমাজবর্তী ভাবনা যে ধ্বংসমুখ উল্লাসের অন্তত অনুঘটক – এ কথা সে ভুলেও স্বীকার করবে না। এই অস্বীকারের যথার্থ কারণও আছে। ধ্বংসমুখ উল্লাস মানেই তো আর ধ্বংস না, আমি ধ্বংস চাই আর আমি ধ্বংসযজ্ঞে অংশ নেবো – এ দুয়ের মাঝে তো অনেক ফারাক। সত্যিই তো – ক্ষোভ পেকে ফল হবে, এমন তো কোনো চুক্তি নেই।

এই ভূ-খণ্ডের অধিবাসী মোটের ওপর এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার শিকার – কালেক্টিভ ঔনারশীপ কী জিনিস তা বুঝে ওঠার আগেই বাঙালি একটা রাষ্ট্র পেয়ে গেছে। সে ব্যক্তি মালিকানা বোঝে, সরকারী মালিকানা বোঝে কিন্তু সামষ্টিক মালিকানা জিনিসটা কী, তা মোটেও বোঝে না। ভোগের একচ্ছত্র সুযোগ তার কাছে সামষ্টিক মালিকানার শীর্ষ শর্ত। একটা প্রাচীন সমাজ দীর্ঘদিন উপনিবেশ থাকার কারণে এবং তারপরে খুব দ্রুত পুঁজিবাদী সমাজে উত্তরণের কারণে তার জন্য সামষ্টিক মালিকানার কনসেপ্ট বোঝাটা কষ্টকর। য়োরোপীয়ান রাষ্ট্রের ক্রমবিকাশের ভেতরের দর্শনের কথা বাদই দিলাম – সহজলভ্য, ইসলামী দর্শনের রুবুবিয়াত সম্বন্ধেও যদি বাঙালির ধারণা থাকতো; তাহলেও  অন্তত তার মাঝে এমন বিচিত্র স্বভাবের উদ্গার হতো না।

স্বাধীনতা ছাড়া সে থাকতে পারে না কিন্তু রাষ্ট্র সে ডিজার্ভ করে না – এমন দুর্ভাগা জনগোষ্ঠীকে ঠাই দেয়ার পলিটিকাল এনটিটি তো পৃথিবীতে নেই।

তাই বলে তো আমরা অরাষ্ট্রীয় নই। বাংলাদেশ, আমাদেরই আছে। কিন্তু বিপ্লব না হোলে আমরা কি অভীষ্টে পৌছুতে পারবো? বাঙালির সামষ্টিক জীবনে সত্যিকারের উত্তুঙ্গস্পর্শী বিপ্লব কি কোনোদিনও সবকিছু ওলট-পালট করবে না? এর ছোটো উত্তর হোলো পৃথিবীতে বিপ্লব বলে আসলে কিছুই নেই। কখনো কখনো বিবর্তন খুব দ্রুত ঘটলে আমরা অভিজ্ঞতা আর শব্দের অভাবে তার নাম দেই বিপ্লব।

Image Course: Jalaluddin Haider/Drik/Majority World

অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রতিটি জাতিরই কখনো না কখনো প্রয়োজন হয় বিবর্তনকে ত্বরান্বিত করার। আমরা দীর্ঘদিন সেই প্রয়োজনীয়তার ভেতরেই দিনাতিপাত করছি। অথচ এখানে বিপ্লবের কোনো সম্ভাবনা অদূর কিংবা সুদূর ভবিষ্যতেও নেই। কেননা যেকোনো বিপ্লবের একেবারে প্রথম যে শর্ত সেটা বাংলার দেশে পুরোপুরি অসম্ভব। বিপ্লবের প্রায় একমাত্র শর্তটি হোলো পুরাতন ও ভবিষ্যতের মাঝে অনতিক্রম্য দেয়াল উঁচু করতে সম্মত হওয়া। অতীতের সাথে এই যে বিচ্যূতি – আপনি মনে করতে পারেন যে  তার প্রধান সঞ্চালক হোলো রাজনীতি। আমার অনুমান – এর প্রধান  সঞ্চালক হোলো ভাষা ও পাবলিক মেমোরী।

অবশ্যই আমরা আওয়ামী লীগ থেকে নিস্তার পাবো, সেটা বিপ্লব না – স্বাভাবিক পরিবর্তন। বিপ্লব হোলো ভবিষ্যতে কেউ যেন – এমন কি তার নিজের পছন্দের দলটিও যেন  কোনোভাবেই আওয়ামী লীগ হতে না পারে – এবং হওয়ার চেষ্টা করলেও তাকে আটকে দেয়া – এই মানসিকতায় উত্তীর্ণ হওয়া। আপনারা জানেন যে ১৯৭১ এ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগ কোনো বিপ্লবে উত্তীর্ণ হতে পারে নি। পাকিস্তান আমলের শীর্ষ পর্যায়ের এমন কোনো অপকর্ম  ছিলো না যেটা বলবৎ রাখি নি আমরা বাংলাদেশ আমলে। বরঞ্চ বহু ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পরে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা পাকিস্তানীদের ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হই (যেমন নির্বিচার লুটপাট ও মেরিটোক্রেসির ওপরে স্বজনপ্রীতিকে স্থান দেয়া) ।

পরমতসহিষ্ণুতার কথা বললে আমি কেবল একটিই উদাহরণ দেবো: ৭ই মার্চ শেখ মুজিবর রহমান “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” বলে বাড়ী ফিরতে পেরেছিলেন – বাড়ীতে স্ত্রী-সন্তানের সাথে ডিনার করতে পেরেছিলেন। আজকে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কোনো নেতা কাছাকাছি কোনো আহবান করলে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে জেলে ঢোকানো হবে পল্টন ময়দান থেকেই।

কীভাবে ব্যক্তিগত প্রয়োজনের ওপরে ন্যায্যতাকে স্থান দিতে হয় এ সম্বন্ধে বাঙালির মাঝে কোনো ধরনের কনসেন্সাস তো নেইই – না থাকাটাকেও বিশেষ কাণ্ডজ্ঞানের বিষয় বলে বড়াই করে।  বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা ৭১ এ “পাকিস্তান” শেষ করতে চান নি, কীভাবে একটি নতুন “পাকিস্তানে” তারা নিজেরা একাই ভোগ করবেন সেই স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা কিংবা প্রস্তুতি ছিলো না রাষ্ট্র কীভাবে “হয়ে ওঠে”। পাঞ্জাবীদের জায়গায় বাঙালি প্রতিস্থাপন করাকে বিপ্লব বলে না, বলে রাজনীতি। তাই ৭১ এ বাঙালির রাজনীতি জয়ী হয়েছিলো – এর বেশী কিছুই যে হয় নি সেটাই সত্যিকারের ট্র্যাজেডি।

না হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিলো। পৃথিবীর প্রতিটি বিপ্লব এক অর্থে ভাষার কারসাজি। প্রতিটি বিপ্লবের প্রস্তুতি পর্বে সেই জনগোষ্ঠী এমন কিছু নতুন শব্দ, এমন কিছু টার্মিনোলজি কিংবা পুরনো কিছু এক্সপ্রেশন এমন নতুন ভাবে হাজির হয় – শব্দগুলো আপনার মাথাকে এমনভাবে রিওয়্যার করে –  যে নতুন ও পুরোনোর মাঝে একটি চূড়ান্ত ভেদরেখা না টানা ছাড়া কোনো উপায় অবশিষ্ট থাকে না।

আপনি বিপ্লব করেন না, বিপ্লব আপনাকে করে।

আমার কাছে মনে হয়েছে বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে অতীতের সাথে বর্তমানের যে ইনসেসটুয়াস সম্পর্ক, তা ছেদ করতে না পারার একটা মূল কারণ হোলো তার সম্ভাবনারহিত ভাষা – যে ভাষায় উৎকীর্ণ অভিজ্ঞতা আপনার কানে ফিস ফিসিয়ে যায়, খুব বড় কোনো পরিবর্তনকে আত্মস্থ করার তর্জমা হোলো ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ – শেকড়ের সাথে।

শেকড়কে রক্ষা করার এই বায়বীয় প্রকল্প যা মূলত অলস হয়ে থেকে যাওয়ার আগাম অজুহাত – সেই প্রকল্পে নিজেকে নিবেদন করে বাঙালি কেবল একটি কাজেই মনোনিবেশ করতে পারে শেষমেশ; সেটা হোলো তর্ক – টং দোকান থেকে ফেইসবুক – সর্বত্র। তর্কে জেতাকে বিপ্লবের অর্ধেক অর্জন বলে মনে করতে থাকাটাই তাই বাঙালির শীর্ষ অভীপ্সা।

বাঙালির বিপ্লব এমন কোথাও হয় তাই, হচ্ছে ঠিক এই মুহূর্তেও – যেখানে তার অক্ষমতা ছাড়া আর কেউ বসত গাড়ে নি।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন একাদেমীয়া প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ফাহাম আব্দুস সালামের “বাঙ্গালির মিডিওক্রিটির সন্ধানে” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বুকশেয়ারের ইনবক্সে

Featured Image: lvcandy/ Getty Images

আপনার মন্তব্য লিখুন