Skip links

জাহাজমারা যুদ্ধ: ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর স্পাই এবং পাকিস্তানি জাহাজ দখল

অধ্যয়ন থেকে প্রকাশিত সারতাজ আলীম-এর "১৯৭১: ফ্রন্টলাইনের সেরা অপারেশন" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 9 মিনিট

আর্টিকেলটি আপনি চাইলে অডিও পডকাস্ট হিসেবেও শুনতে পারেন:

অডিওটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক। অডিওটি শুনতে ভালো লাগলে সাবস্ক্রাইব করুন তার “ইতিহাসের গল্প” চ্যানেল এবং অনুসরণ করুন তার ইতিহাসের গল্প ফেসবুক পেজ

আগস্ট, ১৯৭১ সাল।

গোপন এক মিশনে দখলকৃত ঢাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন মুক্তিবাহিনীর স্পাই মমতাজ খান। বুড়িগঙ্গার এক জেটিতে তাকে কয়েকটা জাহাজের খোঁজখবর নেয়ার অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। মমতাজ খানের পকেটে আছে একটা চিঠি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইতিহাসের ভয়াবহতম বিপর্যয় নামাতে পারে এই এক চিঠি। পাক বাহিনী দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি তাদের অতি বিশ্বস্ত মমতাজ খান একজন স্পাই। তিনি গোপনে ইনফরমেশন এবং এই চিঠি জোগাড় করেছেন। তারপর ফিরে যান মুক্তিবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এক এলাকায়। এই চিঠির সূত্র ধরেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ৪০০ কোটি টাকার সমমূল্যমানের অস্ত্র হারায়। তাদের ইতিহাসের সব থেকে বড় অস্ত্র হারানোর ঘটনা মনে হয় এটি।

গেরিলা হামলায় এরই মধ্যে ধরাশায়ী নিজেদের এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বাহিনী দাবি করা পাকিস্তানি বাহিনী। তবে দেশে তখনো নিয়মিত বাহিনীর অভিযান আরম্ভ হয়নি। পুরো দেশকে দখলকৃত বাংলাদেশ বলা গেলেও দেশের মাঝেই এমন কিছু এলাকা আছে যেটা পাক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেই। এমন একটি এলাকা টাঙ্গাইল অঞ্চল। সেই এলাকায় খবরদারি করার দুঃসাহসও দেখাচ্ছে না জেনারেল নিয়াজির বাহিনী।

টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ এলাকার বিশাল এক জলা জঙ্গল এলাকার নিয়ন্ত্রণ কাদেরিয়া বাহিনীর হাতে। আব্দুল কাদের সিদ্দিকী (বীর উত্তম) বিশাল বাহিনী গড়ে তুলেছেন। অনবদ্য এক রণকৌশল এবং সাংগঠনিক ক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছে তারা। এশিয়ার স্বঘোষিত শ্রেষ্ঠ বাহিনীকে একেবারে নাকানিচুবানি খাইয়ে ছাড়ছে। আশেপাশের অঞ্চলের পাক ঘাঁটির সেনারা ভয়ে ঘাঁটি ছেড়েই বের হচ্ছে না! কাদের সিদ্দিকী স্কুলে পড়াকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে সেনাবাহিনীতে অল্প কিছুদিন চাকরি করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আবার শিক্ষাজীবনে ফিরে যান।

৫ আগস্ট, ১৯৭১ সাল। মুক্তিবাহিনী পাক বাহিনীর এক ওয়্যারলেস বার্তা ইন্টারসেপ্ট করে ফেলে। তার সারমর্ম হলো সদরঘাটের ইপিআর জেটিতে কয়েকটা বড় বড় জাহাজে অস্ত্র বোঝাই করা হচ্ছে। একই খবর সুবেদার নবী নেওয়াজও পেয়েছিলেন। যমুনার ওপর দিয়েই যাবে জাহাজগুলো। আর যমুনাসংলগ্ন কিছু এলাকা কাদেরিয়া বাহিনীর আয়ত্তে। জাহাজগুলো যাচ্ছে কই? এদের লক্ষ্য কী? কোথায় গণহত্যা চালাতে যাচ্ছে এরা? বিস্তারিত জানা দরকার।

মুক্তিবাহিনীর গুপ্তচর মমতাজ খান। ঝড়ের বেগে চলে যান ঢাকায়। উদ্দেশ্য সত্যতা যাচাই করা। কারণ এটা পাকিস্তানিদের চাল হতে পারে। আর সত্য হলে যতটা সম্ভব বিস্তারিত খোঁজ নেয় চাই। তার আপন বড় ভাই পুরান ঢাকায় অবস্থান নেয়া পাক বাহিনীর কর্নেল। মমতাজ খানকে সন্দেহ করা দূরে থাক উল্টো পরিচয় পেয়ে রাজকীয় সম্মান দিয়ে চলে পাকসেনারা।

পরিবার নিয়ে তিনি থাকতেন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সংগ্রামপুর গ্রামে (বর্তমানে ১২নং ইউনিয়ন পরিষদ)। এই গ্রামে কিছু পাঠান পরিবার থাকত। বিড়ি পাতার সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী এরা। অবাঙালি এই পরিবারগুলো নিয়েছে ন্যায়ের পক্ষ, নিয়েছে নিজ দেশের পক্ষ। নিজ জাতির কিছু লোকের অপকর্মের ভাগীদার না হয়ে বরং মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছেন। কাদেরিয়া বাহিনীর সাথে তাদের যোগাযোগ নিবিড়। এই পাঠান জাতির মমতাজ খান ডাবল এজেন্টের ভূমিকা পালন করছেন।

দ্রুত খবর নিয়ে ঢাকা থেকে সংগ্রামপুরে ফেরত এলেন স্পাই মমতাজ খান। মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প আগে থেকেই এখানে ছিল। কাদের সিদ্দিকী আসার পর সরাসরি রিপোর্ট করলেন তাকে। তার হাতে তুলে দিলেন সেই চিঠি।

জানা গেল জাহাজগুলোর গন্তব্য বগুড়ার ফুলছড়ি, তারপর রংপুর। উল্লেখ্য যে তখন মুক্তিবাহিনী ভারত থেকে এসে সীমান্তসংলগ্ন বিওপিগুলোতে (বর্ডার আউটপোস্ট) অতর্কিত হামলা শুরু করেছে। ভোজবাজির মতো কোথা দিয়ে মুক্তি গেরিলারা এসে হামলা করে মিলিয়ে যায় তার রহস্য পায় না পাক বাহিনী। সম্ভবত এ জন্যই উত্তরের সীমান্তে বাড়তি অস্ত্র পাঠানো।

জানা যায় কাদেরিয়া বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ করা এলাকার ভেতর দিয়েই যাবে জাহাজগুলো। ইপিআর জেটিতে সব মিলিয়ে ৭ জাহাজ বোঝাই করা হচ্ছে। মুক্তিবাহিনীর মূল লক্ষ্য ইউএসএ ইঞ্জিনিয়ারিং এলসি-৩ এবং এসটি রাজন নামের দুই জাহাজ। অস্ত্র রসদে ঠাসা হচ্ছে এই জলদানবকে। শুরু হয় পরিকল্পনা। এদিকে পাক বাহিনীর এক ঘাঁটি তছনছ করে দিতে ৩০ জন যোদ্ধা নিয়ে কাদের সিদ্দিকী সংগ্রামপুর থেকে টাঙ্গাইলের দেওপাড়ার দিকে অগ্রসর হন। তবে যাবার আগেই প্রাথমিক পরিকল্পনা করে যান তিনি।

কাদেরিয়া বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাকে বেশ কয়েকটি এলাকায় ভাগ করেছে। টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর ঘাট ঘেঁষে যাবে জাহাজগুলো। যমুনা নদীর ভুয়াপুর ঘাটের অপর দিকে সিরাজগঞ্জ ঘাট। সিরাজগঞ্জ পাক বাহিনীর দখলে। ৩০ কিলোমিটার দূরেই পাক বাহিনীর ঘাঁটি। তবে এই জায়গা বেছে নেয়ার কারণ হলো পানির কম গভীরতা এবং সামনে থাকা কিছু চর। ভুয়াপুর আঞ্চলিক দপ্তরকে কড়া সতর্কতায় রাখা হয়। দায়িত্ব পান কমান্ডার হাবিবুর রহমান (বীর বিক্রম)। গেরিলাদের মধ্যে থেকে ১৫-২০ জন সেরা যোদ্ধা বাছাই করেন তিনি। সামরিক বাহিনীর সংগ্রহ করা তথ্যবিবরণী নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সামরিক অভিযান বই অনুযায়ী এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন ২১ জন।

কাদেরিয়া বাহিনী; Image Source: bangladiary.com/

৯ আগস্ট, ১৯৭১।

সিরাজকান্দি ঘাটে (বর্তমান যমুনা সেতুর অদূরে) এসে ভিড়ে ৭টি জাহাজ। এস্কর্ট করার জন্য সাথে কয়েকটা স্পিডবোট। বিশাল আকারের জাহাজগুলোতে বেশ কটা বড় শহর একেবারে জ্বালিয়ে ছাই করে দেবার মতো গোলাবারুদ ছিল। জাহাজের আলো রাতের অন্ধকার ভেঙে শহরের মতো আলোকিত করে ফেলে নদীর ঘাট। জনগণ ভীত হয়ে ওঠে। জাহাজগুলো শুধু জোয়ারের সময় চলত। মুক্তিবাহিনীর এক বড় সুবিধা ছিল এটা। জাহাজের বিপরীত দিকে জোয়ার থাকলে সম্পূর্ণ বোঝাই করা জাহাজগুলো চালাতে প্রচুর জ্বালানি খরচ হতো এবং মাঝপথে কয়েকবার জ্বালানি ভরতে হতো।

কমান্ডার হাবিব মোতাহার, জিয়া ও জামশেদকে নিয়ে জেলের ছদ্মবেশ ধরেন। আক্রমণের আগে আরো তথ্য চাই তার। বিপদ আসার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও জাহাজের কাছে গিয়ে তিনি মাছ ধরতে শুরু করেন। সাধারণ জেলের ছদ্মবেশ ভালোই কাজে দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে টহল স্পিডবোটের মুখোমুখিও হয় তারা।

পাক বাহিনীর সাথে গল্প জুড়ে দেন তিনি। যুদ্ধের ক্লান্তিতে থাকা পাকসেনারা জানতে চায় তাজা খাবারের কথা। জাহাজের প্রিজারভ করা খাবার খেতে খেতে রুচির বদল দরকার তাদের। তরতাজা মুরগি আর চমচমের খোঁজ দেন কমান্ডার হাবিব। কৌশলে জেনে নেন দরকারি তথ্যগুলো। যেমন জাহাজের সব লোক খাওয়াতে কয়টা মুরগি চাই?

জানা গেল ভেতরে অন্তত ৩০০ থেকে ৮০০ (১ ব্যাটালিয়ন) সেনা আছে। এই ১০-১৫ জনের দল কয়েক মিনিটও টিকতে পারবে না। রিইনফোর্সমেন্ট চেয়ে ভুয়াপুরের আঞ্চলিক দপ্তরে বার্তা পাঠালেন কমান্ডার হাবিব। রিইনফোর্সমেন্টের বদলে এল এক রহস্যময় বার্তা।

‘এই মাত্র অধিনায়কের (কাদের সিদ্দিকী) কাছ থেকে নির্দেশ এসেছে, সুবিধামতো অবস্থান থেকে শুধু আক্রমণ করো, আক্রমণ করা মাত্রই জাহাজের পতন ঘটবে’

এই বার্তার মর্মোদ্ধার করতে পারে না কেউই। তবে সবাই বুঝতে পারে ভালো কিছুর ইঙ্গিত করা হয়েছে। হয়তো গোপন কিছু আছে যেটা আক্রমণের আগে কাউকে জানানো ঠিক হবে না।

১০ আগস্ট মাটিকাটা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম একটি শক্তিশালী দল নিয়ে পজিশন নেন। এই দলটিতে ৩ ইঞ্চি মর্টার ছিল। এছাড়াও আশেপাশে আরো কয়েকটি দল পজিশন নেয়। কোনোভাবেই টার্গেটকে ছেড়ে দেয়া যাবে না। গভীর রাতে কমান্ডার হাবিব নদীর কিনারে গিয়ে দেখে আসেন হানাদাররা কী করছে। মুক্তিযোদ্ধারা ভীষণ উদগ্রীব আক্রমণের জন্য। কিন্তু কমান্ডারের নির্দেশ প্রথম গুলি তিনি চালাবেন। তারপর বাকিদের অস্ত্র একসাথে ফায়ার করবে। এই যুদ্ধের কৌশল ছিল বষবসবহঃ ড়ভ ংঁৎঢ়ৎরংব। হঠাৎ করে পাক বাহিনীগুলোকে চমকে দিতে হবে, ফায়ার পাওয়ার অল্প হলেও সব অস্ত্রকে একসাথে ব্যবহার করতে হবে, যাতে পাক বাহিনী দিশা হারিয়ে ফেলে।

১১ তারিখ মুক্তিবাহিনী তাদের অবস্থান থেকে সরে একটু পেছনে অবস্থান নেয়। একটু পরে এসেই একজন খবর দেয় জাহাজগুলো উত্তরে যাত্রা শুরু করেছে অর্থাৎ তাদের সামনেই আসছে। সকাল ৯টায় আবার জাহাজ থেমে যায়। নদীতে ডুবোচর থাকতে পারে এবং সেখানে বড় জাহাজ দুটি আটকে যেতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে ছোট একটি জাহাজ আগে যেতে শুরু করে। এক পর্যায়ে এটি মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে দিয়ে চলে যায়। সারাদিন বাকি জাহাজগুলো থেমে থাকে।

পরেরদিন জাহাজগুলো আবার চলতে শুরু করে, প্রথমে ছোট দুটি জাহাজ ঠিক মুক্তিবাহিনীর সামনে দিয়ে চলে গেল কিন্তু কমান্ডার গুলি চালালেন না। এবার বহরের বড় দুটি জাহাজ মেশিনগানের রেঞ্জের মধ্যে চলে আসে।

৩ দিন ধরে পজিশন নিয়ে থাকা মুক্তিবাহিনী তাদের নীরবতা ভাঙল। কাদেরিয়া বাহিনী এক ঝাঁক বুলেট দিয়ে স্বাগত জানাল জাহাজদুটিকে। পেছনে থাকা দুটি জাহাজ তাড়াতাড়ি পালিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধা রেজাউলের নিখুঁত নিশানায় ১২টি মর্টার নিখুঁতভাবে দুই জাহাজের ব্রিজে আঘাত করে। ইঞ্জিন রুমেও কয়েকটি মর্টার আঘাত হানে জাহাজ দুটির। ডান পাশে ছিলেন মঞ্জুরুল হক, প্রায় কুড়িটি মর্টার শেল লিক্ষেপ করেন তিনি। তবে জাহাজের পুরু লোহার কাছে মর্টার ছিল সামান্য টোকা। এই ক্ষতি নিয়ে দুই জাহাজ অনায়াসেই পালিয়ে যেতে পারত। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীনভাবে জাহাজদুটো সামনের চরে গিয়ে আটকে যায়।

কিছুক্ষণ গুলি চলতে থাকে। ২০-২৫ জন পাক সেনা নিহত হয়। স্পিডবোট এবং ছোট জাহাজগুলো পালিয়ে যায়। এক পর্যায়ে গুলি বন্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা জাহাজের দখল নেয়। বন্দী করা হয় সবাইকে। দুজন পাকসেনা জাহাজের ওপর থেকে লাফ দেয়। জোয়ারে ভেসে প্রায় ২ মাইল সামনে চলে যায় তারা।

কমান্ডার হাবিব তাদের উদ্ধার করার নির্দেশ দেন। ভয়ার্ত দুই পাকসেনাকে উদ্ধার করে মুক্তিবাহিনী। পিছু হটা বা বিপদে পড়া নিরস্ত্র শত্রুকেও সহায়তা যুদ্ধের প্রাচীন শিষ্টাচার, যা পরে জেনেভা কনভেনশন দ্বারা লিপিবদ্ধ হয়েছে। যদিও পাক সরকার জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষর করেও ১৯৭১ সালে নিয়মনীতির সবকটি সফলভাবে ভেঙেছিল।

মুক্তিযোদ্ধারা আবিষ্কার করলেন যে গোলাবারুদের অভাবে তারা ঠিকমতো যুদ্ধ করতে পারছেন না সেই আধুনিক অস্ত্র গোলাবারুদে ঠাসা জাহাজটি, অন্যটি ছিল তেলের ট্যাংকার যাতে ১ লাখ ৮০ হাজার গ্যালন ডিজেল ছিল। অস্ত্র ছাড়াও জাহাজের রান্নাঘর ভর্তি মুরগির মাংস এবং প্রচুর উপাদেয় খাদ্য।

শুরু হয় অস্ত্র নামানো। আশেপাশের সব গ্রামের শারীরিকভাবে সক্ষম সব লোক এসে যোগ দেয় এই কাজে। যাদের নৌকা আছে তারা নৌকা নিয়ে এগিয়ে আসে। আটক সারেংয়ের কাছে জানা গেল পাক বাহিনী বারবার সাহায্য চেয়ে ওয়্যারলেসে বার্তা পাঠাচ্ছিল। যেকোনো সময় পাল্টা আঘাত হানতে পারে তারা। রাত ১০টা নাগাদ কমান্ডার হাবিব জাহাজ ত্যাগ করতে নির্দেশ দেন। জাহাজে তখনো প্রচুর অস্ত্র। মাত্র ৪০ ভাগ অস্ত্র নামানো হয়েছে। কিন্তু বিপদের আশঙ্কা ছিল। নিরাপদ দূরত্ব থেকে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জাহাজে আগুন ধরানো হয়।

অস্ত্র এবং তেল আগুনের শিখায় ভস্ম হয়। অনেকে বলেন ৩০ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা গিয়েছিল সেই ফুলকি এবং ধোঁয়া। আগুনের লেলিহান শিখা শুধু জাহাজদুটি নয় পাক বাহিনীর মনোবলকে একেবারে ভেঙে চুরমার করে দেয়। তেলের ট্যাংকারটির মালিক ছিল পাবনার কুখ্যাত মুসলিম লীগ নেতা মতিনের। রাজাকারদের দম্ভও সম্পূর্ণভাবে ধূলিসাৎ হয় আগুনের ফুলকিতে। রাতের অন্ধকার ভেঙে যমুনার পাড় আগুনের শিখায় আলোকিত হয়ে ওঠে। হাজার হাজার উৎফুল্ল লোকজন সে আগুনের শিখা বহুদূর থেকে প্রত্যক্ষ করে ও আনন্দে ফেটে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধারা যখন ক্যাম্পের দিকে ফেরত যাচ্ছেন পেছনে এক ইতিহাস রচনা করে রেখে।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন অধ্যয়ন থেকে প্রকাশিত সারতাজ আলীমের লেখা “১৯৭১: ফ্রন্টলাইনের সেরা অপারেশন” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে পারবেন রকমারির এই লিঙ্ক থেকে অথবা বুকশেয়ারের এই লিংক থেকে।

পরদিন আঞ্চলিক ক্যাম্পে পৌঁছে গেরিলারা শোনেন স্বয়ং কাদের সিদ্দিকী এসে হাজির হয়েছে তাদের ক্যাম্পে। আটক পাক সারেংকে হাজির করা হয় তার সামনে। মুক্তিযোদ্ধাদের অবাক করে সারেংকে বুকে জড়িয়ে ধরেন কাদের সিদ্দিকী। ‘ওয়েল ডান’ বলে অভিবাদন জানান। তাকে জড়িয়ে ধরে নাচতে শুরু করেন।

রহস্য ভেদের পালা এবার। তিনি পাকিস্তানি না, বাঙালি। চট্টগ্রামের বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা। ২৫ মার্চের তাণ্ডব থেকে রক্ষা পায়নি তার পরিবার। চালনা বন্দরে কর্মরত গোলাম মোস্তফা নজরবন্দী হন। পরে তাকে অনেকটা জোর করেই জাহাজে কাজ দেয়া হয়। মাতৃভ‚মির ঘ্রাণে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার পরিকল্পনা করেন তিনি। কিন্তু এক বন্ধুর পরামর্শে পাকিস্তানের সাথে থেকেই বড় রকম ক্ষতি করার ছক কাটেন তিনি। মুক্তিবাহিনীর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল তার। ঢাকায় যেয়ে স্পাই মমতাজ খান তার লেখা ছোট্ট চিঠিও নিয়ে এসেছিলেন।

তবে মমতাজ খান কীভাবে গোলাম মোস্তফা পর্যন্ত পৌঁছান এবং তার চিঠি আনেন এই রহস্য কাদের সিদ্দিকী নিজেও জানেন না। স্পাইদের কিছু জিনিস রূপকথার মতো রহস্যই থেকেই যায়! কোথা দিয়ে কীভাবে জাহাজ যাবে, কী থাকবে সবকিছুই বলা ছিল এতে। আর মুক্তিবাহিনী আক্রমণ শুরু করলে তিনি জাহাজ থামিয়ে দেবেন তাও বলে দেন তিনি। সম্ভবত তিনি বেতারবার্তা উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন যেটা মুক্তিবাহিনীর চ্যানেলে ধরা পড়ে। আক্রমণের পুরো ছকই করা হয় তার কথার ভিত্তিতে। আক্রমণ শুরুর পরপরই তিনি জাহাজ থামিয়ে দেন। জাহাজ দখলের পর থেকে যুদ্ধের বাকি দিনগুলো তিনি মুক্তিবাহিনীর সাথেই ছিলেন।

জাহাজের লগবুক থেকে জানা যায় জাহাজে ১২০০০ রাইফেল, ১০০ মেশিনগান, ১০০ মর্টার, ২০টা রিকয়েললেস গান, ২৪টি দূরপাল্লার কামান, ৪টি ছোট কামান, ২ কোটি ৫০ লক্ষ গুলি, ৯ লক্ষ মর্টারের গোলা, ৩ লক্ষ কামানের গোলা, দেড় লক্ষ রিকয়েললেস গানের গোলা, ২ লক্ষ গ্রেনেড ছিল।

মুক্তিবাহিনীর হাতে এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র (পাক বাহিনীর হিসাব মতেই ২১ কোটি টাকা; বর্তমানে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার বেশি) হারিয়ে পাক বাহিনীর এতটাই ক্ষতি লেগেছিল যে তারা এই অঞ্চলে আবার নতুন করে অভিযান শুরু করে। অস্ত্র উদ্ধারে প্রাণপণ চেষ্টা করে তারা। উল্লেখ্য যে ১২ থেকে ১৪ আগস্ট চলা পাক বাহিনীর এই অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছিল জেনারেল নিয়াজি। পাক বাহিনীর ৪৭ ব্রিগেড এ অঞ্চল দখলের চেষ্টা করে। বিমানবাহিনীর দুটি এফ-৮৬ স্যাবর বিমান বোমা হামলা চালায়। কিন্তু কাদেরিয়া বাহিনী পাকিস্তানিদের লুট করা অস্ত্র দিয়েই সফলভাবে প্রতিহত করে।

এসব অস্ত্রশস্ত্রের বেশির ভাগই আশেপাশের ২২টি গ্রামে বিভিন্ন গোয়ালঘর ও খড়ের স্ত‚প ও মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে জাহাজের লগবুক ও মুভমেন্ট কভারের হিসাব থেকে জানা যায়, জাহাজে ১২০০০০ বাক্সে ২১ কোটি টাকার অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছিল।

এদিকে জাহাজ ধ্বংসের খবরে পাকসেনারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ১৭ নভেম্বর টাঙ্গাইল ভুয়াপুর সদর থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে ছাব্বিশ গ্রামে গণহত্যা চালায়। ওই দিন গ্রামের ৩২ জন নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে এবং গ্রামের প্রায় ৩৫০টি বাড়িঘর আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

পাকিস্তানি হানাদাররা চারদিক থেকে টাঙ্গাইল ভুয়াপুর আক্রমণ করে। তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মুক্তিযোদ্ধারা। গেরিলা কায়দায় তাদের গতিরোধ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পাকিস্তানিদের বিমান এবং ভারী অস্ত্রের সামনে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা কৌশলে পিছু হটে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। পাকিস্তানিদের চতুর্মুখী আক্রমণে পড়ে ঘাটাইলের মাকড়াই যুদ্ধে কাদের সিদ্দিকী নিজেও আহত হন এবং চিকিৎসা গ্রহণের উদ্দেশ্যে ভারতে চলে যান।

সিরাজকান্দির মাটিকাটার জাহাজ ধ্বংস ও অস্ত্র উদ্ধারে দেশব্যাপী গোটা মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা। কাদের সিদ্দিকী যুদ্ধের শেষদিকে ভারতে গিয়ে মিত্রবাহিনীর সেনানায়কদের কাছে সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন এবং তার ওপর ভিত্তি করেই অগ্রবর্তী দল হিসেবে টাঙ্গাইলে হেলিকপ্টার ও বিমান থেকে মিত্রবাহিনীর প্যারাট্রুপার (ছত্রীসেনা) নামানো হয়।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান থেকে ফিরে এলে কাদের সিদ্দিকী এবং তার বাহিনী টাঙ্গাইল শহরের বিন্দুবাসিনী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেছিল। সেদিন তাদের হাতে এত অস্ত্র দেখে সবাই চমকে ওঠেন এবং জাহাজমারা যুদ্ধের গুরুত্ব বুঝতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধু পরে সাংবাদিক পিটার জেনিংস এবং লুই শেককে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘সিদ্দিকী আমার কাছে ৫৮ ট্রাক অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ করেছে।’

মুক্তিযুদ্ধে এই যুদ্ধটিকে একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা হিসেবে ধরা হয়। হাবিবুর রহমানের নাম হয়ে যায় জাহাজমারা হাবিব। তাকে বীর বিক্রম উপাধিতে ভ‚ষিত করা হয়। কাদের সিদ্দিকী তাকে আদর করে ‘মেজর’ বলে ডাকতেন।



আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন অধ্যয়ন থেকে প্রকাশিত সারতাজ আলীমের লেখা “১৯৭১: ফ্রন্টলাইনের সেরা অপারেশন” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে পারবেন রকমারির এই লিঙ্ক থেকে অথবা বুকশেয়ারের এই লিংক থেকে।

Featured Image: dhakatribune.com

আপনার মন্তব্য লিখুন