Skip links

গরমশিরের অশ্বারোহী: বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়

সরলরেখা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বখতিয়ার মুজাহিদ সিয়ামের "গরমশিরের অশ্বারোহী" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 5 মিনিট

ছদ্মবেশী হামলা

চারদিকে হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ!
সবাই ছুটছে!
কেউ দৌঁড়াচ্ছে!
কেউ পালাচ্ছে!
কারা যেন বজ্রপাতের মতো হঠাৎ ঝাড়খ-ের দুর্গম পথ দিয়ে নদীয়া প্রবেশ করলো!
মানুষজন প্রথমে ভেবেছিলো ঘোড়ার কারবারি কি না!
হয়তো ঘোড়া বেচতেই এতো তড়িঘড়ি!
এতো দ্রুত বেগে ছুটে আসা!

ভাবারই তো কথা।
মাত্র ১৮ জন ঘোড়সওয়ার!
এতো কম সৈন্য নিয়ে তো কারো এতো সুরক্ষিত রাজ্যে হানা দেয়ার কোন প্রশ্নই আসে না!
সাহসেই তো কুলাবে না!
এর উপর সে পথ বেশ দুর্গম!
গহীন জংগল, বাঘ-ভাল্লুক আর বনবাদাড়ে ঘেরা।
তাই লক্ষ্মণ সেন নিশ্চিন্তেই নগরের সেই প্রবেশপথে বাড়তি কোন সৈন্যই রাখেনি।

কিন্তু কে জানতো ঝাড়খ-ের দুর্গম পথ দিয়েই ঝড়ের বেগে ধেয়ে আসবে এক অসীম সাহসী সেনাপতি ও তার জানবাজ সাথীরা!
কেউ কী জানতো এরাই শেষে নদীয়া আক্রমণ করে বসবে!
সেদিন দুপুর বেলা অবস্থা বুঝে উঠার আগেই আঠারো জন্য সৈন্য ও তাদের সেনাপতি নগরীর রাজপ্রাসাদের দিকে উল্কার বেগে ছুটতে লাগলো।

কয়েকজন লোক পরিস্থিতি বুঝতে পেরে যে যার মতো যেদিকে পারলো সেদিকে ছুটলো। রাজপ্রাসাদের প্রহরীরা প্রাসাদের সামনে অমন উল্কার বেগে কাউকে ঘোড়া ছুটিয়ে আসতে দেখে, হঠাৎ ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো! কেউ প্রাসাদের দিকে, কেউবা শহরের দিকে ছুটে পালালো!

যারা রাজদরবারের মূল ফটকে তখনও দাঁড়িয়ে ছিলো, তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘোড়সওয়ার বাহিনীর সৈন্যদের তলোয়ারের আঘাতে নিহত হলো। দ্রুতই তাদের গগণবিদারী চিৎকার আর আশপাশের ‘পালাও, পালাও, বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকারগুলো পৌঁছে গেলো রাজদরবারের ভেতর মহলে।

লক্ষ্মণ সেনের কানে শব্দ পৌঁছাতেই সে বলে উঠলো:

‘হায়! চলে এসেছে! ও চলে এসেছে! বখতিয়ার চলে এসেছে!
পালাও, পালাও!’

এ বলেই হন্তদন্ত হয়ে সেনাপতিসহ কয়েকজন সৈন্য নিয়ে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে পেছনের দরজা দিয়ে পালালো লক্ষ্মণ সেন।
তার দেখাদেখি রাজপ্রাসাদের অন্য হর্তাকর্তারাও পেছন পেছন ছুটতে লাগলো।

লক্ষ্মণ সেন প্রাণভয়ে ছুটতে ছুটতে নদীর ঘাটে এসে পৌঁছালো।
এরপর সবাই মিলে হুড়মুড়িয়ে চেপে বসলো নৌকায়।
অবশেষে নৌকায় ভেসে পাড়ি জমালো পূর্ব বাংলার বিক্রমপুরে।
বাকি জীবনটা তারা সেখানেই কাটালো।

এভাবেই প্রায় কোনপ্রকার বাঁধাহীন পরিবেশে বাংলার রাজধানী নদীয়া বিজয় হলো।
প্রথমবারের মতো মুসলিমরা জয় করলো অপরূপ রূপের লীলাভূমি এই বৃহৎ বাংলা অঞ্চলের একটুকরো সোনাঝরা ভূমি। রাতারাতি অত্যাচারী রাজা লক্ষ্মণ সেনের হাত থেকে নিস্তার পেলো বাংলা অঞ্চলের অগণিত নিরীহ ও সাধারণ জনগণ।

লোকজনের আশা ভরসার প্রতীক হয়ে উঠলেন বাংলায় প্রথম মুসলিম শাসনের সূচনাকারী, পরবর্তীতে সমগ্র বাংলা-বিহার বিজয়ী মুসলিম বীর, সাহসী তুর্কি নওজোয়ান, তরুণ সেনাপতি ‘ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজি’।

তাঁর হাত ধরে আমাদের এই সোনাঝরা মাতৃভূমিতে পৌঁছে গেলো ইসলামের সুমহান আদর্শ ও দিগবিজয়ী আলো।
সত্যের আলোয় আলোকিত হলো মানুষ।

ঘরে ঘরে পৌঁছে গেলো ইসলাম নামক দিগবিজয়ী আদর্শের সুমহান বাণী।
লোকে লোকে জনে জনে ছড়িয়ে গেলো ইসলাম ও রাসূল (সা.) এর উত্তম আদর্শ।
বাংলার অভাগা ও নিরীহ মানুষের সরল প্রাণে গেঁথে গেলো একটি নাম- ‘বখতিয়ার’।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন সরলরেখা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বখতিয়ার মুজাহিদ সিয়াম এর “গরমশিরের অশ্বারোহী” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি প্রি-অর্ডার করতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। আর বিশেষ ছাড়ে পেতে চাইলে প্রি-অর্ডার  করুন গুগল ডকের এই ফর্মে গিয়ে।
বখতিয়ার খিলজিকে নিয়ে লেখা কিশোর থ্রিলার গরমশিরের অশ্বারোহী বইয়ের প্রচ্ছদ

বাংলা বিজয়ী সিংহপুরুষ

বখতিয়ার খিলজি।
খিলজিদের সাদা ঘোড়ার সওয়ারি।
যে নামে পাখিরা গান করে।
দূর থেকে ভেসে আসে পাহাড়ি নদীর সুমধুর কলতান।
যে নামে হৃদয়ে শিহরণ খেলে যায়।
জমা হয় রোমাঞ্চকর সব অনুভূতি।
যে সাহসী স্রোতের গতিবেগ পাল্টে দেয় নিমেষেই।
উত্তাল তরঙ্গের ঢেউয়ের মতো যে ভেসে চলে দিগবিদিক।
উত্তপ্ত মরুর বুকে যে সদ্য ঝরে পড়া বৃষ্টির শীতল জলের ফোঁটা।

কাগজে কলমে পুরো নাম ‘ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজি।’
কিন্তু লোকে তাকে ‘বখতিয়ার খিলজি’ নামেই চেনে।
অথচ চেনার কথা ছিলো ‘ইখতিয়ারউদ্দিন’ নামে।
কেননা পুরো নামের অর্থ দাঁড়ায় বখতিয়ার খিলজির ছেলে ইখতিয়ারউদ্দিন।

কিন্তু বিধিবাম!
লোকে যাকে ভালোবেসে যে নামে ডাকতে চায়, সেটাই তার নাম বনে যায়। তার ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছে।
ভালোবাসার প্রতিদান বলে কথা!
যুগ যুগ ধরে মহামানবদের বেশিরভাগের ভাগ্যেই লোকের দেয়া ডাকনামই ঠাঁই পেয়েছে।
দেখা গেছে, লোকে ভালোবেসে যাকে যে নামে ডেকেছে সে নামেই সে দুনিয়াবাসীর কাছে পরিচিত হয়েছে।
তাই বখতিয়ারের ক্ষেত্রেও সেটা ব্যতিক্রম কিছু নয়।

জন্ম আফগানিস্তানে।
গরমশির প্রদেশে।
পাহাড়ি এলাকা।
ছিমছাম পরিবেশ।
পাহাড়লাগোয়া সরু রাস্তাগুলো এঁকেবেঁকে চলে গেছে বহুদূরে।
এখানকার পাহাড়গুলোর অপরূপ সৌন্দর্যে যে কেউই বিমোহিত হবে।
এক কথায় গরমশিরের লোকেদের মাথার উপর আকাশ বাস করে।

জাতিতে আফগানী হলেও পূর্বপুরুষের বাস ছিলো বর্তমান তুরস্কে।
সেলজুক সাম্রাজ্যের সোনালি সময়ে।
এক সময়ের যাযাবর তুর্কি জাতির অনেকগুলো সম্ভ্রান্ত বংশের একটি- ‘খিলজি বংশ’।
বখতিয়ার এই সম্ভ্রান্ত খিলজি বংশের একজন যোগ্য উত্তরসূরি।

সময় বদলায়। সাথে ভাগ্যও বদলায়।
তাই কালের পালাবদলে বখতিয়ারের খিলজি বংশের দাদা-পরদাদারা এসে বসত গড়েন আফগানিস্তানের পাহাড়ঘেরা ছায়াময় এলাকা গরমশিরে।

যতদূর জানা যায় ছোটবেলা থেকেই শত দারিদ্র্যের মাঝে বেড়ে উঠেন বখতিয়ার। কিন্তু প্রখর মেধা ও প্রতিভার জোরে খুব কম সময়ে ছাড়িয়ে যান সমবয়সী অন্য কিশোরদের।

অল্পবয়সেই রপ্ত করেন যুদ্ধবিদ্যা।
এর পাশাপাশি ঘোড়া ছোটানোর কৌশলও খুব ভালোভাবে শেখা হয়ে যায় তার। কিশোর বয়সেই তার ঝড়ের বেগে ঘোড়া ছোটানো দেখে অনেকে অবাক হয়ে যেতো।
ভাবতো ‘এত অল্প বয়সে কাউকে তো ঘোড়ার লাগামটা ঠিকমত টেনে ধরতে দেখলাম না! আর এ কি না ঝড়ের বেগে দিব্যি ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে!’

এমনি এক অদ্ভুত কিশোর ছিলেন বখতিয়ার!
অসীম সাহসী এই বীরের ছেলেবেলা কেটেছে লড়তে আর লড়তে।
কখনো অভাবের সাথে।
কখনোবা জীবনের প্রয়োজনে।

তাই জীবনের শত প্রতিকূলতা তাকে টলিয়ে রাখতে পারেনি।
তিনিও টলে যাননি।
থমকে যাননি ভীতু ও কাপুরুষদের মত।
সাহসের নজির রেখে লড়ে গেছেন প্রতিটি লড়াই।
পরিশেষে বিজয়ের মালা পরেছেন গলায়।

শৈশব থেকেই বখতিয়ার ন্যায়পরায়ণ ছিলেন।
চোখের সামনে কোন অন্যায় দেখতে পেলে তা সহ্য করতে পারতেন না তিনি।
অন্যায় দেখলে তার গা জ্বালা করতো।
কখনো কখনো তো বিবাদেও জড়িয়ে যেতেন।

বয়স বাড়তেই সেই ন্যায়বোধ ও ইনসাফের জ্ঞান আরো শক্তিশালী হয়ে ভর করে তার মাঝে। সময়ের ধারাবাহিকতায় নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন তিনি।
অন্তরে গাঁথেন ইসলামের সুমহান জ্ঞান, আদর্শ ও সত্যের বাণী।
যে বাণী শিক্ষা দেয় মহানুভবতা ও সহমর্মিতার।
যে পথে অনন্তকালের শান্তির সুবাতাস ছোটে।
সেই সত্য, সঠিক ও সুন্দরের অনুসারী হন।

তুর্কিরা বীরের জাতি।
যুদ্ধই তাদের ধ্যান-জ্ঞান।
একে তো যাযাবর জাতি হবার ফলে তাদের নিজের বলতে স্থায়ী কোন ভূমি কখনোই ছিলো না।
এর উপর মুসলিম হওয়ার বদৌলতে যখন যেখানে তারা বসতি গড়তো সেখানেই বাইরের শত্রুরা হামলা চালাতো।
বিশেষ করে খ্রিস্টান ক্রুসেডার বাহিনী হরহামেশা হামলা চালিয়ে বসতো।
লুটপাট করতো। নারী-শিশুদের হত্যা করতো।
তাই শত্রুর আক্রমণ সামাল দিতে দিতেই তাদের সারা বছর কেটে যেতো।
এভাবে লড়াই ও যুদ্ধবিদ্যাই হয়ে ওঠে তাদের নেশা ও পেশা।

একরকম জীবন হাতে নিয়ে লড়াইয়ের পর লড়াই করে জিইয়ে রাখতে হতো নিজেদের ভূমিকে।
কিন্তু শত্রুদের নিয়মিত একের পর এক আক্রমণে খুব বেশিদিন তারা কোন জায়গায় থিতু (স্থায়ী) হতে পারতো না।
তাই বসতি নিয়েই বেরিয়ে পড়তো নতুন কোন নিরাপদ ভূমির উদ্দেশ্যে।
তরুণদের মধ্যে কেউ কেউ আবার আশপাশের মুসলিম রাজ্যগুলোতে পাড়ি জমাতো।

লক্ষ্য: মুসলিম সেনাবাহিনীতে যোগদান।
স্থান বদল ও দারিদ্র্যের শেকলও বখতিয়ারকে তাই
বেঁধে রাখতে পারেনি। তিনিও সেই শেকলে আটকা পড়েননি।
দারিদ্র্যের পিছুটান মাড়িয়ে ছুটে চলেছেন অবিরত। তাইতো তরুণ বয়সেই একদিন হঠাৎ বেরিয়ে পড়েছিলেন ঘর ছেড়ে।
পাড়ি জমিয়েছিলেন অনিশ্চিত গন্তব্যে।
ভাগ্য বদলের আশায়।

আফগান শাসক মুহাম্মাদ ঘুরী
ইতোমধ্যে ভারতবর্ষের অনেকগুলো অঞ্চল জয় করেছেন।
তাঁর হাত ধরেই ভারতবর্ষে পাকাপাকিভাবে প্রবেশ করলো ইসলামের দিগবিজয়ী আলো। একের পর এক নগরী অধিকার করতে লাগলো মুসলিম সেনাপতিরা।
বখতিয়ার তাই ঘুরীর ভারত বিজয়ী মুসলিম বাহিনীর গর্বিত সৈন্য হওয়ার স্বপ্ন বুনতে লাগলেন মনে।

একদিন স্বপ্নেরা পাখি হয়ে ডানা মেললো আকাশে।
বাঁধন ছেড়ে উড়তে লাগলো নতুন উদ্যমে। এবার দূর দিগন্তে উড়ে বেড়ানোর পালা। বখতিয়ারও তাই ঘর ছেড়ে চেপে বসলেন ঘোড়ার পিঠে।
ফেরারি (নিখোঁজ) হয়ে ছুটতে লাগলেন স্বপ্নের পানে।
মনোবাসনা পূরণ করতে রওনা হলেন গজনিতে।
মুহাম্মাদ ঘুরীর রাজদরবারে।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন সরলরেখা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বখতিয়ার মুজাহিদ সিয়াম এর “গরমশিরের অশ্বারোহী” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি প্রি-অর্ডার করতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। আর বিশেষ ছাড়ে পেতে চাইলে প্রি-অর্ডার  করুন গুগল ডকের এই ফর্মে গিয়ে।
আর বিশেষ ছাড়ে পেতে চাইলে প্রি-অর্ডার  করুন গুগল ডকের এই ফর্মে গিয়ে।

আপনার মন্তব্য লিখুন