Skip links

একজন আবু তালিব বনাম কুরাইশদের বয়কট

আদী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ-এর "দ্য প্রফেট" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 14 মিনিট

আর্টিকেলটি আপনি চাইলে অডিও পডকাস্ট হিসেবেও শুনতে পারেন:

অডিওটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন নাদিয়া আফরিন খান। 

আজকের যুগের মুসলিমদের কাছে অবাক লাগতে পারে- কেন ইসলামের এত মহান বাণী আসার পরেও দল বেধে মক্কার সবাই মুহাম্মাদ (সা)-এর অনুসরণ করা শুরু করেনি একদম শুরুতেই? কথা তো ঠিকই, কেন করেনি?

কারণ হলো, মানবজাতি পরিবর্তন পছন্দ করে না। তখনও করেনি, আজও করে না। অন্তত একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর করে না আর কী। আর মক্কার সেই অভিজাত শ্রেণী সেই গোত্রেই পড়েছে। স্থিতিশীল সমাজ তাদের জন্য ভালো, আর ব্যবসার জন্যও ভালো। অনিশ্চয়তা হলো ব্যবসার শত্রু। তাই স্থিতিশীল সমাজে অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে চাওয়া কোনো ধর্মের অনুসারী গোড়ায় কম থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। হলোও তা-ই; এক বছরে ডজনখানেক অনুসারী জুটলো। তারা এ জাতির প্রথম মুসলিম। আর এদের মাঝে আছে তরুণ নারী-পুরুষ, দাস, আর প্রাক্তন দাস। এই কয়েকজন মানুষের আন্দোলনকে পাত্তা দেয়াটাই হয়তো বড় ব্যাপার।

তারপরেও অবাক ব্যাপার- এই গুটিকয়েক লোকের বিরুদ্ধে উঠে-পড়ে লাগলেন মক্কার নেতারা! তবে প্রতিষ্ঠিত ধর্মগুলোর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সবগুলোই শুরুতে প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছে; যেসকল তথাকথিত ধর্মপ্রচারক কোনোই প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়নি, তারা ইতিহাসে স্থানই পায়নি, ধর্ম তো দূরের কথা- ঐতিহাসিকদের পাদটীকাতেই তাদের বিদায়। মুহাম্মাদ (সা) এর ক্ষেত্রেও একই কথা, কুরআনে বারংবার তাঁকে ডাকা হয়েছে “কেবলই একজন রাসুল/দূত”, “তোমাদেরই মতো মানুষ মাত্র”, “তোমাদের থেকে উঠে আসা একজন সতর্ককারী”। বহুদিন পর কুরআনে মুহাম্মাদ (সা)-কে ডাকা হয়েছে “দ্য ফার্স্ট মুসলিম”, বা প্রথম মুসলিম। “বল, নিশ্চয় আমি আদিষ্ট হয়েছি যে, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে যেন আমি তাদের প্রথম হই।” “(বলো) এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম।” “আমাকে আরো নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন আমি প্রথম মুসলিম হই।” ‘মুসলিম’ বলতে অবশ্যই এখানে বোঝানো হচ্ছে স্রষ্টার প্রতি প্রথম আত্মসমর্পণকারী।

মনে আছে প্রথম ওহীর পরের ঘটনাগুলো? মুহাম্মাদ (সা) তখন নিজেই চিন্তায় ছিলেন তিনি আসলেই রাসুল তো? এবার তিনি নিজে নিশ্চিত তিনি রাসুল, কিন্তু মক্কার মানুষেরা তাঁর ব্যাপারে সন্দিহান। তবে নিজের নবীত্বের ব্যাপারে নিশ্চয়তার কারণে মুহাম্মাদ (সা) হতাশ হলেন না এই বিপুল প্রত্যাখ্যানে। বরং একেই তিনি তাঁর নবুওয়াতের বার্তার সত্যতার প্রমাণ হিসেবে নিলেন।

সত্যি বলতে, আয়াতগুলো যদি কেবল আল্লাহর সৃষ্টি নিয়েই বর্ণনা দিয়ে ক্ষান্ত হতো, তাহলে মক্কার নেতাদের কোনো মাথাব্যথাই ছিল না তাকে নিয়ে। মানে, এতে আসলে তাদের কোনোই ক্ষতি নেই। আল্লাহকে তাদের মানতে কখনই সমস্যা ছিল না, তারা তো তাঁকে মানছেই। তিনি সর্বোময় ক্ষমতার অধিকারী। কাবাঘর তো তাঁরই ঘর, সে ঘরেরই রক্ষক তারা। তাদের অন্যান্য উপাস্যরা কাজ করছে আল্লাহ আর তাদের মাঝে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে, যেহেতু আল্লাহর সাথে সরাসরি যোগাযোগ করাটা তাদের আসে না। এই যেমন লাত, উজ্জাহ আর মানাকে ‘আল্লাহর কন্যা’ ডাকে তারা।

কিন্তু আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্যই নেই? এটা কীভাবে মানা যায়? এটা হতে পারে না। এ তো পুরোই বাপদাদার ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে।

আজকের যুগে যেমন আমরা আল্লাহর কসম খেয়ে থাকি, কিংবা খ্রিস্টানরা যেমন যীশু বা মেরির কসমও খেয়ে থাকেন, তেমনই মক্কার লোকেরাও আল্লাহর নামে শপথ করত, আর অন্যান্য দেবদেবীর নামে কসম করা তো ছিলই কথায় কথায়। তবে এর পাশাপাশি তাদের মৃত পূর্বপুরুষদের নামেও কসম কাটবার স্বভাব ছিল, যেটা হয়তো আজকের দিনে আমাদের কানে অদ্ভুত শোনাতে পারে। “আমার মায়ের কবরের কসম”- কেমন লাগছে? অদ্ভুত নয় কি? অথচ আরবদের অহরহ এমন কসম করা একটা জিনিসই প্রমাণ করে, দেবদেবীর পাশাপাশি তাদের পূর্বপুরুষদের সম্মানও অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাদের কাছে। তাদের ঐতিহ্য বর্জন চিন্তার অতীত একটি ব্যাপার।

মৃত বাপদাদার গুরুত্ব কেন এত বেশি সেটা পশ্চিমাদের জন্য বোঝা বড়ই কষ্টকর। এর চেয়ে তাদের কাছে রুশ উপন্যাসের দাঁতভাঙা নামকরণও সহজবোধ্য। আরব দেশে, অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে, আপনার পরিচয় কেবল আপনার ডাকনাম নয়, বরং আপনার পুরো নাম- যে নামে আপনার বাবার নাম, আপনার দাদার নাম, পরদাদা, তার বাবা- এরা সবাই উপস্থিত। বুঝতেই পারছেন। এভাবে চলতে চলতে ট্রেনের মতো সেই নাম একদম বংশের প্রতিষ্ঠাতা পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। বাইবেল খুললেও আপনি গস্পেল অফ ম্যাথিউতে দেখতে পাবেন, যীশুর বংশতালিকা একদম ইব্রাহিম (আ) আর দাউদ (আ) পর্যন্ত গিয়ে থেমেছে। কারণ যীশুও ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যেরই মানুষ। তাদের নামই একেকটি ইতিহাস, যাতে আছে কয়েক প্রজন্মের পরিচয়। আর সেই অতীত হারানো প্রজন্ম নিয়ে তাদের গর্বের শেষ নেই।

কুরআনের আয়াতেও দেখা মেলে আরববাসীদের পূর্বপুরুষ নিয়ে গর্বের কথা (তারা এই ছিল, তারা সেই ছিল, কত কী), অথচ তারা কিনা মিলিয়ে গিয়েছে ধ্বংসস্তূপের আড়ালে। প্রাক-ইসলামী যুগের কবিতাগুলোতেও এর ব্যতিক্রম নেই। এই ধ্বংসস্তূপগুলো আসলে আরবদের জন্য শিক্ষা, কুরআন তা-ই বলছে। এ থেকে যেন তারা শিক্ষা নেয়, তাদের প্রতি কী ঘটতে পারে। হতে পারে ভূমিকম্প, খরা, প্লেগ, শত্রুর অভিযান- যেকোনো কিছুতেই তারা মিশে যেতে পারে ধুলোয়। শেষমেশ তারা তাদের বংশধরদের নামের পেছনের “ইবনে অমুক ইবনে তমুক” হিসেবেই রয়ে যাবে, এর বেশি কিছু নয়।

Courtesy: binimad.com

পূর্বপুরুষদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা প্রায় পূজনীয় স্তরে চলে গিয়েছিল- তবে না, তারা উপাস্য ছিল না। সবচেয়ে ক্ষমতাবানদের কবর হয়ে যেত মাজার, আজকের দিনেও প্রথিতযশা র‍্যাবাই, সেইন্ট আর ইমামদের কবরের ক্ষেত্রেও আমরা একই ঘটনাই ঘটতে দেখি। অর্থাৎ এ ব্যাপারটা ইহুদী, খ্রিস্টান ও ইসলাম তিন ধর্মেই বিদ্যমান। পূর্বপুরুষদের মনে রাখবার জন্য বুঝি মানুষদের সবসময়ই ধরা ছোঁয়ার মতো কিছু খুব প্রয়োজন পড়ে, যার স্পর্শ করে তার স্মৃতি তারা মনে করতে পারবে। যার ওপর তারা ফুল রাখবে, কিংবা উপহার বা চিঠি; কেউ বা পাশে বসে কাঁদবে, আর কেউ করবে প্রার্থনা। মোট কথা কিছু একটা থাকা লাগবে।

একদিন সবাইকেই জেগে উঠতে হবে হাশরের ময়দানে- এটা নিয়ে মক্কাবাসীদের এতটা আপত্তি ছিল না। আত্মায় বিশ্বাস তাদের ছিল। অবশ্য মুহাম্মাদ (সা) এর সমালোচকরা এ ব্যাপারেও তাঁকে খোটা দিতে বাদ রাখেনি- “তারা বলত, আমরা যখন মরে অস্থি ও মৃত্তিকায় পরিণত হয়ে যাব, তখনও কি পুনরুত্থিত হব? এবং আমাদের পূর্বপুরুষগণও!” তারা পুনরুত্থিত হবে সেটার চেয়ে তাদের বড় মাথা ব্যথা, তাদের পূর্বপুরুষরাও উত্থিত হবে?

আয়াতগুলো বলছে, তাদের বাপদাদারা মূর্খ ছিলেন একত্ববাদ বিষয়ে, তারা জাহিলিয়ার বাসিন্দা। আর সেজন্য তাদের শাস্তিও পেতে হবে? কী অপমান! সত্যিকারের একত্ববাদীরা মুক্তি পাবে- যেমন ইব্রাহিম (আ), অন্যান্য নবীগণ, যারা হানিফ ছিলেন। যারাই আল্লাহ ছাড়া অন্য উপাস্যের পুজো করেছে, তারাই ‘চিরস্থায়ী অগ্নি’-র স্বাদ নেবে, ‘জান্নাতীদের সঙ্গী’ তারা মিলিত হতে পারবে না। পূর্বপুরুষদের যেহেতু এখন আর অনুতপ্ত হবার সুযোগ নেই, তার মানে তাদের ঠিকানা হতে চলেছে জাহান্নামের আগুন। আক্ষরিকভাবেই তারা এ আয়াতগুলোকে নিলো এমনভাবে যেন মুহাম্মাদ (সা) তাদের পূর্বপুরুষদের বলছেন- “জাহান্নামে যাক”।

মুহাম্মাদ (সা) নিজে বাপ-মাহারা ছিলেন, সেটা মানা গেল, কিন্তু তাই বলে এভাবে অপমান? আর কত রেহাই দেয়া চলে? কুরাইশদের ভাবনা ছিল অনেকটা এমনই। সত্যি বলতে, মুহাম্মাদ (সা) ঠিক তেমনটাই প্রচার করছিলেন যেমনটা তার ছয়শ বছর আগে পবিত্র ভূমিতে গালিলি সাগরের পাড়ে আরেক নবী নিজের জাতির লোকদেরকে বলছিলেন- বংশ-গোত্র পরিচয়ের উর্ধ্বে হলো নিজের স্রষ্টার প্রতি সকলের আনুগত্য, আর তাঁর একত্ববাদে বিশ্বাস।

বাইবেলে যীশু বলেছিলেন, “আমি পিতার সঙ্গে পুত্রের, মায়ের সঙ্গে কন্যার এবং শাশুড়ির সঙ্গে পুত্রবধূর বিচ্ছেদ জন্মাতে এসেছি; আর নিজ নিজ পরিজনই মানুষের দুশমন হবে। যে পিতা বা মাতাকে আমার চেয়ে বেশি ভালবাসে, সে আমার যোগ্য নয় এবং যে পুত্র বা কন্যাকে আমার চেয়ে বেশি ভালবাসে, সে আমার যোগ্য নয়।” মুহাম্মাদ (সা) এর প্রচার করা আয়াতগুলো সেই কথাই ঘুরিয়ে বলছে, পূর্বপুরুষদের ব্যাপারেও।

মক্কাবাসীরা সব হারাবে “যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের পুত্রগণ, তোমাদের ভাইগণ, তোমাদের স্ত্রীগণ, তোমাদের স্বগোত্র, আর ঐ সব ধনসম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, আর ঐ ব্যবসায় যাতে তোমরা ক্ষতির আশংকা করছ অথবা ঐ গৃহসমূহ যেখানে অতি আনন্দে বসবাস করছ, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের চেয়ে এবং তাঁর পথে সংগ্রাম করার চেয়ে যদি (এসব) তোমাদের নিকট অধিক প্রিয় হয় তাহলে তোমরা প্রতীক্ষা করতে থাক যে পর্যন্ত আল্লাহ নিজের নির্দেশ পাঠিয়ে দেন। আল্লাহ আদেশ অমান্যকারীদেরকে পথ প্রদশর্ন করেন না।” যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারাই একে অন্যের আসল ভাই-বোন। এ এক নতুন পরিবার। এ পরিবারের কোনো পরম পূজনীয় পূর্বপুরুষ নেই, বরং আছে ইব্রাহিম (আ) আর মুসা (আ) এর প্রচারিত একেশ্বরবাদের প্রতি শ্রদ্ধা।

মোদ্দা কথা, মক্কাবাসীরা চিন্তিত যে এই নতুন ধর্মের ডাক তাদেরকে তাদের পূর্বপুরুষদের প্রথা বর্জন করতে বলছে। আদতে বাপদাদাদের প্রতি সম্মানই ছেড়ে দিতে বলছে। আর তার চেয়েও বড় কথা, ব্যবসায়িক স্বার্থের ওপরও একটা বড় আঘাত এগিয়ে আসছে। কুরআন এখন কথা বলছে তাদের অন্যান্য উপাস্যের বিরুদ্ধেও! তা-ই যদি মানতে হয়, তাহলে ব্যবসা হবে কী করে? ধর্মব্যবসা আর নানা অনাচার নিয়ে সমাজের উঁচু স্তরের লোকজনের মুখোশ উন্মোচন ভালো চোখে দেখছে না তারা।

ক্ষমতার দাপট নিয়ে উত্তর দিতে লাগলের তারা। “মুহাম্মাদের সঙ্গীদের জাতটা দেখ একবার!” এক কুরাইশ নেতা বলছিলেন, “এই হলো লোকের নমুনা যাদেরকে আল্লাহ সঠিক রাস্তা দেখানোর জন্য বাছাই করেছেন? তাঁর কথা সত্যি হলে এই লোকগুলোর আগে আমরাই নাগাল পেতাম।”

অন্যেরা বলল, এই লোক এক সুবক্তা ছাড়া কিছুই না, দুর্বল মনের যারা তাদেরকে দলে টানছে- যেমন পরিবারের ছোট ছেলে যার কর্তা হবার সুযোগ নেই, ছোট গোত্রের স্বল্পচেনা সদস্য, কুরাইশের ছত্রছায়ায় থাকা কিছু লোক, নারী, প্রাক্তন কিংবা বর্তমান দাস। অবশ্য, কিছু উঁচু স্তরের লোকেও এই ‘বিপথে’ পা দিয়েছে, যেমন আতিক ইবনে উসমান, লোকে তাকে আবু বকর ডাকে (অনুবাদক- আতিক তার উপাধি ছিল, আসল নাম আব্দুল্লাহ ইবনে উসমান ইবনে আমির)। এই মানুষটিই পরবর্তীতে মুহাম্মাদ (সা) এর উত্তরসূরি হবেন, মুসলিম জাহানের প্রথম খলিফা।

আবু বকর (রা)-কে সকলেই পছন্দ করতেন। তিনি সফল লোক। বংশবিদ হিসেবে ভালোই নামকরা। (অনুবাদক- বংশবিদ মানে বংশ তালিকা নিয়ে যার বিশদ জ্ঞান, পাঠক ইতোমধ্যে বংশ পরিচয় নিয়ে আরবদের অতি রোমান্টিসিজমের ধারণা পেয়ে গেছেন।) তিনি মক্কার সেরা ইতিহাসবিদ, সকল কিছু তার নখদর্পণে। তিনিই যখন ইসলাম গ্রহণ করে ‘শাহাদা’ (‘সাক্ষ্য’) পাঠ করলেন যে “আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ তার প্রেরিত দূত”, তখন নেতাদের মাথায় হাত। কারণ আবু বকর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের মানে হলো, মক্কার সেরা বংশবিদ মনে করছেন মুহাম্মাদ (সা) পূর্বপুরুষদের অসম্মান করছেন না! ইবনে ইসহাক বলেন, “এর পর থেকে মক্কায় সবাই ইসলাম নিয়ে আলাপ শুরু করলো।”

আবু বকরের মতো অঘটন আর ঘটতে দেয়া যাবে না। মুহাম্মাদ (সা) আর তাঁর অল্প-স্বল্প অনুসারীরা যেন ঘৃণার পাত্র হিসেবেই রয়ে যায়, সেটা নিশ্চিত করতে তারা উঠে-পড়ে লাগলো। আবু তালিবের ওপর চাপ আসতে লাগলো তিনি যেন তার ভাতিজা মুহাম্মাদ (সা)-কে ত্যাজ্য করেন। তাঁকে হাশিম গোত্র থেকে বহিষ্কার করা হোক। আর গোত্র থেকে বহিষ্কারের মানে একটাই। সবাই সেটা জানে।

এর মানে- এই লোকের রক্ত ঝরানো বৈধ। কারণ, তাঁকে রক্ষা করার জন্য কোনো গোত্রই দাঁড়িয়ে নেই।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে?তাহলে পড়তে পারেন আদী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ এর লেখা “দ্য প্রফেট” বইটি, যা মূলত লেজলি হেইজেলটনের “দ্য ফার্স্ট মুসলিম” বইয়ের ভাষান্তর। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে পারবেন রকমারির এই লিঙ্ক থেকে, বুকশেয়ারের এই লিংক থেকে, অথবা বইনগরের ফেসবুক পেজ থেকে।

‘রক্তপণ’ বলে একটা কথা আছে, অর্থাৎ ‘ব্লাড মানি’। আধুনিক বিশ্বে এর প্রচলন তেমন না থাকলেও তৎকালে এটাই ছিল সমাজের একটি রীতি। অষ্টম আর নবম শতকের ইতিহাসবিদদের মতে, এটি জাহিলিয়ার সময় থেকেই ছিল, ইসলামের আবির্ভাবের পর খুনাখুনির বদলে ক্ষমাকে উৎসাহিত করা হয় অবশ্য। কুরআন যদিও বলে যে পূর্বে রক্তের বদলা হিসেবে রক্তের আইন ছিল, যেমন বাইবেলে “চোখের বদলে চোখ”-এর কথা বলা, তারপরও ক্ষমার কথা বলছে আল্লাহ কুরআনে, “আর আমি তাদের প্রতি তাতে (তাওরাতে) এটা ফরয করেছিলাম যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং (তদ্রুপ অন্যান্য) যখমেরও বিনিময়ে যখম রয়েছে; কিন্তু যে ব্যক্তি তাকে ক্ষমা করে দেয়, তাহলে এটা তার জন্য (পাপের) কাফফারা হয়ে যাবে।”

চক্ষুর বদলে চক্ষু” রীতি অবশ্যই হিব্রু বাইবেল থেকে নেয়া, মানে ওল্ড টেস্টামেন্ট থেকে। বুক অফ এক্সোডাস বা তাওরাতের হিজরত কিতাবে আমরা এর প্রথম দেখা পাই, এরপর লেভিটিকাস বা লেবীয় পুস্তকে আবার মনে করিয়ে দেয়া হয়। তবে এটা যে পুরোই বাইবেলভিত্তিক তা কিন্তু নয়। বাইবেলের বাইরেও এর অস্তিত্ব ছিল। লাতিনে একে বলা হতো ‘লেক্স টালিওনিস’ যার মানে ‘প্রতিশোধের আইন’। ঈগল বা শকুনের ‘ট্যালন’ বা ধারাল নখের সাথে ইংরেজিতে মাঝে মধ্যে এই টালিওনিসের মিল ভাবা হয়, আসলে তা নয়।

তৎকালীন ইসলামি ইতিহাসবিদ আর আধুনিক পশ্চিমা ইতিহাসবিদদের মতে, সপ্তম শতকের আরবভূমিতে সারাক্ষণই যুদ্ধ লেগে থাকত গোত্রে গোত্রে, আর সেই সাথে রক্তপণের দ্বারা ফয়সালা হতো বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের। এভাবে যে একটা জাতি কীভাবে এতদিন টিকে ছিল কে জানে। এই হানাহানির উদ্দেশ্য কিন্তু প্রতিশোধ ছিল না, বরং ছিল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা। ক্ষমতা হাতে থাকা মানে পানির কুয়ার দখল আপনার হাতে, আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কোথায় আপনার গবাদি পশু চরাবেন, আপনার এলাকা দিয়ে কেউ গেলে কত অর্থ আদায় করবেন ইত্যাদি। রক্তপণ রীতির কারণ ছিল যেন কেউ যখন তখন কাউকে মেরে না ফেলে, কারণ মারলে বড় অংকের পণ দিতে হবে।

কোনো গোত্রের কেউ মারা গেলে, সেই গোত্রকে অবশ্যই এর প্রতিশোধ নিতে হবে। যদি কারও মৃত্যুর বদলা নেয়া না হয়, তাহলে বিশ্বাস করা হতো যে তার কবর থেকে এক পেঁচা উঠে এসে ডাকতে থাকবে, “আমাকে পান করাও! আমাকে পান করাও!” এখানে পান বলতে রক্ত পানের কথা বোঝানো হয়েছে। প্রাক-ইসলামি কবিতা থেকে আমরা তা-ই জানতে পারি। অন্য গোত্রের কাউকে মারলে আপনার নিজের গোত্রই বিপদে থাকবে, কখন না জানি প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে। যখন বেদুইন যোদ্ধারা কাফেলা লুণ্ঠন করত, তখন তারা খুবই সতর্ক থাকত যেন কেউ মারা না যায়, খুন না হয়ে যায়- হয়ে গেলে তারাই রক্তবন্যার বিপদে পড়ে যাবে। লুণ্ঠন কেবল মালের হবে, জানের নয়। মূলনীতি অন্তত তা-ই ছিল।

রাগের মাথায় হাতে তরবারি চলে এলে প্রাণহানি হয়ে যেতই। এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে তখন রক্তপণ বা ব্লাডমানির রীতি আছে। ব্যবিলন আর রোমান সাম্রাজ্যেও এই রক্তপণের রীতি ছিল, যেমনটা আমরা আরবদের মাঝে দেখছি। এই রক্তপণ সোনাদানা দিয়েও পরিশোধ করা যেতে পারে, আবার অন্য পণ্য দিয়েও হতে পারে। কী দিয়ে করতে হবে সেটা ঠিক করবেন একজন হাকাম, যার মানে ‘জ্ঞানী ব্যক্তি’, সালিশ বিচারক। হতে পারে সেটা দশটি দুধেল উট, কিংবা পাঠকের মনে থাকবার কথা, মুহাম্মাদ (সা) এর বাবার ক্ষেত্রে যেমন নির্ধারণ হয়েছিল- একশ উট। প্রাণের বদলে রক্তপণ নিতে রাজি হওয়া কাপুরুষদেরকে ক্ষেপানো হতো এই বলে যে, রক্তের বদলে তাদের ধমনীতে বুঝি দুধ বইছে। তবুও প্রাণহত্যার চেয়ে রক্তপণ ঢের ভালো ছিল।

কোনো গোত্রের প্রতিরক্ষার ডালপালা দাসদাসী পর্যন্তও যায়। এতটাই পবিত্রজ্ঞান করত তারা একে। তাহলে ভাবুন, যখন মুহাম্মাদ (সা)-কে সেই গোত্র থেকেই বহিষ্কারের কথা এলো, তখন তারা তাঁকে কোন পর্যায়ে চিন্তা করতে শুরু করেছে! যদি সত্যি সত্যি নির্বাসিত হন তিনি, তাহলে তাঁর খুনের বদলা নেবার জন্য কেউ থাকবে না।

Courtesy: islamicity.org

আবু তালিবের অবস্থা খারাপ। মুহাম্মাদ (সা) এর প্রতি তার সম্মান বেড়েছে, কিন্তু আবু তালিবের ধনসম্পদ আর প্রভাব প্রতিপত্তি কমে গিয়েছে। হাশিম গোত্রের প্রধান হিসেবে তারই দায়িত্ব এটি, সবাইকে নিরাপত্তা দেয়া। অন্য গোত্রের লোকেরা তখন তাকে চেপে ধরলো মুহাম্মাদ (সা) এর ওপর থেকে নিরাপত্তার চাদর সরিয়ে নিতে। কিন্তু আবু তালিব তো মুহাম্মাদ (সা) এর কাছে ঋণী। মুহাম্মাদ (সা) তাকে ব্যবসার কাছে অনেক সহায়তা করে এসেছেন, আর তাছাড়া আলী (রা) এর দায়িত্বও নিয়েছেন। ভাতিজার প্রচারিত ধর্ম তিনি গ্রহণ করতে অপারগ সেটা এক বিষয়, আর তাঁর সাথে নেমকহারামি করা সম্পূর্ণ আরেক ব্যাপার। আবু তালিবের মতো সৎ মানুষের পক্ষে এমনটা করা সম্ভব নয়।

হাশিম গোত্রের প্রধান আবু তালিবের কাছে যারা এলো তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মাখজুম গোত্রের প্রধান, তিনিই মুহাম্মাদ (সা) এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে সোচ্চার। এতটাই হিংস্রতা দেখাতে লাগলেন তিনি যে তার ‘আবু হাকাম’ (জ্ঞানের পিতা) নামখানা ইসলামি বর্ণনায় বদলে গিয়ে হয়ে যায় ‘আবু জাহল’ (মূর্খতার পিতা)। তিনি এসেই আবু তালিবকে আল্টিমেটাম ধরিয়ে দিলেন। “আল্লাহর কসম, আমরা বাপদাদার এমন অপমান, দেবদেবীর এমন অশ্রদ্ধা আর সহ্য করতে পারব না। হয় আপনি থামাবেন মুহাম্মাদকে (সা), নয়তো আমাদেরকে থামাতে দেবেন। যেহেতু আপনি তার ধর্ম গ্রহণ করেননি, তার মানে আপনি আমাদের পক্ষেই, আমরা আপনার হয়ে তাঁকে সরিয়ে দিচ্ছি।” আবু তালিব ভাতিজাকে খুব চেষ্টা করলেন চুপ করাতে, বোঝালেন যে নাহলে চিরতরে দুনিয়াত্যাগ করতে হবে তাঁকে।

একই সাথে আবু তালিব খেয়াল করলেন গোত্রগুলোর সততা কতটা নিচে নেমে গিয়েছে যে আবু জাহলের মতো লোক এমন দাবি উত্থাপন করতে পারেন। তবে আরেকটি ব্যাপারও আছে।

আবু তালিব নিজে মুহাম্মাদ (সা) এর ধর্ম গ্রহণ করেননি বটে, কিন্তু তার বার্তায় তিনি গভীর কিছু একটা খুঁজে পান। তিনি নিজেই কিন্তু ঘোষণা করতে পারতেন যে তার ভাতিজার প্রচারিত ধর্ম গোত্রের রীতিনীতির বিরুদ্ধে যায়, তিনি তাঁকে আদেশ করতে পারতেন এ ধর্ম প্রচার করা থামাতে। কিন্তু তিনি তা করেননি। এর বদলে, তিনি আবু জাহলের হুমকি জেনেও পুরো পরিস্থিতি হজম করলেন। তিনি হয়তো ভেবেছেন, এগুলো রাগের বশে বলা কথা, আসলে কেউ তার ভাতিজার রক্ত ঝরাতে আসবে না। ইবনে ইসহাক জানান, আবু তালিব আবু জাহল গংকে মৃদু প্রত্যুত্তর দিয়ে ঠান্ডা করতে চাইলেন।

আবু তালিবের মাথায় তখন হয়তো ঘুরছে, তিনি মুহাম্মাদ (সা) এর সাথে আলাপ করবেন, নিশ্চয়ই তিনি যুক্তিগুলো বুঝবেন। আবু তালিবের দিকে চেয়ে হলেও নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ (সা) তাঁর ধর্মের বার্তার তীব্রতা কমিয়ে আনবেন। কিন্তু কীসের কী!

মুহাম্মাদ (সা) সোজাসাপটা জবাব দিলেন, “চাচা, আল্লাহর কসম, আমার এক হাতে যদি ওরা সূর্য, আর আরেক হাতে চন্দ্রও এনে দেয়, তবুও আমি পিছপা হবাও না এ রাস্তা থেকে, আমি ত্যাগ করব না এ পথ, আমি মারা গেলেও না।” নিজের কথার মধ্য দিয়েই যেন তিনি আবু তালিবকে অনুমতি দিয়ে দিলেন যে, হ্যাঁ, তিনি তাকে বহিষ্কারের ব্যবস্থা করতে পারেন। মুহাম্মাদ (সা) অশ্রুভরা চোখে ঘর ত্যাগ করতে গেলেন যখন, তখন আবু তালিব নিজেও অশ্রু ঝরা কণ্ঠে বললেন, “ফিরে এসো, ভাতিজা। আল্লাহর কসম, তুমি যা ইচ্ছে বলে বেড়াতে পারো, আমি কখনও তোমাকে নিরাপত্তা দেয়া থামাবো না।”

Courtesy: https://islom.uz/

আবু জাহল এই কথোপকথনের কথা যদি না-ও জেনে থাকেন, মুহাম্মাদ (সা)-কে কাবাপ্রাঙ্গণে প্রচার করতে দেখে যা বোঝার বুঝে নিলেন তিনি। এবার তার রাগটা আবু তালিব আর মুহাম্মাদ (সা) দুজনের ওপরই। তিনি এবার আলাপ তুলতে লাগলেন পুরো হাশিম গোত্রকেই শাস্তি দেয়া যায় কিনা সে ব্যাপারে। তবে অন্য গোত্রের নেতারা আরেকটু সভ্য উপায় খুঁজতে চাইলেন। তারা সবাই চান মুহাম্মাদ (সা)-কে চুপ করিয়ে দেয়া হোক, কিন্তু পুরো গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে পুরো মক্কাই কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে। তারা এবার নতুন চাল চালতে চাইলো- আবু তালিবের কাছে গিয়ে তাকে নতুন পুত্র প্রস্তাব করা।

এবার নেতৃত্বে আবু জাহল নন, আবু সুফিয়ান- তিনি আব্দ শামস গোত্রের নেতা। তারা সাথে নিয়ে গেলেন এ গোত্রের সন্তান উমারাকে, কুরাইশ গোত্রের মধ্যে উমারা সবচেয়ে বলবান, তীক্ষ্ণ আর সুদর্শন। উমারার কাঁধে হাত দিয়ে তাকে আবু তালিবের সামনে উপস্থিত করলেন আবু সুফিয়ান, এরপর বললেন, “আমরা আপনার কাছে আরেকটি প্রস্তাব নিয়ে এলাম। উমারাকে গ্রহণ করুন, নিজের সন্তান করে নিন, তাকে সাথে রাখলে আপনি নানা দিক দিয়েই উপকৃত হবেন। এর বদলে আপনার ভাতিজাকে আমাদের দিয়ে দিন, সে আপনার বাপদাদা আর দেবদেবীর অপমান করেছে। আমাদের মাঝে হানাহানি লাগিয়ে দিচ্ছে। আমরা তাঁকে খতম করতে চাই।”

আবু তালিব হতবাক হয়ে গেলেন। “এত বদমাইশি প্রস্তাব কীভাবে আনলেন আপনারা আমার কাছে? আপনারা চান আমি আপনাদের এক ছেলেকে লালনপালন করি, তার বদলে আমার ভাতিজাকে আপনাদের হাতে খুন হবার জন্য তুলে দিই? আল্লাহর কসম, এমনটা কোনোদিন হবে না।”

আবু তালিব তার নম্রতা আর বজায় রাখলেন না। তিনি তার গোত্রের সকলকে আর তাদের মিত্রদেরকে ডেকে বললেন, মুহাম্মাদ (সা)-কে বহিষ্কারের দাবির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে। আবু জাহল যে গৃহযুদ্ধের আভাস দিচ্ছিলেন, তা এবার চলে এলো বলে। অলিতে গলিতে মানুষ এ নিয়ে আলাপ করতে লাগলো, বাদ গেল না কাবার প্রাঙ্গণও। সবাই এর বিরুদ্ধেই, কিন্তু সবার আলোচনাই যেন একে আরও বাস্তব করে তুলতে লাগলো।

তবে পর্দার আড়ালে নেতারা আরেকটা শেষ চেষ্টা চালাতে চাইলেন। তৃতীয় একটি দলকে তারা পাঠালেন এবার মুহাম্মাদ (সা) এর কাছেই। এবার ধনদৌলত বা জাগতিক কিছু দিয়ে তাঁকে কিনে নেবার পরিকল্পনা। তিনি যেন দেবদেবীর অপমান থামান, তাদের পূর্বপুরুষদের অবিশ্বাসী বলা বন্ধ করেন, তাহলে তিনি যা চান তা-ই দেয়া হবে। “অর্থকড়ি লাগলে আমরা আমাদের ধনসম্পদ জড়ো করে তোমাকে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী বানিয়ে দেব। দরকার লাগলে আমাদের দলপতি বানিয়ে দেব তোমাকে, সব কিছু তোমার ফয়সালা মাফিক হবে। আর তোমার কাছে যে আত্মা এসে আয়াত বলে যায়, তাকে তাড়াতে না পারলে আমরা ওঝার ব্যবস্থা করে দেব।”

তাদের এই প্রস্তাব যে ভন্ডামি তা তো বোঝাই যাচ্ছে। তারা অবশ্যই মুহাম্মাদ (সা)-কে ক্ষমতায় বসাবে না, তাঁকে ধনদৌলতও দেবে না। তারা কেবল চায় তিনি একবার রাজি হন, তাহলেই তারা সবাইকে বলে বেড়াতে পারবে, মুহাম্মাদ (সা) একটা ভণ্ড! সামনে এক কথা, আর আড়ালে বলে আরেক কথা। মুহাম্মাদ (সা) কুরআনের আয়াত শুনিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি (আল্লাহ) তাদের অন্তরের ওপর আবরণ দিয়েছি যেন তারা উপলদ্ধি করতে না পারে এবং তাদেরকে বধির করেছি।” নেতারা ব্যর্থ মনে ফিরে গেলেন। নিজের স্বার্থই যেখানে নেই, সেখানে মুহাম্মাদ (সা) এত কষ্টটা করছেনই বা কেন?

তাদের নৈরাশ্যের কারণটা বোধগম্য সহজেই। তাদের লক্ষ্য ছিল মুহাম্মাদ (সা)-কে চুপ করিয়ে দেয়া। কিন্তু যতই চেষ্টা তারা করছে, লোকে যেন আরও বেশি করে কথা বলছে মুহাম্মাদ (সা)-কে নিয়ে। আরও বড় ঝামেলা হলো, সামনে হজ্ব আসছে! লাখো লোক আসবে মক্কায়, আর শহরের বাইরে উকাজ মেলা তো আছেই। মুহাম্মাদ (সা) যদি তাদের কাছেও গিয়ে এই ধর্ম প্রচার করে, তবে ব্যবসা তো লাটে উঠবে! মুহাম্মাদ (সা)-কে পাত্তা যেন তারা না দেয়, সেজন্য কী ব্যবস্থা করা যেতে পারে?

ইবনে ইসহাক একটি বৈঠকের কথা বলেছেন, সেখানে এক নেতা বলছেন, “আমাদের রটিয়ে দেয়া উচিৎ যে সে একজন কাহিন।” কাহিন মানে যারা জ্বিনদের থেকে জেনে নিয়ে লোকের ভবিষ্যৎ আওড়ে বেড়ায়। উমারার পিতা ইবনে মুগিরা এতে বাগড়া দিলেন। এ পরিকল্পনা কাজ করবে না। “মুহাম্মাদ কাহিনের মতো কথা বলে না, কাহিনরা বিড়বিড় করে ছন্দহীন কবিতা আওড়ায়।”

তাহলে আমরা বলব তাকে জ্বিনে ধরেছে,” আরেক নেতা বললেন। এতেও ইবনে মুগিরা না বললেন। “জ্বিনে তাকে ধরেনি। জ্বিনে ধরা লোক আমরা দেখলেই চিনি। তার মাঝে তেমন কোনো লক্ষণই নেই।”

তাহলে কবি বলা যায়,” আরেকজনের প্রস্তাব এলো। কিন্তু আবারও, না- “কবিতার সকল শাখা-প্রশাখা আমাদের নখদর্পণে। এগুলো তেমন কবিতা নয়।”

জাদুকর?”

ইবনে মুগিরা মাথা নেড়ে বললেন, “না, সে তো জাদুমন্ত্র আওড়ায় না, কোনো জাদু করতেও দেখিনি আমরা।”

তারা শেষমেশ একমত হলো যে বলবে, “কল্পনায় রাজ্যে বাস তার, বুড়িদের আওড়ানো গল্প বলে বেড়ায় সে।” কিন্তু কাজের কাজ হলো না। লোকে তো তাকে পাত্তা দিলই, বরং আগ্রহ আরও বেড়ে গেল মুহাম্মাদ (সা) এর প্রতি।

কুরাইশ বাদে অন্য বংশের লোকেরা ভাল করেই জানে কুরাইশেরা এখানে ধর্মব্যবসা খুলে বসেছে। তবুও তারা অর্থ দেয়, হজ্ব করতে আসে। বেশি দামে খাবার কেনে, পানি পান করে- কুরাইশদের মনোপলির শিকার হয়। মুহাম্মাদ (সা) নামের কেউ যে কুরাইশদের একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে, এটাই তো বড় খবর। এমন জিনিসে লোকে পাত্তা না দেয় কী করে?

“আরবরা উকাজ মেলা থেকে ফিরে গেল মুহাম্মাদ (সা) এর কথাবার্তা শুনে, আর এরপর তার কথা ছড়িয়ে দিল পুরো আরবে,” বলেন ইবনে ইসহাক।

মিশনে ব্যর্থ হয়ে মক্কার নেতারা ক্রোধে আগুন হয়ে গেলেন। আর আবু তালিবের বারংবার প্রত্যাখ্যানে তারা অপমানিতও বটে। আবু তালিব কোনো মতেই মুহাম্মাদ (সা)-কে তাদের হাতে তুলে দেবেন না। কুরাইশ নেতারা তাই ঝোঁকের বশে ওভার-রিয়্যাক্ট করে বসলেন।

আবু জাহলের পরিকল্পনা মোতাবেক পুরো হাশিম গোত্রকেই তারা বয়কট করলেন!



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে,তাহলে পড়তে পারেন আদী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ এর লেখা “দ্য প্রফেট” বইটি, যা মূলত লেজলি হেইজেলটনের “দ্য ফার্স্ট মুসলিম” বইয়ের ভাষান্তর। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে পারবেন রকমারির এই লিঙ্ক থেকে, বুকশেয়ারের এই লিংক থেকে, অথবা বইনগরের ফেসবুক পেজ থেকে।

Featured Image: Karim Abou Shousha/ artstation.com/

আপনার মন্তব্য লিখুন

  1. আলহামদুলিল্লাহ অনেক ভাল লেগেছে। মাশাল্লাহ বারাকাল্লাহু লাহু অনুবাদ টা মনের তৃপ্তিকর খুব।কিনে পড়ার ইচ্ছা বেড়ে গেছে।
    একটা প্রশ্ন, মাফ করবেন,
    মূল লেখক কি মত দিয়েছেন বাংলা অনুবাদের ব্যাপারে, কিংবা নিজ কালেকশন এ রাখতে চেয়েছেন কি না।যেহেতু এটা তার জন্য গর্বের ব্যাপার

    1. জ্বী ভাই, মূল লেখিকার সাথে অনুবাদ যোগাযোগ করেছেন। তার অনুমতি নিয়েই অনুবাদটা করা হয়েছে।