Skip links

তৃতীয় আরব-ইজরাইল যুদ্ধ: ইতিহাস, কারণ এবং ফলাফল

গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত সোহেল রানার "কিংডম অব আউটসাইডার্স" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 10 মিনিট

তৃতীয় আরব-ইজরাইল যুদ্ধ

৫ জুন, ১৯৬৭।

সোমবার, সকাল সাতটা। ইজরাইলের আকাশে একঝাঁক যুদ্ধবিমান। এগুলো দ্রুতই সমুদ্র বরাবর উড়ে যায়, তারপর পানির স্তরের সামান্য ওপর দিয়ে এগোতে থাকে মিশরের দিকে। বিমানগুলো খুব নিচ দিয়ে উড়ছিল। কারণ, ইহুদি বায়ুসেনারা চাচ্ছিলেন আরবদের স্থাপন করা রাডারের চোখ ফাঁকি দিতে। কিন্তু জর্ডানের আজলুনের পাহাড়ের চূড়ায় বসানো রাডারের নজর এড়াতে পারেনি জেট বিমানের এই বহর। ব্রিটিশ নির্মিত অত্যাধুনিক এই রাডার স্থাপন করা হয়েছিল জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে ৫০ মাইল উত্তরে। জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২০০ মিটারের মতো উঁচু।

ইজরাইলি বিমান উড়ে যাওয়ার তথ্য পাঠানো হয় মিশরের সেন্ট্রাল জেনারেল হেড কোয়াটার্সে। কিন্তু সেই তথ্য গৃহীত হয়নি। কারণ, মাত্র একদিন আগে তথ্য কনভার্টের গোপন কোড পরিবর্তন করেছিল মিশরের মিলিটারি কমান্ড। মিশর ও জর্ডানের বাহিনী একই কমান্ডের অধীনে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও গোপন কোড পরিবর্তনের খবর জানানো হয়নি জর্ডানকে। ফলে জর্ডান থেকে পাঠানো জরুরি তথ্যটি মিশরের কাছে পৌঁছাল না, মিশরও সতর্ক হতে পারল না। এর প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা পর জর্ডানের বাদশাহ হোসেন বিন তালালের কাছে খবর এলো-মিশর আক্রান্ত হয়েছে!

অবশ্য খুব শিগগিরই আজলুনের রাডার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রিপোর্ট করল-‘সিনাইয়ের দিক থেকে একঝাঁক বিমান উড়ে আসছে। জেনারেল হেডকোয়ার্টাস থেকে বাদশাহ হোসেনকে জানানো হয়, ইজরাইল ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং মিশরের বিমান বাহিনী বড়ো ধরনের পালটা আঘাত হেনেছে। এই খবর শুনে হোসেন এবার তার দেশের বাহিনীকে ইজরাইল আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে দেন। সাড়ে ৯টার দিকে, রেডিওতে জর্ডানের বাদশাহর জরুরি বার্তা প্রচার করা হয়-‘জর্ডান আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার সময় এসে গেছে!’

পৌনে দশটার দিকে জর্ডানের গোলন্দাজ বাহিনী পশ্চিম জেরুজালেম বরাবর কামানের গোলা ছুড়তে শুরু করে। ইজরাইল প্রথমে পালটা আক্রমণে যায়নি। তারা ভেবেছিল, আরবদের প্রতি ঐক্য দেখাতে গিয়ে জর্ডান হয়তো লোক দেখানো কিছু শেল ইজরাইলের দিকে ছুড়ছে। কিন্তু গোলন্দাজ আক্রমণ তীব্র হলে ইজরাইলের ভুল ভাঙে। ১১টার দিকে সীমান্তের ইজরাইলি অবস্থানগুলোতে বোমাবর্ষণ শুরু করে জর্ডানের যুদ্ধবিমানগুলো। ভূমিতে স্থাপন করা দূরপাল্লার ১৫৫ মিলিমিটার হাউটজার থেকেও ইজরাইলের ভেতরের বিভিন্ন টার্গেটে গোলা ছোড়া হচ্ছিল। এর আগে মিশর-জর্ডানের হিত্তিন ইনফ্র্যান্টি ব্রিগেড জেরুজালেমের একটি বেসামরিক এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়। এখানে একসময় প্যালেস্টাইনে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বাসভবন ছিল। তারা একাধিক ইজরাইলি সরকারি ভবনও দখল করে নেয়। এবার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নারকিসের নির্দেশে পালটা হামলায় যায় ইজরাইলের গোলন্দাজ ও পদাতিক বাহিনী। জর্ডান বাহিনীর কাছ থেকে কিছু এলাকা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয় ইহুদি সেনারা।

Courtesy: AP/ timesofisrael.com

জেরুজালেম রক্ষার লড়াই

৫ জুন। দুপুর ১২ টা বাজার আরও দশমিনিট বাকি। জর্ডান বিমান বাহিনীর ১১টি হকার হান্টার ইজরাইলের নেতানিয়া এলাকা ঘিরে সিরিজ হামলা চালাতে থাকে। দ্রুতই ইরাক ও সিরিয়ার বিমানগুলো কিবুৎজ দেগানিয়া এলাকা কাঁপিয়ে দেয়। ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী লেভি এশকল ও বিমান বাহিনীর কমান্ডার মেজর জেনারেল মরদেচাই হোডের বাসভবন এখানেই। হামলায় ইজরাইলের খুব একটা ক্ষতি হয়নি সত্য, কিন্তু তাতে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে বেশ। এর দ্বারা পরিষ্কার হয়ে যায় ইজরাইলের সঙ্গে জর্ডানের যুদ্ধ! এটা ধারণারও অতীত ছিল। কারণ, জর্ডানের সাথে বিভিন্ন সময়ে ইজরাইলের ছিল গোপন যোগাযোগ।

ইজরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে হামলার নির্দেশ দেয়। অন্যদিকে, ব্রিগেডিয়ার হোড ইরাক, জর্ডান ও সিরিয়ার বিমানঘাঁটিতে হামলার নির্দেশনা জারি করেন। সাড়ে ১২টা থেকে হামলায় যায় ইজরাইলি বিমানবাহিনী। দুপুর ১টা ১০ মিনিটের দিকে আরেক দফা হামলায় জর্ডানের বিমানবাহিনী বিধ্বস্ত হয়। এমনকী ইজরাইলি বাহিনীর কামান ও রকেট জর্ডানের বাদশাহ হোসেনের রাজকীয় প্রাসাদ বাসমানের উদ্দেশে ছুটে যায়। সৌভাগ্যবশত বাদশাহ প্রাসাদে ছিলেন না। ইজরাইল বারবার যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করতে লাগল। তাদের সেনারা যেকোনো মূল্যে জেরুজালেম থেকে আরব সেনাদের তাড়াতে চাইল। তরুণ ইজরাইলি এয়ারফোর্স কর্মকর্তা কর্নেল গার তার সহযোদ্ধাদের বললেন,

We will free Jerusalem!

গারের নেতৃত্বাধীন প্যারাট্রুপার বাহিনীর শহুরে এলাকায় যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল না। তাদের হাতে না ছিল পর্যাপ্ত ম্যাপ, না ছিল শহরের বিবরণসংবলিত দরকারি ফটোগ্রাফ। তাই প্যারাট্রুপারদের ব্যাকআপে ছিল আরেকটি পদাতিক ইউনিট।

জর্ডান শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যূহ প্রস্তুত করে রেখেছিল। তাদের বাংকারগুলো ঘিরে বসানো হয়েছিল সারি সারি মাইন। সীমান্তে যাদের মোতায়েন করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে দুর্ধর্ষ তৃতীয় তালাল ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেডের সেনারাও ছিল। রণাঙ্গনের এই অংশে জর্ডানের সেনাদের নেতৃত্ব দেন মেজর মানসুর ক্রাসনুর। অন্যদিকে, ইজরাইলের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মেজর (পরবর্তী সময়ে কর্নেল) মোত্তা গার।

রাত আটটায় ইজরাইলি আক্রমণ শুরু হয় গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায়। ৯০ মিনিটেই ৩৪টি জর্ডানিজ বাংকার ও মেশিনগান পয়েন্ট ধসিয়ে দেয় ইহুদি প্যারাট্রুপাররা। পরদিন ভোরে জেরুজালেমের অ্যামুনিশন হিলে থাকা বাকি তিনটি জর্ডানি বাংকার খুব কাছ থেকে আক্রমণ করে ধসিয়ে দেওয়ার জন্য ইজরাইলের শ্যার্মন ট্যাংকগুলো এগিয়ে যায়। অ্যামুনিশন হিলের যুদ্ধে ১০৬ জর্ডানি সেনা নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়। যুদ্ধে অংশ নেওয়া পাঁচশো ইজরাইলি প্যারাট্রুপারের মধ্যে ৩৭ জন নিহত ও দেড় শতাধিক আহত হয়। প্যারাট্রুপারদের অন্য দুটি ব্যাটালিয়ন রাতভর লড়ে পুরাতন জেরুজালেম শহরের দেয়ালের কাছেই রকফেলার মিউজিয়াম দখল করে নেয়। এরপর তারা শেখ জারাহ শহর অভিমুখে এগোতে থাকে। ইজরাইলিরা জারা হয়ে অ্যাম্বাসেডর হোটেলের দিকে যায় ৬ জুন সকাল দশটা নাগাদ।

Courtesy: mwi.usma.edu

এদিকে জর্ডানের বাদশাহ তখন মহা টেনশনে। জেনারেল রিয়াদ চাচ্ছিলেন যুদ্ধবিরতি হোক। তিনি বাদশাহর কানে ঢোকালেন-অন্যথায় হোসেনের সিংহাসন ও দেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে। এই সময়টাতে পরিষ্কার হয়ে যায়,ইরাক, সিরিয়া ও সৌদির বাহিনী ইজরাইলের বিপক্ষে জর্ডানকে সহায়তা দেবে না। পশ্চিম তীর থেকেও দুঃসংবাদ আসছিল, তবুও যুদ্ধে অটল থাকলেন বাদশাহ হোসেন। মিশরের নাসেরের সাথে টেলিফোনে পরামর্শ চাইলেন।

তাদের দুজনের কথোপকথন-

নাসের : আমরা আক্রমণাত্মকভাবে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। রাতভর আমাদের সৈন্যরা সবকয়টি ফ্রন্টে লড়াই করেছে। এখনও লড়ছে বীরদর্পে।

হোসেন বিড়বিড় করে কিছু বলছে, কিন্তু কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।

নাসের হোসেনের কথার দিকে খেয়াল না দিয়ে আবার বলা শুরু করল, ‘শুরুর দিকে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকলে মনে কিছু নেবেন না। আমরা নিশ্চয় যুদ্ধে অনেক ভালো করব। মহান আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন। যুদ্ধে ইঙ্গ-মার্কিনরা জড়িয়ে পড়া নিয়ে যদি একটা বিবৃতি দিতেন…’

হোসেন এখনও বিড়বিড় করে চলেছে…

জবাব না পেয়ে নাসের আবারও বলে চলল, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে আমরা বরং বিষয়টি নিয়ে বিবৃতি দিই। আমি এবং আপনি আলাদাভাবে দুটি বিবৃতি ইস্যু করি। সেইসঙ্গে সিরিয়ান সরকারকেও বিবৃতি দিতে অনুরোধ করি, ইঙ্গ-মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো আমাদের স্বার্থবিরোধী কর্মকান্ড অব্যাহত রেখেছে।’

হোসেন মৃদু কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলল-‘ঠিক আছে।’

নাসের বলল, ‘অসংখ্য ধন্যবাদ। অটল থাকুন। মিশরের সরকার ও জনগণ সব সময় আপনাদের পাশে আছে। মিশরের যুদ্ধবিমানগুলো এখন ইজরাইলের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে।’

হোসেন অস্পষ্টভাবে নাসেরের কথায় সম্মতি এবং ধন্যবাদ দিলো। এরপর ‘আল্লাহ আপনার কল্যাণ করুন’ বলে নাসের ফোন রেখে দিলো।

কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কায়রো, আম্মান ও দামেস্কের রেডিও স্টেশন থেকে প্রচার করা হলো-‘আমেরিকা ও যুক্তরাজ্য ইজরাইলের পক্ষে যুদ্ধবিমান সহায়তা দিচ্ছে।’ আমেরিকা ও মিশরের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েনের সৃষ্টি হলো। ব্রিটিশরা বলছিল‘এটা ঢাহা মিথ্যা কথা।’ বাদশাহ হোসেন প্রভাবশালী বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের ডেকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিতে চাপ দিলেন। সাত জুন, ১০ টা ১৫ মিনিটের মধ্যে পুরোনো জেরুজালেম শহরের ওয়েস্টার্ন ওয়াল দখলে চলে যায়।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত সোহেল রানার “দ্য কিংডম অব আউটসাইডারস: ইহুদি দখলদারিত্ব, সন্ত্রাসবাদ ও মোসাদ সাম্রাজ্যের ইতিবৃত্ত” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। এছাড়া বিশেষ ছাড়ে বইটি পেতে চাইলে ক্লিক করুন বুকশেয়ারের এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বইনগরের ফেসবুক পেজে

জেরুজালেম এখন ইজরাইলের হাতে

যুদ্ধের প্রথম দিনেই বিমান হামলা চালিয়ে মিশরীয় বিমানবাহিনীর প্রায় ৯০ শতাংশ ধ্বংস করে দেয় ইজরাইল। বিমান হামলার ছত্রছায়ায় ইজরাইলি সাঁজোয়া যান ঢুকে পড়ে মিশরীয় ভূখন্ডে। জবাবে পালটা যুদ্ধের ডাক দেয় আরব দেশগুলো। তারা জেরুজালেমে ইজরাইলি অবস্থান লক্ষ্য করে গোলা ছুড়তে শুরু করে।

৬ জুন ইজরাইলি বাহিনীর অভিযানে গাজার পতন হয়। তখন ওই উপত্যকা মিশরের শাসনে ছিল। ইজরাইলি বাহিনী সিনাই উপদ্বীপের দিকে এগিয়ে যায় এবং জেরুজালেমের আরব অংশে প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে একটি অস্ত্রবিরতি প্রস্তাব গ্রহণ করে।

৭ জুন ইজরাইলি সেনাবাহিনী সুয়েজখালের পূর্ব তীর দখল করে নেয়। ইহুদি নৌ-বাহিনী মিশরের পর্যটন এলাকা শারম আল-শেখে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে, এরপর ইজরাইলি বাহিনী জেরুজালেমের ওল্ড সিটিতে প্রবেশ করে। তারা বেথলেহেম এবং জেরিকো শহরসহ জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরের বেশিরভাগ এলাকা দখল করে নেয়।

৮ জুন ইজরাইলি সেনারা সুয়েজ খালের তীরে পৌঁছায়। এটা ছিল সিনাই দখলের লড়াই অবসানের সংকেত। তখন মিশরীয় বেতারে ঘোষণা দেওয়া হয়-‘কায়রো জাতিসংঘের অস্ত্রবিরতি প্রস্তাব গ্রহণ করছে।’

৯ জুন ইজরাইলিরা সিরিয়ার সুরক্ষিত গোলান মালভূমিতে অভিযান শুরু করে। একদিনের প্রচন্ডলড়াই শেষে তারা সিরীয় বাহিনীকে হটিয়ে গোলান দখল করে নেয়। ওই দিনই মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে পদত্যাগের ঘোষণা দেন, তবে তিন ঘণ্টা পরই তিনি অবস্থান পালটে জানান গণদাবির মুখে প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকছেন। ইজরাইল অস্ত্রবিরতি মেনে নেয়। ১০ জুন শনিবার সিরিয়া-ইজরাইল সম্মুখযুদ্ধ জোরদার হয়। সিরিয়াকে হটাতে ইজরাইল তাদের পুরো সামরিক শক্তি কাজে লাগায়। সিরিয়ার কুনেইত্রা শহরের পতনের পরও ইজরাইলিরা এগিয়ে যেতে থাকে।

১৯৬৭ সালের জুনে হওয়া এই ‘ছয় দিনের যুদ্ধ’ (৫ জুন থেকে ১০ জুন) তৃতীয় আরব-ইজরাইল যুদ্ধ নামে পরিচিত, যা মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র অনেকখানি বদলে দেয়। লড়াইয়ে ইজরাইলি বাহিনী আরবদের পরাজিত করে এবং মিশরের সিনাই উপদ্বীপ, গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে নেয়।

পরবর্তী সময়ে মিশর ও ইজরাইলের মধ্যে এক চুক্তির মাধ্যমে সিনাই ও গাজা উপত্যকা থেকে ইজরাইলি সেনারা সরে গেলেও সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং পূর্ব জেরুজালেম তারা ছাড়েনি। জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরেও স্থাপন করা হয় নতুন নতুন ইহুদি বসতি।

Courtesy: AP/ Times of Israel

যুদ্ধের ফলাফল এবং পরাজয়ের কারণ

এক.

দ্বিতীয় আরব-ইজরাইল বা সুয়েজ যুদ্ধের সময় নাসের যেভাবে আরব জাতীয়তাবাদের আইকনে পরিণত হয়েছিলেন, ’৬৭-এর যুদ্ধের পর তা টিকিয়ে রাখা যায়নি। ছয় দিনের যুদ্ধে তার সামর্থ্য নিয়ে আরব দেশগুলোতে চালু থাকা উচ্চ ধারণার পরিবর্তন হয়। ইজরাইল এই অল্প সময়ে তিনটি আরব দেশের সেনাবাহিনীকে একরকম ধ্বংস করে দেয়। পরবর্তী সময়ে সুয়েজখাল, জর্ডান নদী গোলান উপত্যকা ধরে এ অঞ্চলের সীমানা নির্ধারণ করা হয়।

ইজরাইল ও আরবদের পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং বিদ্বেষ দিনকে দিন বাড়ছিল। এর মধ্যে ১৯৫০ এবং ৬০-এর দশকের স্নায়ুযুদ্ধ সে তিক্ততা আরও বাড়িয়ে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন আধুনিক বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে মিশরকে সাহায্য করেছিল। অন্যদিকে, ইজরাইলের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল আমেরিকার। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পর থেকেই ইজরাইল তার সামরিক শক্তি বাড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লাগে। ফ্রান্স ও ব্রিটেনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান ও ট্যাংক ক্রয়ের পাশাপাশি বাড়ানো হয় সেনাসংখ্যা। ১৯৬৭ সাল নাগাদ পরমাণুশক্তি অর্জনের দ্বারপ্রান্তে চলে যায় ইজরাইল।

আইজ্যাক রবিন তখন ইজরাইলি সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। তার প্রচ- আত্মবিশ্বাস ছিল, তার সেনাবাহিনী যথেষ্ট শক্তি অর্জন করেছে। তারা বুঝতে পারে, প্রতিটি যুদ্ধে তাদের জিততে হবে; কোনো ধরনের পরাজয়ের কথা চিন্তাও করেনি ইজরাইল।

সে সময় মিশর আর সিরিয়াকে সামরিক শক্তির দিকে ততটা মনোযোগ দিতে দেখা যায়নি। সুয়েজখাল জাতীয়করণের মাধ্যমে জামাল আবদেল নাসের আরবদের কাছ থেকে যে গৌরব অর্জন করেছিলেন, সেটি তাকে ১৯৪৮ সালের পরাজয়ের কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্যান-আরব জাতীয়তাবাদের নেতা। একটি দক্ষ সেনাবাহিনী গড়ে তোলার প্রতি তার তেমন মনোযোগ ছিল না। এ ছাড়া সিরিয়ার সেনাবাহিনীও রাজনীতির মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিল।

দেশটিতে ধারাবাহিক কয়েকটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়। আরবরা নিজেদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের কথা বলত প্রচুর, কিন্তু সেগুলো ছিল কথার কথা। বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যেত না; বরং আরব নেতাদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভক্তি ছিল স্পষ্ট। সিরিয়া আর মিশরের শাসকগোষ্ঠী মনে করতে থাকে, জর্ডান ও সৌদি আরবের মদদে তাদের দেশে অভ্যুত্থানের চেষ্টা হচ্ছে। জর্ডানের বাদশাহ হোসেন ছিলেন ব্রিটেন এবং আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র। তার দাদা বাদশাহ আব্দুল্লাহর সঙ্গে ইহুদি গোয়েন্দা সংস্থার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। আরব এবং ইজরাইলের মধ্যে ক্রমাগত তিক্ততা এবং সীমান্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ শুরু হয়।

ইজরাইল-মিশর সীমান্ত তুলনামূলক শান্ত ছিল। ইজরাইলের সঙ্গে সবচেয়ে বড়ো সংঘাতটি হয়েছিল সিরিয়ার। আমেরিকা জানত, আরব দেশগুলো যদি ইজরাইলকে সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে, তাহলেও তারা জিততে পারবে না। মিশরের বিমানবাহিনী শক্তিশালী থাকলেও তাদের সেনাবাহিনী ছিল দুর্বল। ১৯৬৭ সালের জুন মাসের ২ তারিখে ইজরাইলের সামরিক কর্মকর্তারা যুদ্ধের জন্য তৈরি হয়।

Courtesy: The Guardian

দুই.

ইজরাইলি সামরিক কর্মকর্তারা রাজনীতিবিদদের বুঝিয়েছিলেন, তারা মিশরকে পরাস্ত করতে পারবেন। এর কিছুদিন আগে ইজরাইলি গুপ্তচরসংস্থা মোসাদের প্রধান গোপনে ওয়াশিংটন সফর করেন। তিনি মার্কিন প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন, ইজরাইল যুদ্ধ করতে চায়। ইজরাইলকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সবুজ সংকেত দেয় আমেরিকা। অন্যদিকে মিশরের প্রেসিডেন্ট নাসের ধারণা করে বসে আছেন, ইজরাইল হয়তো জুন মাসের ৪ অথবা ৫ তারিখে হামলা করতে পারে।

১৯৬৭ সালের জুন মাসের ৫ তারিখ সকাল সাতটা চল্লিশ মিনিটে বিমান আক্রমণের জন্য তৈরি হয় ইজরাইল। তাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল আরবদের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া এবং সেটি শুরু হবে মিশরকে দিয়ে। ইজরাইল তার সামরিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বছরের পর বছর ধরে আরবদের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গোপন নকশা জোগাড় করেছে। ইজরাইলের যুদ্ধবিমানের পাইলটদের কাছে একটি বই দেওয়া হয়েছিল, যেখানে মিশর, জর্ডান ও সিরিয়ার বিমানঘাঁটিগুলোর চিত্র ছিল।

সাইনাইয়ের বিমানঘাঁটিতে মিশরের সেনাপ্রধান তার বাহিনীর শীর্ষ অফিসারদের নিয়ে যখন বৈঠকে ব্যস্ত, তখনই খবর আসে ইজরাইলি বিমান হামলার। শুরুর দিকে ব্যাপারটা বুঝতেই পারেনি মিশরের সেনা কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা ছিল, এটা হয়তো মিশরের সেনাবাহিনীর একটি অংশের বিদ্রোহ, কিন্তু দিন শেষ হতে না হতেই জর্ডান এবং সিরিয়ার বহু বিমানঘাঁটি ধ্বংস করে দেয় ইজরাইলের বিমানবাহিনী। পুরো আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চলে যায় তাদের নিয়ন্ত্রণে।

ইজরাইল অবশ্য জর্ডানকে সতর্ক করে দিয়েছিল, যাতে তারা যুদ্ধে না জড়ায়, কিন্তু জর্ডান শোনেনি ইজরাইলের বারণ। পাঁচ দিনের যুদ্ধে মিশর, সিরিয়া ও জর্ডানের সেনাবাহিনী ইজরাইলের কাছে পরাস্ত হয়। ইজরাইল মিশরের কাছ থেকে গাজা উপত্যকা, সিনাই উপদ্বীপ, সিরিয়া থেকে গোলান মালভূমি এবং জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয়। প্রথমবারের মতো পবিত্র জেরুজালেম ইজরাইলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। সেখান থেকে বহু ফিলিস্তিনিকে বিতাড়িত করা হয়। এর জেরেই পদত্যাগ করেন জামাল আবদেল নাসের। কিন্তু তার সমর্থনে বহু মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ফলে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন তিনি। ১৯৭০ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন নাসের।

জর্ডানের বাদশাহ হোসেন অবশ্য ক্ষমতায় টিকে যান। তার সাথে ছিল ইজরাইলের গোপন আঁতাঁত। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালে জর্ডান ইজরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করে। অন্যদিকে, সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পিতা হাফেজ আল আসাদ। হাফেজ ছিলেন বিমানবাহিনীর একজন কমান্ডার।

সম্মিলিত আরব বাহিনীকে হারিয়ে দেওয়া ইজরাইলি আর্মির গুরুত্ব বাড়ে পশ্চিমের দেশগুলোতে। ’৬৭-এর যুদ্ধের পর থেকে ইজরাইলকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা শুরু করে আমেরিকা। আর সে যুদ্ধের পর আরবরা ইজরাইলকে দেখে আরও বেশি আগ্রাসী ও দখলদার হিসেবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হুঁশিয়ারি ডিঙিয়ে প্যালেস্টাইন ভূখ-ে নতুন ইহুদি বসতি নির্মাণ শুরু করে ইজরাইল। এখন প্রশ্ন হলো, ইজরাইল কেন আগ বাড়িয়ে তৃতীয় আরব-ইজরাইল যুদ্ধের সূচনা করল? কারণ, তার কাছে ছিল আরবদের দুর্বলতার গোয়েন্দা তথ্য। আর সেই তথ্য মোসাদের হাতে তুলে দিয়েছিল আরব রাষ্ট্র মরক্কো!



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত সোহেল রানার “দ্য কিংডম অব আউটসাইডারস: ইহুদি দখলদারিত্ব, সন্ত্রাসবাদ ও মোসাদ সাম্রাজ্যের ইতিবৃত্ত” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে চাইলে ক্লিক করুন রকমারির এই লিঙ্কে। এছাড়া বিশেষ ছাড়ে বইটি পেতে চাইলে ক্লিক করুন বুকশেয়ারের এই লিঙ্কে অথবা যোগাযোগ করুন বইনগরের ফেসবুক পেজে

Featured Image: history.com

আপনার মন্তব্য লিখুন