Skip links

আঠারোটা বসন্ত যার কেটে গেল কারাগারেই!

স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক-এর "ফিলিস্তিনের আর্তনাদ" বই থেকে সংকলিত

পড়তে সময় লাগবে: 24 মিনিট

আর্টিকেলটি আপনি চাইলে অডিও পডকাস্ট হিসেবেও শুনতে পারেন:

অডিওটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক। অডিওটি শুনতে ভালো লাগলে সাবস্ক্রাইব করুন তার “ইতিহাসের গল্প” চ্যানেল এবং অনুসরণ করুন তার ইতিহাসের গল্প ফেসবুক পেজ

এক.

আমার বয়স আর ইসরায়েলিদের এই অবৈধ দখলদারিত্বের বয়স প্রায় সমানই বলা যায়। সাতষট্টির যুদ্ধ যখন শুরু হলো, আমি তখন মা-র পেটে। বাবা-মা তখন দেহাইশেহ শরণার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা। আটচল্লিশের যুদ্ধে বাড়িছাড়া হয়েই তারা এখানে আশ্রয় নেন। এক দশকেরও বেশি সময় তাঁবুতে থাকবার পর পঞ্চাশের দশকে বাবা ক্যাম্পেই ছোটখাট একটা ঘর বানিয়ে ফেলেন। সাতষট্টির যুদ্ধে অনেকেই ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যায়, ঠাই নেয় জর্ডানে। এদের এক বড় অংশই আম্মানে আশ্রয় নিয়েছিল।

কিন্তু বাবা আর পালাতে চাইলেন না, নিজের মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু হারাতে চাইলেন না। তাই সাতষট্টির যুদ্ধ চলাকালে বাবা বাড়িতেই থেকে গেলেন, ওদিকে মা কাছেরই এক জঙ্গলে কয়েকদিন লুকিয়ে থাকলেন। মাসখানেক পর ক্যাম্পেরই এক ধাত্রীর সহায়তায় জন্ম হয় আমার।

ক্যাম্পে কাটানো শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা আমার ভাল করেই মনে আছে। সবাই নিজেদের মতো করে খুপরি ঘর বানিয়ে থাকত। ছাদ ফুটো ছিল, পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল না, আলাদা কোনো বাথরুমও ছিল না। বেশ কিছু পাবলিক টয়লেট ছিল ক্যাম্পে, আমরা সেগুলোতেই প্রাকৃতিক কর্মাদি সেরে নিতাম। শাওয়ারের ব্যবস্থা ছিল না। গামলায় পানি গরম করে সেটা দিয়েই কাজ সেরে নিতাম।

কাপড়চোপড়ের জন্য জাতিসংঘ ত্রাণ ও কার্যক্রম সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) ছিল আমাদের একমাত্র ভরসার জায়গা। বছরে মাত্র দুবার কাপড় পেতাম আমরা। সবসময় যে সেটা ঠিকমতো গায়ে লাগতো তা-ও না। মাঝে মাঝে তো মেয়েদের কাপড় পরেই চালিয়ে দিতে হতো!

ঠান্ডায় খুব কষ্ট হতো আমাদের। ঘরের বাইরে পুরনো তেলের ড্রামে আগুন জ্বালিয়ে সেখানেই পরিবারের সবাই মিলে আগুন পোহাতাম। আগুনের লেলিহান শিখা এতটাই উপরে উঠত যে অপর পাশে যে থাকত তার চেহারাই দেখা যেত না। এর পাশাপাশি কলেরাসহ আরও অনেক রোগে নিয়মিতই আক্রান্ত হতো ক্যাম্পের বাসিন্দারা।

এক খুপরি থেকে আরেক খুপরির কথা খুব সহজেই শোনা যেত। তাদের ঝগড়াঝাঁটি, গল্পগুজব- সবই শুনতে পেতাম আমরা, ঠিক যেমন আমাদেরটাও শুনতে পেত ওরা! ঘরগুলো এতটাই গা ঘেষে ছিল যে সেখানে গাড়ি দিয়ে চলাচলের কোনো অবস্থাই ছিল না। হেঁটে হেঁটেই যেতে হতো সব জায়গায়।

বেথলেহেম শহরে যখন যেতাম, তখন সেখানকার বাচ্চাকাচ্চাদের দেখে নিজেদের জীবনের সাথে ঠিক মেলাতে পারতাম না। তারা সাইকেলে চড়ত, ভাল পোশাক পরত, সময়ে সময়ে কোকাকোলা দিয়ে গলা ভেজাত; আমাদের এসবের কিছুই ছিল না।

আমার বাবা-মা যে সবসময় এতটা কষ্টে ছিলেন, বিষয়টা কিন্তু মোটেও সেরকম না। একসময় গ্রামের বাড়িতে তাদেরও অনেক জমি ছিল। আমার ছোটবেলায় বাবা ইসরায়েলে কাজ করতেন। পাথর ভাঙার কাজ ছিল তার। কিন্তু এই কাজ করে তেমন আয় হচ্ছিল না। ওদিকে পরিবারের সদস্য সংখ্যাও ছিল বিশাল। চার ছেলে আর দুই মেয়ের দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। দেহাইশেহ ক্যাম্পে কারোরই আর্থিক অবস্থা তেমন সুবিধার ছিল না, সবারই নুন আনতে পান্তা ফুরাবার অবস্থা। তবে এর একটা ইতিবাচক দিকও ছিল। বিভেদ ভুলে আমরা সবসময়ই একে অন্যের পাশে দাঁড়াতাম।

Courtesy: XYZ Pictures/Getty Images

দুই.

খুব অল্প বয়স থেকেই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আর তাদের অবৈধ দখলদারদের অমানবিক আচরণ দেখে বড় হয়েছি। বিশেষ করে ইসরায়েলি বাসিন্দারা ছিল সবচেয়ে খারাপ। তাদের কাছে আমাদের ক্যাম্প ছিল এমন এক জায়গা, যেখানে তারা সবসময় নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চাইত।

এদের নেতা ছিলেন র‍্যাবাই মোশে লেভিঞ্জার, পুরো পশ্চিম তীরকেই যিনি ইসরায়েলের অংশ হিসেবে দেখতেন। ক্যাম্পের আশেপাশের সব জায়গার দখলই তারা নিতে চেয়েছিল। আর এভাবে তারা আমাদের জীবনকেই দুর্বিষহ করে তোলে। সপ্তাহে একদিন বাসে চড়ে আসত ওরা। বাস থেকে নেমে যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই ইচ্ছেমতো গুলি করত। রবার বুলেট না, একেবারে আসল বুলেট। আমাদের উদ্দেশ্যে অকথ্য ভাষায় গালাগালি, পাথর ছুড়ে মারা, গায়ে পড়ে মারামারি লাগান- কিছুই করতে বাকি রাখত না তারা। আর আমাদের কেউ যদি প্রতিবাদ করত, তাহলেই তারা ডেকে আনত স্বজাতির সেনাসদস্যদের। তখন দুর্ভাগা সেই প্রতিবাদকারীকে ধাওয়া করত খোদ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী, প্রতিবাদকারীদের উদ্দেশ্যে ছুড়ে মারত টিয়ার গ্যাস। ঘরের জানালা বন্ধ করার কোনো উপায় ছিল না। ফলে ঘরে বসেও টিয়ার গ্যাসের গন্ধ সহ্য করা লাগত।

ইউএনআরডব্লিউএ আমাদের জন্য স্কুলের ব্যবস্থা করেছিল। ইসরায়েলি খলদাররা স্কুলে গিয়ে দরজা, জানালা, ডেস্ক- সবকিছুতে ভাঙচুর চালাত। শিক্ষকদেরও মুখ বুজে সেসব সহ্য করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। সবার মাঝেই একধরনের চাপা আতঙ্ক আর নিরাপত্তাহীনতা কাজ করত। ছোটবেলায় দেখা এই অমানবিক ঘটনাগুলো আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছিল। বিশেষত শিক্ষকদের সাথে আমার সম্পর্ক, তাদের প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গি- সবই এই ঘটনাগুলো ফলে প্রভাবিত হয়েছিল। বলা যায়, তাদের এই সম্মানহীনতা আমার নিজের মাঝেও তাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমিয়ে দেয়। এভাবে একসময় দেখা যায় আমরা কেউই আসলে তাদের কথাকে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছি না, কারণ ততদিনে আমরাও বুঝে গিয়েছিলাম যে তাদের আসলে প্রতিবাদের ক্ষমতাও নেই।

আশির দশকের শুরুর দিকে আমাদের ক্যাম্পের চারদিকে প্রায় বিশ ফুট উঁচু বেড়া তুলে দেয় ইসরায়েলি সেনারা। একবার তো বেথলেহেমে ঘুরতে আসা কিছু পর্যটক এটাকে চিড়িয়াখানা ভেবে ভুল করে! ক্যাম্পে সবসময়ই কারফিউ জারি থাকত। সন্ধ্যা সাতটার ভেতর আমাদের অবশ্যই ঘরে ফিরতে হত, নাহলে সেনারা কোনোভাবেই আমাদের ঢুকতে দিত না। এই কারফিউ চলাকালে বের হবারও কোনো উপায় ছিল না। মাঝে মাঝে এমনও হয়েছে যে আগে থেকেই অসুস্থ কারও অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু সাতটা পেরিয়ে যাবার ফলে ক্যাম্প থেকে বের হবার অনুমতি পাওয়া যায়নি। ফলে সেই মানুষকেই শেষপর্যন্ত বাঁচান যায়নি।

ওদিকে ইসরায়েলের বাসিন্দারা ক্যাম্পের বাইরেই বড় বড় গাড়ি এনে অস্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছিল। আমার মনে পড়ে, সন্ধ্যার পর কারফিউয়ের জন্য আমরা ঘরে আটকে থাকতাম আর সারা রাত জুড়ে ওদের উচ্চশব্দে বাজান দেশাত্মবোধক গানগুলো সহ্য করা লাগত!

সেনাদের সাথে আবার ইসরায়েলিদের বেশ ভাল বোঝাপড়া ছিল। চৌদ্দ বছর বয়সে আমি জীবনে প্রথমবারের মতো স্কুলব্যাগ পাই। এর আগে ক্যাম্পের অধিকাংশ ছেলেমেয়ের মতো প্লাস্টিকের ব্যাগে করেই বই-খাতা আনা-নেওয়া করতাম। সবুজরঙা সেই স্কুলব্যাগ পেয়ে আমার যে সেদিন কী ভাল লাগছিল তা বলে বোঝাতে পারব না।

একদিন সকালে আমি স্কুলে যাচ্ছি। এমন সময় ছ’জন ইসরায়েলি সেনা আর সাদা পোশাকের অস্ত্রধারী এক লোক (দখলদার এক ইসরায়েলি নাগরিক) আমাকে ডাক দিল। কাছে যেতেই আমাকে লাথি-ঘুষি, চড়-থাপ্পড় মারা শুরু করল সেই লোক। তারপর ব্যাগ কেড়ে নিয়ে পাশের ড্রেনে ছুড়ে ফেলল। যে-ই না আমি সেটা তুলে আনতে গেলাম, তখন সেনারা আমাকে পেটাতে লাগল, ব্যাগ আবারও ড্রেনে ছুড়ে মারল। আমার কয়েকজন বন্ধুরও  একই দশা হয়েছিল সেদিন। ওদের বইগুলো তারা ড্রেনে ফেলে দিয়েছিল।

আমি ইউএনআরডব্লিউএ-র স্কুলে পড়তাম। ওরা বিনামূল্যেই বই দিত আমাদের। স্কুল কর্তৃপক্ষকে সব জানালে ওরা আমাকে আবারও বই দিয়েছিল। কিন্তু আমি সেই সবুজ ব্যাগ আর ব্যবহার করতে পারিনি। আবারও প্লাস্টিকের ব্যাগই হয়ে ওঠে আমার একমাত্র সম্বল।

ক্যাম্পের শরণার্থীরা দখলদার ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে পাথর ছুড়ে প্রতিবাদ জানাত। দশ বছর বয়স থেকে আমিও এটা শুরু করি। দলে দলে ভাগ হয়ে এই কাজ চলত। পাঁচজন এখানে, ছয়জন ওখানে- এভাবেই চলত ইসরায়েলিদের উদ্দেশ্যে পাথর নিক্ষেপ।

বয়স যখন আরেকটু বেড়ে তেরোতে ঠেকল, তখন আরও গোছানভাবে চলত এই আন্দোলন। ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ান তখন একেবারেই নিষিদ্ধ। আমরা তাই কয়েকজনের হাতে ফিলিস্তিনের পতাকা ধরিয়ে দিতাম। পাশাপাশি দেয়ালে শ্লোগান লেখার ব্যবস্থাও করতাম। এটাও নিষিদ্ধ ছিল সেসময়। এই সন্দেহে যদি কেউ ধরা পড়ত, তবে তাকে সোজা জেলে পাঠিয়ে দিত।

আমরা ছুড়তাম পাথর, ওদিকে ইসরায়েলি সেনারা ছুড়ত গুলি! অস্বীকার করব না, গুলির শব্দ শুনে শুরুতে ভয়ই লাগত। কিন্তু তাদের অন্যায়, অত্যাচার সহ্য করতে করতে আমরা একেবারে অতিষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম। ফলে জীবনের মায়া তুচ্ছ করেই লড়ে যেতাম আমরা।

আমরা বিশ্বাস করতাম, গুলির সামনে পাথর যত নগণ্যই হোক না কেন, তারপরও সেটা প্রতিবাদের বার্তা নিয়ে যেত। আমাদের চোখে ওরা ছিল কেবলই দখলদার। আমাদের যাবতীয় দুঃখ-কষ্টের মূলে এরাই। তাই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া আমাদের সামনে প্রতিবাদই ছিল একমাত্র রাস্তা। তখনও প্রথম ইন্তিফাদা শুরু হয়নি। কিন্তু আমাদের মতো ক্যাম্পের বাসিন্দাদের জন্য ঠিকই ইন্তিফাদা শুরু হয়ে গিয়েছিল, ইন্তিফাদা ছিল আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

আর্টিকেলটি পড়তে কি আপনার ভালো লাগছে? তাহলে পড়তে পারেন স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক এর ওয়ার ডায়েরি সিরিজের তৃতীয় বই, “ফিলিস্তিনের আর্তনাদ: নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে পারবেন রকমারির এই লিঙ্ক থেকে, বুকশেয়ারের এই লিংক থেকে অথবা অনলাইনে পড়তে চাইলে পড়তে পারেন বইটই অ্যাপের এই লিঙ্ক থেকে।

Featured Image: AFP/Daily Sabah

তিন.

ধীরে ধীরে আমাদের উন্নতি হতে লাগল। ইসরায়েলি সেনাদের দিকে আর পাথর না, বরং মলোটোভ ককটেল ছুঁড়ে মারা চিন্তা আসে আমাদের মাথায়। তবে বিষয়টা মোটেও সহজ কিছু ছিল না। সিদ্ধান্ত হলো মোশে লেভিঞ্জার আর ইসরায়েলি সেনারা মিলে যে আউটপোস্ট তৈরি করেছে, ওখানেই হামলা চালান হবে।

তখন আমার বয়স আর কতই বা হবে; বড়জোর পনের কী ষোল বছর। গ্রুপের কারও কারও বয়স আরও কম। গোপনে গোপনে আমরা বেশ কিছু মলোটোভ ককটেল বানালাম। এরপর সময়-সুযোগ বুঝে সবার অগোচরেই ক্যাম্পের দেয়ালে ছুড়ে সেগুলোর পরীক্ষাও চালাই।

ডিসেম্বর ১১, ১৯৮৪; সেদিন রাতে ভালই ঠান্ডা পড়েছিল, তুষারপাতও হচ্ছিল বেশ। গায়ে লেপ জড়িয়ে গুটিশুটি মেরে ঘুমাচ্ছিলাম। হুট করেই আমাদের খুপরিতে ঢুকল ইসরায়েলি সেনারা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাতকড়া পরিয়ে আমাকে গাড়িতে তোলা হলো। সেখানে আমাদের গ্রুপের আরও কয়েকজনকে একইভাবে দেখতে পেলাম। সেদিন আমাকেসহ মোট পাঁচজনকে ওরা আটক করে নিয়ে গেল আল-মুস্‌কুবিয়া কারাগারে।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হলো আমাদের। সেদিন রাতে ওরা চল্লিশজনের মতো ফিলিস্তিনিকে ধরে এনেছিল। আমাদের পাঁচজনকে পুরোপুরি উলঙ্গ করা হলো। এরপর হাতকড়া আরও শক্ত করে আটকে আমাদের বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো, মাথা ব্যাগ ঢাকা হলো। তুষারপাত হচ্ছিল তখন, আর আমরা সবাই পুরোপুরিই নগ্নাবস্থায় এই শীতের রাতে বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। কাউকে দেখতে না পেলেও তাদের দাঁত কাঁপার শব্দ ঠিকই কানে আসছিল, জোরে শোনা যাচ্ছিল কাঁপাকাঁপির ফলে হাতকড়াগুলো নড়াচড়ার শব্দও।

মাসদুয়েক ধরে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা। একদিকে প্রশ্ন চলত, আরেকদিকে তারা উচ্চস্বরে গান ছেড়ে আমাকে অমানুষের মতো পেটাত। দিনে কেবলমাত্র একবার বাথরুমে যাবার অনুমতি ছিল। সারাক্ষণ হাতগুলো পাইপের সাথে আটকে রাখা হতো। খুব ব্যথা করত তখন। একটা সময় পর হাতের অস্তিত্বই আর টের পেতাম না; বুঝতে পারতাম না আমার হাত আসলেই আছে নাকি ওরা কেটে নিয়েছে! আমাকে ওরা এতই মেরেছে যে পুরো শরীরে কালশিটে পড়ে গায়ের জ্যাকেটের মতোই কালো হয়ে গিয়েছিল। জ্ঞান হারালেই মুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনতো, তারপর আবারও শুরু হতো নির্যাতন।

আমার কবজিতে যে দাগ দেখতে পাচ্ছেন, এটা সেই দিনগুলোরই সাক্ষী। হাতকড়া থেকেই এই দাগ এসেছে। ওরা এগুলো এতই শক্ত করে আমাদের হাতে পরাত যে সেগুলো যেন একেবারে মাংস কেটে ঢুকে যেত! পায়ের বিভিন্ন জায়গায় এখনও মার খাওয়ার দাগ আছে। অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানো তো ছিল দূরের কথা।

জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যারা আসত, তারা সরাসরি কোনো প্রশ্ন করত না। বারবার শুধু একটাই জিজ্ঞাসা, “তুই কী করছিস বল? কী করছিস? বল কী করছিস?” টানা মার খেতে খেতে আমার এমন দশা হয় যে কোনোকিছু নিয়েই ঠিকমতো চিন্তা করতে পারছিলাম না, জ্ঞান থাকলেও না। কোনোকিছু স্বীকার যে করব তা-ও পারছিলাম না, কারণ মারের চোটে আমি জেলে আসের আগের অনেক ঘটনাই বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম। আমার সাথে অন্য যারা ধরা পড়েছিল, তারা সবাই মলোটোভ ককটেল বানিয়ে সেটার পরীক্ষা চালাবার কথা স্বীকার করেছিল। কিন্তু আমি কিছুই বলিনি। বিষয়টা এমন না যে আমি তাদের কাছ থেকে সেসব লুকাতে চাচ্ছিলাম। আসলে মার খেয়ে খেয়ে আমার স্মৃতিশক্তি, চিন্তা করার ক্ষমতা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে আমি স্বীকার করে নেয়ার মতো অবস্থাতেও ছিলাম না।

মাঝে মাঝে টানা কয়েকদিন ধরে জোর করে জাগিয়ে রাখা হতো আমাকে, এরপর মাত্র ঘণ্টাচারেকের জন্য ঘুমাতে দিত, তারপর আবার সেই আগের অবস্থা। টানা কয়েকদিন ধরে না ঘুমাতে ঘুমাতে আমার হ্যালুসিনেশন শুরু হয়ে যায়। আশেপাশে কী ঘটছে তার কিছুই বুঝতে পারতাম না। কখনও মনে হত, আমি বুঝি একটা স্কুলে এসেছি আর বাচ্চারা চারদিকে খালি চিৎকার-চেচামেচি করছে, কিন্তু আমি ওদের থামাতেই পারছি না। অবস্থা এমন হলো যে কোনটা বাস্তব আর কোনটা কল্পনা আমি সেটাই বুঝতে পারছিলাম না।

একদিন হুট করে এক উকিল হাজির হলেন। নাম তার লিয়া সেমেল, একজন ইসরায়েলি। ভিজিটিং রুমে আমার সাথে আলাপ করতে করতেই সিগারেট সাধলেন। আমার কেস তিনিই দেখবেন বলে জানালেন। পুরো ব্যাপারটা এতটাই অদ্ভুত ছিল যে আমি কিছুই মেলাতে পারছিলাম না। তার কাছে কেবল জানতে চাইলাম এটা কি স্বপ্ন নাকি সত্যি? জেলে থাকতে মাঝে মাঝেই হ্যালুসিনেশন হয়ে মনে হতো, আমার চারদিকে অজস্র বিষধর সাপ কিলবিল করছে। সবকিছুই আমার কল্পনা বলে আশ্বস্ত করলেন লিয়া। এরপরই আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো পড়ে শোনালেন, জানালেন আমাকে শীঘ্রই কোর্টে তোলা হবে।

একজন পুলিশ অফিসারের আচরণ অবশ্য বেশ ভাল ছিল। একদিন সকালে আমি টয়লেটে যেতে চাইলেও যিনি জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্বে ছিলেন তিনি একেবারে গভীর রাতের আগে আমাকে ছাড়লেন না। যখন সেই পুলিশ অফিসার আমাকে ব্যথায় কাতরাতে দেখলেন, তখন তিনি ছুটে এসে ক্ষোভ নিয়েই বলতে লাগলেন, “হায় খোদা! এই লোকগুলোর সমস্যা কোথায়? মানুষগুলোকে তারা এভাবে পেটায় কেন?” প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়েছিলেন তিনি। আমাকে টয়লেটে যাবার ব্যবস্থাও তিনিই করে দেন। এরপর যখন ফিরে আসলাম, তখন আমার জন্য চা আর সিগারেটের ব্যবস্থা করলেন, সাথে বললেন, “বিশ্রাম নাও ভাই।” পুরো কাজটাই তার জন্য বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তারপরও আমার জন্য তিনি সেদিন যেভাবে এগিয়ে এসেছিলেন তা আমি কখনোই ভুলব না।

দু’মাস ধরে চলল জিজ্ঞাসাবাদ। আমার ভয় হচ্ছিল যে ওরা বুঝি আমাদের মেরে ফেলবে, কারণ ততদিনে বন্দীদের উপর ওদের অমানবিক নির্যাতনের অনেক কিছুই আমরা জেনে গিয়েছিলাম। আমার এক চাচাও এই ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন। জেলেই মারা যান তিনি। অনশনে করেছিলেন। এরপর গার্ডরা তাকে জোর করে খাওয়াতে গেলে খাবার গলায় আটকেই মারা যান চাচা।

একটা বিষয় আমি বেশ ভালভাবেই বুঝতে পেরেছিলাম- তারা আসলে উন্মাদ। তারা মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচার করে আমাকে মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে দিতে চাচ্ছিল, আর এই কথা তারা আমাদের সামনেও বলত, “ভেতরে ভেতরে তোদের একেবারে শেষ করে দেব।”

সত্যি বলতে, বন্দী অনেক ফিলিস্তিনিই তাদের অত্যাচারের চোটে মানসিকভাবে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ত। কেউ কেউ মারাও যেত। আমি পাগল হইনি। চারপাশের সবার অবস্থা খুব ভালভাবে খেয়াল করতাম আমি। মাঝে মাঝে মনে হতো, যে মানুষগুলো নিয়মিত ধর্মকর্ম করত, তাদের জন্যও বেশ কঠিন ছিল সময়গুলো। কারণ তারা বারবার আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করত, কিন্তু প্রত্যাশিত সাহায্যের বিলম্ব তাদের আরও কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দিত। আমি অবশ্য তাদের দলে ছিলাম না। বরং সামনের দিনগুলোতে করণীয়, এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে কী করা দরকার- সেসব নিয়েই আমি ভাবতাম।

দুই মাস পর আমাদের কোর্টে তোলা হলো, অভিযোগ সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ততা। বিচারে আমাদের চার থেকে ছয় বছরের জেল হলো। মা সেদিন কোর্টে এসেছিলেন। রায় শুনে সাথে সাথেই জ্ঞান হারান তিনি।

Courtesy: AFP Photo

চার.

আমাকে দামুন জেলে পাঠানো হলো। সত্যি বলতে, জেলে গিয়ে আমি যা যা শিখেছি, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এতকিছু আমি কোনোকালেই শিখতে পারতাম না। ইসরায়েলিদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বেশ কয়েকজন নেতার সাথে পরিচয় হয় সেখানে। নিজেকে নিয়ে বেশ গর্ব হতো তখন, কারণ আমার আশেপাশে সব নামীদামী যোদ্ধারা রয়েছেন। আমার বন্ধুবান্ধবরাও বিষয়টা নিয়ে বেশ খুশি ছিল, যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। তাদের সাথে থেকে নিজেদেরও বেশ বড় মনে হতো তখন, কিন্তু সত্যি কথা হলো আমাদের গোঁফও তখন গজায়নি! এতটাই অল্প বয়স ছিল আমাদের। এমনও সময় গিয়েছে যে দিনে আমরা চারবার পর্যন্তও শেভ করেছি যেন শুধু একটু দাড়ি গজায়, নিজেদের একটু বড় বড় দেখায়!

আমাকে যে চার বছরের কারাদণ্ড দিল, এই বিষয়ে আমার ক্ষোভের শেষ ছিল না। না, আমার রাগ এই কারণে না যে চার বছর অনেক লম্বা সময়, বরং এই সময়টুকু খুব অল্প লাগছিল আমার কাছে। বারো বছর দিলেই আসলে আমি বেশি খুশি হতাম। ওটাকেই বরং বেশি সম্মানের বলে মনে হচ্ছিল আমার।

দামুনে আমার আশেপাশে ইসরায়েলি মাফিয়া, মাদকদ্রব্য চোরাকারবারিসহ সব ধরনের অপরাধীই ছিল। আমার মনে হয় কারা-কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করেই এমন দাগী আসামীদের সাথে আমাদের রেখেছিল যাতে আমাদের মনও ওদের সংস্পর্শে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু আমরা এই ফাঁদে পা দেইনি। অল্প সময়ের মাঝেই নিজের কর্মকান্ডেরর মাধ্যমে জেলের নেতাগোছের একজন হয়ে উঠি আমি। তরুণ বন্দীদের বিষয়ে গার্ডদের সাথে কথা বলতাম। আমাদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া পেশ করা এবং আমাদের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায় আচরণ সম্পর্কে নিয়মিতই প্রতিবাদ করতাম আমি।

ছিয়াশিতে এক অনশন কর্মসূচি শুরু হয় আমার নেতৃত্বে, কারণ কারা-কর্তৃপক্ষ আমাদের ঠিকমতো খাবারদাবার দিচ্ছিল না। তখন শীতও পড়েছিল মারাত্মক, কিন্তু আমাদের রুমগুলোতে আলাদা কোনো হিটারের ব্যবস্থা ছিল না, বন্দীদের জন্য ছিল মাত্র একটা করে পাতলা কম্বল। শরীরচর্চার জন্য আমরা যে সময়টুকু বাইরে কাটাতাম সেটাও পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে আমরা বারোজনের মতো বন্দী এই অনশনে অংশ নেই।

সেই সময়ে রাতের বেলায় খাবারের স্বপ্ন দেখতাম। ইসরায়েলি সেনারা আমাদের নিয়ে ইচ্ছেমতো মজা নিত। আমাদের সেলের বাইরেই বারবিকিউ করে খেত তারা, জানালা দিয়ে সেই গন্ধ ঢুকত আমাদের নাকে।

টানা আঠারো দিন ধরে চলে আমাদের এই অনশন। আঠারোতম দিনে গিয়েও যখন কিছুই হলো না, তখন আমি ঘোষণা দিলাম- তখন থেকে আর পানিও না ছোঁব না আমরা। এবার টনক নড়লো কর্তৃপক্ষের। তারা রেড ক্রসের ডাক্তার ডেকে আনল। ডাক্তাররা আমাদের বোঝাতে লাগলেন যে এভাবে চলতে থাকলে দু’দিনের ভেতরেই মারা পড়ব আমরা। তাদের কথা শেষপর্যন্ত আমরা মেনে নিলাম, অনশন কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করা হলো। তবে নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ের ব্যাপারে আমরা কত দূর পর্যন্ত যেতে পারি সেটা কর্তৃপক্ষ ঠিকই বুঝে গিয়েছিল। পরদিনই লোক পাঠিয়ে আমাদের দাবি মেনে নেয় তারা। বরাদ্দ দেয়া হয় বাড়তি খাবার, দুটো করে বাড়তি কম্বল এবং দিনে অতিরিক্ত পনেরো মিনিট শরীরচর্চার সুবিধা।

এটা ছিল আমাদের সুস্পষ্ট বিজয়। পরের দু’সপ্তাহ ধরে কীভাবে খাবার খেতে হয় তা যেন আমরা একেবারে শুরু থেকেই শিখলাম। শক্ত খাবার খাওয়ার উপায়ই ছিল না। আমাদের পেট কেবল দুধ, আলু সিদ্ধ আর এমনই কিছু নরম খাবার রাখতে পারছিল।

এভাবে অল্প দিনের ভেতরেই ‘বিপদজনক বন্দী’র তকমা জুটে গেল আমার কপালে। আমি যে সহিংস কোনোকিছুর সাথে জড়িত ছিলাম বিষয়টা মোটেও তেমন না, বরং আমি অন্য বন্দীদের নিয়ে বিভিন্ন আন্দোলনের সূচনা করছিলাম- যা তাদেরকে আরও বেশি ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। ফলে কর্তৃপক্ষ আমাকে আশকেলন কারাগারে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। বলে রাখা ভাল, ইসরায়েলের কাছে সবচেয়ে বিপদজনক মনে হওয়া বন্দীদেরই ঠাই মেলে আশকেলনে। সেখানে গিয়ে সৌভাগ্যবশত ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে জড়িত আরও অনেক নেতার সাথে দেখা হয়ে যায়। ইসরায়েলের কাছে তারা হয়তো সবচেয়ে বিপদজনক বন্দী, এটা হয়তো সবচেয়ে কুখ্যাত কারাগার, কিন্তু সত্যি বলতে দামুনের চেয়ে আশকেলনে গিয়ে আমার আরও বেশি ভাল লাগল!

আমাদের মতো তরুণরা এবার জেলে পড়াশোনা শুরু করল। সব কিছু নিয়েই জানবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল আমাদের। আশকেলনের বয়স্ক বন্দীদের সাথে বসে তাদের অভিজ্ঞতা শুনতাম আমরা। তারা প্রতিদিনই লেকচার আর লেসন বানিয়ে আমাদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করতেন। আমৃত্যু কারাদন্ডের সাজা হয়েছিল তাদের। কেউ কেউ তো সেই ‘৬৭ থেকেই এখানে বন্দী!

ইতিহাস, অর্থনীতি, দর্শন- সবকিছু নিয়েই পড়াশোনা করতাম আমরা। সকাল ছ’টায় উঠেই হাতমুখ ধুয়ে পড়াশোনা শুরু হতো। দশটা থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত চলত লেকচার। এরপর দেড় ঘণ্টার বিরতি। বিরতির পর যেকোনো বিষয়ে লেখা জমা দিতে হতো; সেটা রাজনৈতিক, শিক্ষামূলক থেকে শুরু করে যেকোনো বিষয়ই হতে পারত। প্রতিদিনই বন্দীদের মধ্য থেকে একজনকে সারাদিনে সে যা পড়েছে এবং যে বিষয়ে লিখেছে তা নিয়ে লেকচার দিতে হতো। এরপর আমরা আবার পড়াশোনা শুরু করতাম।

সন্ধ্যা সাতটায় রাতের খাবার দেয়া হতো আমাদের। সাতটা থেকে দশটার মাঝের সময়টায় আবারও পড়াশোনা, এরপর ঘুমাতে যাওয়া। লেখালেখি শেষ না হলে রাত জেগে কাজ শেষ করার সুযোগও ছিল। ধীরে ধীরে পুরো বিষয়টাই একধরনের নেশায় পরিণত হয়ে গেল আমার কাছ। “এরপর কী পড়ব? এরপর কী লিখব?”- এই চিন্তাগুলো সারাক্ষণই মাথায় ঘুরপাক খেত।

প্রত্যেক বন্দীই কোনো না কোনোদিকে ছিল অসাধারণ। রাজনীতি, দর্শন, অর্থনীতি, মার্ক্সবাদ- একেকজনের দখল একেক দিকে। কেউ কেউ তো জেলের ভেতরেই বোমা বানানো শেখাত আমাদের! বিভিন্ন ভাষা শেখারও সুযোগ হয়েছিল আমাদের, কেননা বন্দীদের মাঝে গ্রীক, রাশিয়ান, তুর্কিসহ বিভিন্ন ভাষা জানা মানুষও ছিল। ফলে তারা তাদের জ্ঞান অন্যদের সাথে শেয়ার করে বিষয়গুলো এগিয়ে নিচ্ছিল। সত্যি বলতে, আশকেলনে গিয়ে আমার মনে হয়েছিল আমি হয়তো হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড কিংবা এর চেয়েও সেরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি!

এসব শুনে আবার ভাববেন না যে আশকেলনে আমরা বেশ সুখেই ছিলাম! ওখানে আমাদের সাথে বেশ খারাপ ব্যবহার করা হতো। বিশেষত ওখানকার নির্জন কারাবাস (Solitary Confinement) ছিল ইসরায়েলের জেলগুলোর মাঝে নিকৃষ্টতম। কখনও কখনও একজন বন্দীকে বছরের পর বছর অন্য সকলের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হতো। এক বন্দীকে আমি চিনতাম যে এই নির্জন কারাবাসের চাপ সইতে না পেরে একসময় পাগল হয়ে যায়। তাকে নিয়মিতই চিকিৎসা নিতে হতো।

এর প্রতিবাদ হিসেবে আমরা প্রতিটি সেলেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলাম। জেলের প্রত্যেক বন্দীই এই আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছিল। সেলের মাঝখানে নিজেদের কাপড়চোপড় জমা করে চুরি করে আনা ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। অল্প সময়ের ভেতরেই চারদিক ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। দমবন্ধ হবার দশা সকলের। আটচল্লিশজনকে সেবার হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। আমাদের আন্দোলন ঠিকই মিডিয়ায় এসেছিল, ফলে আমাদের উদ্দেশ্য সফল বলা যেতে পারে। তবে কারা-কর্তৃপক্ষ এসব নিয়ে মাথা ঘামায়নি, নির্জন কারাবাসে শাস্তিদানের প্রক্রিয়া তাই চলতেই থাকে।

জেলের ভেতর যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার ভিত বেশ মজবুত হয়। বিভিন্ন শহর থেকেই বন্দীদের এখানে ধরে আনা হয়- রামাল্লা, নাবলুস, হেব্রনসহ বিভিন্ন জায়গা। ফলে জ্ঞানার্জনের এক বড় ধরনের সুযোগ বলা যায় একে, জানা যায় বিভিন্ন এলাকার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কেও। জেল থেকে বেরিয়ে এলেও এই সম্পর্ক থাকে অটুট। নিজ নিজ এলাকায় এই মানুষগুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তিও ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রথম ইন্তিফাদার অনেক নেতারই সাক্ষাত হয় এই জেলে এসেই।

১৯৮৯ সালে মুক্তি মেলে আমার। প্রথম ইন্তিফাদা চলছে তখন। আমার বয়স তখন মাত্র বিশ বছর। কিন্তু এই যে এক লম্বা সময় ধরে আমি জেলে ছিলাম, এজন্য মানুষ আমাকে বেশ সম্মান করত, সমাজে আমাকে এক মর্যাদাপূর্ণ চোখে দেখা হতো। সমাজের চোখে আমরা অপরাধী না, বরং নেতা হিসেবেই গণ্য হতাম।

Courtesy: Cal3b Gee/Pinterest

পাঁচ.

দীর্ঘদিন পর মুক্তি পেলেও খুব বেশিদিন বাইরে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়নি, মাত্র ছয় মাস পরই আবার যেতে হয় জেলে। এবার আমি অন্তত কোনো কিছু করার জন্য জেলে যাইনি। তবে আমার আগের রেকর্ড, বিভিন্ন স্তরের মানুষজনের সাথে পরিচয়, আর সবচেয়ে বড় কথা সেই সময়ের চলমান ইন্তিফাদা- সব মিলিয়ে আমাকে জেলে পুরেই যেন খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ!

এবার বিচারের রায়ে আমাকে পাঠানো হয় ক্‌ৎজি’অৎ জেলখানায়। সেখানে গিয়ে আমি হিব্রু ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধিতে নজর দেই। ক্‌ৎজি’অৎ জেলখানা হলেও বেশ খোলামেলা ছিল, ছিল অনেকগুলো তাবু। এমনই এক তাবুর নাম ছিল ‘হিব্রু তাবু’, যেখানে কেবলমাত্র হিব্রু ভাষাতেই কথাবার্তা বলা হতো। একপর্যায়ে সেখানে গিয়ে অন্যদের হিব্রু ভাষা শেখাতে শুরু করে দিই আমি। সেই সাথে হিব্রুতে লেখা সংবাদপত্রগুলোও অন্য বন্দীদের জন্য অনুবাদ করে পড়ে শোনাতাম।

ততদিনে আমার অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার বেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। ফলে নতুন বন্দীরা প্রায়ই বিভিন্ন ব্যাপারে আমার পরামর্শ চাইত। বেশ সম্মান করত তারা আমাকে। জেলখানার নিয়ম হলো, কারও যদি কারাবাসের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে, তাহলে বন্দীদের থেকে শুরু করে ওয়ার্ডেন এবং গার্ডরাও তাকে বেশ সম্মান করত। ফলে তাঁবুতে সবচেয়ে সেরা খাট আমাকেই দেয়া হতো। কারা-কর্তৃপক্ষও আমাকে একধরনের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করত যে কিনা কথার জাদুতে অন্যদের বশে আনতে সক্ষম। ফলে গার্ডরাও আমাকে বিশেষভাবে খাতির করত। পুরোটাই ছিল একধরনের ‘গিভ এন্ড টেক’ টাইপের বোঝাপড়া।

১৯৯৪ সালে জেল থেকে ছাড়া পাই আমি, তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নজরদারি থেকে মুক্তি মেলেনি। মাঝে মাঝেই আমাকে কোনো কারণ ছাড়া তুলে নেয়া হতো, এরপর জেলে আটকে রাখত একদিন, কখনও বা দু’সপ্তাহও। আসলে আমার মতো লোকদের ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে কেউ যদি জীবনে একবার হলেও জেল খেটে থাকে, তাহলে সে আসলে সারা জীবনের জন্যই হুমকিস্বরুপ, তাকে সবসময়ই নজরদারির ভেতর রাখতে হবে।

১৯৯৫ সালে আমাকে আবার আটক করা হলো। এবার আমাকে পাঠানো হয় আল-মুস্‌কুবিয়াতে। আমার বিরুদ্ধে তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগই ছিল না, বরং পরিচিত কয়েকজন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই আটক করা হয় আমাকে। এবারও জিজ্ঞাসাবাদের সময় চলে অমানবিক নির্যাতন।

টানা বারো দিন ধরে আমাকে ঠিকমতো খেতে বা ঘুমাতে দেয়া হয়নি। বারোতম দিনে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আসা অফিসাররা এক অদ্ভুত কাজ শুরু করলো। তারা আমাকে রীতিমতো ঝাঁকাতে লাগল- কখনও কেবল ঘাড় ও মাথা, কখনও আবার পুরো শরীর। টানা দুই সপ্তাহ ধরে শরীরের উপর দিয়ে এমন ধকল যাবার পর নতুন এই অত্যাচার শরীর আর নিতে পারল না। অক্সিজেনের অভাবে একটু পর পর আমি জ্ঞান হারাতে লাগলাম। মৃত্যুকে সেদিন যেন খুব কাছ থেকেই দেখা হয়েছিল।

জ্ঞান ফিরলে নিজেকে জেরুজালেমের হাদাস্‌সাহ মেডিকেল সেন্টারে আবিষ্কার করি। কিছুটা সুস্থ হবার পর আমাকে আবারও আল-মুস্‌কুবিয়াতে নিয়ে যাওয়া হয়, শুরু হয় একঘেয়ে আর অত্যাচারে পরিপূর্ণ জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব।

এবার নতুন আরেক ধরনের নির্যাতনের সম্মুখীন হলাম। খুব শক্ত করে হাতকড়া আটকে আমাকে চেয়ারের সাথে বাঁধা হলো। এরপর সেই চেয়ারকে উল্টে রেখে ওরা চলে গেল, উল্টো হয়ে রইলাম আমিও। এভাবেই চলে গেল টানা বারো দিন। ততদিনে আমার কবজি দিয়ে বেশ গভীরেই বসে গেল হাতকড়া, একেবারে কেটেই যেন ঢুকল।

কখনও আবার বমি কিংবা পায়খানা ভর্তি ব্যাগ রেখে দিত আমার মাথার উপর। টানা বারো দিন এমন নির্যাতনের পর মুক্তি মিলত মাত্র চার ঘণ্টার জন্য। এভাবেই চলল মাসের পর মাস। মাঝে মাঝে লোকজন এসে আমাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করত, সেটাও বড়জোর মিনিট পনেরোর জন্য। তারপর আবারও দিনের বাকিটা সময় চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হতো আমাকে।

কখনও তারা এসে বলতো, “আয়, তোকে পেটের একটা ব্যায়াম করাই।” তারপর হাতকড়া লাগানো অবস্থাতেই দুজন মিলে আমার শরীর একে অপরের বিপরীতে সর্বশক্তি দিয়ে টানতে থাকতো যতক্ষণ না আমি বমি করে দিচ্ছি কিংবা জ্ঞান হারাচ্ছি।

আল-মুস্‌কুবিয়াতে আমার বিরুদ্ধে তাদের কোনো অভিযোগই ছিল না, কিন্তু তারা এটাও চাচ্ছিল না যে আমি স্বাধীনভাবে ফিলিস্তিনের রাস্তায় ঘুরে বেড়াই। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে আমার উকিলকেও তারা আমার সাথে দেখা করতে দেয়নি। এরপর একদিন নতুন এক উকিল আসলো দেখা করতে, নাম তার অ্যালেগ্রা পাচেকো। দীর্ঘদিন ধরে কারাবাসের অভিজ্ঞতার ফলে কে আমার জন্য বিপদজনক বা নিরাপদ, কাকে আমি বিশ্বাস করতে পারব- এমন ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বেশ প্রখর হয়ে উঠেছিল। আর অ্যালেগ্রাকে দেখে আমার সেই অভিজ্ঞ ইন্দ্রিয় বলে উঠল, “ওকে তুমি বিশ্বাস করতে পার!”

ছয় মাস পর আমাকে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত মেগিদ্দো জেলখানায় পাঠানো হয়। আমার বিরুদ্ধে তারা কখনোই কোনো অভিযোগ আনেনি, বরং আমার বিরুদ্ধে তারা এক বছরের জন্য অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশনের রায় দেয়। এই মেয়াদ পরে আরও এক বছর বাড়ান হয়।

ততদিনে কারাগারের জীবন নিয়ে আমি বলতে গেলে পিএইচডি করে ফেলেছি। আমি এতটাই ভাল হিব্রু ভাষা শিখে ফেলেছিলাম যে আমার কথা শুনে কয়েকজন গার্ড সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করে ফেলল যে আমি একজন ইহুদী! তারা আমাকে সাহায্যও করতে চাইত। সেই সুযোগে আমি তাদের বলে একটা মোবাইল ফোন যোগাড় করে ফেলি!

বিভিন্ন সুবিধাই আমি আদায় করে নিচ্ছিলাম, আর এর সবই ভাল হিব্রু জানার বদৌলতে। জেলে পেপার রাখা হতো, পেছনের পাতায় থাকত হরেক রকম বিজ্ঞাপন। একবার পেছনের পাতায় পিজ্জার বিজ্ঞাপন দেখে আমার খুব খেতে ইচ্ছা করল। তাই আমাদের মোবাইল দিয়ে জেলের পরিচালক সেজে কল করলাম ঐ দোকানেই! মোট পঁচাত্তরটা পিজ্জা অর্ডার করেছিলাম সেদিন, যা দিয়ে আমরা কয়েদিরা সবাই মিলে পেটপুরে খাওয়া সম্ভব। দুই ঘণ্টা পর পিজ্জা চলে এল, আমরাও পেট ভরে খেলাম। ঘণ্টাখানেকের মাঝে জেলের পরিচালক আমাদের তাঁবুতে চলে আসলেন। আমার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে ঠান্ডা গলায় জানতে চাইলেন, “আরও পিজ্জা খাবি?” আমিও নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিয়েছিলাম, “আপনি খাওয়াতে চাইলে মানা তো আর করতে পারি না স্যার!”

লোকটা সেদিন রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চিৎকার করে সে বলে উঠল, “আমি জানি তুই-ই এতগুলা পিজ্জা অর্ডার দিছিলি। কারণ এই লোকগুলার মাঝে তুই-ই সবচেয়ে ভাল হিব্রু জানস। তোর পিজ্জার শখ আমি মিটাইতেছি। আজকে থেকে তোরে একলা আটকায়ে রাখা হবে।”

এভাবেই শুরু হলো আমার দুই সপ্তাহের নির্জন কারাবাস। আরেকবার পেপারে নর্তকীদের বিজ্ঞাপন দেখে তাদেরও আনাতে চেয়েছিলাম! পরে অবশ্য নির্জন কারাবাসের কথা মনে পড়াতে নিজের বাঁদরামি বুদ্ধিকে সেবারের মতো মাটিচাপা দেই!

Courtesy: Amir Levy/Getty Images

ছয়.

জেলে থাকার দিনগুলোতে অ্যালেগ্রা নিয়মিতই আমার খোঁজ নিত, দেখা করতে আসত। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশনের শুনানির জন্য প্রতি ছয় মাস অন্তর আপিল করতে সে-ই সাহায্য করত। সুন্দর এক ভবিষ্যতের স্বপ্নও আমাকে দেখাতে শুরু করেছিল সে। একটা সময় আমি বুঝতে পারি যে তার প্রতি আমি দুর্বল হয়ে পড়েছি। কম করে হলেও বিশবার ভালবাসার কথা জানিয়েছি তাকে, কিন্তু প্রতিবারই আমাকে ‘পাগল’ বলে বিষয়টা এড়িয়ে গেছে সে।

অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশন শেষ হয় ১৯৯৮ সালে। এরপর বিভিন্ন মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনের সাথে কাজ শুরু করি, যেমন- প্যালেস্টাইনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরিং গ্রুপ এবং বেইতসেলেম। ফিলিস্তিনিদের মানবাধিকার হরণের কোনো ঘটনা ঘটলে এর তদন্তে নামতাম। পাশাপাশি লিয়া, অ্যালেগ্রাসহ অন্য যেসব আইনজীবী জেলখানায় বন্দী ফিলিস্তিনিদের নির্যাতন বন্ধে কাজ করছিলেন, তাদের সাথেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছিলাম। ১৯৯৯-এ তারা ইসরায়েলের হাইকোর্টে বেশ কিছু অমানবিক নির্যাতন বন্ধের আপিল করে এবং শেষপর্যন্ত সফলও হয়। নিঃসন্দেহে নিপীড়িত জনতার পক্ষে কাজ করা মানুষগুলোর জন্য বেশ বড় এক বিজয় ছিল এই রায়।

এর কাছাকাছি সময়েই অবশেষে অ্যালেগ্রার মনের বরফ গলাতে সক্ষম হলাম, সে আমাকে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণে রাজি হলো। শীঘ্রই এক ছাদের নিচে আসব দুজনে- এমন চিন্তাভাবনাই ছিল। এর পরপরই এক ফেলোশিপে আমেরিকায় চলে যেতে হলো ওকে। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা যে খুব বেশি দূরে নয়, সেই বিষয়ের উপরেই এক বই নিয়ে কাজ করছিল অ্যালেগ্রা। কিন্তু ও আর সেই বই শেষ করেনি, কারণ এর আগেই ২০০০ সালে শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় ইন্তিফাদা।

সেই সময় আমি বেইতসেলেমের হয়ে কাজ করছিলাম। মাঝে মাঝেই জেরুজালেমে গিয়ে ফিলিস্তিনিদের সাথে কথা বলতাম, তাদের উপর চলা বর্বরতা সম্পর্কে রিপোর্ট সংগ্রহ করতাম। ইসরায়েলের সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকা হারিৎজের রিপোর্টার গিডিয়ন লেভির সাথেও কাজ করতাম। তাকে আমি বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরই ঘুরিয়ে দেখাতাম, সত্য ঘটনা জানিয়ে সেগুলো তুলে ধরতে সাহায্য করতাম। জেরুজালেমে বেশ পরিপাটি হয়ে যেতাম আমি, সাথে রাখতাম লেদারের বেশ চমৎকার এক ব্রিফকেস, যেন আমাকে বড় ব্যবসায়ীর মতো দেখায়, যেন আমার কাজকর্ম কিছুটা সহজ হয়ে যায়। কিন্তু ২০০১ সালের মে মাসে পুলিশের হাতে ধরা পড়তে হয় আমাকে, কারণ সেখানে যাবার অনুমতিপত্র আমার ছিল না। ফলে আবারও কারাবরণ করতে হলো।

আমাকে সেই আল মুস্‌কুবিয়াতেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের ধরন সামান্যই বদলেছিল। আগেরবারের মতো এবারও হাতকড়া শক্ত করে পরিয়ে চেয়ারে বেঁধে উল্টে রাখা হলো আমাকে। তবে গতবারের মতো শরীরে আঘাত করল না এবার, বরং এবার তাদের লক্ষ্য ছিল আমাকে মানসিকভাবে আঘাত করা। আমাকে কিছু ছবি দেখানো হলো, যেখানে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছিল আমার বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। কিন্তু ওগুলো আসলে ছিল ফটোশপের কারসাজি!

অ্যালেগ্রা তখন আমেরিকায়। ফেলোশিপ শেষ করে জুনে ইসরায়েলে ফিরে আসার কথা ওর। আমার আটক হবার খবর যখন মেয়েটা জানল, তখন ও বোস্টনের এক দোকানে বিয়ের পোশাক কিনছিল! ভাগ্য ভাল যে এটা শুনে ও আর একমুহূর্তও দেরি করেনি। সময়মতোই আমার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশনের শুনানির সময় চলে আসে। সাথে লিয়াকে নিয়ে আসতেও ভুল করেনি। ছিল হারিৎজের একজন ফটোগ্রাফারও, যিনি সাক্ষ্য দেন আমার পক্ষে। অ্যালেগ্রা তো সাথে ব্যান্ড দলও নিয়ে এসেছিল, যারা আমাদের বিয়ে উপলক্ষে সুরের ঝংকার তুলবে!

কোর্টরুমেই আমাদের দেখা হয়ে গেল, আমরা সবার উদ্দেশ্যে আমাদের বাগদানের খবর জানিয়ে দিলাম। বিচারকদের জন্যও লিয়া কিছু খাবার নিয়ে গেল, সাথে জানতে চাইল আমরা আরও কিছুটা সময় একসাথে থাকতে পারব কি না। যখন কোর্ট রুমেই আংটি বদল করছি, তখন হারিৎজের সেই ফটোগ্রাফার ঝটপট বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিল। এক অদ্ভুত সুন্দর সময় ছিল সেটা।

বিচারকরা অবশ্য বড্ড বেরসিকের মতোই আচরণ করলেন। প্রসিকিউটররা বলে যেতে লাগলেন কীভাবে আমি জিজ্ঞাসাবাদে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি, গালাগালি করেছি, ‘শূয়রের বাচ্চা’ বলে চেচিয়ে উঠেছি (!), এবং বারবার বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাওয়া সত্ত্বেও তাদের কোনো তথ্যই আমি দেইনি। এসব অভিযোগের কারণে তারা আমাকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখার কথাও জানাল!

অ্যালেগ্রা সেদিন আমার জন্য সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়েছিল। সে বারবার বিচারকদের কাছে অনুরোধ করছিল আমার কবজির কাছের কালো দাগগুলো দেখতে, যা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের অমানবিক আচরণেরই সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু তারা সেগুলো দেখলেন না, বরং আমার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশনের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে দিলেন!

২০০২ সালের মে মাসে মুক্তি পেলাম আমি। এর পরপরই আমরা বিয়ে সেরে ফেলি। নভেম্বরে আবারও আমাকে গ্রেফতার করা হলো। ততদিনে অ্যালেগ্রার গর্ভে আমাদের সন্তানের পাঁচ মাস চলে। দ্বিতীয় ইন্তিফাদার মাঝামাঝি সেই সময়ে পূর্বের আরও অনেক বন্দীকেই গ্রেফতার করা হচ্ছিল। যে রাতে আমাকে গ্রেফতার করা হলো, সেদিন ওরা আসলে আমার ভাইয়ের জন্য এসেছিল। কিন্তু যেহেতু আমার আগে বেশ লম্বা সময় ধরে কারাগারে থাকার রেকর্ড ছিল, তাই ভাইয়ের সাথে আমাকেও ধরে নিল।

আমাকে এবার ছয় মাসের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশনের নির্দেশ দিয়ে অফার জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। আমি জেলে থাকার সময়ই ২০০৩ সালের এপ্রিলে আমাদের ছেলে কুদস জন্ম নিল। সন্তান জন্মের জন্য যা যা ব্যবস্থা করার দরকার, অ্যালেগ্রা একা হাতেই সেসব সামাল দিয়েছিল। এবারেরটা মিলিয়ে মোট সতেরবারের মতো আমি ছয় মাসের কারাদণ্ডাদেশ পেলাম। কোর্টে লিয়া চেষ্টা করেছিল কুদসের কিছু ছবি আমাকে দেখাতে। এটা হলে প্রথমবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে পেতাম আমি। কিন্তু অমানুষ বিচারক সেটাও হতে দিল না। উল্টো তিনি আমার সাজার মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়িয়ে দেন!

শুনানি চলাকালেই সবার অগোচরে কুদসের কিছু ছবি আমি পকেটে পুরে ফেলি। অবশেষে বাপ-ব্যাটার মিলন হলো, সেটা যেভাবেই হোক না কেন! এরপর আমার সাজার মেয়াদ আরও দু’দফা বাড়ানো হয়- প্রথমবার এক বছর আর দ্বিতীয়বার ছয় মাসের জন্য। ফলে বাসায় যাওয়া, কুদসের সাথে দেখা হওয়া- এসব হতে হতে ছেলের বয়স পাক্কা দু’বছর হয়ে গেল!

জেনে অবাক হবেন যে ততদিনে আমার কারাবন্দী জীবনের মোট বয়স সতের বছর ছুঁয়ে ফেলেছিল! এর ভেতর তের বছরই কেটেছে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশনের অংশ হিসেবে, যেখানে আমার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগই তারা উত্থাপন করতে পারেনি।

Courtesy: timesofisrael.com/Moshe Shai/Flash90/File

সাত.

২০০৪ থেকে জেলের বাইরে আমি। সর্বশেষ মুক্তি পাবার পরপরই আইন বিষয়ে পড়া শুরু করি, আর এখন অ্যালেগ্রার মতোই আমি একজন আইনজীবী! গত জানুয়ারিতে এক সামরিক আদালতে আমি এক বন্ধুর জন্য লড়েছি। সেদিন যিনি বিচারক হিসেবে ছিলেন, তিনিই এর আগে বিভিন্ন সময় আমাকে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশনের নামে কারাগারে আটকে রেখেছিলেন। সেদিন ভেবেছিলাম লোকটার মুখে ঝামা ঘষে দিয়ে বলে আসব, “দেখেন, আমিও এখন একজন আইনজীবী!” কিন্তু সেদিন ওরা আমাকে কোর্টরুমের ভেতরেই ঢুকতে দেয়নি!

প্যালেস্টাইনিয়ান অথোরিটি (পিএ) যদি কাউকে গ্রেফতার করে, তবে সেই বন্দীর পক্ষেও আমি লড়ে থাকি। ইসরায়েলি দখলদারদের চেয়ে বরং পিএ-র সাথে আমাদের দ্বন্দ্ব আরও বেশিই বলতে হবে। পিএ পরিচালিত জেলখানাগুলোতে আমি মাঝে মাঝেই কয়েদীদের সাথে দেখা করতে যাই। কখনও কখনও সেখানে নির্যাতনের যে বর্ণনা শুনি তা ইসরায়েলি জেলখানাগুলোকেও ছাড়িয়ে যায়। জেলখানায় ক্লায়েন্টদের সাথে আমি প্রতিদিনই দেখা করতে যাই। বসে খুব মন দিয়ে তাদের কথা শুনি, প্রয়োজনমতো পরামর্শ দেই। এখানকার অবস্থা আসলেই বেশ খারাপ। কোনো কেস যদি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে বন্দীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রাপ্ত তথ্য আমেরিকা, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন এই তিন দেশের গোয়েন্দা সংস্থার মাঝেই শেয়ার করা হয়।

জেলে থাকার সময় যেসব বন্দীর সাথে পরিচয় হয়েছিল, তাদের সাথে আমি এখনও দেখা করতে যাই। নতুন নতুন বন্দীদের সাথেও আলাপ করি। সেই সাথে দেখা করতে যাই লিয়া সেমেলের সাথেও। আমি আর আমার স্ত্রী দুজনের কাছেই তিনি মাতৃতুল্য এক ব্যক্তিত্ব। তিনিও মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। বেশ মহৎ হৃদয়ের এক মানুষ তিনি।

আমাদের ঘর আলো করে এসেছে দুই ছেলে আর দুই মেয়ে। ছেলেদের বয়স দশ আর সাত বছর; এরপর জন্ম নেয়া দুই মেয়ের বয়স পাঁচ আর দুই বছর। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের বড় করা অনেক সহজ। তারা খুবই শান্তশিষ্ট আর কোমল স্বভাবের হয়ে থাকে। ওদিকে ছেলেদের আবদারের যেন কোনো শেষ নেই! অবশ্য আমার ছেলেরা অমন না। তারা সবাই খুব ভাল, সবাই মিলেমিশে বাইরে খেলাধুলা করতে চায়।

বাচ্চারা এখন যে পরিবেশে বেড়ে উঠছে সেটা নিয়ে আমার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। আমি অবশ্যই চাইব আমার ছেলেমেয়েরা যেন ন্যায়বিচার পায়, স্বাধীন ও সার্বভৌম এক দেশে বেড়ে ওঠে, যেন ওদের জীবনে ‘সমস্যা’ নামক শব্দের অস্তিত্বই না থাকে। শৈশবে অনেক কিছুর শখ থাকলেও আমরা পাইনি, এর একটা আক্ষেপ আজীবনই আপনার মনে থেকে যাবে। তাই তো আমার ছেলেমেয়েরা যদি কিছুর জন্য বায়না করে, তাহলে আমি ওদের মানা করি না। মাঝে মাঝেই দামী বাইসাইকেলসহ এমন আরও জিনিস কিনে দেই।

অ্যালেগ্রা মানা করে, কিন্তু তারপরও আমি কিনে দেই। আমি চাই শৈশবে আমার মাঝে যে অভাববোধ কাজ করেছে, আমার সন্তানদের তা যেন কখনোই স্পর্শ করতে না পারে।

আমেরিকায় শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখতে যেতে পারলে আমি খুশিই হতাম। আমার স্ত্রী আমেরিকার নাগরিক। নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে আমাদের ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের ভিসা দিলে আমেরিকার নিরাপত্তা নিয়ে কী এমন সমস্যা হবে শুনি? আজ পর্যন্ত ইসরায়েলের কোনো আদালত আমাকে কোনো অপরাধে অভিযুক্ত করতে পারেনি। অনেকদিন হলো আমি ভিসা পাবার ব্যাপারে চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছি। এ নিয়ে কাজ করে এমন এক উকিল আমাদের ভিসা পাইয়ে দেবার জন্য ১,২০,০০০ ডলার চেয়েছে! এরপর থেকে আমরা ভিসার আবেদন করা ছেড়ে দিয়েছি।

ইসরায়েলের জেলে সেসব নির্যাতনের প্রভাব আমার শরীরে এখনও আছে। হাতকড়া খুব শক্ত করে লম্বা সময় পরানো থাকত। ফলে নার্ভ ড্যামেজ হয়ে যাওয়ায় আমি আমার বাম হাতে এখন তেমন একটা জোর পাই না। আর সত্যি কথা বলতে শরীর আর মনে এমন অমানুষিক নির্যাতনের ছাপ নিয়ে বেঁচে থাকাটাও সহজ কোনো কথা না। প্রতি মুহূর্তেই সেই স্মৃতিগুলো তাড়া করে ফেরে।

সেদিন জেলে না গেলে আমার জীবন আজ অন্যরকম হতে পারত। হয়তো আইনজীবী না হয়ে আমি ডাক্তার হতাম। তবে এই বিষয় নিয়ে আমি এতটা মাথাও ঘামাই না। কারণ ফিলিস্তিন, লেবানন কিংবা সিরিয়ার লাখ লাখ শরণার্থীর অবস্থাও আমার মতো। একে কেবলমাত্র ব্যক্তিগত পরিমণ্ডলে আটকে রাখার সুযোগ নেই, সমস্যা আরও বহু দূর জুড়ে বিস্তৃত।

এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই আমি কাজ করতে চাই। কারণ এটা শুধু আপনি না, বরং আপনার আশেপাশের সবার উপরেই প্রভাব ফেলে। এই দমবন্ধ অবস্থার যদি উন্নতি না ঘটে, তাহলে আমার ছেলে কুদসেরও একদিন আমার মতোই পরিণতি বরণ করতে হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই একই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে আসছে, বিগত পয়ষট্টি বছর ধরে আমরা লড়াই করে চলেছি। যদি এই দুষ্টচক্রের বিনাশ ঘটান না যায়, তবে কোনোদিনই এই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে না।

Courtesy: aa.com.tr

টীকা

১) ১৯৬৭ সালে সংঘটিত এই যুদ্ধটি ছয় দিনের যুদ্ধ, জুনের যুদ্ধ, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধ, তৃতীয় আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধ প্রভৃতি নামেই পরিচিত। সাতষট্টির ৫ জুন থেকে শুরু হয়ে ১০ জুন পর্যন্ত মোট ছয় দিন স্থায়ী হয়েছিল বিধায় এর এরুপ দিনভিত্তিক নামকরণ। দিনের হিসেবে স্থায়িত্ব যত অল্পই হোক না কেন, এই যুদ্ধের ফলাফল ঠিকই সুদূরপ্রসারী। এই যুদ্ধের একপক্ষে ছিল ইসরাইল, অপরপক্ষে মিশর, সিরিয়া ও জর্দান। মিত্রপক্ষ হিসেবে এই তিন দেশের পাশাপাশি ইরাক, লেবানন ও পাকিস্তানের অংশগ্রহণও ছিল। যুদ্ধে বিজয়ী পক্ষ ইসরায়েল, যার মাধ্যমে জেরুজালেম, পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, গোলান মালভূমি ও সিনাই উপদ্বীপ চলে যায় তাদের দখলে।

২) ১৯৪৯ সালে বেথলেহেম শহরের দক্ষিণভাগে তিন হাজার বাসিন্দার হিসেবে এই শরণার্থী ক্যাম্পটি তৈরি করা হয়। বর্তমানে এখানে প্রায় এক বর্গ মাইল এলাকায় রয়েছে ষোল হাজারের মতো শরণার্থীর বসবাস।

৩) বিনা বিচারে কেবল রাষ্ট্রের নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে যখন কাউকে গ্রেফতার করা হয়, তখন সেটাকে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিটেনশন বলা হয়। বিরোধীপক্ষকে দমাতে কিংবা সরকারবিরোধী যেকোনো কর্মকান্ড প্রশমনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশই এই পন্থাবলম্বন করে থাকে।

৪) ইসরাইলে বসবাসরত ফিলিস্তিনি মানবাধিকারকর্মী বাস্‌সেম ইদের হাত ধরে ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করে প্যালেস্টাইনিয়ান হিউম্যান রাইটস মনিটরিং গ্রুপ বা সংক্ষেপে পিএইচআরএমজি। পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা এবং পূর্ব জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় কাজ করত প্রতিষ্ঠানটি। পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে ২০১১ সালে বন্ধ হয়ে যায় অলাভজনক এই সংস্থা।

৫) ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত অলাভজনক এই সংস্থাটি ইসরায়েলের দখলকৃত অঞ্চলসমূহে মানবাধিকার রক্ষা সংক্রান্ত কর্মকান্ড পরিচালনা করে আসছে।



আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে, তাহলে পড়তে পারেন স্বরে অ থেকে প্রকাশিত মুহাইমিনুল ইসলাম অন্তিক এর ওয়ার ডায়েরি সিরিজের তৃতীয় বই, “ফিলিস্তিনের আর্তনাদ: নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা” বইটি। আর্টিকেলটি মূলত এই বইয়েরই নির্বাচিত একটি অংশ।
বইটি কিনতে পারবেন রকমারির এই লিঙ্ক থেকে, বুকশেয়ারের এই লিংক থেকে অথবা অনলাইনে পড়তে চাইলে পড়তে পারেন বইটই অ্যাপের এই লিঙ্ক থেকে।

Featured Image: AFP/Daily Sabah

আপনার মন্তব্য লিখুন